Home » আন্তর্জাতিক » তেল-গ্যাস-লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস-লুট দেশে দেশে

 

তেলের রাজ্য রক্তাক্ত চক্রান্ত এবং নৃশংসতার

ফারুক চৌধুরী

coal power-1আধুনিক জীবনে তেল বিপুল প্রভাব ফেলে, এ কথা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। স্বাভাবিকভাবেই শিল্পেসাহিত্যেও স্থান পেয়েছে তেল। চলচ্চিত্রও বাদ পড়েনি, তৈরি হয়েছে ‘দেয়ার উইল বি ব্লাড’ এবং ‘সিরিয়ানা’ নামে চলচ্চিত্র। শেষোক্ত চলচ্চিত্রটি তৈরি হয় ২০০৫ সালে এবং অপরটি তৈরি হয় ২০০৭ সালে। সিরিয়ানার পটভূমি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, চক্রান্ত কবলিত, রক্তাক্ত আজকের মধ্যপ্রাচ্য।

দেয়ার উইল বি ব্লাড’ তৈরি হয়েছে, ব্যাপকতর অর্থে, সিনক্লেয়ারের বিখ্যাত অয়েল বা তেল নামের উপন্যাস অবলম্বনে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে তেলের তেজী অবস্থার সময়ে সম্পদের জন্য এক তেল সন্ধানীর নিষ্ঠুর কাহিনী নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘অয়েল।’ এটি রচিত হয় ১৯২৭ সালে। আর, প্রায় ৮০ বছর পরে এ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্র ‘দেয়ার উইল বি ব্লাড’ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে, ভূষিত হয় দুটি অস্কারসহ অনেক পুরস্কারে, আর সিরিয়ানাকে বলা যায়, ভুরাজনীতি কেন্দ্রিক থ্রিলার ফিল্ম। এ চলচ্চিত্রের ভিত্তি হচ্ছে রবার্ট বায়েরের স্মৃতিকথা ‘সী নো ইভিল।

এ চলচ্চিত্রে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় একটি আরব দেশ, লেবানন, স্পেন, কাজাখস্তান, ইরান, সুইজারল্যান্ড এবং টেক্সাস ও ওয়াশিংটন ডিসিতে নানা ঘটনা, তেল, রাজনীতি, তেল শিল্পের বিশ্বব্যাপী প্রভাব, অস্ত্র পাচার,সিআইএ চর ইত্যাদিকে ঘিরে। এ সিনেমায় দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরিবার শাসিত রাজ্যে তেল ক্ষেত্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল তেল কোম্পানি। এ কোম্পানির নাম কনেক্স। সে রাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে চীনের একটি কোম্পানিকে। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সে দেশের তেল শিল্প বিক্ষুব্ধ।

এ দুটি বই ও চলচ্চিত্র বলে দেয়, তেলের জগত মানব জীবনে ও রাজনীতির জগত কতো বিস্তৃত; তা কতো দিন ধরে প্রভাবিত করছে; তা কতো জটিল ও কুটিল। লোভ, চক্রান্ত, প্রাণহানি ছড়িয়ে রয়েছে তেলের এ জগতে। এত কুটিলতা ও নৃশংসতার পেছনে রয়েছে লোভ, ঘৃণ্য লোভ।

কোনো ছোট শিল্প এত বিপুল ক্ষমতাধর হতে পারে না। এ তেল শিল্প বিস্তৃত, এখানে রয়েছে অনুসন্ধান, আহরণ, শোধন ও পরিবহনের বিশদ আয়োজন। এ শিল্পের সব চেয়ে বেশি উৎপাদিত পণ্য হচ্ছে জ্বালানি তেল। আর, পেট্রোলিয়াম ব্যবহৃত হয় রসায়ন শিল্পে, সার ও কীটনাশক শিল্পে, প্লাস্টিক শিল্পে। আরো বহু শিল্পে পেট্রোলিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজনী ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অনেক দেশে ও অঞ্চলে যত শক্তি ব্যবহৃত হয়, তার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে আছে পেট্রোলিয়াম। যেমন, উত্তর আমেরিকায় ৪০ শতাংশ, ইউরোপে ৩২ শতাংশ, এশিয়ায় ৩২ শতাংশ, মধ্য আমেরিকায় ৪৪ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্যে ৫৩ শতাংশ, আফ্রিকায় ৪০ শতাংশ। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়। ডলারের হিসেবে পেট্রোলিয়াম উৎপাদন, শোধন, বিতরণ ও খুচরা বিক্রি মিলিয়ে এটাই পৃথিবীর বৃহত্তম শিল্প।

পৃথিবীতে যতো তেল ও গ্যাস মজুদ, তার ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ২০টি তেলগ্যাস কোম্পানির মধ্যে ১৫টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। পেট্রোলিয়ামের রাজ্যে ও রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলোর ভূমিকা ও গুরুত্ব বিশাল। এ সব কোম্পানিকে ইংরেজিতে ‘ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানিজ’ বা সংক্ষেপে এনওসি নামে অভিহিত করা হয়। এগুলোর বিপরীতে রয়েছে বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো। ইংরেজিতে এগুলোকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অয়েল কোম্পানিজ’ বা সংক্ষেপে আইওসি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এই এনওসি এবং আইওসিসমূহের মধ্যে সম্পর্ক, সহযোগিতা, বিরোধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা তেল শিল্পে, তেলের রাজনীতিতে অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতিতে বিপুল প্রভাব ফেলে। কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে মারাত্মক, রক্তাক্ত।

পৃথিবীর কয়েকটি প্রধান এনওসির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : সৌদি আরামকো, লিবিয়া এনওসি, সোনাট্রাক, ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি, পেট্রোলেওস ডি ভেনেজুয়েলা, কাতার পেট্রোলিয়াম, নাইজেরিয়ান ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, ইরাক ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন।

সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় চোখ বা টিভির পর্দায় চোখকান রাখলে, এ সব কোম্পানির খবর মনোযোগ কাড়ে। একই সঙ্গে, এ সব দেশের নানা ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিলে, সংশ্লিষ্ট দেশের তেল ও তেল কোম্পানির ভূমিকা, গুরুত্ব বা অবস্থান বুঝতে পারা যায়। আর, এ সব দেশের সামাজিকরাজনৈতিকঅর্থনৈতিক ঘটনা প্রবাহের উত্থানপতনে এ কোম্পানিগুলোর জড়িয়ে থাকাও স্পষ্ট হয়।

কারণ, এ কোম্পানিগুলোর হাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ তেল ভান্ডার, যদি এদের সঙ্গে আইওসিগুলোর সম্পর্ক, সহযোগিতা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দেখা হয়, তাহলে নানা ঘটনা বুঝতে পারা সহজ হয়ে যায়।

তেল উৎপাদিত হয়, এমন দেশের সংখ্যা কম নয়। এ সংখ্যা শতাধিক। সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, কঙ্গো, নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কাতার, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের নাম জানা আছে। এমন সব দেশে তেল উৎপাদন হয়, যেগুলোর নাম শুনলে বুঝতে পারা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নানাবিধ খেলা, ইত্যাদি অঙ্গনে এদের গুরুত্বের কারণ। যেমন, ত্রিনিদাদতোবাগো (ইংরেজিতে এর নাম হচ্ছে ত্রিনিদাদ এন্ড টোব্যাগো), তিমুর, সুরিনাম, ক্রোশিয়া, সার্বিয়া, লিথুয়ানিয়া, বেলিজ, আরুব, স্লোভেনিয়া বলা যায়, ইংরেজি প্রথম অক্ষর ‘এ’ থেকে শেষ অক্ষর ‘জেড’ পর্যন্ত নানা দেশে তেল উৎপাদিত হয়। উদাহরণ দেয়া যাক, আলজেরিয়া, এঙ্গোলা, আজারবাইজান, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, আলবেনিয়া, (এসব দেশের নামের বানানের প্রথম অক্ষর ইংরেজি ‘এ’), আবার, ‘জেড’ দিয়ে শুরু তেল উৎপাদক দেশের নাম হচ্ছে, জাম্বিয়া। এসব তালিকা তৈরি করলে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ইত্যাদি নাম পাওয়া যাবে।

এবার এ সব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতির নানা ঘটনার দিকে নজর দিলে অনেক বিষয়, হেতু, খুঁজে পাওয়া যাবে। নানা সামরিকবেসামরিক জোট, চুক্তি, নানা দেশের কূটনীতিকদের ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা, ঘটনাদুর্ঘটনা, সহিংসতা, সশস্ত্র সংগঠন, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ইত্যাদিও অর্থ বহুরূপে চোখে ধরা পড়বে। এ সব দেশের রাজনীতিতে অবশ্যই, নানা ব্যবসা সংগঠন, ব্যবসা সংঘের নানা কাজে, এমনকি শ্রমিক, ছাত্র ও সামাজিক ক্ষেত্রের নানা সংগঠন, তৎপরতা ও আন্দোলনেও এ দিকটি পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। কেন, একই ধরণের ঘটনা ঘটেই চলে, কেন এক ধরণের উদ্যোগ বা ঘটনা ব্যর্থ হতেই থাকে, কেন ‘ইনি’ এমন বলেন আর ‘তিনি’ তেমন বলেন, এসব ব্যাপারেও অনেক স্পষ্ট হয় এ দিকগুলোতে দৃষ্টি দিলে।

সমকালীন বিশ্বে তেল, গ্যাস ইত্যাদি নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি শব্দ বহুবার, বহুভাবে অনেক ব্যবহার করেন। এ শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে, তেল রাজনীতি, তেল আধিপত্য, তেল স্বেচ্ছাচার, তেল অস্ত্র, তেল যুদ্ধ। এসব শব্দ বলে দেয়, তেল নিয়ে রাজনীতি, কূটনীতি, শক্তি প্রদর্শন ইত্যাদি চলে। আর, গুরুত্ব আছে বলেই তো এতো আয়োজন। চিনি নিয়ে, বন, গম, সয়াবিন নিয়েও চলে নানা ‘খেলা।’ কিন্তু, চিনি রাজনীতি, গম কূটনীতি, বন যুদ্ধ, সয়াবিন স্বেছ্চাার ইত্যাদি শব্দমালা এখনো ব্যবহৃত হয়নি। আগামীতে পানিযুদ্ধ হতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন। পানির গুরুত্ব বাড়ছে বলেই এমন শব্দ জোড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাই, এ শব্দগুলোই বলে দেয় তেলের গুরুত্ব।

অনেকে ব্যবহার করেন, আরো দুটি শব্দ। সে শব্দ দুটো হচ্ছে, তেল সাম্রাজ্যবাদ, কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, বিশ্বে তেল মওজুদের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষ নিয়নন্ত্রণ আরোপের জন্য নানা স্বার্থ, নানা পুঁজি বা নানা রাষ্ট্র বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা চালায়। এ সব চেষ্টা সব সময় প্রকাশ্যে, আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হয় না। কেউ বলেন, সকল আন্তর্জাতিক রাজনীতির শেকড় হচ্ছে, তেল সম্পদের ওপর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা। এদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপই হয়ে উঠেছে সকল আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল বিষয়। এটাই সব ঘটনা, কাজকে রূপ দিচ্ছে।

তবে, অন্যরা বলেন, তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু, এক মাত্র বিষয় বা নির্ধারক উপাদান নয়।

একই ভাবে চালু আছে, আরেকটি কথা। সেটি হচ্ছে, পেট্রোডলার যুদ্ধ। এ বিষয়ে কেউ কেউ বলেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে, বিশ্বের প্রধান মওজুদ মুদ্রা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ডলারের অবস্থান।

উল্লেখ করা দরকার যে, তেলের অধিকাংশ বেচাকেনা হয় ডলারে। তাই, তেল আমদানিকারক দেশগুলোও বাধ্য হয় ডলারের বিপুল মওজুদ রাখার জন্য। এ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু সুবিধা দেয়। কোনো কোনো দেশ চেষ্টা করেছে, এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসার। এদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাক উল্লেখযোগ্য। ইরান এ ধরণের চেষ্টা করেছে।

তবে, এ বিষয়গুলো কেবল একদিক থেকে দেখে দ্রুত উপসংহারে পৌঁছালে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই, এ সব বিষয়ে স্পষ্ট হওয়ার জন্য দরকার পড়ে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য দিকের প্রতিও দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। তেলের গুরুত্ব বুঝতে পারার জন্যই এ বিষয়গুলো এখানে উল্লেখ করা হলো।।