Home » রাজনীতি » দেখা মাত্র গুলি – আইনের ব্যাখ্যা

দেখা মাত্র গুলি – আইনের ব্যাখ্যা

মোঃ আসাদুজ্জামান

police fireব্রিটিশ আমল থেকেই এই উপমহাদেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম, হত্যাকাণ্ড কমবেশি চলে আসছে। পাকিস্তান আমলে এর প্রচলন ছিল। বিশেষ করে সরকার বিরোধী আন্দোলনে জনগণকে অংশগ্রহণ থেকে নিবৃত করার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে মিছিলের উপর গুলি করে মানুষ হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধ করেছিল। কিন্তু এ ধরণের হত্যাকাণ্ডকে তাৎক্ষণিকভাবে কখনই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। তবে কালের বিবর্তনে, ইতিহাসের পরিক্রমায় জনগণের আদালতে এ ধরণের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, যার পরিসমাপ্তি হয়েছে, হয় সরকার বদল, না হয় দেশ ভাগের মধ্যে দিয়ে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যকার সময়ে অনেক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, যার মধ্যে ’৫২র ভাষা আন্দোলনে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকেই। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন আসাদ, মতিউর প্রমুখ। এ তো গেল মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি আধিপত্যবাদী শক্তির ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ ভেবেছিল, সকল প্রকার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান হবে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ’৭৫ সালের সরকারি প্যারামিলিটারি ফোর্সের ভিন্নমতের নেতাকর্মীদের হত্যাযজ্ঞ জাতিকে শুধু হতাশই করেনি, বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর, ১৯৯০ সালের ১০ নভেম্বর মিছিলের উপর পুলিশ এবং সরকারি বাহিনী গুলিবর্ষণ করে মানুষ হত্যার মতো অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক বিচার না হলেও ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণরায়ের গণরোষে এরশাদ সরকারের ঠিকই বিচার হয়েছিল।

২০০৯ পরবর্তী বিএনপি শাসন আমলে মিছিলের উপর গুলি করে মানুষ হত্যার মতো অপরাধ সংগঠিত না হলেও অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং ক্রসফায়ারের মতো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমরা কখনো ভালোভাবে দেখিনি। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা দখলের পর সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রক্রিয়ায় বিএনপির ভালো কাজ এবং অর্জনকে বর্জন করলেও ক্রসফায়ার অনুসরণ করেছে এবং তা ডিজিটাল সিস্টেমে আধুনিকায়ন করে পাখির মতো এমন ভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছেযা শুধুমাত্র গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ১৯৫২ কিংবা ১৯৬৯ সালের হত্যাকাণ্ড ২০১৩এর হত্যাকাণ্ডের কাছে তুলনামূলক চিত্রে অত্যন্ত ম্রিয়মান।

এখন দেখা যাক, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় যন্ত্র কিভাবে একজন মানুষের জীবন হরণ করতে পারে। আমাদের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতিত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’

আইনানুযায়ী ব্যতিত শব্দের অর্থ হলো আইনে যে ভাবে একজন মানুষের জীবন হরণের কথা বলা আছে ঠিক সেভাবেই জীবন হরণ করা যাবে অন্য কোন ভাবে নয়।’ জীবন হরণ করতে গেলে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে চিহিৃত দণ্ড ও বিচার সম্পর্কিত বিধান সমুন্নত রেখেই কেবলমাত্র জীবন হরণের অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে, অন্য কোনো ভাবে নয়। অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন অপরাধীর ফাঁসির আদেশ হলে কেবলমাত্র সেক্ষেত্রেই তার জীবন হরণ করা যাবে। এটাই আইনানুযায়ী জীবন হরণের বিশ্লেষণ, যা সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

আমাদের প্রচলিত আইনে যেকোনো মানুষের জীবন হরণের জন্যে যে সমস্ত বিধান বা দন্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে তার মূল ধারায় ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি অন্যতম। অর্থাৎ কোন ব্যক্তির জীবন হরণ করলে, তা কি প্রক্রিয়ায় বিবেচনার মধ্যে আনা হবে, তা দন্ডবিধিতেই কেবল সুবিন্যাস্ত ভাবে উল্লেখ করা আছে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, এসিড সংক্রান্ত আইন কিংবা মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত আইনে সংগঠিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ডের যে বিধান রাখা হয়েছে, তা কেবল ওই সংক্রান্ত আইনেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, দন্ডবিধিতে নয়।

আপাতদৃষ্টিতে মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ কিংবা ক্রসফায়ারের নামে জীবনহরণের যে অপসংস্কৃতি বাংলাদেশে চালু করা হয়েছে, তা ১৮৬০ সালের দন্ডবিধিতে বিচ্যুত কিছু বিধানকে অপব্যাখ্যা করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অপরাধের দায়মুক্তির রক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করছে। ১৮৬০ সালের দন্ডবিধির চতুর্থ ভাগের সাধারণ ব্যতিক্রম এবং জরমযঃ ড়ভ চৎরাধঃব ফবভবহপব (ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার) নামক কিছু বিধানের অপব্যাখ্যা করে তা তারা মানুষ হত্যার লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে। দন্ডবিধির ৭৬ ধারায় বলা আছে যে, যদি কোন ব্যক্তি আইনের ভুল ব্যতিত ঘটনার ভুলের কারণে কোন অপরাধ করে থাকে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। ৭৬ ধারার উদাহরণে বলা আছে, যদি কোন সৈনিক তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈধ নির্দেশে কোন মিছিলের উপর গুলি চালায়, তাহলে তা অপরাধের পর্যায়ে পড়বে না। আমাদের উপমহাদেশের বিভিন্ন রায়ে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র উশৃংখল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য গুলি চালানো হয়েছে, এই ধরণের অজুহাতে কোন হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করলে তা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে না। কারণ, এই ধরণের হত্যাকাণ্ড বৈধ কি বৈধ না তা আদালত খতিয়ে দেখবে। যদি আদালত মনে করে যে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবিকৃত রক্ষা কবচ একটি সাজানো নাটক মাত্র, তাহলে এ ধরণের হত্যাকাণ্ডকে দণ্ডবিধি ৩০২ ধারায় সাধারণ হত্যাকাণ্ড গণ্য করে শাস্তি প্রদান করতে পারবে।

Right of Private defence (ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার)-কে। অনেক সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এ ধরণের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করে থাকে যা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। জরমযঃ ড়ভ চৎরাধঃব ফবভবহপব ততটুকু পর্যন্ত বর্ধিত করা যায়, যতোটুকু প্রয়োজন। অর্থাৎ কেউ যদি কাউকে হত্যা করতে আসে তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য হত্যা করতে পারে, অন্য কোনো ভাবে নয়।

আমাদের দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিচারবহির্ভূত ভাবে মানুষ হত্যা শুধু করেছেন তা কোনো ভাবেই আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। এ ধরণের হত্যাকাণ্ডের জন্য শুধুমাত্র দন্ডবিধির ৩০২ ধারা যে হত্যা মামলা হবে তাই নয়, এটি গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে বিধায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তাদের বিচার হতে পারে, যা বসনিয়া, হার্জেগোভিনিয়া, রুয়ান্ডা কিংবা কম্বোডিয়ার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে তুলনা করা যায়, অন্যভাবে নয়।।

লেখক এডভোকেট, সুপ্রিমকোর্ট।