Home » প্রচ্ছদ কথা » সরকারই সংঘাত চায় – সমঝোতা প্রয়োজন রাষ্ট্রপতি পদ নিয়েও

সরকারই সংঘাত চায় – সমঝোতা প্রয়োজন রাষ্ট্রপতি পদ নিয়েও

আমীর খসরু

politics-1-বৃটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডমন্ড বার্ক ১৭৮৯ সালের ৫ মে সে দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এমন এক ঘটনা ঘটে গেছে, যা নিয়ে কথা বলা খুবই মুশকিল এবং চুপচাপ থাকাও একেবারে অসম্ভব।’ তার এই বক্তব্য এখনো সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। এতো বছর আগে এডমন্ড বার্কের এই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট, হানাহানি, রক্তপাত এবং দেশ ক্রমাগত সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির দিকে চলে যেতে থাকার কারণে। কথা বলা মুশকিল কেন, তা সবারই জানা। আর চুপচাপ থাকাযেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত দেশবাসীর পক্ষে অসম্ভব।

কারো মত, কারো পরামর্শ উপেক্ষা করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হঠাৎ করে বাতিল করার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি আরো প্রকটতর হতে থাকে। সরকারের একক এই সিদ্ধান্তে বাড়তে থাকে বিবাদ, সংঘাত। আগে থেকেই প্রধান দুই দলের মধ্যে দূরত্ব ছিল বিস্তর। নির্বাচন কিভাবে হবে, সে প্রশ্নে সরকার যখন একক সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো, তখন ওই দূরত্ব বিভাজন এবং পরবর্তীতে জটিল অবস্থায় রূপ নেয়। যে আওয়ামী লীগ কিনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য ১৯৯০এর দিকে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে অচল করে দিয়েছিল এক সঙ্গে আন্দোলন করে, তখন জনমনে এমন একটা ধারণারও জন্ম দেয়া হয়েছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এলেই সব মুশকিলের আসান হয়ে যাবে। সেই আওয়ামী লীগই এখন বলছে, বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনোই প্রয়োজন নেই। এমন এক সঙ্কটময় পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে যে রক্তারক্তি, সংঘাত, নৈরাজ্য চলছে, অসংখ্য সাধারণ মানুষসহ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, ভাংচুরসহ জানমাল কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে মরণপণ হানাহানিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে, সরকার সেই শক্তিকে সামাল দেবে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এটাই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু সরকারের দিক থেকে কি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, সে ব্যাপারে জনগণকে তো নয়ই, কাউকেই কিছু জানানো হচ্ছে না। এটা মনে হয়, সরকারের খোদ নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এ বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে এবং জামায়াতকে নেয়ার ভুল সিদ্ধান্তের একটি অবস্থায় থাকার পরেও ১৮ দলীয় জোটকে আবার শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে । কাজেই, সঙ্কট এখন নানামুখী।

দেশ এখন এমন এক ভয়াবহ ও কঠিন সঙ্কটে পড়েছে, এমন অবস্থা নিকট অতীততো বটেই, স্বাধীনতা উত্তর সময়েও এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। অতীতে বিভিন্ন সময় সঙ্কট দেখা দিলেও, তার সমাধানে একটা দেশীয় পথ খোলা ছিল। কিন্তু এবারে সমাধানের সকল পথ ক্রমাগত বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী, কথিত সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সবাই সমঝোতার কথাই বলে যাচ্ছেন, তাদের অনেকে চেষ্টাও করছেন। কিন্তু তার উপরেও দলের কয়েকজন ছাড়া দেশের মানুষ সবাই এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চান।

এই অবস্থায় গত ৭ মার্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা স্বস্তির বলে মনে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘সঙ্কট নিরসনে যেকোনো স্থানে বিরোধী দলের সঙ্গে তারা আলোচনায় প্রস্তুত। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল। তাই যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো স্থানে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।’ অনেকেই আশার বাতি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, সরকার হয়তো এবার নমনীয় অবস্থায় পৌঁছেতে পারে। কিন্তু প্রায় একই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন, তাদের কঠোর হতে হবে। তাদের যেন কেউ দুর্বল না ভাবে। প্রধানমন্ত্রী এমন সময় এই বক্তব্য দিলেন, যখন প্রাণহানির সংখ্যা শয়ের কাছাকাছি চলে গেছে, সম্পদহানি হয়েছে সীমাহীন, হরতাল চলছিল। তখন অনেকের মনেই আবার এ প্রশ্নও উঠেছিল আর কতোটা কঠোর তিনি হবেন? তিনি কতোটা কঠোর হলে, দেশ এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাবে?

সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছিল এই কারণে যে, মানুষ আর সহিংসতা চায় না, চায় পরিত্রাণ। কিন্তু এখানে একটি বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন, সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যটি যে শুধুই বলার জন্য বলা, শুধুই কথার কথা, তা প্রমাণিত হতে সময় লেগেছে ৪৮ ঘন্টার মতো। কারণ, এর মধ্যেই প্রথম দফায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নয়াপল্টনের সমাবেশ পণ্ড করে দেয়া হলো, পুলিশকে দেয়া সরকারি নির্দেশ তারা অক্ষরে অক্ষরের চাইতেও বেশি মাত্রায় পালন করলো। কিন্তু এরপরেও সেই যে আশার বাতি, অর্থাৎ সমঝোতার বক্তব্য বাস্তব হোক, তা কায়মনোবাক্যে কামনা করেই যাচ্ছিলেন অনেকে। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী জয়ী হবেন এটাই নিয়ম, এটাই হওয়ার কথা। কারণ, স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় এটাই অনিবার্য, হতে বাধ্য। সৈয়দ আশরাফরা যে সব বক্তব্য দেন, তারা নিজেরাও সে কথা বিশ্বাস করেন না, এটা তাদের বিশ্বাস করতেও মানা। এটা তাদের মনের কথা নয়। এটা যে উপর থেকে আসা নির্দেশ, এটা বার বার প্রমাণিত হয়, হবে এবং হতেই থাকবে। আর এটি পাকাপোক্তভাবে স্পষ্ট হয়েছে, বিএনপির গত ১১ মার্চের সমাবেশকে কেন্দ্র করে। প্রধান বিরোধী দলের অফিস যেভাবে শাবল, কুঠার আর বড় বড় হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা হলো, তা যেমন নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য, অদৃশ্যপূর্ব তেমনি, এক সঙ্গে এতো কেন্দ্রিয় নেতাসহ একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে থাকা নেতাকর্মীদের আটক করা, তাদের জেলে পাঠানো এবং ওই অবস্থায়ই ১৪৮ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত চার্জশিট দেয়ার মধ্যদিয়েই প্রমাণিত হলো, সরকারের আসল চরিত্র। তারা যে বিরোধী মত, পথ এবং চিন্তাভাবনাকেও সমূলে উপড়ে ফেলতে চায়, এটা তারই নমুনা। অতীতেও এর ভুড়ি ভুড়ি নজির আছে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সৈয়দ আশরাফসহ ক্ষমতাসীনদের মুখে এখন আর সমঝোতার কথা শোনা যায় না।

সৈয়দ আশরাফ যে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন, তার পেছনে দুটো কারণ অবশ্যই আছে এক. সাংঘর্ষিক এই পরিস্থিতিতে লোক দেখানো দুই. পশ্চিমী দুনিয়ার যে চাপ অব্যাহত আছে, তাতে তাকে এ ধরনের বক্তব্য দিতেই হতো। এখানে বিশ্বাসঅবিশ্বাস কিংবা নেত্রীর আদেশনির্দেশের বিষয়টি ভিন্ন। সৈয়দ আশরাফ তার ৭ মার্চের বক্তব্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটানো হলো, এটা কোন রাজনৈতিক দলের নমুনা? সরকার আলোচনা, সমঝোতা বা কোনো ধরনের মীমাংসা চায় না বলেই এই পথ বেছে নিয়েছে। যদি সরকার আন্তরিকই হতো, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো।

সংলাপের ইতিহাস এদেশে কখনই সুখকর তো হয়ইনি, বরং পরিস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরো ঘোলাটে করা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে। সমঝোতার জন্য ১৯৯১এর নির্বাচনের আগে, স্যার স্টিফেন নিনিয়ানকে পর্যন্ত আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিদেশি এবং তাকে যারা পাঠিয়েছিল, সেই কমনওয়েলথ বুঝেছিল, সমঝোতা অন্তত এই দেশে কতোটা অসম্ভব । ২০০৬ সালে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মহাসচিব পর্যায়ের সংলাপটিও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এভাবে অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে হলে, প্রধানত. সরকারি দলকে খোলা মনে এগিয়ে আসতে হয়। কিন্তু এই সরকারের খোলা তো দূরের কথা, সমঝোতার কোনো মনই নেই।

আগামী নির্বাচনকে নিয়ে তাদের উদ্দেশ্য এবং ফায়দা হাসিলের জন্য, সরকার বরাবরই ঘোরতোর সংঘাতের একটা পরিস্থিতি চাইছিল। তাদের উদ্দেশ্য আরো একটি ছিল, তাহচ্ছে, তাদের সব দুর্ষ্কম ঢাকা দেয়ার জন্য নিত্যনতুন ফন্দিফিকির বের করা। এই সরকার প্রথম থেকেই তাদের সমালোচনাকারী বিরোধী দল তো অবশ্যই, এমনকি কোনো সংগঠনকে বা ব্যক্তিকেও সহ্য করতে পারছিল না। তারা অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পা ভাঙা থেকে শুরু করে, ফেসবুক, ইউটিউব এমনকি সংবাদপত্র পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। সরকার বরাবরই মনস্তাত্বিকভাবে একটি বড় বিভাজন চাইছিল।

কাদের মোল্লার রায়ের পরে শাহবাগের তরুণরা যখন সরকার এবং জামায়াতের আঁতাত ভেঙে দেয় এবং প্রথম অন্তত তিনদিন সরকারি কোনো ব্যক্তিই ওই আন্দোলনের ধারেকাছেও ঘিষতে পারেনি। কিন্তু তারা এতে হাল ছেড়ে দেননি, কব্জা করতে চেয়েছিলেন এবং এখন পেরেছেন। সরকার যে বিভাজনটি চাইছিল বরাবর, সে উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেছে। সরকার এখন এ নিয়ে ফায়দা লুটছে। সরকার এখন এই কারণেই সমঝোতার পথে যাবে না। এর একটি কারণ, তারা তাদের নানা দুষ্কর্মকে এর মাধ্যমে চাপা দিতে পেরেছে বলে মনে করছে। প্রধান যে রাজনৈতিক প্রশ্ন, আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান, তা নিয়ে কোনো আলোচনা তাদের মুখে নেই। ইচ্ছাকৃতভাবে তারা এই ইস্যুটিকে মাটিচাপা দিতে চাইছে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, তারা চাপা দিতে পেরেছে সীমাহীন ঊর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্য, জনমানুষের নানাবিধ সঙ্কট, তেলগ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, কুইক রেন্টালের নামে অবাধ লুটপাট। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্র“পসহ ব্যাংক এবং আর্থিক খাতের সব লুটপাট এবং কেলেঙ্কারির ঘটনা চাপা পড়ে গেছে। ছাত্রলীগযুবলীগসহ খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, সন্ত্রাসসহ নানাবিধ দুষ্কর্ম, খুন, ধর্ষণ, যৌন সন্ত্রাস, সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতন, তাদের জমি দখলসহ অসংখ্য বিষয় তারা চাপা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে তারা মনে করছে। তারা এও মনে করছে, সংখ্যালঘু হিন্দুদের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করে সংবাদ সম্মেলন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার বিষয়টিও সবাই ভুলে গেছে। তারা মনে করছে, গুম, খুন, তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে হত্যাসহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতাসহ চার বছরের সব কিছুই সবাই ভুলে গেছে। তারা এও মনে করছে, মানুষের স্মৃতি শক্তি লোভ পাওয়ার একটা অসীম শক্তি তারা অর্জন করেছে। কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরশাসকরা সবসময়ই মনে করে, মানুষের স্মৃতি শক্তি এবং মনোজগতের দুঃসহ যন্ত্রণাও তাদের হাতের মুঠোয়, তাদের কূটকৌশল আর অপরাজনীতির হাতে জিম্মি। তারা মনে করে, সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু ইতিহাস সর্বশ্রেষ্ঠ স্বাক্ষী, যখন সরকার জনসমর্থন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে বিপন্ন অবস্থায় পড়ে, তখন তারা নানা কৌশল এবং দুষ্ট বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করে যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য নেতিবাচক ফলই নিয়ে আসে। জনসমর্থন হারিয়ে বোদবুদ্ধির লেশমাত্র আর তাদের থাকে না। এটাই হচ্ছে, স্বৈরাচারী শাসকদের শেষ ফলাফল।

সরকারের একের পর এক কর্মকাণ্ডে এখন প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনরা চায় এই রক্তারক্তি, হানাহানি, হিংসাত্মক কার্যকলাপ চলুক, চলুক আরো বেশি মাত্রায়। আর যদি নির্বাচন পর্যন্ত এই অবস্থা টেনে নেয়া যায়, তাহলে নির্বাচন তাদের ইচ্ছাধীন অর্থাৎ বর্তমান সরকারের অধীনেই হতে বাধ্য। কারণ, তারা মনে করছে, এমন সময় নির্বাচনটি দেয়া হবে যখন বিরোধী দলের আর কোনো পথপদ্ধতি এবং সময় হাতে থাকবে না।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার এমন একটি প্রশ্ন, যেখানে অধিকাংশেরই কোনো দ্বিমত নেই। দীর্ঘ চার দশক ধরে ঝুলে থাকা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সমাধান হয়ে যাক, জাতি এ থেকে মুক্তি পাক, এটা সবাই চায়। কিন্তু সরকার কি তা চায়? স্পষ্ট জবাব, না। তাহলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনীতির ফায়দা লুটবে কি দিয়ে? শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিচারের মধ্যদিয়ে একটি বিষয়ের সমাধান করা গেছে।

জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রশ্নেও সরকার আরেকটি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে বলেই মনে হয়। সরকার এই প্রশ্নে যদি আন্তরিকই হতো, তাহলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের ২০০৯ সালের রিট আবেদনটি ২০১৩ সালে এসেও কেন ঝুলে আছে? নিবন্ধন বাতিলের অর্থ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ নয়, এটা সরকারের সবাই জানেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এখন বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জামায়াত প্রশ্নে সবকিছু সমাধান করা হবে। তাহলে নির্বাহী আদেশে করা যায়, সন্ত্রাসী আইনে পারা যায়, এসব বক্তৃতাবিবৃতি দিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করার হচ্ছে কেন?

সৈয়দ আশরাফের সংলাপের প্রশ্নে বলা যায়, সংলাপের কথা, সমঝোতার কথা, তারা সংসদে, মাঠেঘাটে সর্বত্র বলেছেন এবং বলছেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই একেকবার একেক কথা বলছেন। একবার তিনি বলছেন, রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে সরকার হবে, আরেকবার বলেন, নির্দলীয় সরকার হবে, বিএনপি ইচ্ছা করলে প্রতিনিধি দিতে পারে। আবার প্রায়শই বলে থাকেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। আবার কখনো বলেন, এই সরকারের অধীনে যে সব নির্বাচন হয়েছে, তা সব অবাধ এবং সুষ্ঠু হলে, এই সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা কোথায়? তাদের কথারই ঠিক নেই। এ অবস্থায় অন্যরা কোনটি সঠিক বক্তব্য বলে ধরে নেবেন?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সমস্যা এবং সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে সরকার। সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা সঙ্কটের জন্ম দেয়া হয়েছে। সমঝোতা যদি তারা চাইতেনই, তাহলে এসব ব্যাপারে সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট বক্তব্য নিয়ে, এগিয়ে আসতেন। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা নির্দেশনা তাদের দিক থেকে নেই। উল্টো, আরো সংঘাত সৃষ্টির নানা ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর ৬ মার্চের সংসদে দেয়া বক্তব্যের মধ্যদিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । তিনি পাড়ায় পাড়ায় সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কথা বলেছেন। এই সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি কি করবে, কি করতে পারে তা সবারই জানা। বিনা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটিতে গত চার বছরে যা হয়েছে, তাতেই মানুষ অতিষ্ঠ। এখন যদি আর এমন কমিটি গঠিত হয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ইতোমধ্যে যুবলীগ তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছে। এই সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির পাল্টা হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট একটি পাল্টা কমিটি গঠনের কথা বলছে। এ সবই নতুন সংঘাতের ইঙ্গিতবাহী।

দেশটির গণতন্ত্র এবং নির্বাচিত সরকারের ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে দেশে এখন নির্বাচনের উত্তাপ, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এবং কর্মকাণ্ড থাকার কথা ছিল, যা পরিপূর্ণভাবে অনুপস্থিত। এই অবস্থায় সবাই সমঝোতার কথা বললেও, সরকারের দিক থেকে চলছে উল্টো কার্যক্রম।

নতুন যে পরিস্থিতি, তাতে সমঝোতা প্রয়োজন আগামী রাষ্ট্রপতি কে হবেন তা নিয়েও। দুইতৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তাদের পছন্দের যে কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্ঠাচারের কারণে রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা হলে, তা সামগ্রিক রাজনৈতিক সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করলেও করতে পারে বলে আশা করতে বাধা কোথায়। কারণ, আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি দাড়াবে সে বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও গ্রহণযোগ্য এবং কমপক্ষপাত দুষ্ট একজনকে এ পদে নির্বাচিত করাই সঙ্গত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে পথে যাবে, এমন অতীত রেকর্ড তাদের যেমন নেই, এবারেও ওই পথে যাবে, তা আশা করা কঠিন।

প্রধান দুই দলের মধ্যে সমঝোতার অভাবে পরিস্থিতি দিনে দিনে ঘোরতর ঘোলাটে হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়ে পড়েছে যে, বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ‘সেনাবাহিনী নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। সেনাবাহিনী সময় মতোই তাদের দায়িত্ব পালন করবে’ এমন বক্তব্য দিয়েছেন ২৪ মার্চ। কিন্তু এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান রাজনীতির পথেই হতে হবে, এর অন্য কোনো বিকল্প নেই। জনগণও তা মেনে নেবে না। বেগম খালেদা জিয়া এ কথাটি বুঝতে ভুল করেছেন। কারণ, রাজনীতির সঙ্কট যদি রাজনীতি দিয়ে সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প কোনো পথে এর সমাধান খোজাও পুরো রাজনীতির দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। বিএনপিকে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হবে। কারণ, অগণতান্ত্রিক কিংবা অরাজনৈতিক পথে রাজনীতির সমাধান হয় না। আর বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক সামরিক শাসন কিংবা বেসামরিক শাসনের মোড়কে সামরিক শাসনের ইতিহাস কখনোই ভালো হয়নি, ভালো হতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়া এ কারণেই ভুল পথের দিকে চেয়ে আছেন। এতে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাভবান হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলেরও আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তাদের সৃষ্ট সঙ্কট, সংঘাত দেশকে এমনই এক নৈরাজ্যের পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যাতে সমাধান রাজনীতির মাধ্যমে না হয়ে, অন্য কোনো পথে হলে তারাও কি রেহাই পাবেন? আরো সংঘাত সৃষ্টি, তাকে দীর্ঘায়িত করা এবং লালন করার মধ্যদিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে কি দাঁড়াবে যা থেকে ক্ষমতাসীনরাও রেহাই পাবে না। স্পষ্ট কথাটি হচ্ছে এই, রাজনীতির সঙ্কট রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা না করলে, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক শক্তি যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং কোনো না কোনো পক্ষ তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সমর্থন যোগাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সরকার জামায়াতের সংঘাতকে সামাল দেয়ার সঙ্গে এখন প্রধান বিরোধী দলকেও আক্রমণের শিকারে পরিণত করেছে। এর মাধ্যমে সংঘাত যে বহুমাত্রিক হবে, সংঘাত বাড়বে, বাড়বে রক্তপাত, সরকার তা উপলব্ধি করতে পারছে এবং যেনেশুনে সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, সরকার সমঝোতা চায় না, চায় সংঘাত সংঘাতের নতুন নতুন ক্ষেত্র। যে সমাধান দেশের রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে, রাজনৈতিক পদ্ধতিতে সম্ভব ছিল, তা এখন আর সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। অন্তত বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটাই দৃশ্যমাণ। এখন সমাধান যদি ভিন্ন কোনো পথে আসে, রাজনৈতিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়, বিঘ্ন সৃষ্টি হয় গণতন্ত্রের, তবে কে লাভবান হবে? দেশ নয়, গণতন্ত্র নয়, রাজনীতি নয়, দেশের মানুষ নয়। গত চার বছর আগের অভিজ্ঞতা তাই বলে। ওই সময় লাভবান হয়েছিল, চিহ্নিত দেশিবিদেশি চক্রটি।

এবারে লাভবান হবে, যারা চায় বাংলাদেশ তাদের কথায় উঠবস করুক, যারা বাংলাদেশকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করতে পারবে, দেশ, দেশের পথঘাট, সম্পদ, বন্দর অবাধে লুটপাট করতে পারবে, তারাই। আমরা তাদের কাছে আরো তাঁবেদার হয়ে যাবো। আর লাভবান হবে তারা, যাদের শ্যেনদৃষ্টি বাংলাদেশের তেলগ্যাস, খনিজসহ সম্পদের উপরে। এবারেও চিহ্নিত দেশিবিদেশি চক্রটি।

কিন্তু সরকার মানুষের আকাঙ্খার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এর পরিণাম কখনোই ভালো হয়নি। কসম করে বলা যায়, ভবিষ্যতও ভালো হবে না। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের সংঘাতস্পৃহার অসহায় শিকার হচ্ছে দেশ, জাতি এবং সাধারণ মানুষ। এটা মনে রাখতে হবে, অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন সর্বোপরি স্বৈরাচারী কার্যক্রম দিয়ে, কেউ কখনো চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাহলে ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায়।।