Home » অর্থনীতি » দ্রব্যমূল্য – এক সপ্তাহেই চালের দাম বেড়েছে ৪ টাকা

দ্রব্যমূল্য – এক সপ্তাহেই চালের দাম বেড়েছে ৪ টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদক

unstable-economy-1-মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে চালের দাম মানভেদে কেজিপ্রতি ২৪ টাকা বেড়েছে। এক মাসে বেড়েছে ৭ টাকা। ভোজ্যতেল (বোতলজাত ও খোলা) এক সপ্তাহে লিটারপ্রতি বেড়েছে ৫ টাকা। দুই মাস আগে এটি বিক্রি হয়েছে ১০ টাকা কমে। প্রতি কেজি সয়াবিন তেল (লুজ) বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়। বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। ৫ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৬৫০৬৭৫ টাকা পর্যন্ত। সরকার মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে দাবি করলেও বাজার বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমান সরকারের চার বছরে দ্রব্যমূল্য দ্বিগুন থেকে চারগুন হয়েছে। সে তুলনায় বাড়েনি সাধারণ মানুষের আয়। বরং আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার মান কমছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকে সঞ্চয় ভেঙেও চলছেন। এর ফলে দেশে সামাজিক অস্থিরতার আলামত দেখা যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির সূচক যত উঁচুতে গেছে বলে বলা হোক না কেন, এর সুফল পাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। আয়বৈষম্যের কারণে সাধারণ মানুষের অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। বরং নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে অবস্থার অবনতিই হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা খুব বেশি কাজে আসেনি। এতে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। এবং স্বল্প ও সাধারণ আয়ের মানুষ মাছমুরগির আশা ছেড়েই দিয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত এসব মানুষের সামনে এখন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাল, তেল, পেঁয়াজ, ডিম প্রভৃতি নিত্যপণ্য। নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে চালের দামও। অর্থনীতিতে মন্দাভাব, সরকারিবেসরকারি উন্নয়ন কাজে ধীরগতিসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে অস্বাভাবিক হারে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছে। এছাড়া টানা হরতালে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায়ও দাম বাড়ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

এদিকে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের শেষ সময়ে হঠাৎ করে চালের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট জেলায় চাল, তেল, মসলা, ডাল, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়। কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে সাময়িকভাবে তার ট্রেড লাইসেন্স বাতিল অথবা পণ্য জব্দ করার নির্দেশ দেয়া হয়। পাইকাররা পাকা রসিদে পণ্য বিক্রি করছে কিনা তা নজরদারি করার নির্দেশ দেয়া হয়। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও চালের মূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি চালের দাম ৩৫ টাকা বাড়াকে অস্বাভাবিক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি উন্নত মানের মিনিকেট ৪৮৫০, নিম্নমানের ৩৬৪৮, নাজিরশাইল উন্নতমানের ৪৫৪৮, নিম্নমানের ৩৪৩৫, লতা ৩৪৩৫ ও মোটা চাল ৩০৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ২০০৯ সালে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে প্রতি কেজি ভালো মানের নাজির/মিনিকেট ৩৩৩৮ টাকা, সাধারণ মানের নাজির/মিনিকেট ৩৩৩৮, ভালো মানের পাইজাম/লতা চাল ৩৩৩৪ ও সাধারণ মানের পাইজাম/লতা চাল ৩২৩৩, মোটা চাল স্বর্ণা/চায়না ২৯ টাকা। ফেব্র“য়ারির শেষ সপ্তাহে মসুরের ডাল বিক্রি হয়েছে ১৪৫ টাকায় এখন বিক্রি হচেছ ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজির দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে বেড়ে ৩০০ টাকায়। খাসির গোশত ৪৩০ বেড়ে থেকে ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আলু ৪০, মুলা ৪০, পেপে ৩০, গাজর ৪০, শসা ৪৫, শালগম ৪৫, টমেটো ৬০, বাঁধাকপি ৪৫, ফুলকপি ৬০, শিম ৭০, বেগুন ৮০, লাউ ৯০, শিমের বীচি ১৬০ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও এসব পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ৫১০ টাকা কম ছিল। বিভিন্নপর্যায়ের ক্রেতাবিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পনের দিন ধরে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। পাইকারী বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে পণ্যমূল্য অধিক। পণ্য ভেদে কেজিতে ৫৮ টাকা পর্যন্ত দাম বেশি রাখছে খুচরা বিক্রেতারা। এলাকা ভেদেও দামের হেরফের লক্ষ্য করা যায়।

বাজার তদারকের জন্য মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটি থাকলেও প্রকৃত পক্ষে সংশ্লিষ্টদের মাঝে এর খুব একটা উৎসাহ কিংবা প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। পৃথক ও যৌথভাবে নানা সময় তৎপরতা দেখালেও বাজারে এর কোন ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আইন না মানার অপরাধে তেমন কোন শাস্তি না দেয়ায় ব্যবসায়ীদের মাঝে কোন দায়বোধও জন্মাতে দেখা যায়নি।

সরকার বরাবর নানা কথা বললেও বাজারে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রেখেছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। সরকারের তোড়জোড় আর হুমকিধমকি কোন কাজে আসেনি। দাম বেড়েছে সমান তালে, যেভাবে ওই সিন্ডিকেট চেয়েছে। অভিযোগ ছিল সরকারের উপর মহলের অনেকেরই এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল এবং তারা সেখান থেকে ফায়দাও নিয়েছে। বছরের প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন পণ্যের দাম বেড়েছে।

তেল পরিশোধন কারখানা, চিনিকল সবখানেই ছিল মিলমালিকদের তেলেসমাতি। তারা গুদামজাত করে রাখেন পণ্য। বাজারে ছাড়েননি। অল্প অল্প ছাড়েন। এভাবে সঙ্কট সৃষ্টি করে ফায়দা নেয়া হয় বাজার থেকে। পণ্য না ছাড়তে তারা নানা অজুহাত দেখান। এলসি খোলার পরও পণ্য আমদানি হচ্ছে না। জাহাজ থেকে খালাস হচ্ছে না। জাহাজে আছে। উৎপাদন কম হচ্ছে ইত্যাদি। কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর খাদ্য মন্ত্রণালয় দেশে তাদের পণ্যের যোগান পর্যাপ্ত বললেও ব্যবসায়ীরা সব সময়ই সঙ্কটের নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। এখন ধানের ভরা মওসুমেও চালের দাম তেমন কমেনি। কৃষকের কাছ থেকে অল্প দামে ধান কিনে মিল মালিকরা বেশি দামে বিক্রি করছেন। এরকম অভিযোগ অহরহ রয়েছে।

ক্যাব পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। ১৮ টাকার দেশী পিয়াজ ৭০ টাকা। ২০১২ সালের শুরুতে ১৮ টাকা বিক্রি হলেও তা এখন ৭০ টাকা। শতকরা ২৮৯ টাকা বেড়েছে। আমদানিকৃত ১৮ টাকা থেকে ৪৩ টাকা হয়েছে। ডিমডিমের হালি লাল ফার্ম ১০ টাকা বেড়ে ২৮ থেকে ৩৮ টাকা হয়েছে। আটা খোলাবছরের শুরুতে কেজি ছিল ২৯ টাকা। তা বেড়ে এখন ৩৪ টাকা। প্যাকেট প্রতি ৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা কেজিতে ১১ শতাংশ বেড়েছে। ময়দা বছর গড়াতে ৪০ টাকা থেকে ৪৮ টাকা হয়েছে। ডাল মসুর ক্যাঙ্গারু বছরের শুরুতে ৭৫ টাকা ছিল। তা এখন বেড়ে ১৪৫ টাকা। দেশী মসুর ডাল ৯০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, খেসারি ৪২ টাকা থেকে ৮৪ টাকা, ছোলা (ভাঙা) ৮২ টাকা থেকে ১০০ টাকা। চাল কাটারি ভোগ ৬৪ থেকে ৭৬ টাকা, চিনিগুঁড়া ৭৫ থেকে ১১০ টাকা (৪৭ শতাংশ বেড়েছে), কালোজিরা ৭০ টাকা থেকে ৯৫ টাকা হয়েছে। তবে চালের মধ্যে কিছু আইটেমের দাম অল্প কমেছে এই সময়ে। লবণ কেজিতে মোল্লা সুপার কেজি ২৪ টাকা থেকে ৩৩ টাকা, ব্র্যাক ২৫ থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা, কনফিডেন্ট ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, এসিআই ২৫ থেকে ৩২ টাকা, ফ্রেশ ২৪ থেকে ৩৪ টাকা বেড়েছে কেজিতে।

বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, প্রায় সবক’টি পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের দিন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি এক হালি মুরগির ডিমের দাম ছিল ২৩ থেকে ২৫ টাকা। চার বছরের ব্যবধানে একই ডিমের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি হালিতে ডিমের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। একইভাবে ১৪২০ টাকার লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৮৩০ টাকায়, অর্থাৎ প্রতি কেজি লবণে ৫১০ টাকা বেড়েছে। ২৩২৫ টাকার খোলা আটার দাম চার বছরের ব্যবধানে ৩৫৩৬ টাকা, ৩২৩৮ টাকার ময়দা বেড়ে ৫০ টাকা, খোলা সয়াবিন ৮৮৯৪ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০১৩৫ টাকা এবং মানভেদে ৭৬ থেকে ১০৫ টাকার মসুর ডালের দাম বেড়ে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এক নম্বর প্রতিশ্র“তি ছিল, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু সরকারের কার্যকলাপে মনে হয়, তারা এ অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন। যেসব পদক্ষেপ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, সরকার যেন সেসব পদক্ষেপ গ্রহণেই বেশি উৎসাহী। সব মহলের আপত্তি সত্ত্বেও ষষ্ঠবারের মতো বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এসব পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।।