Home » আন্তর্জাতিক » সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (শেষ পর্ব)

সরকারের ব্যর্থ পানি কূটনীতি (শেষ পর্ব)

. ইনামুল হক

inamul-huq-2-ফেনী নদীর উৎপত্তি খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তে একটি বিরোধপূর্ণ ভূমির পশ্চিমে ভারতীয় প্রান্তে। একই এলাকায় আসালং নদী বাংলাদেশের ভেতর থেকে উৎপন্ন হয়ে, এই বিরোধপূর্ণ ভূমির পূর্ব প্রান্তে পৌঁছে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। এরপর উভয় নদীই মিলিত হয়ে ফেনী নাম নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণপশ্চিমে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। এর প্রবাহপথে অনেক ছোট নদী যথা, তাইলালং, গুমতি, অযোধ্যা, আজুংরাই, নালোয়া, কালিয়া ইত্যাদি বাংলাদেশ থেকে এবং সাব্র“ম, লুধুয়া, বেলোগা ইত্যাদি ভারত থেকে এসে যোগ দেয়। বড় নদীর মধ্যে পিলাক বাংলাদেশ থেকে এবং মনু ভারত থেকে এসে যোগ দিয়েছে। ফেনী জেলার আমলিঘাট নামক স্থানে নদীটি পুরোপুরি বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সাগরের দিকে পাড়ি দিতে ফেনী নদীর ডানতীরে মুহুরী ও সেলোনিয়া নদী এসে যোগ দেয়। সোনাগাজীর কাছে ফেনী নদীর উপর একটি রেগুলেটর নির্মাণ করে এর উজানে সাগরের লোনা পানি ও জোয়ারের পানি প্রবেশ রোধ করা হয়েছে এবং একটি মিঠা পানির হ্রদ তৈরী করা হয়েছে।

ফেনী নদীর পানি বন্টন নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয় ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ও ভারত সরকারের মধ্যে। পাকিস্তান বলে, ’ভারত ফেনী নদী থেকে পানি উত্তোলন করে সেচকাজে ব্যবহার করতে চায়, তার বদলে ভারত ফেনী নদীর বাংলাদেশ পাড়ে নদী ভাঙ্গন সমস্যার সমাধান দেবে।’ ফেনী নদীর পানি বন্টন নিয়ে ভারত বলছে, ’ভারত বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের ৩৬তম বৈঠকে ফেনী নদীকে আলোচনার অংশ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, উভয় দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রীরা যেসকল স্থানে উন্নয়ন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে সেকল সাইট পরিদর্শন করবেন । বিগত ১৪২১ সেপ্টেম্বর ২০০৬ অভিন্ন নদী সমূহের উপর বিভিন্ন উন্নয়ন ও বন্যা প্রতিরোধ কাজের সাইটগুলি যৌথভাবে পরিদর্শন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।’ (উইকিপিডিয়া)

আমলিঘাটের উজানে ফেনী নদীর পানি সংগ্রহ এলাকা ২০০০ বর্গ কিলোমিটার (২০০,০০০ হেক্টর), যার ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতে (ত্রিপুরা) এবং ১২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের ভেতরে পড়ে। ফেনী জেলার অপর নদী মুহুরী ভারতের ভেতরে (ত্রিপুরা) উৎপন্ন হয়ে প্রায় ৮০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করে বিলোনিয়ার কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেলোনিয়া নদীর উৎপত্তিও ভারতের ত্রিপুরায় যেখানে তার ২৫০ বর্গ কিলোটিার পানি সংগ্রহ এলাকা আছে। ভারত সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হওয়ায় সেচকাজ ও শহরে পানি সরবরাহের জন্য ফেনী নদীতে পাম্প বসিয়ে পানি তুলে নেয়। বাংলাদেশের মানুষ একই অববাহিকার বাসিন্দা হলেও ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) তাদেরকে ভয় দেখায় ও পানি উত্তোলন করতে বাধা দেয়। সম্প্রতি ফেনী নদীর পানি বন্টন নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে ,তাতে ১২০ কিউসেক ন্যুনতম প্রবাহ ধরে ৫০৫০ হারে ভাগ করার কথা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই ধরনের ভাগাভাগি কতটা যুক্তিযুক্ত? তাছাড়া ভারতের অংশেই যখন বিভিন্ন জায়গায় পাম্প বসিয়ে পানি তোলা হচ্ছে, তখন কিভাবে এই ভাগাভাগি বাস্তবায়ন করা সম্ভব? বাংলাদেশের ভেতরে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলায় ফেনী অববাহিকায় একটি বড় সেচ প্রকল্প আছে, যার আওতাভুক্ত এলাকা ৪০,০৮০ হেক্টর। ভারতের অংশে ফেনী নদীর পানি বিনা বাধায় তুলে নেয়ার এই প্রকল্পটি বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে প্রচন্ডভাবে মার খাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চরিত্রের অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগি ও ব্যবহারের জন্য ইন্টারন্যাশনাল ল’ কমিশন আগস্ট ১৯৬৬ হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত তার ৫২তম কনফারেন্সে আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহার সংক্রান্ত কমিটির রিপোর্ট গ্রহণ করে। একেই হেলসিংকি রুলস ১৯৬৬ বলা হয়। এর ধারা সমুহের ধারা ২এ বলা হয়েছে, একটি আন্তর্জাতিক অববাহিকার ভৌগলিক সীমানা দুই অথবা ততোধিক দেশের ভূপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ জলসীমা নিয়ে প্রবাহিত হয়ে একই প্রবাহপ্রান্তে এসে মিলিত হয়।

এর ধারা ৪ এ বলা হয়েছে, একটি আন্তর্জাতিক অববাহিকার পানি সম্পদের উপর প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানায় তার নায্য অংশ কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের অধিকার আছে। এর ধারা ৫ এ ১১টি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের তালিকা দেয়া হয়েছে যেগুলি এবং অন্যান্যের ভিত্তিতে যুক্তিপূর্ণ ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে একই অববাহিকার দেশগুলি তাদের অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহার করবে। ফেনী নদীর বেলায় একই প্রবাহপ্রান্ত হলো আমলিঘাট। নায্যতার ভিত্তিতে ফেনী নদীর পানি ভাগাভাগি করতে হলে, আমলিঘাট প্রান্তে যে দেশের পানি সংগ্রহ এলাকা থেকে যে পরিমাণ পানি সংগ্রহ হয়ে আসবে তার এলাকায় সেই হারে ভাগ করতে হবে।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ল’ কমিশন আন্তর্জাতিক নদীগুলির উপর একটি আইনের খসড়া করে। ২১ মে ১৯৯৭ জাতিসংঘের সাধারণ সভা এই খসড়াটি কনভেনশন হিসেবে গ্রহণ করে। (এই কনভেনশনটি ভারত বা বাংলাদেশ এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করেনি। ১৮টি দেশ করেছে, আইন হতে হলে ৩৫ দেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে।) এই কনভেনশন অনুযায়ী নদী বলতে বোঝায়, ভূপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের একটি প্রবাহ তাদের ভৌত গুণাবলীর কারণে একই প্রবাহ প্রান্তে এসে মিলিত হয় [ধারা ২এ]। এই কনভেনশন এক বা একাধিক দেশের মধ্যকার পূর্ব স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বাধ্যবাধকতা ও অধিকারকে প্রভাবিত করে না [ধারা ৩()], যা’ পারষ্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে করা হয়েছে [ধারা ৩()], এবং কোন দেশ অন্য দেশের সম্মতি ছাড়া পানি ব্যবহারের মাধ্যমে অন্য দেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না [ধারা ৩()]। এই কনভেনশন একই অববাহিকাভুক্ত দেশগুলিকে তাদের দেশের ভেতরে অভিন্ন নদীর পানি নায্যতার ও যুক্তির ভিত্তিতে ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে [ধারা ৫]। লক্ষণীয় যে, হেলসিংকি রুলস ১৯৬৬ এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদীর কনভেনশন ১৯৯৭ নৌচলাচল ব্যতীত পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে।

এখন আমরা কি ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদী বা ফেনী ও তিস্তা নদীর পানি ব্যবহারের বেলায় হেলসিংকি রূল বা আন্তর্জাতিক নদীর কনভেনশন অনুসরণ হতে দেখি? না, মোটেই না। আমরা বরং দেখি ভারত তিস্তা নদীর পানি তাদের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার নামে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। একই প্রবাহপ্রান্তের নদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে ভারতের এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক রূলস বা কনভেনশনের স্পষ্ট বরখেলাপ। নায্যতার সাথে পানি বন্টনের ক্ষেত্রে কনভেনশনের ধারা ৬() বলছে, পানি বন্টনের নায্যতার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয় তূলনামূলক বিচারে আনতে হবে এবং পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, ফেনী নদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে যেখানে বাংলাদেশের যোগান এলাকা ৬০% সেখানে ৫০৫০ হারে ভাগাভাগি এইসকল নীতিমালা অনুসরণ করে কি ? বাংলাদেশের ভেতরে ফেনী নদী পানি সংগ্রহ এলাকা বেশী থাকলেও ৫০৫০ হারে ভাগাভাগির কথা বলা হচ্ছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। ফেনী নদীর ঐতিহাসিক বাৎসরিক প্রবাহ এবং শুকনা মৌসুমে ন্যুনতম প্রবাহের রেকর্ড আছে। এই নদীর উজানে কোনরকম পানি প্রত্যাহার বা উত্তোলন ঐতিহাসিক প্রবাহের উপর নির্ভরশীল ভাটির বাস্তুতন্ত্র ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন এর ধারা ৭ বলে, অববাহিকার একটি রাষ্ট্র পানি ব্যবহারের বেলায় অন্য রাষ্ট্রের কোনরকম ক্ষতির কারণ হবে না। যদি ঐ ধরনের কোন কাজ অন্য দেশের ক্ষতি করে তাহলে ধারা ৮ বলে, যেখানে অববাহিকার একটি রাষ্ট্র পানি সম্পদ ব্যবহারের কারণে অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়, তাহলে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ করে তা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, এমনকি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিগত ১৭২০ মার্চ ২০১০ নতুন দিল্লীতে ভারত বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের ৩৭তম বৈঠকের পর থেকেই ফেনী নদী আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ঐ বৈঠকে বাংলাদেশ ভারতকে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউমেক বা ৬০ কিউসেক পানি উত্তোলন করার ব্যাপারে সম্মতি দেয়। চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বিষয়টি ৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ ঢাকায় যৌথ নদী কমিশনের ৩৮তম বৈঠকে পুনরায় আলোচিত হবার কথা ছিলো। ঐ বৈঠক এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কোন পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, ফেনী ও তিস্তা সহ অভিন্ন নদীগুলির ঐতিহাসিক প্রবাহের পানি প্রতাহার বা সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ভারতকে অনুমতি দিতে পারে না। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার বরং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুযোগে দুই দেশের জনগণের স্বার্থে আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ যুগপৎভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গ্রহণ করার লক্ষ্যে ভারতকে রাজি করানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।।

minamul@gmail.com