Home » আন্তর্জাতিক » নারী নির্যাতন মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে

নারী নির্যাতন মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী দিবসে আমাদের বুধবারএর বিশেষ প্রতিবেদন

ফরিদা আখতার

women_day-1-বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে বলে আমরা অনেকেই আতঙ্কিত হচ্ছি, কিন্তু হঠাৎ করে যেন নারী নির্যাতন সহিংসভাবেই বেড়ে গেছে। সংক্রামক রোগ যেমন ছড়ায় তেমনি নারী নির্যাতনও এখন মহামারী রোগের মতো ছড়িয়ে গেছে।এই মহামারীতে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন, তাদের মেরেও ফেলা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে, না হলে তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে চলন্ত কোন পরিবহন থেকে। একটি ঘটনা ঘটলে এবং তার প্রতিবাদ হলে আবার একই কায়দায় অন্য এলাকায়ও ঘটছে। পত্রিকায় ছাপা হওয়া বর্ণনা যেন পথ বাতলে দিচ্ছে পরবর্তী ঘটনা কেমন করে ঘটবে। একটি খারাপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যে এই ভয়াবহ ঘটনা পাঠকের গাসওয়া হয়ে যাচ্ছে। শিরোনাম দেখে বাকী খবর কেউ পড়ছে না। কারণ এই ধরণের খবর পড়লে বা দেখলে মন ভীষণভাবে খারাপ হয়ে যায়, এবং সমাজের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায়। তার চেয়ে না পড়াই ভাল। যারা আন্দোলন করেন, তাঁরাই নিজ গরজে পাঠ করেন।

আমি এখানে ধর্ষণের ঘটনার পাশাপাশি অন্য ধরণের নির্যাতনের কিছু চিত্র তুলে ধরতে চাই। যৌতুকের কারণে হত্যার ঘটনা এখনো ঘটছে, যদিও নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনে এটা একটু কম উল্লেখ করা হয়।শুধু ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসেই ২৩টি যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১০জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। পত্রিকার খবরে দেখা যায়, যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় নাজমার স্বামী যৌতুকের জন্য মার ধর এবং পরে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তালা দিয়ে চলে যায়।এলাকাবাসীর সহায়তায় হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে।এই ধরণের ঘটনা আরো বহু আছে।

নারী নির্যাতন বাংলাদেশের সবখানেই ঘটছে। রাজধানী ঢাকা, এর চারপাশের জেলা থেকে শুরু করে টাঙ্গাইল, মধুপুর, চাপাই নবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, দুর্গম পাহাড়ী এলাকা কোথাও বাদ নেই।আর কারা ধর্ষিত হচ্ছে? বয়সের দিক থেকে তারও কোন বাছবিচার নেই। ছোট ৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী, স্কুল ছাত্রী, গৃহকর্মী, গৃহবধু, গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সব বয়সের ও পেশার নারী আজ হুমকির মুখে।প্রতিবন্ধি নারীরাও বাদ পড়ছেন না নির্যাতনকারীর হাত থেকে।পাহাড়ের আদিবাসী নারীদের ওপর বর্বর অত্যাচার হয়েছে।

কারা করছে এই জঘন্যতম কাজ? ইদানীং প্রকাশিত ঘটনায় দেখা যাচ্ছে গণধর্ষণ বেশী হচ্ছে, এবং তা করছে কিছু ‘যুবক’। এদের পরিচয় সব সময় জানা যাচ্ছে না। তবে এদের যখন ধরা হয় না, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এরা রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত অবস্থানে আছে। পুলিশ এদের কখনোই খুঁজে পায় না। উলটা নির্যাতিতা নারী এবং তার পরিবার একবার মুখ খুললেও পরে চুপ হয়ে যাচ্ছে, বা নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মানিকগঞ্জের বাসে গার্মেণ্ট শ্রমিকের ধর্ষণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সরকার তাদের ধরবে বলে কথা দেয়ার সাথে সাথেই বাসের চালক ও হেলপার ঠিকই ধরা পড়লো। অর্থাৎ ধর্ষণকারীদের শাস্তি দেয়া মোটেও আসুবিধা হবার কথা নয় যদি পুলিশ এবং সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেয়, নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে লাগাতার কর্মসুচি নেয়া হয়, পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশনে খুব প্রচার করা হয়। তাহলে বিচারের প্রথম ধাপ অবশ্যই পার করা যায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে সকল ঘটনা একই মাত্রায় মিডিয়া এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না।সেখানে স্থানীয়ভাবে নারী আন্দোলন কর্মী এবং সামাজিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানালেও সেই আওয়াজ রাজধানীতে বাজে না।

নির্যাতনকারীদের তালিকায় স্বামী যেমন আছেন তেমনি স্কুল শিক্ষক, হাসপাতালের ডাক্তার কেউ বাদ নেই। তবে এই হিসাবের মধ্যে নারীর জীবনের অন্য সকল নির্যাতন উপেক্ষিত হচ্ছে। গেটে তালা দেয়ার কারণে গার্মেন্ট কারখানায় আগুনে পুড়ে নারীর শরীর ঝলসে যাচ্ছে, মরার পর তাকে সনাক্ত করা যাচ্ছে না, কারখানা ভেতর তার জ্যান্ত কবর রচিত হচ্ছে তার কথা তো নাই । এখানে দেশের উন্নয়নের নামে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচীর আওতায় এনে নারীর শরীরকে গিনিপিগ বানানো হচ্ছে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ডেপোপ্রভেরানরপ্লান্ট নিয়ে পরীক্ষা চালানোর জন্য। কৃষি ফসল উৎপাদনে বিষ ব্যবহার করায় নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য বিকল হচ্ছে, সে বন্ধ্যাত্বে ভুগছে, কিংবা মৃত সন্তান জন্ম দিচ্ছে। নারীর ওপর নির্যাতনের আরও বহু ধরণ আছে যার কারণে নারী সারা জীবন ধুঁকে ধুঁকে মরে, তার মর্যাদাহানী হয়। ব্যাক্তি পর্যায়ে নারীর ওপর যে নির্যাতন হয় তার বিরোধিতা করতে হবে অবশ্যই, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে সামগ্রিক কাঠামোগত কারণে নারী নির্যাতনের নানান রূপ যেন আমাদের নজর থেকে অদৃশ্য হয়ে না যায় সেই দিকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কাঠামোগত ভাবে নারী নির্যাতনকে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হলে ধর্ষণের মতো সহিংসতাও বন্ধ করা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।

কিন্তু এত সব কিছুর পরও কোথায় যেন একটা নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এই ব্যাপারে কোন সাড়া শব্দ নেই। প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোন ভাষণে নারীদের নির্যাতন বন্ধের কোন উদ্যোগ নিয়ে কথা বলতে শুনি নি। বিরোধী দলীয় নেত্রীও চুপ থাকেন। এই দেশের নারীদের নিরাপত্তা দেয়ার প্রশ্ন কি জাতীয় ইস্যু নয়?