Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – এম সাখাওয়াত হোসেন

সাক্ষাৎকার – এম সাখাওয়াত হোসেন

যে অবস্থা চলছে, তাতে গণতন্ত্র হয়তো কিছুক্ষণের জন্য ব্যাহত হতে পারে

m-shakhawat-hossainএম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকথা বলেছেন, দেশের বিদ্যমান সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এ থেকে উত্তরণের পথ, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার:বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করছেন?

সাখাওয়াত হোসেন:দেশের বিদ্যমান যে পরিস্থিতি, তার দুটো দিক আছে। একটি হলো, চলমান যে রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্যদিয়ে, কিন্তু দাবিটি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আগে থেকেই ছিল এবং নির্বাচন যতোই কাছে আসছে, ততোই এ নিয়ে মূলত একটি রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছিল এবং হচ্ছে। এর সঙ্গে যে বিষয়টি যুক্ত হয়েছে, সেটি হলো, জামায়াতের রাজনীতির মধ্যে একটি কঠিন অবস্থান অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচারের সম্মুখীন হয়েছে তাদের বেশ কিছু নেতা। এদের কয়েকজনের রায় ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে, আরো অনেকের রায় বাকি আছে। জামায়াত এখন সেই রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই বিচার কাজ শুরু হয়েছে এবং সমাপ্তিও হতেই হবে। কাজেই জামায়াত একটি কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং তাদের লক্ষ্যটি মিশ্রিত হয়েছে প্রধান বিরোধী দলের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যর সঙ্গেও। তাই জামায়াতের কার্যক্রম বিরোধী দল এবং এর জোটের জন্য একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অপরদিকে, সরকারের রাজনৈতিক এবং এর বহির্ভূত বিষয়ে যে সব অভিযোগ উঠেছিল, সে নিয়েও সরকার একটা বিব্রতকর অবস্থায় ছিল। এই বিচার নিয়েও সরকার খুব একটা স্বস্তিতে ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়নি। এর সঙ্গে শাহবাগের আন্দোলন যুক্ত হওয়ার পরে, পুরো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। কাজেই, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ত্রিমুখী সঙ্কটের মধ্যে রয়ে গেছে বলেই মনে হয়। এসব কারণে, এখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না যে, বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ভবিষ্যৎ কি হবে, আগামী কয়েক মাসের ভেতরে। এখনো বিষয়টি স্পষ্ট নয় যে, আগামী ৬/৭ মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা, যার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তন বা সরকার অব্যাহত থাকার বিষয়টি নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু যতোই দিন যাচ্ছে, রাজনৈতিক উত্তাপ, উত্তেজনা এবং সে সঙ্গে সংঘাতময় পরিস্থিতি বাংলাদেশকে ভয়াবহ এক অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমাদের বুধবার:পরিস্থিতি কতোটা ভয়াবহ বলে আপনি মনে করেন?

সাখাওয়াত হোসেন:বর্তমানে যে পরিস্থিতি, আমার কাছে মনে হয়, স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কঠিন সঙ্কট আর দেখা যায়নি। ইতোপূর্বে যেসব সঙ্কট ছিল, তা থেকে উত্তরণের একটা মোটামুটি সহজ পথ ও পদ্ধতিও ছিল। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি চলছে, তা থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা কেমন হবে বা কিভাবে হবে, তা বলা মুশকিল। কারণ, আমরা এমন অবস্থায় পৌছিনি, যাতে পরিপূর্ণ অবস্থাটা বোঝা যায়। বর্তমান পরিস্থিতি যদি ভবিষ্যতেও চলতে থাকে, তাহলে আগামীতে সংঘাতের ব্যাপ্তি আরো তৃণমূল পর্যায়ে যাবে এবং সঙ্কট বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে কিন্তু এই রকম ত্রিমুখী সঙ্কটের মধ্যে আর পড়েনি। এই ধরণের সঙ্কটের জন্য কেউ প্রস্তুতও ছিল কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি আগেই বলেছি, কি হচ্ছে এবং কোথায় যাচ্ছি অর্থাৎ অবস্থাটা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, এখনো জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি, সে সঙ্গে তার অঙ্গসংগঠনগুলোও এখনো প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। কথা উঠেছে, গুঞ্জন আলোচনা চলছে, দাবি উঠছে, এই দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। অপরদিকে, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মীমাংসার জন্যও কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছে না। এটা শুনছি, আইনগত ভাবে হবে। আবার বলা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি। কাজেই, রাজনৈতিক ভাবে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার ইচ্ছা এই পর্যন্ত সরকারের নেই। এ রকম অবস্থায়, যদি নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে তার পরেই আমরা বুঝতে পারবো যে পরিস্থিতি কোথায় যাচ্ছে? সংঘাতের এমন একটা পরিস্থিতিতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে তা স্পষ্ট নয়। এখন দৃশ্যমান সংঘাতের মধ্যে আছি, পরে এটি দৃশ্যমান থাকবে কিংবা অদৃশ্য সংঘাতের মধ্যে যাবো কিনা, তা বলা কঠিন।

আমাদের বুধবার:সরকারের কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতকে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা সম্ভব। আপনার অভিমত কি?

সাখাওয়াত হোসেন:নির্বাচন কমিশনের কথাবার্তায় যা মনে হচ্ছে, তাদের পক্ষে আইনানুগভাবে এটা সম্ভব হলেও, বিষয়টি কিন্তু অতো সহজ নয়। কারণ হচ্ছে, যেকোনো দলের গঠনতন্ত্র যদি আইনানুগভাবে এবং আরপিওতে যেসব ধারা আছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন ওই কারণে তার নিবন্ধন বাতিল করতে পারে না। আরেকটি বিষয় হলো, কোনো দলের নিবন্ধন বাতিলের অর্থ এই নয় যে, তার রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো। বহু দল আছে, তারা কিন্তু নিবন্ধিত নয়। নিবন্ধন বাতিল করা, একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ব্যাপার এবং এতে অনেক সময় লাগবে। নিবন্ধন বাতিল এবং দল নিষিদ্ধ করা এক জিনিস নয়।

আমাদের বুধবার:সমাজে ব্যাপকমাত্রায় রাজনৈতিক বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে

সাখাওয়াত হোসেন:যুদ্ধাপরাধীর বিচার বাংলাদেশের সবাই হয়তো চাইবে। আমি মনে করি, এর একটা বিচার হয়ে বিষয়টির একটি অধ্যায় সমাপ্ত হওয়া উচিত। কারণ, এই অধ্যায় জন্মজন্মাতরে বহন করা যায় না। আর এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের যে সৃষ্টি হয়েছে, সে বিভাজন কিন্তু আর বিভাজনের পর্যায়ে নেই। বিভাজন এখন যোজন দূরের ফাটলের মধ্যে পড়ে গেছে। অনেকেই অনেক কথা বলেন, আমি বলতে চাই না। অনেকে বলেন, গৃহযুদ্ধ। গৃহযুদ্ধের নিহিতার্থ কিন্তু খুবই মারাত্মক, এটা এতো সহজ নয়। গৃহযুদ্ধ একটি রাষ্ট্রকে কিন্তু টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে। আমি মনে করি না, বাংলাদেশ সে পর্যায়ে যাবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাতাবরণ বা পরিস্থিতি যা বিদ্যমান আছে, তা এমন অবস্থাকে কোনোক্রমেই ঘটতে দিতে চাইবে না। বিশেষ করে, পাশের বৃহৎ দেশের জন্য এটা সুখকর হবে না। তবে, গৃহযুদ্ধ যদি আমি নাও বলি বা বলতে আমি রাজি নই, কিন্তু যদি রাজনৈতিক বিভাজন ও ফাটলকে মোকাবেলা বা জোড়া দেয়ার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক নৈরাজ্য এবং বড় ধরণের হানাহানি, রক্তপাতের অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। যদি বড় ধরণের বিভাজনকে জোড়া দেয়া বা মোকাবেলা করা না হয়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরো ভয়াবহ পরিণতির দিকে দেশ পৌঁছে যাবে।

আমাদের বুধবার:আপনি বার বার কয়েক মাস শব্দটি ব্যবহার করেছেন কেন?

সাখাওয়াত হোসেন:রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই থাকুক, গণতান্ত্রিক পরিবেশে একটি নির্বাচন করতেই হবে। নির্বাচনের সময়, বর্তমানে যে সংবিধান রয়েছে, তাতে ৭ থেকে ৮ মাস বাকি আছে। আর অন্যরকম হলে, আরো দু’মাস যোগ করা যেতে পারে। কিন্তু যে অবস্থায় দেশ আছে, তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে, নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। সে জন্য বলছি, যতই নির্বাচন এগিয়ে আসবে, ততোই নানা ফ্যাক্টর যুক্ত হতে থাকবে। আর তা পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটময় ও জটিল করে তুলবে।

আমাদের বুধবার:যেভাবে রক্তপাত, হানাহানি হচ্ছে, তাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কতোটা আতঙ্কিত বলে আপনি মনে করেন?

সাখাওয়াত হোসেন:মানুষ আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। শুধু ঢাকা শহরেই নয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ, চলে গেছে গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত। যারা কোন বিভাজনের মধ্যে নেই, তারা শহরের বা গ্রামেরই হোক, সবার মধ্যে উদ্বেগ ও আশঙ্কা মনের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে। সহজ কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না বলেই মানুষের আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে।

আমাদের বুধবার:আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলেছেন। বাস্তব পরিস্থিতিতে কি সমঝোতার কোনো পথ খোলা আছে?

সাখাওয়াত হোসেন:প্রত্যক সমস্যারই একটা সমাধান আছে। সমাধান বলপ্রয়োগ দিয়েও হতে পারে অথবা সমঝোতার মধ্যদিয়েও হওয়া সম্ভব। এখন দেখতে হবে, বলপ্রয়োগ করবেন, না দেশের স্বার্থে নমনীয় হয়ে, সবার সঙ্গে বসে, সবার কথা শুনে, কিছু ছাড় দিয়ে, আলাপআলোচনা শুরু করবেন। যদি আলাপআলোচনা শুরুও হয়, তাহলে বর্তমান রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি তাতে, অনেক সময় দিতে হবে। তবে আমি মনে করি, এখনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়নি। কোনো বিভাজনই কোনো বিভাজন হতে পারে না, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সমঝোতার সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে, দেশের অস্তিত্ব বিরাট সঙ্কটের মধ্যে পড়বে।

আমাদের বুধবার:যদি সমঝোতায় পৌছা সম্ভব না হয় তাহলে

সাখাওয়াত হোসেন:গত ৪১ বছরে আমরা নানা ধরণের সঙ্কট এবং এ থেকে উত্তরণের পথ দেখেছি। এই সমাধান উপর থেকে হয়, পাশে থেকে হয়, ডানেবামে থেকে হয়, আর সাময়িক পর্যায়ে কিছু হয়। তবে খারাপই হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু আবার, ফিরে আসতে হয়, রাজনীতির মূলধারায়। তবে, সে ধরণের সমাধানে কোনো লাভ হয়নি বাংলাদেশের। সমাধান রাজনীতিবিদদেরই দিতে হবে। যদি রাজনীতিবিদগণ সমাধান দিতে না পারেন, তাহলে রাজনীতি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হবে। রাজনীতিবিদদের এটাও বোঝা উচিত, এ সব সঙ্কট সংঘাতের মধ্যে শুধুমাত্র দেশীয় বিষয় আছে এমন নয়, হতে পারে আমরা কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মধ্যে পড়ে গেছি। সবাই যে আমাদের বন্ধু তাতো নয়। কিন্তু আমরা কেন সেই ফাদের মধ্যে পড়বো সেটাই আমার প্রশ্ন। যে অবস্থা চলছে, তাতে কি আমরা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের পরোক্ষ একটা হস্তক্ষেপের দিকেই যাচ্ছি কিনা? আমরা তো দেখেছি, /১১তে কি হয়েছিল? সেখানে তো অবশ্যই বাইরের একটা অবস্থান থেকে হয়েছিল। সে ধরণের অবস্থার দিকে আমরা কি যাচ্ছি?

আমাদের বুধবার:সে ধরণের একটা পরিস্থিতির দিকে কি আমরা যাচ্ছি?

সাখাওয়াত হোসেন:এখন তো দেখছি, বিদ্যমান অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে সে অবস্থার দিকেই চলে যাবো। এই অবস্থা চলতে থাকলে সমাধান কোথা থেকে আসবে? আমি বলছি না, সে সমাধান আমাদের এখান থেকেই হবে। সে সমাধান তো আমাদের উপরে চাপিয়েও দেয়া হতে পারে। সে পরিস্থিতি বা ফাঁদের মধ্যে আমরা পড়তে চাচ্ছি কিনা?

আমাদের বুধবার:প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না, আমাদের কঠোর হতে হবে। আমাদের দুর্বল ভাববেন না। আপনি কি মনে করেন না, এই ধরণের বক্তব্য সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিকে আরো বাড়িয়ে দিবে?

সাখাওয়াত হোসেন:এটা হচ্ছে বাহ্যিক কথা। যেকোনো সরকারই বলবে, আমরা দুর্বল অবস্থানে নেই, কঠিন অবস্থানে যাবো। আরেকটি হচ্ছে, সমাধানের পথ ধরা। প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যকে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, শক্ত অবস্থান এবং সমঝোতার করার একটা ব্যাপার এখানে রয়েছে। এমন একটা ইঙ্গিত কিন্তু দেয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় না, এমন দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় সরকার আর শক্ত অবস্থানে যাবে, সমঝোতার একটা পথ খোলা রাখতেই হবে। বিরোধী দলের উচিত হবে, এই পরিস্থিতিকে আর উত্তপ্ত না করে, অন্তত একটা সমঝোতার পথ খোলা রাখা। আমি মনে করি, সরকারি দলের পক্ষ থেকে একটা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করা উচিত।

আমাদের বুধবার:আগামী নির্বাচন কতোটা অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব?

সাখাওয়াত হোসেন:যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে অবাধ হবে কিনা সন্দেহ আছে। সুষ্ঠু হলেও সে নির্বাচন কেউ মেনে নেবে না। নির্বাচন হতে হবে, সমঝোতার মাধ্যমে, সকল দলের অংশগ্রহণে। কোনো বড় দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করলে, শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও তা স্বীকৃত হবে না। সরকার যাই বলুক, সংবিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। ওই অবস্থার কিছু পরিবর্তন করতেই হবে। নির্বাচন নিয়ে যা কিছু করার দ্রুত করতে হবে। কারণ, হাতে সময় একেবারেই নেই। এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সামনেও কিন্তু পথ পরিষ্কার নয়। নির্বাচন কমিশনকে যতোই শক্তিশালী করা হোক, কমিশন সরকারের বিকল্প হতে পারে না। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার থাকতেই হবে। আর এ কারণেই নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বার বার উঠছে। এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে, পুরো দেশটি কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হয়ে গেছে, রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক মনস্তাত্বিক কারণে। এটা একটা খুবই খারাপ লক্ষণ। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি একটি বড় সঙ্কট।

আমাদের বুধবার:যে পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে তাতে নির্বাচন অনুষ্ঠান কি আদৌ সম্ভব?

সাখাওয়াত হোসেন:এখন যে সময়, তাতে পুরো জাতির, সংবাদমাধ্যমে দৃষ্টি থাকার কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের দিকে। কিন্তু সে পরিস্থিতি অনুপস্থিত, নেই। যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে পুরো নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিই সাইড লাইনে চলে গেছে। মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, নির্বাচন আদৌ হবে কিনা? হলেও কি, সত্যিকার একটি নির্বাচন হবে? এখন সংঘাত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, নবজাগরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের কোনো উত্তাপ নেই। এটা কাম্য নয়, কাঙ্ক্ষিতও নয়।

আমাদের বুধবার:আপনি কি মনে হয়, এটি একটি কৌশল?

সাখাওয়াত হোসেন:হতে পারে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যমান পরিস্থিতি কারো পক্ষে বা কারো বিপক্ষে যাচ্ছে। যে সংঘাতসংঘর্ষ চলছে, জীবননাশ হচ্ছে, সেখানে আমরা ব্যস্ত অন্য দুর্ভাবনাময় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কাজে।

আমাদের বুধবার:এই অবস্থায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যতকে আপনি কিভাবে দেখেন?

সাখাওয়াত হোসেন:আমি গণতন্ত্রেও ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা শঙ্কিত নই। যে অবস্থা চলছে, তাতে গণতন্ত্র হয়তো কিছুক্ষণের জন্য ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু একেবারে নির্বাসিত হবে, বহু বছরের জন্য, তা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।

আমাদের বুধবার:আপনাকে ধন্যবাদ।।