Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

সাক্ষাৎকার – ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

এই অবস্থায় দেশ চলতে পারে না ব্যারিস্টার রফিকউল হক

rafiqul haqব্যারিস্টার রফিকউল হক, প্রবীন আইনজীবী। দেশের বিদ্যমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এবং এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: বর্তমানে যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি চলছে তাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে, তা দেশের জন্য খুবই দুঃসময়, স্বাভাবিক অবস্থা চলছে না। এটা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তবে দুই নেত্রী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও এর নেতারা বসে, একটা বৈঠক অনুষ্ঠান খুবই জরুরি তা প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই হোক বা বিরোধী দলই ডাকুক। এই বৈঠক করে পরিস্থিতির আশু সমাধান এবং মোকাবেলা করা দরকার। শাহবাগের সমাবেশ থেকে কি বলা হলো, এ নিয়ে গরম হওয়ার কিছু নেই বা উত্যক্ত হওয়ারও কিছু নেই। তারা ডিকটেড করবেন না। রাজনীতিবিদ যারা সত্যিকারের রাজনীতিবিদ, তাদের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আর যে ফাঁসি দেয়া হয়েছে, তাতেই বা উত্তেজিত হওয়ার কি আছে? ফাঁসির ব্যাপারে আপিল আছে, তারা আপিল করবেন, আপিল হোক, তার পর দেখা যাক। একটা সামান্য বিষয় নিয়ে এই দেশের মানুষ এতো বেশি সেনসেটিভ হয়ে পড়ে, কোনো একটি ইস্যু পেলেই তা নিয়ে হৈচৈ হুল্লোড় শুরু করে দেয়। এটা দেশের জন্য ভালো নয়। আপনার, আমার, কারো জন্য ভালো নয়। সুস্থ মস্তিস্কে, সুস্থভাবে সমস্যার সমাধান করা উচিত।

আমাদের বুধবার: বর্তমান পরিস্থিতিতো ক্রমশ সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: এ ধরনের ইস্যু নিয়ে, এই ধরনের ঘটনা অতীতে কখনই হয়নি, অন্য ঘটনা হয়েছে। দাঙ্গা হয়েছে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সেগুলো এক বিষয়। আর এখন যা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন দেশ ডিকটেড করছে অন্যরা। এ দিয়ে হবে নাকি? গলার জোর আর স্লোগান দিয়ে দেশ চলে না। সেন্টিমেন্ট দিয়ে দেশ চলতে পারে না। মাথা ঠাণ্ডা করে দেশ চালাতে হয়। দেশ চালাতে গেলে, সুস্থ পরিবেশের মধ্যে, চিন্তা করে, ভালো মন্দ, এদিকওদিক সব বিবেচনা করে দেশ চালাতে হয়।

আমাদের বুধবার: যতদিন যাচ্ছে, সমাজে ক্রমশঃই বিভাজন বাড়ছে…..

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: আমাদের এখানে তো অন্য কোনো বিভাজন নেই। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিভাজন বা চিন্তার বিভাজন আছে। একেকজন একেক ধরনের চিন্তা করছে। গণতান্ত্রিক দেশে এটা করার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে।

আমাদের বুধবার: কিন্তু বিভাজন যদি সাংঘর্ষিক রূপ নেয়?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: এটা খুব খারাপ। সরকারের উচিত, কঠোর কঠিনভাবে তা বন্ধ করা। সংঘর্ষ আমি, আপনি বন্ধ করতে পারবো না। একমাত্র সরকার তা পারে। তাদের কাছে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে। সরকার করতে পারে। আমরা তো অপারগ।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সরকারে থাকলে একনীতি, সরকারের বাইরে থাকলে আরেক নীতি চালানো হয়…..

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: সেটা তো হচ্ছেই, আমরা দেখতে পাচ্ছি। একেকজন একেকভাবে বিষয়টিকে দেখছে। সরকার তো চেষ্টা করছে, সরকার নিজেও তো মার খাচ্ছে। পুলিশকেও তো জামায়াত মারছে। এটা কি উচিত হচ্ছে? এটা গেল একদিক, আরেক দিকে, বিচার বিবেচনা না করে জামায়াতকে গুলি করে মারছে, এটাও তো উচিত নয়।

আমাদের বুধবার: যে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেক সাধারণ মানুষ রয়েছে

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: দুঃখ তো ওখানেই। সাধারণ মানুষ যে নিহত হলেন, গিয়ে দেখবেন, তার পরিবারের কি দূরবস্থা। তাদের স্বামীস্ত্রী, বাবামার কি অবস্থা একটু চিন্তা করে দেখেন। এটা তো আমরা কখনই চিন্তা করি না। আমরা তো, আবেগ বা ইমোশনের উপর চলি। দুঃখ হচ্ছে, বাংলাদেশ পুরো ইমোশনের উপরে চলে। এখানে কোনো যুক্তি নির্ভর চিন্তা বা কর্মকাণ্ড নেই। ইমোশন এই পর্যায়ে যে, কোনো ঘটনা উঠলো, কেউ মাঠে নামলো, হৈহুল্লোড় শুরু করলো সারাদেশ জেগে উঠলো। এটা কি কোনো সুস্থ পরিবেশ, কোনো সুস্থ দেশের কি পরিবেশ এটা? এটা অসুস্থ দেশ এবং সমাজের নমুনা। এটা কার্যকর ওষুধ দিয়ে বন্ধ করতে হবে।

আমাদের বুধবার: বিদ্যমান যে অবস্থা তা অব্যাহত থাকলে, গণতন্ত্র এবং দেশের ভবিষ্যত কি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: যে অবস্থা চলছে, তা চলতে থাকলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে, গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবে। এটা চলতে দেয়া যায় না। গণতন্ত্র ছাড়া তো দেশের কোনো বিকল্প নেই। সবাইকে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেই হবে। বর্তমান দুনিয়ায় গণতন্ত্র ছাড়া কোনো বিকল্প পন্থা নেই। বর্তমানে যেভাবে চলছে, সেভাবে চলবে না বলেই আশা করি।

আমাদের বুধবার: আপনি বরাবরই সমঝোতার কথা বলে আসছেন। কিন্তু সমঝোতা তো হচ্ছে না। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: সমঝোতা তো হচ্ছে না। তাহলে অবস্থাটা কি এমন, রাজি না থাকলেও ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দেবেন। সমঝোতা না হওয়ার কারণ, আপনি, আমি সবাই জানি। দুজনই অনঢ় অবস্থানে আছেন। কিন্তু আবারও বলছি, দুই নেত্রীকে সাহস করে এগিয়ে আসতে হবে, সাহস করে পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে। সমঝোতা হতেই হবে। দেশে যে অবস্থা চলছে, এই অবস্থায় দেশ চলতে পারে না। কিন্তু বাঙালি হুজুগের জাত। এখন হুজুগে মেতেছে, ঠান্ডা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমাদের বুধবার: যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: বিএনপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর শেখ হাসিনা মাঝে বলেছেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার। দুই সপ্তাহ আগে তিনি এটা বলেছেন। দু’দলই এগিয়ে আসছে। সুতরাং আস্তে আস্তে পার্থক্য দূরীভূত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। দুই নেত্রী যা বলছেন, তার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। তাহলে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, এটা বোঝা যায়। তবে সমস্যা হবে, সরকার প্রধান কে হবেন? এরও একটা সমাধান হয়ে যাবে। দু’পক্ষই যদি এগিয়ে আসে, তাহলে নির্বাচনের আগে সমাধান হয়ে যাবে। এমন হতে পারে যে, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা স্পিকার এই সরকারের প্রধানও হতে পারেন। কিছু একটা সমাধান তো হতে হবে। মোদ্দা কথা, এভাবে দেশ চলতে পারে না। তবে এখনো ৮ মাস সময় আছে, সময় আসুক, সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা করি।

আমাদের বুধবার: সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক রয়েছে। আপনি তাদের এই অবস্থাকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

ব্যারিস্টার রফিকউল হক: সাধারণঅসাধারণ সবার মনের মধ্যেই এটা রয়েছে। বর্তমানে যা চলছে, তা স্বাভাবিক বা নরমাল পরিস্থিতি নয়, এটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। অতীতে এ রকম কখনই হয়নি। আমি গভীরভাবে চিন্তা করছি এই কারণে যে, সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রা সব বন্ধ হয়ে গেছে। তার চেয়েও বেশি অসুবিধা হচ্ছে গরীব মানুষদের, তাদের তো সংসার চলছে না। তাদের সমস্যাটা একবার চিন্তা করে দেখার জন্য সবাইকে বলি। রাজনীতি দিয়ে তো তাদের পেট ভরবে না। বাস্তব অবস্থাটা কেউ চিন্তা করছে না, এটাই হচ্ছে দুঃখ। তিনদিন ধরে হরতাল, কি হবে মানুষের? অন্য অসুবিধা বাদ দিলাম, সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার কি হবে, একবার চিন্তা করুন।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।