Home » মতামত » পুনর্বাসন আঁতাত এবং জামায়াতের সহিংসতা

পুনর্বাসন আঁতাত এবং জামায়াতের সহিংসতা

হায়দার আকবর খান রনো

Paltan_Clash-1-বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে নতুন দিকে মোড় নিতে চলেছে, সে ব্যাপারে বোধ হয় কোন বিশ্লেষক দ্বিমত করবেন না। সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে জামায়াত নামক স্বাধীনতাবিরোধী দলটির ব্যাপক, ভয়ঙ্কর, সহিংস তৎপরতা। প্রতিদিন মানুষ মরছে। থানা পুলিশ আক্রমণ করছে। চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলেছে। পুলিশকে যেন অসহায় মনে হচ্ছে। এর আগেও দেখেছি যে, র‌্যাবপুলিশ, শ্রমিক, শিক্ষক বিএনপি অথবা বামদলের প্রতি চরম মারমুখী ছিল, সেই পুলিশই আবার বসে বসে মার খাচ্ছিল, জামায়াতশিবিরের হাতে। তখনই সন্দেহ হয়েছিল, কোন রকম গোপন সমঝোতা হয়েছে কি? সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছিল, যখন দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়া বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হলেও কাদের মোল্লার মাত্র যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো, যদিও বিচারের রায়ে খুন ইত্যাদির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে বলা হয়েছিল। যদিও কোন সমঝোতা হয়েও থাকে তাকে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল শাহবাগ চত্বরে জমায়েত হওয়া তারুণ্যের অভ্যুত্থান। এই তরুণরা এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। যেন অবসাদগ্রস্ত জাতি ১৯৭১এর মেজাজে জেগে উঠলো।

এরপর এলো সাঈদীর ফাঁসির রায়। মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াত। একদিকে, তারা ভয়ঙ্কর তৎপরতা চালাচ্ছে, মন্দির ভাঙছে, শহীদ মিনার ভাঙছে, আগুন লাগাচ্ছে। ব্লগার রাজিবকে খুন করছে, অপরদিকে ইসলাম গেল বলে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে, যখন বিএনপি ও খালেদা জিয়া সরাসরি এই অপশক্তির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেশবাসী উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। আবার তরুণ সমাজ শেষ যুদ্ধ করার জন্য দৃঢ়চিত্ত, বদ্ধপরিকর। বিদেশী শক্তিসমূহ সম্ভবত এই সুযোগে বাংলাদেশের ওপর হস্তক্ষেপ করার জন্য ওৎ পেতে বসে আছে।

সত্যিই এক ক্রান্তি লগ্ন। সম্ভাবনা আছে, জামায়াতের মতো শক্তিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার অথবা আশঙ্কা আছে, অন্ধকারের রাজত্ব চেপে বসতে পারে। খালেদা জিয়া সম্ভবত অসম্ভব ভুল কাজটিই করলেন। হাসিনাও ঝুকির মধ্যে রয়েছেন। আমাদের সকলের জন্যই এ এক মরণপণ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রগতির শক্তিকে জিততেই হবে।

জামায়াত নেতারা গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়েছিল। এক ধরনের গৃহযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য এটাকে গৃহযুদ্ধ না বলে সন্ত্রাসী তৎপরতা বলাই সঠিক হবে। ৪২ বছর আগেও তারা এক গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অবশ্য সেটাও গৃহযুদ্ধ নয় তা ছিল মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ। আর জামায়াতের দিক থেকে দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে সমগ্র জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং নিজেরাও জড়িত ছিল, ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণের সঙ্গে। অনেক দেরিতে হলেও সেই অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। মহাপাপের শাস্তি হোক এটাই জনগণের আকাঙ্খা। তারা সেই বিচার এড়াতে দেশব্যাপী সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করেছে। তবে এইবারের গৃহযুদ্ধেও (যদিও আমরা বলছি, গৃহযুদ্ধ শব্দটি এক্ষেত্রে সঠিক নয়), ১৯৭১এর মতোই পরিণতি হবে। সেবার পাকিস্তানের মতো দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী তাদের পক্ষে ছিল। তারপরও সেই বাহিনী এবং তার সহযোগী জামায়াত মুসলিম লীগ প্রমুখ দল, ঘৃণ্য রাজাকার আলবদরের মতো খুনি বাহিনী সকলেরই এক সঙ্গে পরাজয় ঘটেছিল।

সেই পরাজিত গণশত্র“দের এখন এতো বড় স্পর্ধা এলো কোথা থেকে? এর উত্তর হচ্ছে এই যে, আমরাই তাদেরকে আস্কারা দিয়ে দিয়ে বাড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। উচিত ছিল তখনই অর্থাৎ ১৯৭২ সালেই তাদের চরম শাস্তি দেয়া, যাতে ভবিষ্যতের জন্য এই ভয়ঙ্কর শত্র“র কোনো চিহৃ না থাকে। ১৯৭১ সালে তারা যে জঘন্য অপরাধ করেছিল, সম্ভবত তার আর কোনো তুলনা নেই। এটা ভাবতে অবাক লাগে, এমন গণদুশমন কি করে এখনো টিকে আছে এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে পারে অথবা গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়। আগেই বলেছি, এদেরকে বাড়তে সুযোগ দিয়েছিল বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো।

চার দশক আগে ফিরে যাওয়া যাক। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলেই পাকিস্তানি দালালরা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, বাঙালি ক্ষমা করতে জানে। কিন্তু সবক্ষেত্রে ক্ষমা মহৎ গুণ নয়। অন্ততঃ এই ক্ষেত্রে তো নয়ই। অবশ্য তিনি বলেছিলেন যে, যারা খুন, ধর্ষণ এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তারা এই সাধারণ ক্ষমার মধ্যে পড়বে না। অর্থাৎ খুনিদের গডফাদাররা ছাড়া পাবেন। এ কথা অবশ্য বলার খুব একটা প্রয়োজন হয় না যে, খুন, ধর্ষণ দেশের প্রচলিত আইনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লিতে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যথাক্রমে শরণ সিং, . কামাল হোসেন ও আজিজ আহমেদ যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা দিল্লি চুক্তি নামে পরিচিত। সেখানে জঘন্য অপরাধী পাকিস্তানের ১৯৫ জন সৈন্যকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। আবার ক্ষমা করলো তদানিন্তন বাংলাদেশ সরকার। পাকিস্তানি অপরাধীদের ছেড়ে দেয়া হলেও যে সব বাংলাদেশি খুন, ধর্ষণের মতো নির্দিষ্ট অপরাধ যারা করেছিল, তারা কিছুদিন বন্দী থাকলো। বিচারে চিকন আলী নামে এক রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। কিন্তু ‘মোটা আলী’রা সবাই বেচে গিয়েছিল শেখ মুজিবের আমলেই। একেই শেখ মুজিবের বদন্যতা বলে চিহিৃত করার চেষ্টা হয়। বাস্তবে এটা ছিল, পাকিস্তানপন্থীদের সঙ্গে আপোস করার প্রবণতা। রাজনৈতিকভাবে ও মতাদর্শগতভাবেও। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে তারই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

এরপর, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলেন। শেখ মুজিবুর রহমান অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, পাকবাহিনীর নৃশংসতাও স্বচক্ষে দেখেননি। কিন্তু জিয়াউর রহমান নিজে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তার নামে একটি মুক্তিবাহিনীও ছিল। তিনি শুধু যে আপোস করলেন তাইই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। ১৯৭২ সালে সংবিধানকে এমনভাবে কাটছাট করলেন, যাতে ধর্মীয় দলগুলো রাজনীতির সুযোগ পেল। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ছেটে ফেলা হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটি। সমাজতন্ত্রে অবশ্য আওয়ামী লীগ কোনদিনই বিশ্বাস করেনি। ওটা ছিল জনগণকে ধাপ্পা দেয়ার কৌশল মাত্র। মুজিব আমলে পরিপূর্ণ অর্থে না হলেও ধর্মনিরপেক্ষতা একভাবে কার্যকর ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতের সংবিধানে এর আগে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি ছিল না এবং সেখানে এখনো ধর্মীয় দল নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু যে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তাতে ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধের বিষয়টি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি খুব সঙ্গতভাবেই এসেছিল। তাই বলতে হয় যে, আমরা ভারতের চেয়ে চেতনার দিক দিয়ে অগ্রসর ছিলাম। যাই হোক, জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধী জামায়াতমুসলিম লীগ রাজাকারদের পুনর্বাসিত করলেন। ইতিহাসের এত বড় পশ্চাপৎসরনের এই দুর্ষ্কমটি জিয়ার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। তিনি পাকিস্তানি দালালদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেন। পরবর্তীতে এরশাদ আমলে, খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে (১৯৯১১৯৯৬) এবং শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে (১৯৯৬২০০১) চিহিৃত পাকিস্তানি দালালরা মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন। এরশাদ সামরিক সরকার ৮ম সংশোধনী এনে ‘ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা দিলেন এবং এই ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম আঘাত হানলেন। মুক্তিযুদ্ধের দল বলে দাবিদার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এখনো এই ধারা অপরিবর্তিত রেখেছে।

২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরাসরি যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে তাদেরকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেন। যারা একদিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তারাই বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে মন্ত্রিত্ব করলেন। হায়রে। দুর্ভাগা বাংলাদেশ! লাখ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকাকে এতো বড় অমর্যাদা দান করলেন খালেদা জিয়া!

অপরদিকে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কম যান না। ১৯৯৬ সালে তারাই আন্দোলনের নামে জামায়াতের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রমে অংশ নিলেন। উভয় দলের নেতাদের একত্রে পাশাপাশি দেখা গেল সভায়, সাংবাদিক সম্মেলনে। উপজেলা পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনেরও নির্দেশ এলো। জিয়াউর রহমান জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দিলেন, আর আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিল। এরও আগে ১৯৯১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী দুজনই গোলাম আযমের কাছে গিয়েছিলেন আর্শীবাদ নিতে। এইভাবেই বুর্জোয়ারা একের পর এক জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে জাতীয় শত্র“দের জন্য পথ সুগম করেছিল।

১৯৯৬২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও, তখনো তারা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্নটি আনেননি। কারণ, কিছুদিন আগেই তো জামায়াতের সঙ্গে মৈত্রী হয়েছিল। এই প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী একটি অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেন। তিনি বলেছেন যে, তখন আওয়ামী লীগের সংবিধান সংশোধন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না সংসদে। আসলে বেগম মতিয়া চৌধুরীর এই বক্তব্য শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো। কারণ, যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু করার জন্য সংবিধান সংশোধনের কোন প্রয়োজন নেই। এখনো সংশোধন করার প্রয়োজন হয়নি।

২০০১২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার এই শাসনামলে জামায়াত ও মৌলবাদীরা প্রশাসনের মধ্যেও তাদের ভিত্তিকে শক্ত করেছিল। পাশাপাশি রাজতন্ত্রী সৌদির মতো মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মদদও পেয়ে আসছিল।

২০০৬ সালে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ চরম প্রতিক্রিয়াশীল খেলাফতে মজলিসের (তাদেরও অনেকে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের সহযোগী ছিল) সঙ্গে যে পাচ দফা চুক্তি করেছিল, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী, চরমভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক। এ জন্য তিনি প্রগতিশীল মহল কর্তৃক নিন্দিত হয়েছিলেন। তিনি ওই রকম কয়েকজন কুখ্যাত ব্যক্তিকে নির্বাচনের প্রার্থীরূপে মনোনয়নও দিয়েছিলেন। এই ভাবে দুটি প্রধান দল, কোন নীতি নয়, শুধুমাত্র ভোটের অঙ্কের হিসাবে দুধকলা দিয়ে কালো সাপ পুষেছিলেন। আর তৃতীয় বৃহত্তম দলটি হলো সামরিক শাসক এরশাদের দল। এরশাদ সম্পর্কে বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই। তিনিই ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকেই নস্যাৎ করেছিলেন। তাকে আবার কাঁধে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। একবার কলামিস্ট ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছিলেন যে, হাসিনাখালেদা দুই নেত্রীর কাধে ভর আছে দুই বানর এরশাদ ও জামায়াত। গাফফার চৌধুরীর অধিকাংশ লেখার সঙ্গে একমত না হতে পারলেও, এই বক্তব্যটি তিনি সঠিক বলেছিলেন বলে মনে করি।

১৯৭২ সালে জামায়াত ও অনরূপ ধর্মভিত্তিক দলগুলো পালিয়ে গিয়েছিল। কারণ, ধর্মপ্রাণ জনগণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে থাকলেও, তখনকার সবকয়টি ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক দল (যথা জামায়াত, নেজামইসলাম, মুসলিম লীগ ইত্যাদি) পাকিস্তানের দালালি করেছিল।

পৃথিবীর যে কোন বিপ্লব বা সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে দেখা যাবে যে, বিপ্লব বিরোধীরা কখনই নাগরিক অধিকার পেতে পারে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপের গণতান্ত্রিক বিপ্লব, বিংশ শতাব্দীর একাধিক পরাধীন দেশের সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লব অথবা কমিউনিস্ট বিপ্লব কোন ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে সংবিধানে এদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনীর পর জামায়াত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বৈধতা লাভ করেছিল। হাইকোর্ট কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়ে গেলে স্বল্পকালের জন্য দলটি আইনতঃ বৈধতা হারিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নিজেই তা উপেক্ষা করেছে। তারপর সেই বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তারা শেখ হাসিনার হাত দিয়েই বৈধতা পেয়েছে।

বাচ্চু রাজাকারের বিচারের রায়ে দল হিসাবে জামায়াত যে ১৯৭১ সালে গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তার আইনগত স্বীকৃতি এসেছিল। সেই সূত্র ধরেও সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারতো। কিন্তু তা তারা করেননি। শাহবাগের উত্থানের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা কেবল আপোসের পথই খুজেছেন। দুই নৌকায় পা দিলে যে বিপদ ঘটে, এখন সরকার ঠিক সেই বিপদের মধ্যেই পড়েছে।

সরকার নিজে যে বিপদ সৃষ্টি করেছে, তাকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করার আদৌ কোন ইচ্ছা বা পরামর্শ আমার নেই। কিন্তু গোটা জাতি যে ভয়ঙ্কর সংঘাতময় সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে, সেখান থেকে দেশকে তো অবশ্যই বাঁচাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপআলোচনা ও সমঝোতা দরকার। ইতিপূর্বে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছিল, তার সঙ্গে বর্তমানের সহিংসতা সঙ্কটকে আরেক মাত্রা দিল। প্রথমটির ক্ষেত্রে আমি ইতিপূর্বে বার বার বলে এসেছি যে, অবশ্যই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধরনের কিছু একটা থাকতে হবে, যার রূপরেখা নিয়ে অবশ্যই আওয়ামী লীগবিএনপিসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ দলকে বসতে হবে এবং সমঝোতায় আসতে হবে। কিন্তু জামায়াতের সহিংসতা বন্ধের জন্য কোন ধরনের সমঝোতা কি হতে পারে? জামায়াতের দাবি, তাদের নেতাদের মুক্ত করতে হবে, ফাঁসি দেয়া চলবে না ইত্যাদি। বলাই বাহুল্য, সমঝোতার নামে এই আবদার মানা যায় না। কতিপয় বিদেশী তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থা বিচার স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকমানের হচ্ছে কিনা এ নিয়ে বার বার সংশয় প্রকাশ করছে। এই বিদেশী সংস্থাগুলো সাদ্দামের ফাঁসির সময় কোন বৈধতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে হাজারটা কথা বলছে। একথা দাবি করা যায় যে, যে পদ্ধতিতে জামায়াত, রাজাকারদের বিচার চলছে, তা নুরেমবার্গ ট্রায়াল বা টোকিও ট্রায়াল অথবা সাম্প্রতিক সময়ে হেগে যে সকল বিচার চলেছে (যথা যুগোস্লাভিয়ার মিলোসোভিচের বিচার) তার চেয়ে অনেক স্বচ্ছ। বিনা অপরাধে যখন রাজতন্ত্রী সৌদি আরব বাংলাদেশী শ্রমিকদের শিরোচ্ছেদ করা হয়, তখন জাতিসংঘ অথবা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের প্রতিবাদ দেখিনি। ওই দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও তারা বলে না। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করছে বাংলাদেশ নিয়ে। বাংলাদেশে যে আসলে জামায়াতের মতো একটি উগ্রবাদী দল একদিকে, যেমন পুলিশ, থানা আক্রমণ, হিন্দু গ্রাম আক্রমণ ও গণহত্যা ইত্যাদি, অন্যদিকে ইসলামের নামে মিথ্যাচার চালাচ্ছে। একদিকে, তারা জঘন্য যুদ্ধাপরাধীদের আলেম, ইসলামী পণ্ডিত বলে প্রচার করছে, অপরদিকে, পাশ্চাত্যের মহলের সহানুভূতি আকর্ষণ করছে। চাদে সাঈদীর ছবি দেখা গেছে, এমন মিথ্যাচারও চালাচ্ছে।

এই ক্ষেত্রে যেটা প্রয়োজন তাহলো, . যেকোনো মূল্যে জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ড রুখতে হবে এবং এটা সম্ভব, কারণ, এখন তাদের পাশে ১৯৭১এর দুর্ধর্ষ কোন রাষ্ট্র শক্তি নেই এবং তাদের ২/৩ শতাংশ ভোট ছাড়া কোনো গণভিত্তি নেই, . সে জন্য জামায়াতবিরোধী ব্যাপক গণঐক্য গড়ে তোলা দরকার। সেই ক্ষেত্রে দলীয়করণ বা আওয়ামীকরণের প্রচেষ্টা হলে তা ঐক্যকে নষ্ট করবে, লাভবান হবে শত্র“পক্ষ। ৩. জামায়াতকে অন্যান্য ধর্মীয় দল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, . মসজিদে জামায়াতের পক্ষে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রচার বন্ধ করতে হবে, . জামায়াতের মিথ্যাচারকে উন্মোচিত করতে হবে এবং মতাদর্শগতভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে লড়াই করা খুবই জরুরি।

সমঝোতার নামে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনার কোনো জায়গা নেই। তবে সমস্যা হচ্ছে এই যে, সরকারি দল অথবা সবচেয়ে বড় দুই দলের একটি আওয়ামী লীগ গত চার বছরের বহুবিধ কুকর্মের কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়ে বসে আছে। ফলে জামায়াতের মতো গণধিকৃত শত্র“কে লড়ার জন্য যোগ্যতাও অনেক দুর্বল হয়েছে। জামায়াতকে মাঠে ময়দানে প্রতিরোধ করার বদলে আওয়ামী ক্যাডাররা এখন অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন ও নিজেদের মধ্যে খুনাখুনিতেই অধিক ব্যস্ত। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া ও বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাব গড়ে তুলেছেন। আর বিদেশী শক্তি মজা দেখছে, সুযোগ খুজছে কিভাবে দেশটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে ফায়দা লুটবে। তাহলে, এতগুলো শক্তির বিরুদ্ধেই আমাদের লড়তে হচ্ছে। যথেষ্ট প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধেই লড়তে হচ্ছে। তবু চল্লিশ বছর পরে হলেও যখন উন্নততর চেতনায় জেগে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম, তখন সেখানেই ভরসা রাখতে হবে। আমরা খুবই সঙ্কটজনক সময়ের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছি। তবু শেষ ভরসা জনগণ, নতুন জাগ্রত জনগণ, যে জনগণ অপার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। সেই মানুষের উপর আস্থা রেখেই আমরা এগিয়ে যাবো, যেমন গিয়েছিলাম ১৯৭১ সালে।।

১টি মন্তব্য

  1. Md. Ekram Uddin Khan Chowdhury

    প্রিয় লেখক, আপনি বোধহয় আন্তর্জাতিক আইনের কিছু নিয়ম পরিষ্কার করে জানেন না। একটি বাই-লেটারাল ট্রিটি হওয়ার পর ওটি আবার কেবিনেটের মাধ্যমে সংসদ কর্তৃক পাশ হতে হয় এবং প্রেসিন্ডেন্ট এর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। আপনি বঙ্গবন্ধুকে অনর্থক দোষারোপ করেছেন। ১৯৫ জন পাকিস্থানীদের ক্ষমার কথা বলেছেন, যেখানে ড. কামাল হোসেন ওই চুক্তিতে ছিলেন। ড. কামাল হোসেন অনেকবার স্বীকার করেছেন, ওই চুক্তিতে পাকিস্থান সরকার প্রতি্শ্রুতি দিয়েছিল তারা তাদের দেশে ওদের বিচার করবেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের প্রেক্ষাপটও আপনি বিবেচনায় আনেননি। বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার সময় ২৫০০ এর মত রাজাকার জেলে ছিল। জিয়া সরকার পরর্বতীতে দালাল আইন বাতিল করে রাজাকারদের কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। আপনি আরও বলেছেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এর মন্ত্রী সভায় রাজাকার ছিল, আমি খুব খুশী হতাম যদি তাদের নাম প্রকাশ করতেন। আপনি মতিয়া চৌধুরীর মন্তব্যকে হালকাভাবে নিলেন। এতে আপনার বাংলাদেশের রাজনীতি সম্বর্কে জ্ঞান বুঝা যায়। ওই সময় আওয়ামিলীগ ১৪৭টি আসন পেয়েছিল আর ৩টি আসন জাতীয় পার্টি থেকে ধার করা। যে কোন সময় হর্স ট্রেডিং নামক শব্দটির অর্থ মনে হয় আপনি জানেন। যে কোন সময় সরকার পতনের সম্ভাবনা ছিল। আপনারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা বেশী তাত্ত্বিক হওয়ায় আমাদের অনেক সমস্যা হয়। যেখানে ২৬৭টি আসন পাওয়ার পরও রাজাকারদের বিচার করতে গিয়ে দেশ টাল মাটাল হচ্ছে আর আপনাদের মতো বুদ্ধিজীবিরা ঘরে বসে বসে বড় বড় কথা বলেন তখন দুঃখ হয়। আপনি বেশী নিরপেক্ষতা দেখাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অনেকবার ছোট করলেন। কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যও দিলেন। আগে পথে গিয়ে নামুন, বুক সোজা করে বলুন জয় বাঙলা। তারপর বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করতে নাইমেন।