Home » বিশেষ নিবন্ধ » মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং বাম-প্রগতিশীলদের ভূমিকা (প্রথম পর্ব)

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং বাম-প্রগতিশীলদের ভূমিকা (প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

liberation war-2-এ কথা ভাবতে অবাক লাগে যে, একদা এই বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। ঠিক ২৪ বছর পর তাদেরই সন্তানরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এই স্বল্পসময়ের ব্যবধানে ইতিহাসের এই বৈপরীত্ব বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য। এটা কেমন করে হলো? মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে এই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা আবশ্যক। একই সঙ্গে যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো, বাঙালি জাতির অস্তিত্ব যথেষ্ট পুরাতন হলেও, বাঙালি মুসলমানের জাতীয় চেতনা কেন ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বিকাশ লাভ করলো এবং কেনই বা এতো দ্রুত তা চরম পরিণতির দিকে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন জাতীয় দেশ গঠনে সমর্থ হয়েছিল।

এই সব পর্যায়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে কোন শ্রেণী বা কোন রাজনৈতিক দল বা নেতার কি ধরণের ভূমিকা ছিল সেটাও জানা দরকার। আমার মতে, প্রথম পর্যায়ে এখানে বামপন্থীদেরই ছিল প্রধান ভূমিকা এবং মওলানা ভাসানী ও কমিউনিস্টদের। আমি আমার আলোচনায় ভাসানীকে সঙ্গত কারণেই বামপন্থী শিবিরের অন্তর্ভুক্ত করছি। বস্তুত পাকিস্তান পর্বে মজলুম জননেতা ভাসানীই ছিলেন গোটা বামপন্থী (এমন কি বলা চলে সমগ্র প্রগতিশীল আন্দোলনেরও) শিবির ও আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রবল ও প্রচণ্ড রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, যা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। এই পর্যায়ে আবার বামপন্থীদের বিভক্তি, কিছু ভুল লাইন এবং একটি ক্ষুদ্র অংশের অতি বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর ভূমিকা, সমাজতান্ত্রিক চীনের বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম বিরোধী অবস্থান, ভারতের বুর্জোয়া সরকারের বামবিরোধী অবস্থান ও সমশ্রেণীর দল আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন দান (সেটাই স্বাভাবিক) এবং সর্বোপরি শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ইত্যাদি কারণে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বামপন্থীদের হাতে ছিল না, ছিল এককভাবে উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণী তথা আওয়ামী লীগের হাতে। যুদ্ধ চলাকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রধানত তাজউদ্দিন আহমদ। কিন্তু বাস্তবে দেশের অভ্যন্তরে মাঠ পর্যায়ে যারা যুদ্ধ করেছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা ছিল বাম কমিউনিস্টদের। অনেকগুলো বাম ও কমিউনিস্ট সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ করেছিল। তাদের মধ্যে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’র সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ করার রেকর্ড রয়েছে। এই রচনায় এই সকল বিষয়ে সামান্য ছুয়ে যাওয়া হবে।

. চল্লিশের দশক : পাকিস্তান আন্দোলন : বিভ্রান্তির যুগ

পাকিস্তান আন্দোলন ছিল উঠতি মুসলিম বুর্জোয়া ও জমিদারদের আন্দোলন যা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মদদ পেয়ে এসেছিল। মিস্টার জিন্নাহ পাকিস্তান দাবির জন্য যে অবৈজ্ঞানিক ও চরম প্রতিক্রিয়াশীল দ্বিজাতি তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, তা মেনে নিয়েছিলেন তৎকালীন বাংলার অধিকাংশ মুসলমান রাজনৈতিক নেতারা, যারা পরবর্তীতেও পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন শেরবাংলা ফজলুল হক, যিনি লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন। ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে কার্যকরি করার জন্য বাংলার প্রধানমন্ত্রী রূপে যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা থেকেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। এই দাঙ্গার জন্য অনেকে তাকেই প্রধানত দায়ী করেন। মওলানা ভাসানী আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি রূপে সিলেট জেলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। সেদিনের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সামনের কাতারের কর্মী। ১৯৬৭-’৬৮ সালের দিকে লেখা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও দেখা যায়, তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে সংস্কৃতি তৈরি হলো, তার মধ্যেই ছিল বাংলার আবহমানকালের সংস্কৃতির অস্বীকৃতি। তখন উর্দুতে কথা বলাকে আভিজাত্যের লক্ষণ বলে ধরা হতো। পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, বাঙালি সংস্কৃতির অস্বীকৃতি ও সামন্ত কালচার সব যেন এক সূত্রে গাঁথা। এই অবস্থায় বাঙালি হিসাবে জাতীয় চেতনার কোন লক্ষণ থাকতে পারে না।

বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ও গরিব কৃষক পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। কারণ, তারা ভুলক্রমে ভেবেছিলেন যে, তারা শ্রেণীগতভাবে লাভবান হবেন। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত লেখাপড়ায় এগিয়ে ছিল। তাই চাকরি ও ব্যবসায়েও মুসলমানরা পিছিয়ে ছিল। তারা ভেবেছিল, পাকিস্তান হলে তাদের বিকাশের ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে। তখন এই দেশের জমিদাররা ছিল বেশির ভাগই হিন্দু। অতএব মুসলমান কৃষক ভেবেছিল, তারা জমিদারী শাসন থেকে মুক্তি পাবে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই তারা ধাক্কা খেলো। শিক্ষিত মধ্যবিত্তই প্রথম উপলব্ধি করলো যে, তারা নতুন করে এক পনিবেশিক ধরণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে, অথবা বঞ্চিত হচ্ছে। জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রামের ভেতর দিয়েই প্রথম জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটেছিল।

. পাকিস্তানের প্রথম পর্বে জাতীয় চেতনার বিকাশ

মওলানা ভাসানী ও কমিউনিস্টদের ভূমিকা

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় প্রথম পর্বে এই যে জাতীয় চেতনার বিকাশ, তার সূত্রপাত আমরা ধরতে পারি ভাষা আন্দোলন থেকে। তারও আগে, ১৯৪৭ সালেই পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদে মওলানা ভাসানী কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিলেন। বললেন, ‘‘বৃটিশের শাসন মানি নাই, কেন্দ্রের শাসনও মানিব না।’’ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রথম যে কার্যকরি বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল, তার ঘোষণাপত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছিল। ১৯৪৮ সালেই জিন্নাহ যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা রূপে ঘোষণা দিলেন, তখন তার সামনে দাঁড়িয়েই প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলা রাষ্ট্র ভাষার পক্ষে স্লোগান দেয়ার ঘটনা নবজাগ্রত জাতীয় চেতনার সাক্ষ্য বহন করে।

মনন জগতে কতো দ্রুত পাল্টে গেল দৃশ্যপট। ১৯৫২এর ভাষা আন্দোলন ছিল আরেক ধাপ অগ্রগতি। ভাষা আন্দোলন এবং পাকিস্তান পর্বের প্রথম যুগে জাতীয় চেতনার বিকাশ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী ও আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি। ভাষা আন্দোলনের মূল নেতারা আবদুল মতিন, গাজীউল হক, মহম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মহম্মদ সুলতান প্রমুখ সকলেই ছিলেন কমিউনিস্ট অথবা বামপন্থী।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি প্রমাণ করে যে, বাংলার জনগণ চল্লিশের বিভ্রান্তি থেকে খুব দ্রুতই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে তদানীন্তন প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ার প্রস্তাব করলেন দলের সভাপতি মওলানা ভাসানী। সমর্থন পেলেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের। প্রথমদিকে, সোহরাওয়ার্দী আপত্তি করলেও পরে মেনে নিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সব সময়ই ছিল প্রতিক্রিয়াশীল। প্রথমদিকে, তিনি বাংলা রাষ্ট্র ভাষারও বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তিনি করাচীতে অবস্থান করছিলেন এবং জিন্নাহ মুসলিম লীগ নামক একটি ক্ষুদ্র দলের নেতা ছিলেন।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও জাতীয় চেতনার বিকাশের ধারা বেশ কিছু বাক এবং মোড় নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৩ জন দলীয় সংসদ সদস্যকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জার সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচিকে অস্বীকার করে () পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অস্বীকার করলেন, বললেন, ১৯৫৬এর শাসনতন্ত্রে ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে এবং () পাকমার্কিন সামরিক চুক্তি, সামরিক জোট সিয়াটোসেন্টো (খন নাম ছিল বাগদাদ প্যাক্ট) এর পক্ষে সমর্থন জ্ঞাপন করলেন, বস্তুত পুরোদস্তর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্লজ্জ দালালি শুরু করলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তখন সোহরাওয়ার্দীর এই মতের পক্ষে দাঁড়ালেন আওয়ামী লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।

একদিকে, সোহরাওয়ার্দীমুজিব এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান, অপরদিকে মওলানা ভাসানী ও কমিউনিস্টরা এবং তাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল অবস্থান। সেদিন যদি শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর পক্ষ না নিয়ে মওলানা ভাসানীকে সমর্থন করতেন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষে থাকতেন (যে অবস্থান তিনি অনেক জোরালোভাবে এক দশক পরে নিয়েছিলেন) তাহলে হয়তো এই দেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো এবং প্রগতির ধারা জোরদার হতো।

সোহরাওয়ার্দীমুজিবের বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়েই ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী উচ্চারণ করেছিলেন, তার সেই বিখ্যাত উক্তি, পশ্চিম পাকিস্তানকে আসসালামুওয়ালাইকুম।’ অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতার হুমকি। বাংলাদেশের জাতীয় আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক বিরাট মাইলফলক।

সেদিনের সেই দ্বন্দ্বের পরিণতিতে মওলানা ভাসানী নিজ হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলেন এবং গঠন করলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ। পাকিস্তান আমলের সবচেয়ে প্রগতিশীল, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও জাতীয়তাবাদী দল (কমিউনিস্ট পার্টি তখন আত্মগোপনে ছিল)। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরির ক্ষেত্রে ন্যাপের ছিল বড় ভূমিকা। ন্যাপের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত আত্মপরিচয় গোপনকারী কমিউনিস্টরা। মওলানা ভাসানী বিশাল বটবৃক্ষের মতো কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন।

. শেখ মুজিব, ছয় দফা ও জাতীয়তাবাদী উত্থান

দক্ষিণপন্থী নেতা সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিকে খুবই সুনির্দিষ্ট করে ছয় দফা উপস্থাপন করেছিলেন। সেদিনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় দফা খুবই র‌্যাডিকাল ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে ঘোষিত ন্যাপের ১৪ দফা কিন্তু ছিল অনেক বেশি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি, যার মধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিসহ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও শ্রমিক কৃষকের পক্ষের আশু দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সময় শ্রমিককৃষক আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে বাম প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও ১৪ দফা কিন্তু জাতীয়ভাবে কোন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ, উঠতি বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণী ন্যাপ ও ভাসানীকে ভয়ের চোখে দেখতো। কারণ, কমিউনিস্ট আতঙ্ক। অন্যদিকে, তারা শেখ মুজিবের ছয় দফাকে লুফেনিলো। ছাত্রলীগের র‌্যাডিকাল অংশও উৎসাহিত হয়ে উঠলো। বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যমও সর্বশক্তি দিয়ে এর পক্ষে দাঁড়ালো। সমাজে বুর্জোয়াদের স্বাভাবিক নেতৃত্ব থাকে। সুবিধাটা পেলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে শেখ মুজিবুর রহমানের চমক সৃষ্টিকারী (ক্যারিসমেটিক) নেতৃত্ব এবং অসামান্য সাংগঠনিক যোগ্যতা।

একই সঙ্গে বামপন্থী শিবিরে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের বিভক্তি বাম আন্দোলনকে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের গ্রেফতার করলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের চর বলে প্রমাণ করতে চেষ্টা করলো। কিন্তু তা ওই সময়ে আর কাজে লাগলো না। বন্দী শেখ মুজিবুর রহমান কারা অন্তরালে থেকেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসলেন।

১৯৬৮ সালের ৬৮ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী এক নতুন গণআন্দোলনের উদ্বোধন ঘটালেন যা ১৯৬৮৬৯ সালে মহা অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। ১৯৬৯এর জানুয়ারি মাসে ছাত্ররা ১১ দফা পেশ করলেন, যার মধ্যে একটি দফার মধ্যে ছিল ছয় দফা। এক অর্থে ছয় দফা সম্প্রসারিত হলো, যার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী উপাদান এবং শ্রমিক কৃষকের দাবি, পাট শিল্প জাতীয়করণের দাবি ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট হলো। ইতোপূর্বে ঘোষিত ন্যাপের ১৪ দফা সাড়া জাগাতে না পারলেও ১১ দফা দারুণভাবে সারা জাগিয়েছিল। একই সঙ্গে এটাও বলা দরকার যে, শুধু ছয় দফা যা পারতো, ১১ দফা তার চেয়ে অনেক বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উপরন্তু আওয়ামী লীগ ও বাম শক্তির ঐক্য (ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের দুই গ্রুপ) জনমনে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল। প্রবল আন্দোলনের মুখে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান তখনই হয়ে উঠলেন বাঙালি জাতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা।

এরপরের ইতিহাসও সকলের জানা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল সমগ্র পাকিস্তানেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেন। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করল। তিনি হয়ে উঠলেন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একক প্রতিনিধি।

এই সময় মওলানা ভাসানী ও বামপন্থীরা একটা বিরাট ভুল করেছিলেন। তারা নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। নির্বাচন বর্জনের পেছনে নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভ্রান্তি কাজ করেছিল। ভাসানীও দাবি তুললেন, ভোটের আগে ভাত চাই।’ রণকৌশলগত স্লোগান হিসাবে খুবই ভুল ছিল ওই স্লোগান। এই ভাবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল বামপন্থীরা, তারাই এই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ল।

তবে ইতিহাসকে যদি সঠিকভাবে পাঠ করতে হয়, তাহলে বলতেই হবে, ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধে বাম ও কমিউনিস্টদের অবদান ছিল বিশাল, যা বুর্জোয়া সংবাদ মাধ্যমে উপেক্ষা করে অথবা খাটো করে দেখাতে চায়। ভাবখানা এমন যেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেছে আর কেউ নয়। এটা পরিপূর্ণরূপে অসত্য। বরং মাঠ পর্যায়ে বাম কমিউনিস্টদের সাহসী যুদ্ধ ও জীবনদানের ঘটনা অনেক বেশি। যদিও সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল কলকাতা কেন্দ্রীয় প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগের হাতে। এই রচনায় খুবই সংক্ষেপে রণাঙ্গনে বাম কমিউনিস্টদের গেরিলা তৎপরতার ক্ষেত্রগুলোর কথা উল্লেখ করা হবে।।

(চলবে)