Home » মতামত » গণজাগরণের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগ এজেন্ডায় পরিণত

গণজাগরণের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগ এজেন্ডায় পরিণত

তারিক মাহমুদ

gonojagoron-5-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হওয়া তরুণদের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এক মাসের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। শুরু থেকে এই আন্দোলন ঢাকা সহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তরুণদের মনোযোগ কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সক্ষম হয়েছে শহুরে আত্মকেন্দ্রিক তরুণদেরকে রাস্তায় নামিয়ে আন্দোলনের সাথে একাত্ব করতে। এই ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সংগঠিত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর মাঝে নিঃশ্বন্দেহে অন্যতম। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৎকালীন যে সকল বিষয়াদির মিমাংশা এখনো সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি, যুদ্ধাপরাধীদের বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী গোষ্ঠী ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এদেশিয় সহায়তাকারীদের বিচার তার অন্যতম। এমন একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করেই ঢাকা শহরের তরুণদের রাজপথে নামা, দাবী আদায়ের লক্ষে রাজনৈতিক হয়ে উঠা।

আন্দোলনের শুরুতে এটি কোন সুনিদৃষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়এমন ভাবেই জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিলো। নানান পেশার মানুষ একত্রিত হয়েছে বিচারের দাবী নিয়ে। অরাজনৈতিক ব্যানারের নিচে কোন আন্দোলনে এইভাবে একত্রিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের অভিজ্ঞতায় আমারা দেখেছি, নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র, এর শাসকশ্রেমী এখনো পর্যন্ত তার অর্থনীতিরাজনীতি সংগঠিত ও গতিশীল করতে পারেনি। বলা যায় ব্যার্থ হয়েছে নিজেদের হিংসাবিদ্বেষ আর স্বার্থের কারণে। নাগরিকদের জান মান কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে বলা যেতে পারে কোন কিছুরই নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তা এই রাষ্ট্রের কাছ থেকে জনগণ পায়নি। বরং দেখা গেছে বিদ্যমান নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শাসকশ্রেমীর প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও তাদের জোটগুলোকে রাজনীতি করতে, ভোট বাগাতে। নানা প্রতিশ্রুতি, আর নানাবিধ ওয়াদা দিয়ে তারা নির্বাচনের আগে আগে অসংখ্য প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে নির্বাচিত হয়ে পরে নিজের স্বেচ্ছাচারীতার পূর্ণ প্রয়োগ দেশ ও দেশের মানুষের উপরে জারী রেখেছে। ফলে দেশের মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এই অবস্থা দেখে দেখে হতাশ। তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে শুধু ওই সব রাজনৈতিক দলগুলোর উপর থেকেই নয়, তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে, খোদ রাজনীতির উপরেও, যা এক ভয়ঙ্কর সঙ্কটেরই ইঙ্গিত। বিদ্যমান দলীয় রাজনীতি গেছে মেধাহীন, স্বার্থন্যেষী, চাটুকার, সুবিধাভোগীদের দখলে। তারা লুন্ঠন ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে শাহবাগে গড়ে ওঠা তরুদের প্রজন্ম চত্ত্বর বলে আখ্যায়িত গণ জাগরনের আন্দোলনে অসংখ্য তরুণ সামবেত হয়েছিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যানারহীনতার কারণেই। আওয়ামী লীগ বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে দলীয় কর্মী ছাড়া সাধারণ তরুণদের কে এইভাবে একত্রিত করা সম্ভব ছিল না। এবং প্রথম দিকে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানার প্রত্যাখান করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের এই বৈশিষ্ট্য অরাজনৈতিক মনে হলেও, এই অরাজনীতিই ছিল এই আন্দোলনের মূল রাজনীতি। এটি বিদ্যমান মার্কামারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রপাগন্ডা থেকে তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্খাকে রক্ষার প্রচেষ্টার নতুন রূপ হিসেবে হাজির হয়েছিলো। আর এই প্রচেষ্টা আদতে আরাজনৈতিক ছিল না; বরং এটি ছিল বিদ্যমান রাজনীতিকে প্রত্যাখান করে নতুন রাজনীতি কায়েমের প্রচেষ্টা। এটি কোন মতেই একঝাক শহুরে তরুণের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ছিল না, এটির ভিতরে খুব গোপনে নতুন রাজনৈতিক উত্থানের ও নির্মানের আকাঙ্খা সুপ্ত ছিল।

কিন্তু আন্দোলনের ধারবাহীকতার এক মাসে আমরা লক্ষ্য করলাম, এটি আর আগের মত গতিশীল নয়, এই আন্দোলনের স্পিরিট আর আগের মত নেই। বরং বলা যায়, বর্তমানে এই আন্দোলন নানা ভাবে বর্তমান সরকারের মদদপুষ্ট হয়ে দলিয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। যে পরিমান প্রত্যাসা উচ্চকিত করে তুলেছিল এই আন্দোলন তা হতাশায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষত দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষের সাথে, তাদের স্বার্থ বা আকাঙ্খার সাথে এই আন্দোলন যোগসূত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বাইরে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে এই আন্দোলনের উত্তাপ ছিড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয় নি। ফলে গ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে এই আন্দোলনকে ভূল ভাবে উপস্থাপনের সুযোগও তৈরি হয়েছে, এবং সুযোগ সন্ধানিরা সেই সুযোগ গ্রহনও করেছে। ফলে বর্তমানে এই আন্দোলনের ভবিষ্যত কি, কোন দিকে যাচ্ছি আমরা, কি অপেক্ষা করছে সামনে– – এই সকল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই সকল প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান ছাড়া প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসেব বোঝা যাবে না। যাবে না আগামী করণীয় ঠিক করা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রধানমত ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছাড়া বাংলাদেশ অস্থিত্বহীন। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এই ভূখন্ডের মানুষের সম্মিলিত অর্জন। এটি কোন দল বা গোষ্ঠীর একার অর্জন নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের এমন এক দলিয় ইতিহাস নির্মান করেছে যাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অবস্থানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দলীয় অবস্থান অভিন্ন অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। ফলে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে বললে, তাকে সমালোচনা করলে তা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের অবস্থান বলে চালিয়ে দেয়া যায়। তাই জনগণের দিক থেকে নতুন রাজনীতি বির্নিমানের আকাঙ্খা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়ে বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর মিমাংশা না করে সামনে আগানো সম্ভব নয়। গণজাগরণের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে আওয়ামী লীগ এজেন্ডায় পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখা গেছে কি?

ফলে তরুনারা যে আকাঙ্খার দ্বারা চালিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লড়াইকে ময়দানে হাজির করে নতুন রাজনীতি র্নিমানের প্রত্যাশা করেছিলো, তা ব্যার্থ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গণমানুষের এজেন্ডায় পরিণত করা যায়নি। ইতিহাস বির্নিমান, একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রয়াস, চলমান প্রক্রিয়া। শাহবাগের আন্দোলন সেই প্রক্রিয়াকে নতুন একটি ডাইমেনশনে নিয়ে এসেছে, সন্দেহ নেই। ভবিষৎ লড়াইয়ের ময়দানে এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লাগবে। তবে প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাদের বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিসেই বিচারে যাওয়া।

আজকে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আমরা আওয়ামী লীগের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত করে দিচ্ছি। যত্রতত্র মিছিলে কি সমাবেশে গুলি চালানো, দেশব্যাপি সহিংসতা, ধর্মিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে স্বার্থন্বেষী শ্রেমীর হামলা ইত্যাদি সকল ঘটনা একটা চরম দুঃসময়ের পরিস্থিতি তৈরি করছে। এইগুলিকে পুজি করে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করবে। বৃহত্তর জনগণের স্বার্থের উপযোগী নতুন রাজনীতির বিকাশ রুদ্ধ হবে। পুরো বিষয়টা একটু নিরিব এবং যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগ যদি এই বিচার করতেই পারতো, তবে তো সেটা তারা মুক্তিযুদ্ধের পরপরই পারতো। কেন তখন তারা তা পারেনি? এই প্রশ্নের অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন। এই প্রশ্নের অনুসন্ধান ছাড়া বর্তমান বিচারের রাজনৈতিক ফাকফোকর বোঝা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আওয়ামী লীগের বিচার করতে না পারার ঐতিহাসিক দায় বর্তমানে আমাদের উপর চেপেছেযেটার মিমাংশা করার চেষ্টা আমরা করছি। বর্তমান বিচারের মধ্যে দিয়ে একই রকম একটা নতুন দায় যে আমাদের আগামী প্রজন্মের ঘাড়ে চাপবে না, সেই নিশ্চয়তা কি আমারা দিতে পারি? আমরা কি এই ব্যাপারে সচেতন? মুক্তিযুদ্ধের পরপর আওয়ামী লীগের সাথে তৎকালীন যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল বা ব্যাক্তির সঙ্গে যে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক গাটছাড় তারা তৈরি করেছিল, আজকে কি তার থেকে অনেক বেশি পরিমানে সেই গাটছাড়ের সর্ম্পকে তারা পরস্পর আবদ্ধ নয়? মুক্তিযুদ্ধের পরপরই মাকির্ন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের সাথে আমাদের রাজনৈতিকআর্থনৈতিক সর্ম্পক কি আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার পেছন দিকে চালিত করে নাই? এবং আওয়ামী লীগ কি জামায়েত কে নিয়ে ১৯৯০ দশকে রাজনীতি করেনি? তাদের মধ্যেও কি তৎকালিন যুদ্ধাপরাধীরা ঢুকে পরে দলিয় অবস্থানে নিজেদের পাকাপোক্ত করেনি?

বর্তমান বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে আওয়ামী লিগবিএনপিজামায়েতশেষ বিচারে এদের রাজনীতি কি আলাদা কিছু? একটু ভালো করে বিচার করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ যেভাবে বিগত চার বছরের অধিক কাল যাবৎ নিজেদের সকল ব্যর্থতা আর দূর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রচেষ্টা বানচালের আওয়াজ তুলে রাজনীতি মাত করছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন থেকে শুরু করে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, সোনালী ব্যাংকসহ নানা কেলেংকারি, বিশ্বজিৎয়ের খুন, সগররুনীর হত্যাকাণ্ড, বিদ্যুৎতেলগ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নগরিকদের হত্যার প্রতিবাদ, তেলনুনডালচালের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনের দুর্দশায় ফুসে উঠা জনরোষ পর্যন্ত এই সকল কিছুকেই যুদ্ধাপরাধী বিচার বানচালের প্রচেষ্টা বলে চালিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের ধর্মীয়ও রাজানীতি যেভাবে নানা মাত্রার রাষ্ট্রিয় নিপীড়নের স্বপক্ষে ঢাল স্বরুপ শোসকদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো, এবং যাকে এই দেশের জনগণ প্রত্যাক্ষাণ করেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলো; সেখানে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির নামে, আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, নানা ঐহিতাসিক উপাদানকে রাষ্ট্রীয় ও দলীয়শ্রেমীগত নিপীড়নের স্বপক্ষে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। ভূত তো শুধু ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যেই না; ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মধ্যেও লুকিয়ে আছে। ফলে বর্তমানে হাজির হয়েছে সেই বাস্তবতা যে বাস্তবতায় এ যাবৎ শাসকশ্রেমীর রাজনীতির স্বার্থের উপযোগী যে চোখ ও চিন্তা ধর্মরাজনীতিনিরপেক্ষতার ব্যাপারে আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে, তাকে প্রশ্ন করে, তার বাইরে এসে বৃহৎ জনগণের চোখচিন্তা ও লড়াইয়ের ময়দান থেকে দেখার। সেই নতুন চোখচিন্তা ও বিচার তৈরি করার।

যুদ্ধাপরধের বিচার করা, এটি চার দশক পরে এসে নিখাদ অর্থেই একটি বৈপ্লবিক মিমাংশার ব্যাপার। আওয়ামী লিগের মত কোন পাটির পক্ষে এটি সম্ভব নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সেটি পারেনি। অথচ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, যা ছিল তাদের রাজনীতির প্রথম কাজ। তাই আজকে আওয়ামী লীগ যে ভাবে ধর্মের জিকির তুলে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতির ফায়দা হাসিল করে আর রাজকারের ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জিকির তুলে মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি করে, তাদের পক্ষে এমন তর বিপ্লবী কর্ম সম্ভব নয়। এইটা সে করতে পারবে না। আমরা যদি নিজেরা সে কাজটি কতে না পারি, সেটা তাদের কাছ থেকে আশা করা বোকামি ছাড়া আর কি?