Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প (দ্বিতীয় কিস্তি)

কর্পোরেট সংবাদ মাধ্যম, ড্যাম নির্মাণ আর দমনের কলাকৌশল

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-2ব্যাপক বিদ্রোহ ও যুদ্ধের কারণেই কেবল আমরা মধ্য ভারতের প্রতিবেশগত ও সামাজিক পুনঃগঠনের বিষয়টি জানতে পারছি। সরকার কোনো তথ্য দেয়নি। সমঝোতা স্মারকগুলোর সবই গোপন রাখা হয়েছে। মিডিয়ার কিছু কিছু অংশ মধ্য ভারতে যা কিছু ঘটছে, সে স¤পর্কে লোকজনকে অবগত করছে। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের বেশির ভাগই এ কারণে দুর্বল যে, এর আয়ের প্রধান অংশটি আসে করপোরেট বিজ্ঞাপন থেকে। এটাও যদি যথেষ্ট খারাপ বিবেচিত না হয়ে থাকে, তবে তার চেয়েও কঠিন খবর হলো মিডিয়া ও বৃহৎ ব্যবসায়ের মধ্যকার রেখাটি বিপজ্জনকভাবে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আমরা দেখেছি, আরআইএল প্রকৃতপক্ষে ২৭টি টিভি চ্যানেলের মালিক। তবে বিপরীতটাও সত্য। কোনো কোনো মিডিয়া হাউজ ব্যবসা ও করপোরেট স্বার্থ পরিচালনা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই অঞ্চলের অন্যতম দৈনিক পত্রিকাদৈনিক ভাস্কর (এটা কেবল একটি দৃষ্টান্ত)- ১৩টি রাজ্যে ইংরেজি ও হিন্দিসহ চারটি ভাষায় এক কোটি ৭৫ লাখ লোকের হাতে পৌঁছে। খনি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রিয়েল এস্টেট, টেক্সাইলসহ ৩৯টি কোম্পানির মালিকও সে। সম্প্রতি ছত্তিশগড় হাইকোর্টে দায়ের করা এক রিট পিটিশনে অভিযোগ করা হয়, ডিবি পাওয়ার লিমিটেড (গ্র“পের একটি কোম্পানি) উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রশ্নে শুনানির ফলাফলে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে কোম্পানির মালিকানাধীন সংবাদপত্রগুলোর মাধ্যমে ‘সতর্ক, অবৈধ ও কৌশলী কার্যক্রম’ গ্রহণ করেছে। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করুক বা না করুক সেটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়। আসল কথা হলো, মিডিয়ার সেটা করার অবস্থা রয়েছে। তারা সেটা করার ক্ষমতা রাখে। বিদ্যমান বাস্তবতায় তাদের মারাত্মক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংঘাতে তাদেরকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

দেশের আরো অংশ রয়েছে এবং সেখান থেকে কোনো খবর আসে না। প্রায় জনশূন্য, তবে সামরিকায়নকৃত উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে ১৬৮টি বৃহৎ ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই বেসরকারি মালিকানায়। মনিপুর ও কাশ্মীরে (উভয় রাজ্যই উচ্চ মাত্রায় সামরিকায়নকৃত) উঁচু বাঁধগুলো অনেক জেলা ডুবিয়ে দিতে পারে। এসব রাজ্যে বিদ্যুৎ স্থাপনা নির্মাণের প্রতিবাদ করলেই লোকজনকে হত্যা করা হয়। কাশ্মীরে এমনটাই ঘটেছে। তাহলে তারা কিভাবে বাঁধ বন্ধ করবে?

সবচেয়ে প্রবঞ্চনামূলক ড্যাম হলো গুজরাটের কল্পসার। গালফ অব খামভাতজুড়ে ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্যামটিতে ১০ লেনের হাইওয়ে এবং একটি রেলওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সাগরের লোনা পানি দূরে রাখার মাধ্যমে গুজরাটের নদীগুলোর জন্য মিঠা পানির সংরক্ষণাগার নির্মাণের আইডিয়া হিসেবে এটা গৃহীত হয়। (প্রকৃত ঘটনা হলো, এসব নদী অনেক আগেই রাসায়নিক আবর্জনায় নিষ্কাষণ নালায় পরিণত হয়েছে এবং বিষাক্ত হয়ে পড়েছে)। কল্পসার ড্যামের কারণে সমুদ্রস্তর উঁচু হয়ে উঠতে পারে এবং উপকূলের শত শত কিলোমিটার এলাকার প্রতিবেশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারেএমন আশঙ্কায় ১০ বছর আগে আইডিয়াটি বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু ধলেরা স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট রিজিয়ন (এসআইআর)-এ পানি সরবরাহ করার জন্য হঠাৎ করে পরিকল্পনাটির প্রত্যাবর্তন ঘটে। মনে রাখতে হবে, ওই অঞ্চলটি কেবল ভারতে নয়, বিশ্বের অন্যতম পানি ঘাটতি এলাকা। এসআইআরএর অপর নাম এসইজেড। এটা ‘শিল্প পার্ক, টাউনশিপ ও মেগাসিটি’র স্বশাসিত করপোরেট ডিসটোপিয়া (যে কল্পিত জগতে জীবন অত্যন্ত কষ্টকর, নানা বঞ্চনা, যন্ত্রণায় বিধ্বস্ত)। ধরেলা এসআইআর ১০ লেনের হাইওয়ের মাধ্যমে গুজরাটের অন্যান্য নগরের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই অর্থ কোত্থেকে আসবে?

২০১১ সালের জানুয়ারিতে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মহাত্মা (গান্ধী) মন্দিরে ১০০টি দেশের ১০ হাজার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তারা গুজরাটে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্র“তি দেন। সভাটি হওয়ার কথা ছিল ২০০২ সালের ফেব্র“য়ারিতে দুই হাজার মুসলিমকে হত্যা করার দশম বার্ষিকীকালে। মোদির বিরুদ্ধে কেবল না দেখার ভান করা নয়, তিনি সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে মদদ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। যারা তাদের প্রিয়জনকে ধর্ষিতা হতে দেখেছে, বীভৎসভাবে খুন করা হয়েছে, আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, যে লাখ লাখ লোককে তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তারা এখনো ন্যায়বিচারের প্রহর গুণছে। তবে মোদি তার গেরুয়া রুমাল আর সিঁদুর চর্চিত কপালের বদলে ব্যবসায়িক স্যুট গ্রহণ করে আশা করছেন, ৪৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ব্ল্যাডমানি হিসেবে কাজ করবে এবং সব হিসাব চুকিয়ে দেবে, হয়তো তা হবে। বড় বড় ব্যবসা তাকে আগ্রহভরে সমর্থন দিচ্ছে। ‘অসীম ন্যায়বিচারের বীজগণিত’ (দি অ্যালজেব্রা অব ইনফিনিট জাস্টিজ) কাজ করে রহস্যজনক পন্থায়।

যে ডিসটোপিয়া নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার অভ্যন্তরে ধলেরা এসআইআর কেবল একটি অপেক্ষাকৃত ছোট, ভেতরে থাকা ম্যাট্রিয়শকা পুতুল (রাশিয়ার এক ধরনের পুতুলের সেট, যাতে পাশাপাশি রাখা পুতুলগুলো ক্রমশ ছোট হতে থাকে, একটির ভেতরে অন্যটি ঢোকানোও যায়)। ১৫ শ’ মিটার দীর্ঘ ও ৩০০ মিটার প্রস্থের শিল্প করিডোরের মাধ্যমে এটাকে দিল্লি মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোরের (ডিএমআইসি) সঙ্গে যুক্ত করা হবে, যেখানে থাকবে নয়টি মেগা শিল্প জোন, একটি হাইস্পিড ফ্রেইট লাইন, তিনটি সমুদ্রবন্দর ও ছয়টি বিমানবন্দর, একটি ছয় লেনের ইন্টারসেকশনমুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে এবং একটি চার হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্লান্ট। ডিএমআইসি হলো ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের প্রস্তাবিত ভারত ও জাপান সরকার এবং তাদের নিজ নিজ করপোরেট পার্টনারদের মধ্যকার একটি যৌথ উদ্যোগ।

ডিএমআইসি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের কারণে ১৮ কোটি মানুষ ‘ক্ষতিগ্রস্তরা’ হবে। তবে টিক কিভাবে, তা এতে বলা হয়নি। প্রকল্পটিতে বেশ কয়েকটি নতুন নগরী নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। ধারণা করা হয়, ২০১৯ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের জনসংখ্যা ২৩ কোটি ১০ লাখ থেকে বেড়ে ৩১ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। সেটা হবে সাত বছরে। শেষ কখন কোন রাষ্ট্র, উৎপীড়ক বা স্বৈরাচার কোটি কোটি মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে ছিল? শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এটা করা কি সম্ভব?

ভারতীয় সেনাবাহিনীকে হয়তো একটি নিয়োগ অভিযান চালাতে হবে, যাতে এই বাহিনীকে যখন সমগ্র ভারতে মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হবে, তখন তা অপ্রত্যাশিত মনে না হয়। মধ্য ভারতে ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি হিসেবে বাহিনীটি তার সামরিক মনতাস্তি¡ক বা মিলিটারি সাইকোলজিক্যাল অপারেশন্স বিষয়ক হালনাগাদ ডকট্রিন জনসম্মুখে প্রকাশ করে, যা ‘দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য হাসিলে সহায়ক কাক্সিক্ষত দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব সৃষ্টিকারী বিশেষ বিষয়বস্তু বিকাশের জন্য বাছাইকৃত জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা পৌঁছানোর পরিকল্পিত প্রয়াসের’ রূপরেখা। এতে বলা হয়, ‘উপলব্ধিমূলক ব্যবস্থাপনা’র এই প্রক্রিয়া স¤পন্ন করা হবে ‘এ কাজের জন্য সহজলভ্য মিডিয়া ব্যবহার’ করে।

সেনাবাহিনী তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছে, ভারতের পরিকল্পনাবিদেরা যে মাত্রার পরিকল্পনা পেশ করেছে, তা তারা কেবল দমনমূলক শক্তি ব্যবহার করে কিংবা সামাজিক প্রকৌশলের মাধ্যমে করতে পারবে না। তবে আমরা বাকিদেরমধ্যবিত্ত শ্রেণী, অফিসার, বুদ্ধিজীবী, ‘জনমত প্রস্তুতকারী’জন্য দরকার ‘উপলব্ধিমূলক ব্যবস্থাপনা’। আর এজন্য আমাদের অবশ্যই করপোরেট জনসেবার চমৎকারিত্বপূর্ণ শিল্পের দিকে নজর ফেরাতে হবে।

সাম্প্রতিককালে খনি কোম্পানিগুলো শিল্পকলার দিকেও ঝুঁকেছে। তারা চলচ্চিত্র, ছবি প্রদর্শনী, সাহিত্য উৎসবে জড়িত হয়েছে, যা ’৯০এর দশকে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আবেশ সৃষ্টি করে। বেদান্ত, বর্তমানে প্রাচীন কুন্ধ উপজাতির আবাসভূমির কেন্দ্রস্থলে বক্সাইট খনি পরিচালনা করছে, এখন তরুণ চলচ্চিত্র ছাত্রদের জন্য ‘ক্রিয়েটিং হ্যাপিনেস’ চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা করছে, যাতে টেকসই উন্নয়নবিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। বেদান্তের ট্যাগলাইন হলো ‘মাইনিং হ্যাপিনেস’। জিনদাল গ্রুপ বেছে নিয়েছে আর্ট ম্যাগাজিন এবং তারা ভারতের প্রধান প্রধান শিল্পীদের অনেককে (তারা সাধারণত স্টেইনলেস স্টিল নিয়ে কাজ করে) সহায়তা করে। এসার হলো ‘তেহেলকা নিউজউইক থিঙ্ক ফেস্ট’এর প্রধান পৃষ্ঠপোশক। এতে ‘অতি জ্বালাময়ী বিতর্ক’ আয়োজন করে থাকে। প্রকৌশলী ফ্রাঙ্ক গেহরিসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, চিন্তাবিদেরা এতে যোগ দেন। (গোয়ায় এ ধরনের একটি উৎসব হওয়ার সময় অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিকেরা এসারের ভয়াবহ মাত্রার অবৈধ খনি কেলেঙ্কারি আবিস্কার করেছিলেন।) টাটা স্টিল ও রিও টিন্টো (তার নিজের অর্থগৃধ্নুতার রেকর্ড আছে) জয়পুর সাহিত্য উৎসবের (এর ল্যাতিন নাম : দর্শন সিং কনস্ট্রাকশন জয়পুর লিটারারি ফেস্টিবল) প্রধান স্পন্সর, শিল্পরসিক ব্যক্তিরা যাকে অভিহিত করে থাকেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট লিটারারি শো অন আর্থ’। টাটার ‘কৌশলগত ব্র্যান্ড ম্যানেজার’ কাউন্সেলেজ উৎসবের প্রেস টেন্টের পৃষ্ঠপোষকতা করে। প্রেমভালোবাসা, সাহিত্য, রাজনীতি, সুফি কবিতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিশ্বের সেরা ও উজ্জ্বলতম অনেক লেখক জয়পুরে সমবেত হন। অনেকে সালমান রুশদির নিষিদ্ধ গ্রন্থ দ্য স্যাটানিক ভার্সেস পাঠ করার মাধ্যমে তার কথা বলার অধিকারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। প্রতিটি টিভি ফ্রেম ও পত্রিকার ছবিতে তাদের পেছনে সদাশয়, মহৎ আয়োজক হিসেবে টাটা স্টিলের (আর এর ট্যাগলাইন হলো : ভেল্যুস স্ট্রংগার দ্যান স্টিল, স্টিলের চেয়ে মূল্যবোধ অনেক শক্তিশালী) লোগো শোভা পায়। ধরে নেওয়া হয় কথা বলার স্বাধীনতার (ফ্রি স্পিচ) শত্রু হলো মুসলিম দাঙ্গাবাজেরা। আয়োজকেরা আমাদের বলে থাকেন, এসব দাঙ্গাবাজ এতই ভয়াবহ যে, তারা এমনকি সেখানে সমবেত স্কুলশিশুদেরও ক্ষতি করতে পারে। (মুসলিমদের প্রসঙ্গ এলে দেখি ভারত সরকার এবং পুলিশও কত অসহায়।) হ্যাঁ, কট্টরপন্থী দারুলউলুম দেওবন্দ ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উৎসবে রুশদিকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদ করেছে। এটাও ঠিক যে, ইসলামপন্থীরা প্রতিবাদ জানাতে উৎসবস্থলে উপস্থিত হয়েছিল এবং সাঙ্ঘাতিক কথা বলো, রাজ্য সরকার ভেন্যুটি সংরক্ষণে কিছুই করেনি। এর কারণ হলো পুরো বিষয়টিই গণতন্ত্র, ভোটব্যাংক এবং উত্তর প্রদেশের নির্বাচন এবং ইসলামি মৌলবাদীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতার লড়াইয়ের কারণে ঘটনাটি বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ঠাঁই পায়। এটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করার মতো ঘটনা। কিন্তু বনজঙ্গল উজাড় করা, লাশের পর লাশ সারি করে রাখা, কারাগারগুলো পরিপূর্ণ করে রাখায় উৎসবের পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন বলতে গেলে দেখাই যায় না। এমনকি ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ এবং ১এ ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট’, যা এমনকি সরকারবিরোধী চিন্তা করা পর্যন্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, নিয়েও কোনো কথা বলা হয় না। কিংবা লোহানদিগুড়ার টাটা স্টিল প্লান্ট নিয়ে বাধ্যতামূলক গণশুনানি নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না, যেখানে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করছে যে, সেটি আসলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কয়েক শ’ মাইল দূরে জগদলপুরে, সশস্ত্র পাহারায় ভাড়া করা জনা পঞ্চাশেক লোকের উপস্থিতিতে কালেকটরের অফিস ভবনে। তাহলে কথা বলার স্বাধীনতা কোথায় থাকে? কেউই কলিঙ্গনগরের কথা উল্লেখ করে না। একথাও কেউ প্রকাশ করে না, এসব কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেসব সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও চলচ্চিত্রনির্মাতাকে ভারত সরকারশ্রীলঙ্কায় যুদ্ধের সময় তামিলদের গণহত্যায় কিংবা কাশ্মীরে সদ্য আবিস্কৃত অচিহ্নিত গণকবর রচনায় এর গোপন ভূমিকার মতোপছন্দ করে না তাদেরকে ভিসা দেওয়া হয় না বা বিমানবন্দর থেকেই সোজা ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু আমাদের মধ্যে কোন পাপী প্রথম পাথরটি ছুড়বে? আমি না, আমি তো করপোরেট পাবলিশিং হাউজের রয়্যালটিতে জীবনযাপন করি। আমরা সবাই টাটা স্কাই দেখি, আমরা টাটা ফোটন দিয়ে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করি, আমরা টাটা ট্যাক্সি চালাই, আমরা টাটা হোটেলে থাকি, আমরা টাটা বোন চায়নায় টাটা স্টিলের চাচামচ দিয়ে নেড়েচেড়ে আয়েশ করে টাটা টি পান করি। আমরা টাটা বুকশপ থেকে টাটা বই কিনি। ‘হ্যাম টাটা কা নমক খাতে হুঁ’। আমরা অবরুদ্ধ।

নৈতিক শুদ্ধতার হাতুরি যদি পাথর ছোড়ার যোগ্যতা অর্জনের মানদণ্ড হয়, তবে যেসব লোক ইতোমধ্যেই নীরব হয়ে গেছে, তারাই একমাত্র যোগ্য মানুষ। যারা এই ব্যবস্থার বাইরে বাস করে; বনে যারা নিষিদ্ধ কিংবা যাদের প্রতিবাদ কখনো সংবাদমাধ্যমে স্থান পায় না বা অধিকারহারা ভদ্রলোকেরা, যারা এক ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেক ট্রাইব্যুনালে যাচ্ছে, সাক্ষী জোগাড় করছে, সাক্ষী দিচ্ছে, তারা।

তবে সাহিত্য উৎসব আমাদের দিচ্ছে আহাউহু! প্রেরণা। অপরাহ এলেন। তিনি বললেন, তিনি ভারত ভালোবাসেন, আর এ কারণেই তিনি বারবার আসবেন। তার বক্তব্য আমাদের গর্বিত করল। এটা স্রেফ চমৎকারিত্বে ঠাসা শিল্পকলার হাস্যকর সমাপ্তি।

টাটারা প্রায় একশ’ বছর ধরে করপোরেট সমাজসেবা করে আসছে, স্কলারশিপ দিচ্ছে, দারুণ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল পরিচালনা করছে। তবে সাধারণভাবে ভারতের করপোরেশনগুলো মাত্র সম্প্রতি বৈশ্বিক করপোরেট সরকারের অতি উজ্জ্বল স্টার চেম্বারে ,যা প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের কারণ হলেও বাইরে থেকে মনে হবে খুবই নিরীহ ধরনের, আমন্ত্রণ পেয়েছে।।

(চলবে)