Home » বিশেষ নিবন্ধ » ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানতে সরকারি উদ্যোগ

ইসলামী দলগুলোকে কাছে টানতে সরকারি উদ্যোগ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

islamic_parties-1-সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে কাছে টানতে উদ্যোগ নিয়েছে। আপাতত ধর্মবিরোধী ব্লগ ইস্যুতে তারা তাদের আন্দোলন থেকে নিবৃত্ত করতে চাইলেও, এর পেছনে উদ্দেশ্য দুটো : যেহেতু জামায়াত বিএনপির দিকেই, সে কারণে, অন্যসব ইসলামী দলগুলোকে তাদের থেকে আলাদা করে রাখা। দ্বিতীয়ত, চিন্তাটি সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদী। আর এটি হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে যাতে আওয়ামী লীগ ওই সব দলগুলোকে দিয়ে নির্বাচনী ফায়দা নিতে পারে। এটা হতে পারে, ইসলামী দলগুলোকে দিয়ে বিএনপিজামায়াত বিরোধী একটা জোট গঠন করা। এছাড়া, গ্রামেগঞ্জে এমন প্রচারপ্রচারণা চালানো যে, আওয়ামী লীগ কোনোক্রমেই ইসলামবিরোধী দল নয়, ইসলামের শত্র“ও নয়। এ পদ্ধতিকে সরকার এখন থেকেই কাজে লাগাতে চাইছে। সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রচারপ্রচারণা বন্ধ করার উদ্যোগের পাশাপাশি আপাতত জামায়াতবিরোধী একটি ইসলামী জোট গঠনের জোর চেষ্টা চলছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ মুহূর্তে যদি জামায়াতবিরোধী জোট গঠন করা নাও যায়, তাহলে অন্তত অন্য ইসলামী দলগুলোর সরকারবিরোধী আন্দোলন, প্রচারণা বন্ধ করার চেষ্টা তাদের রয়েছে।

গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সিনিয়র মন্ত্রীদের বৈঠকে জামায়াতের বাইরে ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী এখন কাজ চলছে। এদিকে, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ধর্ম নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে কিছু না লেখার ব্যাপারে বলা হয়। ওই মন্ত্রণালয় থেকেই সংবাদ সম্মেলন, মোবাইল ফোনে এসএমএসসহ নানা কৌশল এবং ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে রাজনীতি না করার ব্যাপারে বক্তব্য দিলেও জামায়াতকে নিয়ে তারা আন্দোলন করেছিলেন, এমনকি ২০০৬ সালে একটি ইসলামী দলের সঙ্গে চুক্তিও তারা করেছিলেন।

ধর্মবিরোধী ব্লগ ইস্যুতে বেকায়দায় পড়ায় সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন দেশের ইসলামপন্থী দলগুলো এবং ধর্মীয় নেতারা। এজন্য জামায়াতের বাইরে ইসলামী দলগুলো এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে সরকার। জামায়াতশিবিরের প্রতিরোধ যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানে নতুন কোনো প্রতিপক্ষ বানাতে চাচ্ছে না সরকার। ইতিমধ্যে সরকারের দুজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, ইসলামী দল ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার। চট্টগ্রাম এলাকার একজন মন্ত্রী ইতিমধ্যে ঢাকার এবং সেখানকার ইসলামী দল ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বসে পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর ঢাকার একটি আসন থেকে নির্বাচিত এক প্রতিমন্ত্রী রাজধানীর ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ব্লগার রাজীব হায়দার খুন হওয়ার পর ইসলামের বিরুদ্ধে ব্লগের কথা প্রকাশ হওয়ার পর সারা দেশের ইসলামী দল, গ্র“প এবং ধর্মীয় নেতারা যেভাবে আন্দোলনে নেমেছিলেন, সরকার তাদের অনেকটা নিবৃত্ত করতে সফল হয়েছেন বলেও অনেকে মনে করছেন।

গত ১৫ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে খুন হন ব্লগার রাজীব হায়দার। তিনি শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। রাজীবের মৃত্যুর পর কয়েকটি মিডিয়ায় ইসলামের ব্যাপারে তার ব্লগের কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়। প্রথম যে দৈনিকটি এ বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রচার করে সেটি দীর্ঘদিন এদেশের কিছু ইসলামীপন্থী দল ও ধর্মীয় নেতাদের সপক্ষের বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু ‘পত্রিকাটির মালিকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য গড়ে ওঠার পর তারা ওই পত্রিকাটিকে এড়িয়ে চলেন। এককালের প্রতাপে চলা ওই দৈনিকটির বর্তমান অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। ব্লগার রাজীব ইস্যুতে পত্রিকাটি আবারো ইসলামপন্থী দল ও তাদের নেতাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে। এর পরপরই বিএনপি ও জামায়াতপন্থী তিনটি পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে ইসলামবিরোধী ব্লগের কথা প্রচার করতে থাকে। ধর্মীয় নেতারা, যারা জীবনে ব্লগের নামও শুনেননি, তারাও এ ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেন। ইসলামের ব্যাপারে কটূক্তি করা হচ্ছেএমন অভিযোগ এনে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন তারা।

গত ২২ ফেব্র“য়ারি একযোগে সারা দেশের মসজিদ থেকে ‘নাস্তিক ব্লগারদের’ শাস্তির দাবিতে মিছিল বের হয়। এদিন সারা দেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন মারা যায়। সরকার প্রথমে এই আন্দোলনকে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে জামায়াতশিবিরের আন্দোলন’ বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। সরকার মনে করছে, এটা জামায়াতশিবিরের কোনো আন্দোলন নয়। ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় বিষয়টি সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে, সরকার তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চায়।

ইসলামী দল এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোর জন্য সরকার প্রথমে তাদের নিজেদের লোক হিসেবে পরিচিত শোলাকিয়ার ইমাম মাওলান ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে দায়িত্ব দিতে চাচ্ছিল। কিন্তু ফরীদ মাসঊদ তা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ কওমি মাদ্রাসার আলেমওলামার কাছে তার ইমেজ ভালো নয়। তাছাড়া সম্প্রতি শাহবাগে গিয়ে সেখানকার আন্দোলনের সঙ্গে প্রকাশ্যভাবে একাত্মতা ঘোষণা করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইসলামী দল ও ধর্মীয় নেতারা।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, চলমান আন্দোলন ইস্যুতে আলেমদের মধ্যে দুটি ভাগ হয়ে গেছে। বাহ্যিকভাবে সবার অবস্থান সরকারের বিরুদ্ধে হলেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। সন্দেহ ও অবিশ্বাস কাজ করছে আলেমদের মধ্যে। মূলত নেতৃত্ব সংকটের কারণে সরকার তাদেরকে একক কোনো প্লাটফর্মে জড়ো হতে পারেননি। বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের জন্য এক হলেও তারা বহু দলউপদলে বিভক্ত। বর্তমান ইস্যুতেও আলেমদের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে সমঝোতা রক্ষা করে চলছে। আর অপর অংশটি জামায়াত দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত বলে জানা গেছে।

চরমোনাইর পীরের দল হিসেবে পরিচিত ‘বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের’ সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই দলটি পল্টন মোড়ে সমাবেশ করেছে। শায়খুল হাদিসের দল হিসেবে পরিচিত ‘বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস’ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির পাঁচ দফা চুক্তি হয়েছিল। মোহাম্মদপুর সাত মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসাটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। খেলাফত মজলিসের অপর অংশটি ১৮ দলীয় জোটের শরিক। হাফেজ্জী হুজুরের দল হিসেবে পরিচিত ‘খেলাফত আন্দোলন’ জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করে চলে।

সূত্র জানায়, চলমান আন্দোলনে উল্লিখিত দলগুলো স্ব স্ব অবস্থান থেকে সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন হিসাবনিকাশ মিলিয়ে দলগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করছে। এসব দলের মধ্যে অরাজনৈতিক কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বা বেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রতিষ্ঠানটিও বর্তমান সরকারের একটি সুসম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

সবশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘ঈমান ও দেশরক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি নতুন ইসলামী জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ইসলামী বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখতেই এই জোটের যাত্রা। জামায়াতে ইসলামীর বাইরে আটটি দল মিলে এই জোটের সূচনা হয়। এই জোটকে ‘জামায়াতবিরোধী জোট’ বলেও উল্লেখ করা হয়। এই জোটের আহ্বায়ক করা হয় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের সহসভাপতি মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমীকে। আর সদস্য সচিব হন শায়খুল হাদিসের মেজো ছেলে মুফতি মাহফুজুল হক। একটি সূত্রের দাবি, এই জোটটি সরকারই গঠন করিয়েছে। এখান থেকে কৌশলে জামায়াতবিরোধী বক্তব্য বের করতে চাচ্ছে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই জোটের এক নেতা জানান, আট দল নিয়ে জোটের যাত্রা শুরু হলেও এখন এর সঙ্গে দুই তিনটি দল আছে। সরকারের সঙ্গে এই জোটের যোগাযোগের কথা জানার পর অনেকেই এ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এই সুযোগে জামায়াতে ইসলামী চাচ্ছে, ইসলামী দলগুলোর একটি অংশকে তাদের পক্ষে কাজে লাগাতে। এজন্য তারা আটটি দল নিয়ে পাল্টা আরেকটি জোটের সূচনা করিয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকার চাচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে। প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধও করতে পারে। এই মুহূর্তে আলেমদের শত্র“ বানাতে চাচ্ছে না সরকার। এতে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ইসলামী অন্যগুলোর ব্যাপারে নরম ভূমিকায়। মাওলানা আব্দুল লফিত নেজামী ও মুফতি ওয়াক্কাসসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার ছেড়ে দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষে থাকার জন্য নানাভাবে ইসলামী দল, ধর্মীয় নেতাদের ওপর সরকারি চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।।