Home » শিল্প-সংস্কৃতি » আমেরিকার ধনী – আমেরিকার গরিব

আমেরিকার ধনী – আমেরিকার গরিব

ওয়েবসাইট অবলম্বনে

statue-of-liberty-2-বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশটিতে ধনী আর দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েই চলেছে। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবরা হচ্ছে আরো গরিব। একদিকে, গরিবদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারি সহায়তা কমছে, অন্যদিকে, ধনীদের কর কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে অনাহারি ও গৃহহীন লোকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত খাদ্য ও গৃহহীনতাবিষয়ক মেয়রস টাস্ক ফোর্স সম্মেলনে। বোস্টন, শিকাগো, ক্লিভল্যান্ড, ডালাস, ডেনভার, লস অ্যাঞ্জেলস, মিনিয়াপলিস, ন্যাশভিল, ফিলাডেলফিয়া, ফোনিক্স, সল্ট লেক সিটি, স্যান অ্যান্টোনিও, স্যান ফ্রানসিসকো ও ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ২৫টি প্রধান নগরীতে ইমার্জেন্সি ফুড সার্ভিসেসের সহযোগিতায় ২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত জরিপের উপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে দেখা যায়, জরুরী খাদ্য সহায়তার অনুরোধ গড়ে ২২ ভাগ বেড়েছে এবং মাত্র চারটি নগরী ছাড়া বাকি সব স্থান থেকেই সাহায্য বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আর এই সহায়তা বৃদ্ধি করার প্রায় ৫১ ভাগ দাবি এসেছে পরিবার সদস্যদের কাছ থেকে।

ভাবার বিষয় হলো, যারা জরুরী খাদ্য সহায়তা চেয়েছে, তাদের এক তৃতীয়াংশ (৩৭ শতাংশ) কোনো না কোনো চাকরিতে নিয়োজিত। অর্থাৎ তারা যে বেতন পাচ্ছে, তা খাদ্য, আবাসনের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। সার্বিকভাবে, প্রতি সাত আমেরিকানের একজন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ২০১১ সালে প্রায় ৪৭ মিলিয়ন লোক রেশন কার্ড পেয়েছে, যা ২০১০ সালের চেয়ে ১৩ লাখ বেশি।

খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি ২২ বাড়লেও আলোচিত সময়ে গড় সরবরাহ বেড়েছে মাত্র ০.২ ভাগ। অধিকন্তু জরিপে বলা হয়, জরিপকৃত ৯৫ ভাগ নগরীতে জরুরী খাদ্য সরবরাহকারী কিচেন খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। অর্থের অভাবে ৮৯ ভাগ নগরীতে সাহায্য চাইতে আসা লোকজনকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর ৮১ ভাগ নগরীতে খাবার সাহায্য দেওয়ার দিনের সংখ্যা হ্রাস করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ক্ষুধা, গৃহহীনতা, দারিদ্র্য এবং কম বেতনপ্রাপ্ত লোক বাড়ার কারণ হিসেবে অনেক নগরী কর্মকর্তা চাকরি না থাকা এবং বহনযোগ্য ব্যয়ের মধ্যে বাসা না পাওয়ার কথা বলেছে। জরিপে দেখা গেছে, একদিকে খাদ্য সহায়তার দাবি বাড়ছে, অন্যদিকে সহায়তার উৎসগুলো কমে যাচ্ছে। ফলে যেসব গ্রুপ এসব সাহায্য কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, তারা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছে।

খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে সরকারি অবদান ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলেও জরিপে দেখা যায়। বর্তমানে বিভিন্ন মুদি দোকান থেকেই খাদ্য সহায়তার প্রায় অর্ধেকটা পাওয়া যায়।

জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে সহায়তার চাহিদা অন্তত কমবে না।

খাদ্য সমস্যার পাশাপাশি গৃহহীনতা সমস্যাও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জরিপকৃত নগরীগুলোর ৬০ ভাগে গৃহহীনতা বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষুধা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে গৃহহীন লোকের সংখ্যা। প্রাপ্তবয়স্ক গৃহহীন লোকের এক তৃতীয়াংশ আবার মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে।

আগামী বছরগুলোতে গৃহহীনতা বাড়বে বলেই জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে।

কম ভাড়ার বাসা না পাওয়াটাই গৃহহীন লোকের সংখ্যা বাড়ার প্রধান কারণ বলে বলা হয়েছে। কম খরচে বাড়ি নির্মাণ করে এই সমস্যার সুরাহা করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে হচ্ছে বিপরীত ঘটনাটিই। আমেরিকান সমাজে সাধারণ প্রবণতা হলো মৌলিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় হ্রাস করা হচ্ছে। ফিসক্যাল পলিসি ইনস্টিটিউটের জরিপে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ডিসির সরকারি গৃহায়ন বাজেট ২০০৪ সালে যেখানে ছিল ১২০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১০ সালে হয়েছে ৬০ মিলিয়ন ডলার।

২০১২ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ৭০০টি কিচেন পরিচালনাকারী ক্যাপিটল এরিয়া ফুড ব্যাংক দেখতে পেয়েছে, ওই বছরে সরকারি খাদ্য রেশন ৩৮ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সেখানকার বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। স্কুল ছুটির সময়ে তাদের কষ্টটা বাড়ে, কারণ তখন স্কুলের ফ্রি লাঞ্চ পাওয়া যায় না। এতে আরো বলা হয়েছে, সেখানকার ৪৭ হাজার শিশু, মোট ছাত্রের প্রায় এক চতুর্থাংশ, সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত।

২০১২ সালের মেয়রস জরিপে নিউ ইয়র্ক ও ডেট্রোয়টের মতো বড় বড় শহরকে অন্তভুক্ত করা হয়নি। ২০১২ সালের আগস্টে অ্যানি ই. ক্যাসে ফাউন্ডেশনের জরিপে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ নগরীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র হিসেবে পরিচিত ডেট্রোয়টে তিন চতুর্থাংশ শিশু সরকার ঘোষিত দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে।

একইভাবে নিউ ইয়র্ক সিটির ১০০টি খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রে পরিচালিত তাৎক্ষণিক জরিপে দেখা যায়, ২০১২ সালে সেখানে চাহিদা বেড়েছে পাঁচ ভাগ।

গরিব মানুষদের অবস্থা ক্রমাগত নাজুক হতে থাকলেও ধনীদের কিন্তু পোয়াবারো। তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে চলেছে।

১৯৯২ সালে আমেরিকার ৪০০তম ধনী ব্যক্তির মুনাফা হয়েছে ২৪ মিলিয়ন ডলার। ২০০৭ সালে দেশটির ৪০০তম ধনী ব্যক্তিটির মুনাফা ছিল ১২৮ মিলিয়ন ডলার (মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে বলা যায়, পরিমাণটি ৮৭ মিলিয়ন ডলার)

২০০৯ সালের তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে ধনী ৪০০ লোক মূলধন বৃদ্ধিজনিত কারণে তাদের সম্পদ বেড়েছে। ‘ফরচুন ৪০০’ অনুযায়ী, সবচেয়ে ধনী ৪০০ লোকের অর্ধেকেরই মূলধন বেড়েছে স্টক বা সম্পত্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে।

১৯৯২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত শীর্ষ ৪০০ উপার্জনকারীর আয় ৬৫০ ভাগ তথা ৩৪৪ মিলিয়ন বেড়েছে। অথচ এই সময়ে গড় বেতন এমনকি দ্বিগুণও হয়নি। অথচ মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে ১,২০০ ভাগ। তবে সেটা তাদের বেতন বাড়ার কারণে নয়, বিনিয়োগের মাধ্যমে।

ধনী হচ্ছে কারা? ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ০.১ শতাংশ লোক অন্তত ১৭ লাখ ডলার করে আয় করছে। তবে তাদের আয় ‘ফরচুন ৪০০’ গ্রুপে থাকাদের চেয়ে ১৪ গুণ কম। তবে এই দুই গ্রুপের মাঝামাঝি আর কারো অস্তিত্ব নেই। এই গ্রুপের ১০ জনের মধ্যে চারজন হলো অর্থবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী, ম্যানেজার ও সুপারভাইজর। ১৮ শতাংশ অর্থ লগ্নিকারক। এছাড়া রয়েছে আইন (৭ শতাংশ), চিকিৎসা (৬ শতাংশ), রিয়েল এস্টেট (৪ শতাংশ) পেশার লোক। তবে মূলধন কারবারিরাই সার্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি সম্পদ আরোহণ করছে। টাকায় টাকা আনেকথাটার সত্যতা তারাই প্রমাণ করে চলেছে। আবার সরকারও তাদের পক্ষে। কর রেয়াত সুবিধা তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগ করে। ১৯৯০ সালে ২৮ শতাংশ কর ১৯৯০এর শেষ দিকে ২০ শতাংশে নেমে আসে। আর জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে তা হয় ১৫ শতাংশ।।