Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ৩

পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ৩

মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-1এই রচনাকে কেউ কেউ কঠোর সমালোচনা বিবেচনা করতে পারেন। অন্য দিকে কারো বিরূপতাকে সম্মান দেখানোর ঐতিহ্যে এটাকে পাঠ করা হতে পারে পুঁজিবাদের জন্য দুনিয়াকে নিরাপদ রাখতে নিবেদিত রূপকল্প, নমনীয়তা, মার্জিতবোধ এবং দ্বিধাহীন প্রত্যয়ী লোকদের কৃতজ্ঞতাস্বীকার হিসেবে।

পুঁজিবাদের (এবং সাম্রাজ্যবাদের) সড়ক উন্মুক্তকারী ও ব্যবস্থা লালনকারী পর্যবেক্ষণ দল হিসেবে করপোরেট জনসেবা মিশনারি কার্যক্রমের স্থলাভিষিক্ত হয়। দাসত্বে আবদ্ধ করাসংক্রান্ত তাদের কার্যক্রম, যা সমসাময়িক স্মৃতিতে সজীব নয়, ১৯২০এর দশকের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রে বৃত্তি প্রদানকারী ফাউন্ডেশনের আকারে আইনি কাঠামোর মধ্যে শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম যেসব ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে ছিল কার্নেগি করপোরেশন, কার্নেগি স্টিল কোম্পানির মুনাফা থেকে ১৯১১ সালে তাদের বৃত্তিদান কার্যক্রম শুরু হয়; এবং রকফেলার ফাউন্ডেশন, স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জে ডি রকফেলার ১৯১৪ সালে এটি চালু করেন। তারা ছিল তাদের সময়ে টাটা ও আম্বানি।

রকফেলার ফাউন্ডেশনের মূলধন বা সহায়তা যেসব প্রতিষ্ঠান পেয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ, সিআইএ, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স, নিউ ইয়র্কের কিংবদন্তিসম মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট এবং অতি অবশ্যই নিউ ইয়র্কের রকফেলার সেন্টার (যেখানে ডিয়াগো রিভেইরার মুর‌্যালটি প্রাচীরে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, কারণ এটা বিরক্তিকরভাবে হতচ্ছাড়া পুঁজিবাদী ও সাহসী লেনিনকে চিত্রিত করেছিল। কথা বলার স্বাধীনতা বিরতি নিয়েছিল।

জে ডি রকফেলার ছিলেন আমেরিকার প্রথম বিলিয়নিয়ার এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লোক। তিনি ছিলেন বিলোপবাদী, আব্রাহাম লিংকটের সমর্থক ও মদ্যপানবিরোধী। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার অর্থ তাকে দিয়েছেন ঈশ্বর, তিনি ছিলেন এর উপযুক্ত ব্যক্তি।

এখানে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানি নামে পাবলো নেরুদার প্রথম দিকের একটি কবিতা তুলে দেওয়া হলো

নিউ ইয়র্ক থেকে আসা তাদের বিপুল স্ফীতাকার সম্রাটেরা

মায়াবি হাসির গুপ্তঘাতক

তারা কেনেন সিল্ক, নাইলন, সিগার

ক্ষুদে প্রজাপীড়ক ও একনায়কদের।

তারা কেনেন দেশ, জনগণ, সমুদ্র, পুলিশ, পার্লামেন্ট,

দূরবর্তী অঞ্চল, যেখানে দরিদ্ররা তাদের শস্য মজুত করে

তাদের স্বর্ণ সঞ্চয়ের মতো করে :

স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল তাদের নিদ্রাভঙ্গ করেছে,

ইউনিফর্ম আকারে তাদের পোশাক দিয়েছে, পদবি দিয়েছে

তার ভাই তার শত্রু।

প্যারাগুয়ের লোকজন তাদের যুদ্ধ করছে,

আর বলিভিয়ানরা মেশিন গান দিয়ে

জঙ্গল ধবংশ করছে।

এক ফোঁটা পেট্রোলিয়ামের জন্য একজন প্রেসিডেন্ট নিহত হলেন,

এক মিলিয়নএকর বন্ধক,

একদা সকালে দ্রুত আতঙ্কে ফিকে হওয়া একটি ফাঁসি হলো

বিধ্বংসীদের জন্য একটি নতুন কারাশিবির,

প্যাটাগোনিয়ায়, একটি বিশ্বাসঘাতকতা, বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি

কঠিন চাঁদের নিচে,

মন্ত্রিবর্গের একটি দুর্বোধ্য পরিবর্তন

রাজধানীতে, কিছু ফিসফিসানি

তেলের ঢেউয়ের মতো,

এবং আক্রমণ, তুমি দেখবে

কিভাবে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েলের চিঠিগুলো মেঘের ওপর চকমক করে,

সমুদ্রের ওপর, তোমার বাড়িতে

তাদের ঝলকানি চোখে পড়ে।

করপোরেটবৃত্তিদান ফাউন্ডেশনগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আত্মপ্রকাশ করতে থাকে, তখন এগুলোর উৎস, আইনগত ভিত্তি ও জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে প্রচণ্ড বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। লোকজন বলছিল, কোম্পানিগুলোর হাতে যদি এতই উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে, তবে তাদের উচিত তাদের শ্রমিকদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া। (লোকজন ওই সময়েই এমনকি আমেরিকাতেও এমন ক্ষুব্ধ পরামর্শ দিয়েছিল।) এসব ফাউন্ডেশনের আইডিয়া, যা এখন খুবই মামুলি, ছিল ব্যবসায়িক উদ্ভাবনীতে একটি ব্যাপক অগ্রগতি। বিপুল সম্পদের সমারোহ এবং প্রায় অসীম নির্দেশনা আছে, অথচ ট্যাক্স প্রদানের কোনো আইনি অস্তিত্ব নেই জবাবদিহিতার পুরোপুরি ঊর্ধ্বে, সম্পূর্ণ অস্বচ্ছঅর্থনৈতিক সম্পদকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূলধনে পরিণত করার, অর্থকে ক্ষমতায় পরিণত আর কোনো সহজতর উপায় আছে কি? সুদখোরেরা তাদের মুনাফার অতি সামান্য একটি অংশ ব্যবহার করে বিশ্বকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর এর চেয়ে আর ভালো কোনো রাস্তা আছে কি? বিল গেটস নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি কম্পিউটার সম্পর্কে সামান্য কিছু জানেন। তার পরও তিনি কিভাবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সমগ্র বিশ্বের সরকারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিনীতি প্রণয়ন করে যাচ্ছেন?

সময়ের পরিক্রমায়, মানুষ ফাউন্ডেশনগুলোর সত্যিকারের ভালো কিছু কাজ (গণপাঠাগার পরিচালনা, রোগ নির্মূল) প্রত্যক্ষ করার প্রেক্ষাপটেকরপোরেশন এবং তাদের দানে পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোর মধ্যকার সরাসরি সম্পর্ক অস্পষ্ট হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তা পুরোপুরি মুছে যায়। এখন এমনকি যারা নিজেদের বামপন্থী মনে করে, তারাও এগুলোর উপঢৌকন গ্রহণ করতে লজ্জা পায় না।

১৯২০এর দশক নাগাদ, মার্কিন পুঁজিবাদ কাঁচামাল ও বৈদেশিক বাজারের জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করতে শুরু করে। ফাউন্ডেশনগুলো বৈশ্বিক করপোরেট পরিচালনার আইডিয়া প্রণয়ন করে। ১৯২৪ সালে রকফেলার ও কার্নেগি ফাউন্ডেশন যৌথভাবে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সিএফআর)- এটি পরবর্তীকালে ফোর্ড ফাউন্ডেশন নামেও পরিচিত হয়গঠন করে যা আজকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত প্রেসার গ্রুপে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সাল নাগাদ সদ্য গঠিত সিআইএ’কে সিএফআর সমর্থন দিতে শুরু করে এবং এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে থাকে। সময়ের পরিক্রমায় সিএফআরএর সদস্যপদ যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য গঠিত ১৯৪৩ সালের স্টিয়ারিং কমিটিতে সিএফআরএর সদস্য ছিল পাঁচজন এবং জাতিসংঘ নিউ ইয়র্ক সদরদফতর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওই জমিটি কিনতে জে.ডি রকফেলার ৮৫ লাখ ডলার মঞ্জুরি দিয়েছিল।

১৯৪৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাংকের ১১ জন প্রেসিডেন্টের সবাইযাদের প্রত্যেকে নিজেকে দরিদ্রদের মিশনারি হিসেবে উপস্থাপন করেছেনছিলেন সিএফআরএর সদস্য। (ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল জর্জ উডস। তবে তিনি ছিলেন রকফেলার ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি এবং চেসম্যানহাটন ব্যাংকের ভাইসপ্রেসিডেন্ট।)

ব্রেটন উডসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সিদ্ধান্ত নেয়, মার্কিন ডলার হওয়া উচিত বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা, এবং বৈশ্বিক পুঁজিতে অনুপ্রবেশের লক্ষ্যে উন্মুক্ত বাজারে সার্বজনীন ও আদর্শকরণকৃত বাণিজ্যিকব্যবস্থার প্রচলন করা দরকার। সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে সুশাসন (যতক্ষণ তারাই থাকবে নিয়ন্ত্রণকারীর অবস্থানে) প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসনের (তারাই আইন প্রণয়ন করবে, এমন শর্তে) ধারণা বিকাশ এবং দুর্নীতিবিরোধী শত শত কর্মসূচিতে (যে সঙ্কীর্ণব্যবস্থা তারা কায়েম করে)। বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বোধ্য ও জবাবদিহিহীন সংগঠন দুটি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর সরকারের কাছ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করতে থাকে।

তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নে বিশ্বব্যাংক কমবেশি নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকায় থাকার প্রেক্ষাপটে, বৈশ্বিক অর্থায়নে যোগ দিতে দেশের পর দেশকে তাদের বাজার খুলে দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে, আপনি বলতে পারেন যে করপোরেট জনসেবা সর্বকালের সবচেয়ে ভিশনারি ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে।

করপোরেট দানে পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলো এলিট ক্লাব ও থিঙ্ক ট্যাংকের মাধ্যমেযেগুলোর সদস্যরা ঘূর্ণায়মান দরজা দিয়ে ঢোকে ও বের হয় এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যায়তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ, বিনিময় ও পরিচালনা করে এবং তাদের দাবাড়ুদের দাবার বোর্ডে স্থাপন করে। প্রচারিত বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বেরবিশেষ করে বামপন্থী গ্রুপগুলোর মধ্যেবিপরীতে এই ব্যবস্থার মধ্যে কোনো কিছুই গোপন, শয়তানিপূর্ণ বা ফ্রিম্যানসুলভ নয়। করপোরেশনগুলো যেভাবে খোলসযুক্ত কোম্পানি এবং বৈদেশিক অ্যাকাউন্টগুলোকে তাদের অর্থ স্থানান্তর ও পরিচালনায় ব্যবহার করে তা থেকে এটা খুব বেশি ভিন্ন নয়, ব্যতিক্রম কেবল এই যে মুদ্রা মানে ক্ষমতা, টাকাপয়সা নয়।

সিএফআরএর বহুজাতিক সমমানের প্রতিষ্ঠান হলো ট্রাইলেটারাল কমিশন। ১৯৭৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন ডেভিড রকফেলার, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি (তালেবানের পূর্বসূরি আফগান মুজাহিদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য), চেসম্যানহাটন ব্যাংক ও অন্য কয়েকজন বেসরকারি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও জাপানের এলিটদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার টেকসই বন্ধন প্রতিষ্ঠা করা। চীন ও ভারতকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এটা এখন পঞ্চপক্ষীয় কমিশনে পরিণত হয়েছে। (সিআইআইয়ের তরুণ দাস; ইনফোসিসের সাবেক সিইও নারায়ণমূর্তি; গোদরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামশেদ এন. গোদরেজ; টাটা সন্সের পরিচালক জামশেদ এন. ইরানি এবং অবন্ত গ্রুপের সিইও গৌতম থাপর)

কয়েকটি দেশের ফ্রাঞ্জাইজিসহ স্থানীয় এলিট, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদদের নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক ক্লাব হলো অ্যাসপেন ইনস্টিটিউট। অ্যাসপেন ইনস্টিটিউট, ভারতএর সভাপতি হলেন তরুণ দাস। গৌতম থাপর এর চেয়ারম্যান। ম্যাকিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (দিল্লি মুম্বাই ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল করিডোরের প্রস্তাবক) বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ট্রাইলেটারাল কমিশন ও অ্যাসপেন ইনস্টিটিউটের সদস্য।

ফোর্ড ফাউন্ডেশন (রকফেলার ফাউন্ডেশনের অধিকতর রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে উদার অস্ত্র, যদিও সব সময়েই প্রতিষ্ঠান দুটি একসঙ্গে কাজ করে) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৬ সালে। ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রায়ই আড়ালে থাকে। তবে এর অত্যন্ত স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ রয়েছে এবং এটি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। গণতন্ত্র সদৃঢ়করণ ও ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার এর প্রকল্পটি আদর্শকরণকৃত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা এবং অবাধ বাজারের কার্যকারিতা বিকাশে ব্রেটন উডসের অবিচ্ছেদ্য অংশবিশেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যখন ফ্যাসিবাদীদের বদলে কমিউনিস্টরা হলো মার্কিন সরকারের এক নম্বর শত্রু, স্নায়ুযুদ্ধ মোকাবিলার জন্য নতুন নতুন ধরণের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফোর্ড সামরিক থ্রিংক ট্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে র‌্যান্ড (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন), যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সার্ভিসের জন্য অস্ত্র নিয়ে গবেষণা দিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫২ সালে ‘মুক্ত জাতিগুলোতে কমিউনিস্টদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং গোলযোগ সৃষ্টির তৎপরতা বন্ধ করতে’ এটি প্রতিষ্ঠা করে ‘ফান্ড ফর দ্য রিপাবলিক’। তারপর এটা পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউশন’এ। যার মূল কাজ ছিল বিরোধীদের [কমিউনিস্ট] দমনে অন্যায় অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ভারতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার ও অ্যাক্টিভিস্টদের তহবিল জোগানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্স ও স্কলারশিপে উদার হাতে দানের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা উচিত।

ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ঘোষিত ‘মানবজাতির ভবিষ্যতের লক্ষ্যগুলোর’ মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতে নাক গলানো। যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রতিষ্ঠানটি ক্রেডিট ইউনিয়ন মুভমেন্টকে, ১৯১৯ সালে ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক অ্যাডওয়ার্ড ফিলেন ছিলেন এর পথিকৃত, সহায়তা করার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মঞ্জুরি ও ঋণ প্রদান করে। ফিলেন ভোগ্যপণ্য কেনার জন্য শ্রমিকদের ঋণ লাভের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে একটি গণভোগকারী সমাজ সৃষ্টিতে বিশ্বাসী ছিলেন, ওই সময়ের আলোকে এই আইডিয়াটি ছিল দুর্দান্ত। সত্যিকার অর্থে এটা ছিল একটি চরম আইডিয়ার অর্ধেকাংশ মাত্র, কারণ ফিলেন জাতীয় আয়ের সুষম বণ্টনের ধারণাতেও বিশ্বাস করতেন। পুঁজিবাদীরা ফিলেনের পরামর্শের প্রথম অর্ধেক কব্জা করে কর্মজীবী লোকদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ‘সহনীয়’ ঋণ দিতে লাগল। এর মাধ্যমে তারা মার্কিন শ্রমজীবী শ্রেণীকে স্থায়ী ঋণগ্রহীতায় পরিণত করল, তাদের জীবনযাত্রার রাশ টেনে ধরল।

অনেক বছর পর এই ধারণাটি বাংলাদেশের হতদরিদ্র পল্লীতে ধীরে ধীরে নেমে এসেছিল, যখন মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক ভয়াবহ পরিণতিসম্বলিত ক্ষুদ্রঋণকে বুভুক্ষ কৃষকদের সামনে এই আইডিয়াটি উপস্থাপন করেছিলেন। ক্ষুদ্রঋণের কারণে ভারতে শত শত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, কেবল ২০১০ সালেই অন্ধ্রপ্রদেশে ২০০ লোক এভাবে জীবন দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ১৮ বছর বয়স্কা একটি বালিকার আত্মহত্যার চিরকুট প্রকাশ করেছে। মেয়েটি তার শেষ সম্বল ১৫০ রুপি, তার স্কুল ফি, ক্ষুদ্রঋণ কোম্পানির বেপরোয়া কর্মীদের কাছে দিতে বাধ্য হয়েছিল। চিরকুটটিতে লেখা ছিল : ‘কঠোর পরিশ্রম করো, অর্থ উপার্জন করো। ঋণ নিয়ো না।’

দারিদ্র্যে অনেক টাকা আছে, এবং অনেক সময় নোবেল পুরস্কারও থাকে।।

(চলবে)