Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্র

ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্র

বিধান রিবেরু

filmবিভিন্ন সময়ে আমেরিকার চলচ্চিত্র বিশ্বের নানা চলচ্চিত্র কারখানাকে প্রভাবিত করেছে। সেই প্রভাব থেকে ইউরোপ গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়েছে, ইরানও হলিউডি চলচ্চিত্রের লেজ ধরে থাকেনি। আর সবচে হুঙ্কার দিয়ে হলিউডের পথ ছেড়ে উল্টোপথে হেঁটেছে লাতিন আমেরকিার চলচ্চিত্র। ভারতীয় লেখক ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী বলেন, “বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ল্যাটিন আমেরিকার চলচ্চিত্রে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে হলিউডের নেতিমূলক ধ্যানধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ছবি নির্মাণে।” সেসময়কার লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রকারদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষবাদী দর্শন আক্রান্ত, এমনটাই দাবী চক্রবর্তীর। তাই তাঁদের ক্যামেরা বাস্তব ঘটনা, সত্যকে তুলে ধরতে সদা সচেষ্ট। তবে চল্লিশ পঞ্চাশের দশকে চোরাস্রোতে প্রবেশ করে হলিউডি প্রভাব। প্রতিকূলের নৌকা বাওয়া বন্ধ হয়ে অনেকটাই হলিউডি কায়দায় ছবি হতে থাকে লাতিন আমেরিকায়। তার মানে এই নয় বাকি সময়টা আর মুক্তি ঘটেনি লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রের। সকল কিছুই রাজনীতি ও ইতিহাসের অংশ। তাই পঞ্চাশের দশকে লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক জগতে শুধু নয়, উত্থান ঘটছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও, তখন পাল্টে যেতে থাকে চলচ্চিত্রের ভাষা। চক্রবর্তী লিখছেন, “পঞ্চাশের দশকটা ছিল সমগ্র মহাদেশ কাঁপানো বিরাট রাজনৈতিক উত্থানের আর আশার যুগ। সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠনসমূহের প্রতি অননুগামিত্য। এই অস্থিরতার বিশেষ লক্ষণ। একনায়কত্বের পরাজয় ঘটেছে ভেনেজুয়েলায়, নিকারাগুয়ায়, কলম্বিয়ায়, কিউবায়।”

তবে আফসোসের বিষয় এসময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা কিংবা কিউবার পরিচালকেরা চলচ্চিত্রে যে শক্তি প্রদর্শন করেছেন, হলিউডের বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে, সেই স্রোত দেখা যায় নি ভেনেজুয়েলায়। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চোখে পড়েনি ভেনেজুয়েলার কারখানা থেকে উৎপাদিত কোন চলচ্চিত্র নজর কাড়ছে সমালোচক ও দর্শকের। তবে ইদানিংকালে ঔজ্জ্বল্য দেখা যাচ্ছে সদ্য প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজের দেশ, ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্রে। এই পর্যায়ে সহায় মানছি আন্তর্জালের মুক্তবিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াকে। এতে বলা হয়, এই শতাব্দীতে ভেনেজুয়েলার দুটো ছবি বেশ নামডাক কুড়িয়েছে। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র দুটি হল: ‘এক্সপ্রেস কিডন্যাপিং’ ও ‘এল কারাকাজো’।

জোনাথন জাকুবোউইজ পরিচালিত ‘এক্সপ্রেস কিডন্যাপিং’ চলচ্চিত্রটি ক্রাইম জঁরার। ছবিটি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায়। বলা বাহুল্য নয়, এধরণের ক্রাইম জঁরার চলচ্চিত্র হলিউডেরই দান। কিন্তু ভেনেজুয়েলার কোন ছবিই যেখানে বিশ্বের দৃষ্টি তেমনভাবে আকর্ষণ করতে পারছিল না, তখন এই ছবিখানা তা পেরেছে। কি আছে এই ছবিতে? দেখা যায় কার্লা ও মার্টিন, এই উচ্চবিত্ত তরুণ জুটি একরাতে পার্টি থেকে বাড়ি ফিরছিল। ফেরার পথে অপহৃত হয় দুজনই। অপহরণকারীদের দাবী মোটা অঙ্কের অর্থ। এরপর নানা নাটকীয় ঘটনা। হলিউডে এই ধারার বিস্তর ছবি হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, কেন এই ছবি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মুক্তি দেয়া হয়। ভেনেজুয়েলার ছবি হলিউডের মত হয়ে উঠছে, সেটা পিঠ চাপড়ে দেয়ার জন্যই যেন এই ছবি পরিবেশনার দায়িত্ব নেয় মিরাম্যাক্স।

একই বছর মুক্তি পায় ইতিহাস ভিত্তিক চলচ্চিত্র “এল কারাকাজো”, পরিচালকের নাম রোমান শালবাউদ। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এল কারাকাজো ও রাজধানী কারাকাসের আশপাশের দাঙ্গা এই ছবির মূল পাটাতন। ছবিটি শুরু হয় ২০০২ সালে সমাজকর্মী সিমন পেত্রভের একটি বিবৃতি পাঠ দিয়ে। ইন্টার আমেরিকান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস নির্ণীত সেই বিবৃতিতে বলা হয়, দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ভেনেজুয়েলার সরকারকে। সেই বৈঠকে উপস্থিত সকলে স্মরণ করতে থাকে দু:খজনক দাঙ্গার স্মৃতি। এভাবেই ছবি ফ্ল্যাশব্যাকে প্রবেশ করে। ইতিহাস ভিত্তিক হওয়ায় ভিন্ন মাত্রা পায় এই চলচ্চিত্র।

এরইমধ্যে পশ্চিমা ভাষ্যে ল্যান্ডমার্ক ছবির তকমা জুটে গেছে ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া মার্গোট বেনাসেরাফ পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র “আরাইয়া”র কপালে। তবে এটি পুরোপুরি ভেনেজুয়েলার ছবি নয়, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ ছবি। ভেনিজুয়েলার আরাইয়া উপকূলে লবন শ্রমিকদের নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্র। পরিশেষে দেখান হয় আধুনিককালে কলকারখানায় যান্ত্রিক উপায়ে লবন উৎপাদিত হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে বহুদিনের পুরনো, ঐতিহ্যবাহী কাজলবনশ্রমিকদের লবন আহরণ। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে যৌথভাবে সমালোচক পুরষ্কার লাভ করে। যে ছবির সঙ্গে পুরস্কার ভাগাভাগি, সেটিও বিখ্যাত ছবিঅ্যালেইন রেসানেইসের “হিরোশিমা মোনামুর”।

ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্র ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আরো একটি ছবিকে। ছবির নাম: “আই অ্যাম আ ক্রিমিনাল”, পরিচালনা করেছেন ক্লেমেন্ট ডে লা সারডা। এই ছবির আয় বিখ্যাত হলিউড মুভি “জ’স” থেকেও বেশী। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিকে বলা হয় ভেনেজুয়েলার নয়া সিনেমা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। অনেক সমালোচক অবশ্য বলেন, এই ছবিতে স্পষ্টভাবে ইতালির নয়াবাস্তববাদী চলচ্চিত্রের প্রভাব রয়েছে। সমালোচকরা যাই বলুন, লোকার্নো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফ্যাস্টিভালে, ১৯৭৭ সালে বিচারকদের বিচারে বিশেষ জুরি প্রাইজ পায় ছবিটি।

১৯৭৮ সাল থেকে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ওরফে অস্কার আসরে ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্র শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র শাখার জন্য বিশেষভাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে প্রথম দুই দশকে জমা পড়া ছবিগুলোর একটিও মনোনয়ন পায় নি ঐ শাখায়।

তাতে কি! লাতিন আমেরিকার যে ঐতিহ্যধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন ও সফল বিপ্লবের ইতিহাস রচিত হয়েছে গত প্রায় ছয় থেকে সাত দশকে এবং তার যে ছায়া কিউবা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলেভিয়া সহ বিভিন্ন লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রে দেখা যায়, সেটা তো কোনো অংশেই কম নয়। হলিউডের অলীক অবাস্তব ও ইউরোপিয় নয়াবাস্তববাদী কিংবা নবতরঙ্গের ঢেউয়ে গা না ভাসিয়ে তৃতীয় চলচ্চিত্রের যে ধারণা সেটার জন্মও তো লাতিন আমেরিকায়। এখনো লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কতকত চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে তৃতীয় চলচ্চিত্র ধারাকে পুঁজি করে। সেই ধারাবাহিকতায় হয় তো অতোটা উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখতে পারেনি ভেনেজুয়েলা। তবে এর মানে কোনো দিন পারবে না, তা নয়। যে দেশের সমাজ ও রাজনীতি হুগো শ্যাভেজের মত বিপ্লবী নেতার জন্ম দিতে পারে, সে দেশে সমান মাপের বিপ্লবী চলচ্চিত্রকার পয়দা হওয়ার সকল সম্ভাবনাও বিরাজ করে। যদিও প্রতিবছর মাত্র দশ থেকে পনেরোটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পায় দেশটিতে।

আশার কথা ভেনেজুয়েলায় ২০০৬ সালের ৩ জুন রাজধানী কারাকাসের কাছে গুয়ারেনাস শহরে যাত্রা শুরু করে ভিলা ডেল সিনে বা সিনেমাভিল। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এই ফিল্ম ও টেলিভিশন স্টুডিয়োর উদ্বোধন করেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই স্টুডিয়োর লক্ষ্য বেশ স্পষ্ট করেই ঘোষণা দেন শ্যাভেজ। তিনি বলেন, সিনেমাভিল তৈরী হয়েছে হলিউডের আধিপত্য গুড়িয়ে দেয়ার জন্য। হলিউড এমন বার্তা দেয়ার চেষ্টা করে যে, ভেনেজুয়েলার ঐতিহ্য দিয়ে কিছু করা অসম্ভব। কিছু হলিউডি মুভি উপভোগ্য হলেও ন্যাটিভ অ্যামেরিকানদের “অসভ্য” হিসেবে তুলে ধরা হয় মার্কিন মুভিতে, সেটার কঠোর সমালোচনা করেন শ্যাভেজ। আধাযুগ আগে নির্মিত এই সিনেমাভিল শুধু ‘হলিউড ঠেকাও’ কার্যক্রম নয়, পাশাপাশি দেশের স্থানীয় গণমাধ্যমের ঘাটতি পূরণ করবে এবং জাতীয় চলচ্চিত্রের মান আরো উন্নত করবে।

সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুরু থেকেই বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধ, সাম্রাজ্যবাদী আচরণের মুখোশ উন্মোচন ও নয়া ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকে সিনেমাভিল। যাত্রা শুরুর চার বছরের মধ্যে তারা নির্মাণ করে ২৬টি প্রামাণ্য ও কাহিনীচিত্র। এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রটি হল “মিরান্দা রিটার্নস”। ১৮১১ সালে স্পেনের শাসন থেকে মুক্ত হয় ভেনেজুয়েলা। সেই সময়কার স্বাধীনতাযুদ্ধে অসীম সাহসী যোদ্ধা ফ্রান্সিসকো ডে মিরান্দার বিপ্লবী জীবন এই চলচ্চিত্রের প্রাণ। এই ছবিটিই ছিল সিনেমা সিটি বা সিনেমাভিলের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। শত বছর আগের ঐতিহাসিক চরিত্র শুদ্ধ নয়, শ্যাভেজের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার যে পরিবর্তন ঘটে, মানে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল, এই সময়ের মধ্যে তিনি তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলাকে গড়ে তোলেন শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে। শ্যাভেজ এসময় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে কমমূল্যে তেল বিক্রি করে বিশ্ব তেলের বাজারে দেশকে নিয়ে যান শক্ত অবস্থানে। এরপর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে তো অবশ্যই দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলেন আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে। দেশীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের পাশাপাশি বিপ্লবী এই নেতার অবদানকে তুলে ধরার চেষ্টাই করে যাচ্ছে সিনেমাভিল।

আমার মনে হয়, ২০০৬ সালে এমন একটি স্টুডিয়ো করার পেছনে বোধহয় কাজ করেছে ২০০২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনাটি। যে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় আমেরিকার ষড়যন্ত্রে। তবে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ব্যর্থ হয় মার্কিন ষড়যন্ত্র। আমেরিকান রাজনীতির বিরোধীতাকারী এই নেতা বুঝেছিলেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করতে না পারলে, নয়া উপনিবেশবাদের কালো থাবার হাত থেকে রক্ষা নাই। তাই তো জাতীয় সিনেমা তৈরীতে এতটা জোর দিয়েছিলেন শ্যাভেজ। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা কিংবা পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বাসনা, যে কারণেই হোক, সিনেমাভিলের ভেতরে ও বাইরে তৈরী হচ্ছে নতুন ধারার ভেনেজুয়েলার চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহ হলিউডের স্পাইডারম্যান, আয়রনম্যানে ভরে গেলেও ভেনেজুয়েলার নয়াধারার চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ তেমন নাই। আশা করব, সেই সুযোগ এখানে তৈরী হবে একদিন।।