Home » আন্তর্জাতিক » হুগো শ্যাভেজ আর বাংলাদেশের বিপুল সম্পদ

হুগো শ্যাভেজ আর বাংলাদেশের বিপুল সম্পদ

ফারুক চৌধুরী

chavezভেনেজুয়েলার কথা উঠলেই যে নাম প্রথমে সবার মনে পড়ে, তা হচ্ছে দেশটির প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের নাম। আর, শ্যাভেজ সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন দেশটিতে। তার সূচিত রূপান্তরমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে।

এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্যাভেজকে সহায়তা করেছিল যে সব অবস্থা ও উপাদান, সেগুলোর একটি হচ্ছে, দেশটির বিপুল তেল সম্পদ। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের কথা সবার জানা। দেশটির প্রতিপক্ষ স্থানীয় মহলগুলোর হিসেব অনুসারে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত মজুত তেলের পরিমাণ সৌদি আরবের চেয়ে বেশি। তেলগ্যাস সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো দায়িত্বশীল সূত্র নানা সন্ধান ও হিসেবপত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, ভেনেজুয়েলার কেবল একটি এলাকায় কারিগরি দিক থেকে আহরণযোগ্য তেলের পরিমাণ কানাডা ও সৌদি আরবের মোট তেলের পরিমাণের চেয়ে বেশি। এর ফলে বলা হয়, বিশ্বের বৃহত্তম হাইড্রোকার্বন উৎস হচ্ছে ভেনেজুয়েলা। এদিকে, খেয়াল রেখেই একবার শ্যাভেজ বলেছিলেন, এ সম্পদ দেশে যে পরিমাণ রয়েছে, তাতে আগামী দু’শ বছর তা আহরণ করা যাবে। ভেনেজুয়েলায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মওজুদও রয়েছে বিপুল পরিমাণ। বলা হয় যে, দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মওজুদের পরিমাণ পশ্চিম গোলার্ধে দ্বিতীয় বৃহত্তম, দেশটির অপ্রচলিত তেল, যেমন এক্সট্রাহেভী অশোধিত তেল, বিটুমিন ও টার স্যান্ডসের মওজুদ বিশ্বে প্রচলিত তেল মওজুদের প্রায় সমপরিমাণ। এসব অতি সংক্ষিপ্ত তথ্যই বলে দেয় তেলগ্যাসের বিবেচনায় দেশটি কতো সম্পদশালী।

এই বিপুল সম্পদ বিশেষ করে, তেল সমৃদ্ধ এ দেশটিতে ‘মজার’ বা অবাক করা সব ঘটনা ঘটালো। বলা যায়, তেল নিয়ে তেলেসমাতি হয়। তেলের দাম বিশ্ব বাজারে বৃদ্ধি পায় ১৯৭৩ সাল থেকে। কিন্তু, সে বর্ধিত দাম থেকে দেশটি সামান্যই সুবিধা নিতে পেরেছিল। বরং ১৯৮০র দশকের গোড়া থেকে দেশটির অর্থনীতি ডুবতে থাকে। তেল বিক্রি করে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পেয়েছিল প্রায় ২৭ হাজার কোটি ডলার। অর্থের এ পরিমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপ পুনর্গঠনে মার্শাল প্লানের আওতায় খরচ করা অর্থের ২০ গুণ। অথচ, ভেনেজুয়েলার জাতীয় বৈদেশিক ঋণ ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে পড়ে। এ তথ্যই সে সময়কার শাসকদের অপচয় আর বর্বর অর্থনৈতিক লুটপাটের প্রমাণ দেয়। এ সব দেখে সে সময় ভেনেজুয়েলার জনসাধারণ ব্যঙ্গের সুরে দেশকে সম্বোধন করতেন ‘সৌদি ভেনেজুয়েলা’। এ সব তথ্য রয়েছে ‘ভেনেজুয়েলা, রূপান্তরের লড়াই’ বইতে।

এর পওে যা চলতে থাকে, সেটা বহু দেশে বহুবার শোনা ‘কাহিনী’ বা বাস্তব বিবরণ। দেশটির শাসকরা ১৯৯০য়ের দশকের গোড়াতেই দেশটিকে হাতপা মুখ বেঁধে তুলে দেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হাতে। একের পর এক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পানির ধরে বিক্রি করা হয়, টাকাওয়ালা ব্যক্তিদের কাছে। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিটিকেও বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেটা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এ সবই করা হয়েছিল বহু দেশে বহুবার শোনা যুক্তি পেশ করে। সে যুক্তি ছিল বাজেট ঘাটতি হ্রাস, বিদেশি পুঁজি আসায় উৎসাহ যোগানো, দেশের শিল্প আধুনিক করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, প্রতিযোগিতার সামর্থ বৃদ্ধি করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস করা, বেকারত্ব কমানো। এ তথ্য উপরোক্ত বইয়ের।

তবে, মিষ্টি কথায় মোড়া পর্যন্তঅর্থনীতিবিদদের এসব ‘সুবচনের’ ফলাফল ভেনেজুয়েলার মানুষ টের পেলেন। দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে খোদ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক অর্থনৈতিক কমিশন এবং পোপশাসিত ভ্যাটিক্যান এসব নীতি কৌশলের ভয়াবহ ব্যর্থতা স্বীকার করে নেয়।

মাঝখানে দেখা দেয় গভীর একটি পরিবর্তন। কৃষিপ্রধান দেশটির অর্থনীতি হয়ে উঠলো তেল আহরণ ও বিক্রয়ভিত্তিক। পরিণতিতে, কৃষিতে ঘটলো বিপর্যয়। অর্থনীতি যে চেহারা নেয়, তাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন, ‘ডাচ ডিজিজ।’ বাংলায় এর নাম হতে পারে তেড়াবেকা অর্থনীতি বা অর্থনীতির খোদ রোগ। উত্তর সাগরে তেল আবিষ্কারের পরে ডাচদের বা ওলন্দাজদের অর্থনীতিতে যে প্রতিক্রিয়া হয়, সেই অনুসারে এ নাম রাখা হয়।

ভেনেজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি চড়ে যায়, আমদানি বৃদ্ধি পায়, বিদেশি পণ্যে বাজার সয়লাব হয়, কৃষি উৎপাদন ধসে পড়ে, গ্রামাঞ্চলে বাস করা মানুষের সংখ্যা বসতে থাকে, বাড়তে থাকে নগরে বস্তির বিস্তার, দারিদ্র্য লাঘবে কার্যকর কিছুই হলো না, জমির মালিকানার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেল বৈষম্য, কৃষি উৎপাদন হয়ে উঠলো অলাভজনক, নগরায়ন হয়ে উঠলো অপ্রতিরোধ্য, জমির বাজার তৈরি হলো, শুরু হলো জমি ফটকাবাজি।

এমন অবস্থায় ভেনেজুয়েলার রাজনীতির মধ্য মঞ্চে শ্যাভেজের পদচারণা শুরু। সেটা ১৯৯৯ সাল। এর আগে, দারিদ্র বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল ৭০ দশমিক ৮ শতাংশে, আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে ১৪০ কোটি ডলার, ঋণের শর্ত অনুসারে কাঠামোগত বিন্যাস শুরু হয়েছে, রাষ্ট্রের আরো সম্পদ টাকাওয়ালাদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।

এমনই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেন শ্যাভেজ। তিনি বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না করে জনসাধারণের জীবনমান উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু, ধনীদের রাজনৈতিক দলগুলোর বিরামহীন হামলা শ্যাভেজের চেষ্টাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

শুরু হয় চক্রান্ত শ্যাভেজকে উৎখাতের। সামরিক অভ্যুত্থান হয়। যে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় শ্যাভেজ সমর্থকদের সাহসী প্রতিরোধের মুখে। এ ঘটনা ২০০২ সালের। এরপরে ২০০২ সালেরই শেষ ভাগে তেল শিল্পে তালা দেয় তেলবাবুরা। অর্থাৎ তেল শিল্পের কর্তারা। তারা সঙ্গে জুটিয়ে নেয় তেল শিল্প সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের। তেলবাবুদের সঙ্গে জোট বাঁধে বড় ব্যবসায়ীরা। তেল শিল্পের তালাবন্ধ ঘটনা আঘাত কওে দেশের গোটা অর্থনীতিকে। তেল রফতানি বন্ধ হয়। ক্ষতি হয় আটশ কোটি ডলার। অর্থনীতি প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। বিপুল পরিমাণ পুঁজি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যায়। সেই সঙ্গে চলতে থাকে তেল শিল্পে অন্তর্ঘাত।

এ সঙ্কট কাটিয়ে শ্যাভেজ এগিয়ে গেছেন। তিনি সব সময় থেকেছেন জনতার সঙ্গে, গরিবদের কাতারে। এই জননির্ভরতা শ্যাভেজকে শক্তি যুগিয়েছে, সকল চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাত ব্যর্থ করে দিতে সাহায্য করেছে।

রূপান্তরের লড়াই বইতে বলা হয়েছে : শ্যাভেজের উদ্যোগে তেলকে বীজ হিসেবে বুনে দেয়া হচ্ছে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোতে। তেল বিক্রির আয়ের কিছুটা খরচ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ বাজার ঠিকঠাক রাখতে ও জোরদার করতে। কিছুটা খরচ হচ্ছে, শিল্পায়নে ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে। কয়েকটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ কাজটি করা হচ্ছে। এ সব ব্যবস্থা হচ্ছে, . তেলগ্যাস সংক্রান্ত আইন সংশোধন এবং বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরকারের প্রাপ্য আয় বৃদ্ধি; . মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, . কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থ যোগাতে একটি তহবিল গঠন; . কর সংগ্রহের নতুন পন্থার মাধ্যমে বড় বড় কোম্পানি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কর প্রাপ্তি বৃদ্ধি; . মূল শিল্পগুলোতে সরকারি বিনিয়োগের ব্যাপকতর পরিকল্পনা, যা শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েক গুণ বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; . বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ; . পতিত জমিকে কাজে লাগানো।

শ্যাভেজের এ সব প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল গরিবদের নিয়ে গঠিত সমাজের বড় অংশকে পাশে রাখা আর পুনর্বন্টন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পটভূমি রচনা।

এ পথে সমস্যা কেবল ধনীদের আর তাদের বিদেশি প্রভূদের দিক থেকেই তৈরি হয়েছে, তা নয়। খোদ তেড়াবেকা অর্থনীতিই ছিল বিশাল সমস্যা। এ অর্থনীতিতে নগরগুলো হয়ে ওঠে ঝকঝকেতকতকে, গ্রামে কাজের সুযোগ উবে যায়, গ্রামের লোকেরা কাজের খোঁজে ভিড় জমান নগরে, তেল বিক্রির টাকার বেশির ভাগই চলে যায় নগরের অবকাঠামো তৈরিতে ও নগর সজ্জায়, নগর বাবুদের বসতি তৈরিতে, সেগুলোকে আরামদায়ক বিলাসবহুল করবে। ফলে, অর্থনীতিতে দেখা দেয় খিঁচুনি, কৃষি ভিত যায় চুপসে। অর্থনীতির একটি খাত দ্রুত মনোরম হয়ে ওঠে, বাকি খাতগুলো হয়ে পড়ে অচল।

তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ‘ওপেক’ গড়তে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিলেন যারা, তাদের অন্যতম হুয়ান পাবলো আলফনসো। তিনি ১৯৭৫ সালে বলেছিলেন, পেট্রোলিয়ামের নাম রেখেছি শয়তানের বিষ্ঠা, ঝামেলা, গোলযোগ ডেকে আনে এটা, তাকান, দেখতে পাবেন, অপচয়, দুর্নীতি, ভোগ, জনসাধারণের জন্য সরকারি সেবা ব্যবস্থাগুলো অকেজো হয়ে পড়া। আর রয়েছে ঋণ, যা বছরের পর বছর ধরে ঋণের বোঝা বইতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রেগরি উইলপোর্ট লিখেছেন, দেশের মানুষের মধ্যে ভাড়াখোর, পরজীবী, খরিদ্দার মানসিকতা পরিপূষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে, খরিদ্দার মানসিকতা, অপব্যয়ীলাম্পট্য চরিত্র, দুর্নীতির ক্রমবৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে। এই ছিল শ্যাভেজের পথযাত্রার পটভূমির একাংশ।

ভেনেজুয়েলার তেল থেকে আয় হওয়া অর্থ যেতো কতিপয়ের পকেটে। বলা যায়, তেল লুট করে ধনী আর ক্ষমতাধর লোকেরা হতো আরো ধনী। শ্যাভেজ তা পাল্টে দিলেন।

ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সেই প্রথমবারের মতো তেল থেকে আয় হওয়া অর্থ নিয়োজিত করা হলো, জনগণের জন্য নানা কাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, যাতে দারিদ্র্য মোচনে, যার জন্য দরকার ছিল অর্থের। এ সব খাতে শ্যাভেজ বিনিয়োগ করলেন অর্থ আর সে অর্থ এলো তেল বিক্রি থেকে। লক্ষ লক্ষ নিরক্ষরের কাছে পৌঁছালো শিক্ষার আলো। লক্ষ লক্ষ গরিব, যারা এত দিন একজন চিকিৎসকের সাহায্য নেয়ার সুযোগ পাননি, তাদের কাছে গেল স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সুবিধা।

সেন্টার ফর ইকোনোমিক এন্ড পলিসি রিসার্চ ২০০৭ সালের জুলাই মাসে জানায়, দেশটির দারিদ্র্য হার ১৯৯৯ সালে ছিল ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ, তা ২০০৬ সালের শেষ নাগাদ কম দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে। বেকারত্ব ১৯৯৯ সালের জুন মাসে ছিল ১৫ শতাংশ। তা ২০০৭ সালের জুন মাসে হ্রাস পায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশে। পরবর্তীকালে এসব ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি ঘটে। দারিদ্র, মুদ্রাস্ফীতি আরো কমেছে। এসব তথ্য মূলধারার।

সামাজিক উন্নয়নে তেল শিল্প ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় এক দশকে ব্যয় করে ১২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা সাড়ে ১২ হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থ। সামাজিক বিনিয়োগ ২০১১ সালে ছিল ২১ বিলিয়ন ডলার। তা ২০১২ সালে বৃদ্ধি পায় ২ হাজার ৬ কোটি ডলারের বেশি।

শ্যাভেজের উদ্যোগের আগে তেল থেকে রয়্যালটি পাওয়া যেতো মাত্র ১ শতাংশ। এখন এ হার ৩৩ শতাংশের বেশি। রয়্যালটি দেয় তেল কোম্পানি। সে সময় দিতো বিভিন্ন কর্পোরেশন। সে সময় তেল রয়্যালটিতে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির অবদান ছিল অতি সামান্য। আজ তা অন্তত ৬০ শতাংশ।

তেল বিষয়ে শ্যাভেজের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা সররকার ২০০৪ সালে গ্রহণ করে একটি নতুন নীতি। এর লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ তেল সার্বভৌমত্ব। শ্যাভেজ ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে বলেছিলেন, এখনো তেল ক্ষেত্রগুলো বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর হাতে আছে, সেগুলো আমরা নিয়ে নেবো।

তেল নিয়ে এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত জাতীয়করণ, তেল ও জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক বিনিয়োগ, এ উদ্দেশ্যে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

কেবল গরিব জনসাধারণের বাড়ি তৈরির যে পরিকল্পনা করা হয়, তা প্রায় অতুলনীয়। গত বছর পর্যন্ত সাড়ে ৩ লাখের বেশি বাড়ি তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০১২ সালের পরে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর সাড়ে ৩ লাখ করে বাাড়ি তৈরি করা হবে। অথচ, এর আগে, দেশটিতে বছরে ৯০ হাজারের বেশি বাড়ি তৈরি হতো না।

এভাবে আরো তথ্য দিয়ে দেখানো যেতে পারে যে, তেল তথা দেশের সম্পদ কিভাবে দেশের জনসাধারণের বিশেষ করে, গরিবদের কাজে লাগতে পারে। বিষয়টি কেবল অর্থ এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তর করা না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোন বা কোন কোন সামাজিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হবে বা স্বার্থ রক্ষা করবে, সে প্রশ্নগুলোও। কেবল শ্যাভেজের মতো একজন ব্যক্তির পক্ষে এ ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ ও রূপায়ন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ভেনেজুয়েলার এ সব তথ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ছবিও ভেসে উঠতে পারে।

বাংলাদেশেরও রয়েছে বিপুল সম্পদ। কেবল তেল বা গ্যাসের প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে এক্ষেত্রে বিভ্রানিন্তর অবকাশ থাকবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশের মানুষ। দেশের ১৬ কোটি মানুষ অবিশ্বাস্য সৃজন ক্ষমতার অধিকারী। তারা ইতিমধ্যেই যে পরিমাণ সম্পদ তৈরি করেছেন, তা কয়েক বছর আগেও ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। বিষয়টি দেখার জন্য কেবল দুটি তথ্যের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। একটি হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশের মানুষ যে পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান, সেটাই বলে দেয়, তারা কতো সম্পদ তৈরি করতে পারেন। কারণ, তাদের পাঠানো অর্থ তাদের তৈরি করা মোট সম্পদের এক অতি ক্ষুদ্র অংশ। মূল অংশ, চলে যায় অন্যের পকেটে। কি বিপুল, অমানুষিক পরিশ্রমে তারা এ সম্পদ তৈরি করেন। অপর তথ্যটি হচ্ছে, এ দেশে লুট করে নেয়া, চুরি করে নেয়া সম্পদের অর্থের পরিমাণ। এ সবই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মেহনতে তৈরি। আর, বাংলাদেশের সমুদ্র ও সূর্যালোক রয়েছে, রয়েছে মৃত্তিকা, যা পরিচর্যায় স্বাস্থ্য ফিরে পেলে অসাধারণ ফলন দিতে পারে।

বাংলাদেশের তেলের ও গ্যাসের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, এ সম্পদ ভেনেজুয়েলা বা সৌদি আরব বা কানাডার মতো বিপুল নয় বলে এ যাবত প্রাপ্ত তথ্য জানায়। কিন্তু বহুজাতিক নানা কোম্পানির বাংলাদেশের তেলগ্যাস সম্পদ নিয়ে সীমাহীন আগ্রহ এবং দেশের উপরে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ, গভীরভাবে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্নের জন্ম দেয়, যদি সম্পদ নাইই থাকতো তাহলে কেন এতো কামড়াকামড়ি। রাজনীতির নানা খেলা এবং শাসকদের নানা তৎপরতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তাই, এ সম্পদ সুরক্ষার ও জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পদ বিপুল নয় বলেই অপচয় বা অপব্যবহার বা লুট করার পথ আগলানো দরকার। বাংলাদেশে তেল শিল্পের বয়স বেশি নয়। তাই, এ বিষয়ে যথাযথ তথ্য পাওয়া সময় সাপেক্ষ। এই তেল ও গ্যাস সম্পদ রক্ষায় জনকল্যাণের তথা জনগণের স্বার্থের বিষয়টি অগ্রগন্য।

যদিও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে, জনস্বার্থের বিষয়টি সব দেশে সব সময়ই প্রশ্নাতীত।।