Home » অর্থনীতি » আর্থিক খাতে লুটপাট

আর্থিক খাতে লুটপাট

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ‘দুর্নীতি দমন কশিনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্ত বায়ন ও ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশীশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন এবং সরকারি কর্মকান্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করেন দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।’ দুর্নীতি বন্ধ, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করলেও বর্তমান সরকারের চার বছরের সময়কালে ব্যাপক লুটপাট এবং দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর প্রায় এক লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চিহ্নিত একটি মহল। সোনালী ব্যাংকের দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় নানা কৌশলে। অন্যান্য ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির একাধিক ঘটনা ঘটেছে এ সময়ে। ডেসটিনি, ইউনিপেটুসহ বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি সরকারের ছত্রছায়ায় গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উপরন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পরিষদকে করা হয়েছে শাসক দলের নেতাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। ব্যাংকের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও চাপের কারণে ঋণ দিতে হয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়। এর ফলে এ ব্যাংকগুলো বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অপরদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও সরকার ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং দলীয় বিবেচনায়।

দ্রুত বিদ্যুত্ সমস্যা সমাধানের কথা বলে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পদ্ধতি গ্রহণ করে নিজ দলীয় লোকদের এসব কুইক রেন্টাল স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে মূলত লুটপাটের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। আর এ ব্যাপারে দেয়া হয়েছে ইনডেমনিটি। চার বছর ধরে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল চালানোর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রেন্টালগুলোতে ভর্তুকির টাকার জোগান দিতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নানা কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ করায় ব্যাংকে সৃষ্টি হয় তীব্র তারল্য সঙ্কট। ফলে ঋণের সুদ হার বেড়ে বিনিয়োগকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। ভর্তুকির চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সরকার আইএমএফের কঠিন শর্তের কারণে দফায় দফায় তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মূল্যস্ফীতির হার এখন দুই অঙ্কের ঘরে। গ্যাসবিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট সামাল দিতে সরকার নতুন সংযোগ দেয়াই বন্ধ করে দেয়। শেয়ারবাজার থেকে লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই সরকারের সময়ে। আর প্রতিদিনই শেয়ারবাজারের সূচক নিচের দিকেই যাচ্ছে। ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিও হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তথ্যউপাত্ত তুলে ধরলেও সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

হলামার্ক কেলেঙ্কারি: ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে ২০১২ সালে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হলমার্ক গ্র“পের এমডি তানভির মাহমুদ সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) শাখা থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ভুয়া এলসি খোলার মাধ্যমে। একই শাখা থেকে আরও ২৬টি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ভুয়া এলসি করে অস্তিত্বহীন আরও ৪০টি কোম্পানি হাতিয়ে নেয় আরও ১ হাজার কোটি টাকা। আর নজিরবিহীন এই জালিয়াতির অন্যতম সহযোগী ছিলেন রূপসী বাংলা শাখার তৎকালীন জিএম। সরকারের এক উপদেষ্টার নামও আসে এই জালিয়াতিতে প্রভাবক হিসেবে। দুদকের মামলায় বর্তমানে হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভির আহমেদ, তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তি বর্তমানে জেলে আছে। অথচ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় অর্থমন্ত্রী হলমার্ককে পুনরায় ঋণ দেয়ার কথা বলছেন। হলমার্কের পক্ষ নিয়ে অর্থমন্ত্রী গত ক’দিন ধরেই সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বলছেন, টাকা উদ্ধারের জন্য ওদের দরকার আরও ঋণ। অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ মহলের আশ্বাস ও সহযোগিতা পেয়েই সম্প্রতি হলমার্ক গ্রুপ তাদের সম্পদের একটি হিসাব প্রকাশ করেছে। এর কপিও জমা দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে। হলমার্কের দেয়া সম্পদের বিবরণ ও মূল্য তালিকায় বিস্ময়করভাবে অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে সম্পদের।সোনালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ৩ গুন অর্থ আত্মসাত্ করেছে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। অথচ বিপুল পরিমাণ এ অর্থ উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি ব্যাংকটি। এ আত্মসাতের ঘটনায় সরকারও অনেকটা নির্বিকার ছিল। আর সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তায় অপরাধীরা বার বার উৎসাহিত হয়েছে। এখন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আত্মসাতের ঘটনা যে কোনোভাবে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবারও মোটা অঙ্কের অর্থ লুটপাটের।

হলমার্কের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা উদঘাটনের পরপরই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ে একটা সমঝোতা চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া অর্থের দায়দায়িত্ব হলমার্ককে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিয়ে ১৫২০ বছরের জন্য তা পুনঃতফসিলের প্রচেষ্টা নিয়েছিল সরকার। এ নিয়ে এক দফা বৈঠকও হয়। আর এর নেপথ্যেও কাজ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কৌশল করে হলমার্ক কেলেঙ্কারির তথ্যউপাত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠিয়ে দেয়। ফলে তখন সেই উদ্যোগ আর সফল হয়নি। এ প্রচেষ্টা এখনো চলছে। নতুন করে ঋণ দেয়ার নামে জনগণের আরো অর্থ লুটপাটের ব্যবস্থা করার। অথচ একজন প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা যায় সহজেই। সে পথে অগ্রসর না হয়ে সরকার ভিন্ন পথে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রথম দিকে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা বড় কিছু নয়।

বিসমিল্ল­াহ কেলেঙ্কারি: টেরিটাওয়েল (তোয়ালেজাতীয় পণ্য) উৎপাদক বিসমিল্লাহ গ্র“প দেশের পাঁচটি ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিসমিল্লাহ গ্র“পের অন্যতম দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ও আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস। আলফা টাওয়েলস ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার ৮২টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে ২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ঋণ নেয়। একইভাবে বিসমিল্লাহ টাওয়েলসের ২৭ মে থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ৮৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার ৬১টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে প্রাইম ব্যাংক ২৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা ঋণ দেয়। নিয়ম অনুসারে পণ্য জাহাজীকরণের পর ১২০ দিনের মধ্যে এই বিলের টাকা দেশে আসার কথা। কিন্তু তা দেশে প্রত্যাবাসন হয়ে আসেনি। সবগুলো রপ্তানিই হয়েছে এলসি (ঋণপত্র) নয়, চুক্তির (এক্সপোর্ট বা সেল কন্ট্রাক্ট) বিপরীতে। বিসমিল্লাহ টাওয়েলস ও আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস প্রাইম ব্যাংক থেকে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে ১৭৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকার ঋণ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৬৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার ৬৭টি রপ্তানি বিলের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলেছে, এখানে রফতনিকারক, আমদানিকারক ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার যোগসাজশে ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরি করে রপ্তানির বিপরীতে (ফরেন ডকুমেন্ট বিল পারচেজ বা এফডিবিপি) ব্যাংক থেকে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিসমিল্লাহ গ্র“প এভাবে নানা ফন্দিফিকির করে জনতা ব্যাংক থেকে মোট (ফান্ডেড বা ঋণ ও নন ফান্ডেড বা গ্যারান্টি জাতীয়) ঋণ সৃষ্টি করেছে ৩৯২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, প্রাইম ব্যাংকে এক শাখাতেই ৩০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংকে ১৬৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, শাহজালাল ব্যাংকে ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে ৬২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দুদক বা সরকার তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানা যায় না। হলমার্ক থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ লুট করে নিয়ে গেলেও কথা বলছেন না সরকার।

ডেসটিনি, ইউনিপে টুইউ, আইসিএলের কোটি টাকা লুট: দুদকের প্রাথমিক তদন্ত উল্লেখ করা হয়, মোট পাঁচ হাজার ৯৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে তার মধ্যে থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন ডেসটিনি গ্র“পের পরিচালকেরা। এর মধ্যে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের এমএলএম পদ্ধতিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২০০০ সাল থেকে দুদকের তদন্ত কার্যক্রম পর্যন্ত ৬৬টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিন হাজার ৫৯৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ টাকা বিভিন্নভাবে তুলে নেন কর্মকর্তারা। ট্রি প্ল্যানটেশনের নামে ১৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৯২১ কোটি তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্নভাবে ৯০০ কোটি টাকা নিজেরাই নিয়েছেন। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটির নামে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে এক হাজার ৪৪৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন উপায়ে এক হাজার ৪১৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার মামলায় ডেসটিনি এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা আটক ও পলাতক থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ জন্য কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সংশোধনীতে বেসরকারি খাতে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগের ফলে তা নানা মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তা আর সংশোধন হয়নি। ডেসটিনির অনিয়মদুর্নীতি খতিয়ে দেখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি গত অক্টোবরে রিপোর্ট পেশ করে। সেখানে ডেসটিনির ৩৫ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। আট মাস বন্ধ থাকার পর আবারও লুটপাটের আয়োজন করছে ডেসটিনি। জনগণের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা না করে সরকারই সে অর্থ লুট করে নেয়ার চেষ্টা অব্যহত রেখেছে বলে অভিযোগ।

আরেক প্রতারক প্রতিষ্ঠান এমএলএম কোম্পানি ইউনিপেটুইউ মাত্র ১০ মাসে বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ দেয়ার কথা বলে জনসাধারণের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৩ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়ে ইতিমধ্যে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ৭ জন গ্রাহক। ঘরবাড়ি ছাড়া কয়েক হাজার মধ্যস্বত্ব ভোগী বিনিয়োগকারী। দুই বছর সময় পেরিয়ে গেলেও কোন গ্রাহক তাদের টাকা ফেরত পায়নি। জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে ইউনিপেটুইউ’র বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে দুদক। মামলার চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। দুদকের দায়ের করা মামলায় প্রতিষ্ঠানের মোট ১১ জন কারাগারে আছেন। অর্থ আত্মসাতের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতে দায়ের করা একটি মামলায় ২ বছরের দণ্ড হয়েছে তাদের। জানা গেছে, এতে খুশি ইউনিপেটুইউ’র সঙ্গে জড়িত কর্তাব্যক্তিরা। ৩৬০০ কোটি টাকা লুটে নিয়ে ২ বছর জেলখাটাকে তারা লাভজনকই মনে করছেন।

আইডিয়াল কোঅপারেটিভ সোসাইটি আইসিএল একটি এমএলএম কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন নেয় ২০০১ সালে। হজ আমানত, ডিপিএস, মাসিক দ্বিগুণ মুনাফা, বার্ষিক দ্বিগুণ মুনাফা, কোটিপতি স্কিম সহ মোট ১৩টি প্রকল্পে আকর্ষণীয় প্রচারের দ্বিগুণ মুনাফা দেয়ার কথা বলে আইসিএল মোট ৩৭০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে জনগণের কাছ থেকে। গত বছর শেষের দিকে হঠাৎ করে একযোগে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। এই সোসাইটির কারোরই এখন খোঁজ খবর মিলছে না। আইসিএলএর প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গত মাসে দুদক ৫ সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে মাত্র। কোনো অগ্রগতি নেই এক্ষেত্রেও।

শেয়ারবাজারে লুট: ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমেই মহাধস নামানো হয়। একের পর অব্যহত দরপতনে শেয়ারবাজার খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়। পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৬ এপ্রিল শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গণভবনে ৪ ঘণ্টার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সে বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে ২৩ নভেম্বর এসইসি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য ১০ দফা, মধ্য মেয়াদে (৩ মাস) বাস্তবায়নযোগ্য ৪ দফা এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য (৬ মাস) ৬ দফা পদক্ষেপ সংবলিত মোট ২০ দফার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ স্কিম প্রণয়নে কমিটি গঠন এবং কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু এক বছরেও অধিকাংশ ঘোষণারই বাস্তবায়ন হয়নি। কিছু কিছু বাস্তবায়িত হলেও সেগুলোর কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েনি। শুরু হয় মহাধ্বস। পুঁজি হারানো বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের জোর দাবি জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষণা করা হয় প্রণোদনা প্যাকেজ। কিন্তু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর বাজারে আরও বেশি পতনের ঘটনা ঘটে। পুঁজি হারিয়ে রাজধানীতে আত্মহত্যা করেছেন যুবরাজ, চট্টগ্রামে দিলদার হোসেন নামে দুই বিনিয়োগকারী। নানা প্রতিশ্র“তি দিয়েও কথা রাখেনি সরকার। বরং শেয়ারবাজার লুটপাটকারীর অভিযুক্তদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এর দেখভালের। এ কারণে আস্থা ফিরে আসেনি এখানে।

কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে লুটপাট: সরকার জ্বালানি তেলভিত্তিক ১৯টি কুইক রেন্টাল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ভর্তুকি দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেখানে সরকার টাকার অভাবে ও দাতা সংস্থা না পেয়ে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬টি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে পারছে না, সেখানে কুইক রেন্টালের জন্যই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর এই ১৯টি কুইক রেন্টালের চুক্তির মেয়াদও শেষ হবে ২০১৪ সালের মধ্যে। এর মধ্যে চলতি বছরেই মেয়াদ শেষ হবে ১১টির। সরকারের একটি মহল আবারও চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য জোর লবিং শুরু করেছে। নতুন করে নির্মিত ভাড়াভিত্তিক, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক (কুইক রেন্টাল) বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছে পুরনো যন্ত্রাংশ দিয়ে। আর এটাকে কেন্দ্র করেই কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আর গত ২০১২ সালের ৩০ জুন এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ২০০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এক হিসাবে প্রতি মাসে বিপিডিবি লোকসান দেয় প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠিত ‘কুইক রেন্টাল পাওয়ার’ কোম্পানি থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে তা কম দামে বিক্রি করায় প্রতি বছরই সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ পড়ছে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু গ্রাহকপর্যায়ে বিক্রি করা হচ্ছে সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। দামবেশি তারপরও বিদ্যুৎ নাই। সরকারের হিসাব ঠিক হলে প্রশ্ন, তাহলে বিদ্যুৎ গেলো কোথায়? রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দুর্নীতির কারণে পাকিস্তানের একাধিক রাজনৈতিক নেতার বিচার চলছে এবং দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আমাদের এখানে লুটপাটকারীদের পৃষ্টপোষকতা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিয়ে, প্লান্ট বন্ধ রাখলেও জোগানো হচ্ছে অর্থ। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে অর্থ লুট করছে।

এদিকে ব্যাপক এ লুটপাট সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলছেন, সামপ্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষের দুর্নীতির মাধ্যমে দ্রুত অর্থ আয় করে রাতারাতি বড় লোক হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাদের এ প্রবণতাকে হালে পানি পাইয়ে দিচ্ছে আইনের বেশ কিছু দুর্বলতা এবং আইনপ্রয়োগকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দুর্নীতির প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজে দুর্নীতি করে দুর্নীতিবাজদের আরও সুযোগ করে দিচ্ছে। মহামারী আকারে বিস্তারিত ওই দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতির পরিত্রাণের জন্য সবার আগে দরকার সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় তদারক বৃদ্ধি করা। দেখা যায়, দুদক অনেক কষ্ট করে অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর দিনের পর দিন মামলা বিচারাধীন পড়ে থাকে তাতে অন্য দুর্নীতিবাজরা নিজেদেরকে আরও উৎসাহিত বোধ করে। এছাড়া, সব সময়ই দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতার ভেতরে বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে বলে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ইতিহাসে দেখা যায়, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহযোগিতা ছাড়া লুটপাট এবং দুর্নীতি সম্ভব নয়। এবারেও এমনটিই দেখা যাচ্ছে।।