Home » মতামত » বীরাঙ্গনার লড়াই-এ যৌনবাদের ঠাঁই নাই

বীরাঙ্গনার লড়াই-এ যৌনবাদের ঠাঁই নাই

নাসরিন খন্দকার

stop-violence-1-‘‘তুই বীরাঙ্গনার সন্তান….”এইটুক পড়ে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা ফেসবুকের ম্যাসেজে প্রেরক কি বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু ঠিক পরের লাইনেই তিনি আমার পিতৃপরিচয়ের প্রতি প্রশ্ন তোলায় আমি বুঝি তিনি আমাকে গালি দিচ্ছেন। কিন্তু মুশকিল হলো, এতে আমার একটুও অপমানিত লাগেনা। মনে হয়, আহা! সত্যিই যদি আমি বীরাঙ্গনার সন্তান হতাম, তাহলে তাঁর সন্তান হবার গর্বে তাঁকে নিয়ে যেতাম গণজাগরন মঞ্চে, যাতে কিছুটা কমে তাঁর যন্ত্রণার ভার। তাঁর বিয়াল্লিশ বছরের প্রতিটি সংগ্রামী মুহুর্ত সামান্য হলেও যেন সার্থকতা খুঁজে পায়। তাই বীরাঙ্গনার সন্তান না হয়েও আমি শেফালির মতো সেই বীরাঙ্গনাদের মা বলে ডাকতে চেয়েছি যাদেরকে ক্যাম্পের ভয়াবহ নির্যাতনের পরে ‘পাকি’সন্তান জন্ম দেবার অপরাধে বাঙালিরাও নির্বাসিত করেছিল। গণজাগরন মঞ্চে আমি শহীদ মাতা জাহানারা ইমামের পাশে তাঁদের ছায়া খুঁজেছি। কিন্তু লজ্জা আর অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেছি, যখন গণজাগরণের অনেকেই শহীদের রক্তের পাশে বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহীনতাই কেবল দেখেছেন। যখন তাদের যন্ত্রণা আর লড়াইয়ের কথা গর্বের সাথে মনে করেননি। যখন নানা ভাবে চেষ্টা করেও গণজাগরণের ২০১৩ তে এসে ‘বীরাঙ্গনার যন্ত্রণা আর ভুলতে দেবোনা’ এই স্লোগানটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। তখন মনে হয়, আবারো যেন ভুলেই থাকছি তাদের। আবারো গর্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লজ্জা আর কলঙ্গ হিসেবেই আমরা রেখে দিচ্ছি বীরাঙ্গনাদের। কিন্তু কেন? বীরাঙ্গনা আমাদের গর্ব না লজ্জা? প্রসঙ্গ তাদের যন্ত্রণা না সম্ভ্রম? এই প্রশ্নের পথ ধরে এগুলে যৌন সহিংসতার যে বিষবৃক্ষ এই বাংলাকে গ্রাস করেছে তার শেকড় চিনতে পারবো আমরা।

বাসে ধর্ষণের প্রতিবাদে যখন ভারত ফুঁসে উঠে তখন বাংলাদেশেও প্রতিদিন একই ধরণের বর্বরতম যৌন সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে আসতে থাকে। যদিও আজকাল শাহবাগের গণজাগরণ আর যুদ্ধপরাধের বিচারের উত্তাপে যৌন সহিংসতার খবর আবারো পত্রিকায় ভেতরের পাতায় ঢুকে গেছে। কিন্তু তার ভয়াবহত্ব কমেনি এতটুকুও। ছোট হয়ে আসা খবরেই প্রতিদিন দেখি মাদারীপুরের সাড়ে চার বছরের শিশু ধর্ষিত হয়ে মৃতপ্রায়, ১৩ বছরের শিশুকে তিন দিন ধরে আটকে রেখে চলে গণধর্ষণ, চলন্ত বাসে একজন ধর্ষিত হয় আর একজন ধর্ষণের ভয়ে বাস থেকে লাফিয়ে মরে যায়। গত ছয় মাসে ১৭ জন আদিবাসী নারী হয় ধর্ষণের শিকার। আর এটি কেবল পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান, প্রকৃত সংখ্যা যে এর কয়েকগুণ বেশি তা আমরা সাধারণ বুদ্ধিতেই বুঝি।

আমরা দেখি, যুদ্ধের সময়ে প্রতিপক্ষ আর শান্তির সময়ে নারী নির্যাতিত হয় স্বজাতির কাছেই। প্রতিদিন ধর্ষিত হয় নতুন কেউ। দেশের শত্রু পরাজিত হলেও নারীর শত্রু হয়ে ধর্ষণের সংস্কৃতি, ধর্ষক মানসিকতা বিরাজিতই থাকে। যে মানসিকতায় নারী ভোগের উপকরণ যার অসম্মতির প্রশ্ন অবান্তর। ধর্ষণের সংজ্ঞা যেখানে জোরপূর্বক যৌনসঙ্গম বা আক্রমণ, সেখানে ধর্ষিতার ‘অসম্মতি’ বা ধর্ষকের আক্রমণ আলোচিত না হয়ে আলোচনা হয়, নারীর পোশাক বা চরিত্র নিয়ে। নারীর সম্মতিঅসম্মতির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা না বলে, তাকে স্রেফ যৌনবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার এই মানসিকতাই ধর্ষক মানসিকতা, যৌনবাদী মানসিকতা।

আমরা এই ধর্ষক পক্ষীয় যৌনবাদী মানসিকতাকে চিনতে বা মোকাবেলা করতে শিখিনি। আমাদের জাতীয়তাবাদী বয়ানে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে গর্বের ইতিহাস। কিন্তু গর্বের এই মুক্তিযুদ্ধে যেন অগৌরবের কাঁটা এদেশের লাখো ধর্ষিতা নারী। আমরা বলি ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে আমরা গান গাই ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। এই ফুল হলো নারীদেশমা। আমরা নিপীড়িত নারীদের বলেছি ‘কতকুলের কুলঙ্গনা, নাম দিয়েছি বীরাঙ্গনা’। বীরাঙ্গনা মানে বীর নারী। অথচ নারী এই বয়ানে ইজ্জত হারানো, ভাইস্বামী হারানো ত্যাগী, মামাটিদেশের প্রতীক, যার জন্যে যুদ্ধ করে তার বীর ছেলেরা। কিন্তু সে এই ইতিহাসের বিষয়, রচয়িতা নয়। এই পুরুষালী বয়ানে বীরাঙ্গনা বা যোদ্ধা নারীর যন্ত্রণা ও লড়াইয়ের স্বীকৃতি নাই। সে আছে শুধু তার রক্ষাকারী পুরুষের বীরত্বগাঁথার অলঙ্কার হয়ে, তার অধীন হয়ে। এই বয়ান আর তার শিক্ষা নারীকে বস্তু হিসেবে দেখার যৌনবাদী মানসিকতার সাথে অবিচ্ছেদ্য।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বাঙালির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদ্দেশ্য, দানবীয় ত্রাস সৃষ্টি করা, মনোবল ভেঙ্গে দেয়া, বাঙালি নারীর গর্ভে পকিস্তানী সন্তানের বিস্তারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে নির্মূল করা, আর বাঙালি নারীর শরীরকে শত্রু দ্বারা কলঙ্কিত করে বাঙালি পুরুষের গর্বকে নষ্ট ও ধ্বংস করা। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয়, বিশ্বযুদ্ধ, কসোভো, রুয়ান্ডা সহ প্রত্যেকটি যুদ্ধে জাতি নির্মূল ও ত্রাস সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধের সময় নারীর শরীর দেশের মতোই আর একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে গণ্য হয়েছে। ধর্ষণের যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে পরাজিত করা হয় সেই যুদ্ধক্ষেত্রকে। এর উৎস সেই যৌনবাদী মানসিকতা, একে সফলও করে সেই একই মানসিকতা। তাই আমরা যখন আমার দেশের বীরাঙ্গনাদের ইতিহাসের কলঙ্ক হিসেবে ঢেকে রাখি, তখন আমরা যৌনবাদী এই যুদ্ধাস্ত্রকে সফল করি, শক্তিশালী করি, জয়ী করি পাকিস্তানিদের। ফলে ‘গালি’ হিসেবে বীরাঙ্গনার সন্তান পরিচিতি আর যুদ্ধকালীন লাখো নারীর ধর্ষণ আর নিপীড়নকে ‘সম্ভ্রমহানি’ হিসেবে দেখা, একই যৌনবাদী মানসিকতার দুটি পিঠ মাত্র।

যুদ্ধকালীন সময়ে জাতিগত পরিচিতির কারণে নারীদের প্রতি অবর্ণনীয় যৌন সহিংসতা আইনের ভাষায় গণহত্যার সমার্থক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু শুধু ক্যাম্পের নির্যাতন নয়, একে সম্পূর্ণ করে পরবর্তীকালে স্বজাতির কাছ থেকে পাওয়া গঞ্জনাও। সব মিলিয়ে তা শ্রেফ গণহত্যার মতো অযৌন কোনো বিষয় না। বরং এটা এক নিরন্তর গণহত্যা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এই সহিংসতা চলতে থাকে যৌনবাদের হাত ধরে। তাদের সম্মান বাঁচানোর নামে যখন, তাদেরকে ইতিহাস থেকে মেরে ফেলা হয়, যখন নির্যাতনের সমস্ত প্রামাণ্য দলিল ধ্বংস করে, তাদের বিচার পাবার পথটিও বন্ধ করা হয় তখন এই গণহত্যার ষোলকলা পূর্ণ হয়। একদিকে বীরাঙ্গনা উপাধি দেয়া, আরেক দিকে তাদেরকে ইতিহাসের লজ্জা হিসেবে গায়েব করার এই স্ববিরোধ যৌনবাদকে মোকাবেলা করেনা। তার সঙ্গে মানিয়ে চলে। আরো শক্তিশালী করে। যার কারণে পরবর্তীতে বীরাঙ্গনা নামের অর্থটাই উল্টে যায়। ‘নষ্ট’ নারীর খেতাব হয়ে যায়।

তাই যৌন সহিংসতার শেকল ভাঙতে গেলে যে সুত্র দিয়ে এটা গাঁথা সেই যৌনবাদী মানসিকতাকে ভাঙতে হবে। যা শুধু যুদ্ধকালীন না, আপাত শান্তিকালীন সময়েও নারীকে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রাখে। ধর্ষণের নিরন্তর ভীতি আর তার থেকে নিজেকে রক্ষা করার কৌশলের মধ্যে বন্দী রাখে। যশোরের হালিমারা তাই অস্ত্র হাতে শত্রু বধ করে, নির্যাতিত হয়ে, সহযোদ্ধার কবর খুঁড়ে দেশ স্বাধীন করলেও জানেন, তাঁরা স্বাধীন হননি। নারীর মুক্তির যুদ্ধ কেবল শুরু হয়েছে মাত্র, শেষ তো নয়ই। বরং এই যুদ্ধ আরো কঠিন হয়েছে। তাই স্বাধীন দেশে বীরাঙ্গনারা ‘নষ্ট’ হয়ে বেঁচে থাকে, প্রতিদিন ধর্ষিতা নারীরা চক্রাকারে সামাজিক ধর্ষণের স্বীকার হন। যুদ্ধ বা শান্তিকালীন সময়ে ধর্ষণের প্রসঙ্গটি তাই যৌনতার রাজনীতির পরিসরে, নারী শরীরের দখলআধিপত্যের রাজনীতির পরিসরে দেখতে হবে। যেখানে নারী যুদ্ধ বা শান্তিকালীন কোনো ক্ষেত্রেই কর্তা নয়, কখোনো পুরুষের যুদ্ধক্ষেত্র কখোনো তার ভোগ্যবস্তু মাত্র। কখোনো শত্রুর বা কখোনো স্বজাতির যৌনবাদী পুরুষের মালিকানার অধীন মাত্র। নারী শরীর, যৌনতা আর জীবনের মালিকানার এই নিয়ম উল্টে দিতে না পারলে, নিজের উপর স্বত্তাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, যৌন সহিংসতা মোকাবেলা সম্ভব না। নারী নিপীড়ন বা ধর্ষণ মোকাবেলার জন্যে তাই এই শেকড় চিনতে হবে। যৌনবাদী এই শেকড় উপড়ে ফেলতে পারলেই কেবল বীরাঙ্গনার লড়াই সার্থক হবে, তাদের লড়াইয়ের প্রতি আমাদের দায় শোধ হবে।।

লেখক শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

nasrin.khandoker@gmail.com

১টি মন্তব্য

  1. বীরঙ্গনা মানে বীর কন্যা। এটাকে গালি ভাববেননা। গালি বানাবেন না। মুখে সম্মান ভিতরে অসম্মান দিবেন না। পারলে নিজের মেয়ের নামটি বীরঙ্গনা রেখে তার গর্বিত মা বাবা হোন।