Home » রাজনীতি » দেশে কি জরুরী অবস্থা চলছে?

দেশে কি জরুরী অবস্থা চলছে?

আমীর খসরু

constitution-2-দেশে জরুরী অবস্থা জারি করা হলে সংবিধানের ১৪১ খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২ অনুচ্ছেদের বিধান স্থগিত হয়ে যায়। সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে চলাফেরার স্বাধীনতা, ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা, ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতা, ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা, ৪০ অনুচ্ছেদে পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা, ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭২এর মূল সংবিধানে জরুরী অবস্থার বিধান ছিল না। শেখ মুজিবের শাসনামলে ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সংবিধানে জরুরী অবস্থার বিধান সন্নিবেশিত হয়। আর এটি ছিল সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী।

জরুরী অবস্থা চলাকালে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের যে সব ধারাগুলো স্থগিত হয়ে যায়, বর্তমান সরকার দেশে জরুরী অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করলেও, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে এক অদ্ভুত মিল। দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে সরকার মৌলিক অধিকারের ওই সব ধারাগুলো কার্যত স্থগিত করে ফেলেছে। তাহলে এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরী যে, দেশে কি অঘোষিত জরুরী অবস্থা চলছে? এক শব্দে এর উত্তর হ্যাঁ।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই, তাদের ভিন্নমতাবলম্বী তা বিরোধী দলই হোক বা কোনো সংগঠন কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েই হোক, তাদের তারা সহ্য করতে রাজি ছিল না এবং এখনো নেই। দিনে দিনে পরিস্থিতি আরো কঠিন থেকে কঠিনতর এবং জটিল থেকে জটিলতর রূপ নিয়েছে। বিরোধী দল তো দূরের কথা, ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতাও ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন ক্যাডারদের মাধ্যমে সরকার মানুষের এই অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। গুম, অপহরণ, ক্রসফায়ারসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি, এসব এখন নিত্যদিনকার ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের গত চার বছরে প্রায় পাঁচশ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গত দুই বছরই আইনি হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে দু’শতাধিক। এই সময়ে গুম হয়েছেন ৫৪ জনের বেশি মানুষ। গত দুই বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন তিনশতাধিক। এসব হিসেব মানবাধিকার সংস্থাগুলোর। বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হবে। বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি কিসে সম্পর্কে দেশবাসী সবাই ওয়াকিবহাল। সরকারের পক্ষ থেকে এভাবে হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের কারণে মানুষ আতঙ্কিত, শঙ্কিত এবং বিপর্যস্ত।

সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশে স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বিরোধী কোনো পক্ষ অবাধে কোনো সভাসমাবেশ স্বাধীনভাবে করতে পেরেছে, এমন নজির নেই। এটা শুধু প্রধান বিরোধী দলের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী তেলগ্যাসবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ যেকোনো সংগঠনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই কমিটির সমাবেশে পুলিশ হামলা চালিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের পা ভেঙে দেয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে। সিপিবিসহ বাম সংগঠনগুলোর শান্তিপূর্ণ হরতাল এবং সমাবেশ ও এর নেতৃবৃন্দকে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ছোটখাটো থেকে শুরু করে বড় সংগঠন পর্যন্ত কেউই সরকারের এবং ক্ষমতাসীন ক্যাডারদের হামলার শিকার হননি, এমনটা দেখা যায় না। সমাবেশ ভণ্ডুলের নামে হাজার হাজার বার ১৪৪ ধারা জারির ঘটনা ঘটেছে দেশের সর্বত্র। সভাসমাবেশের জন্য অনুমতির নামে হয়রানি এবং অনুমতি না দেয়ার ঘটনা ঘটেছে অসংখ্যবার। শান্তিপূর্ণ সভাসমাবেশের আয়োজন করা হলেও, তাতে লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট প্রথমদিকে ব্যবহার করা হতো। এখন এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেখামাত্র গুলি। নাশকতা দমনের নামে দেখামাত্র গুলির করার যে বেআইনি অধিকার দেয়া হয়েছে তা শুধুমাত্র স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষেই সম্ভব। গত মাস দুয়েক সময়ে দেড়শতাধিক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের দিক থেকে কোনো অনুশোচনা নেই, নেই কোনো দুঃখ বোধ। অবশ্য কর্তৃত্ববাদী এবং স্বৈরাচারী সরকারের এটাই চরিত্র। সেদিক বিবেচনায় সরকার শতকরা একশতভাগ খাটি স্বৈরাচার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বেআইনি কর্মকাণ্ডকে আইনের মোড়ক দেয়ার জন্য বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এই গুলি করার অধিকারের পক্ষে নানা আইনি সাফাই গাইছেন। এমনকি তিনি এও বলেছেন, পুলিশ কি আঙুল চুষবে? একজন সুস্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখ থেকে এ ধরণের অশ্লীল বক্তব্য কেউ প্রত্যাশা করে না। এ বিষয়টি বারবার বলা হচ্ছে, জামায়াতশিবির যে কর্মকাণ্ড করছে, তার জন্য তাদের বিচার এবং শাস্তি সরকারের দেয়া উচিত এবং সরকার তা পারে। কিন্তু এর দোহাই দিয়ে পুরো দেশকে এবং জনগণকে এক আতঙ্ক, নৈরাজ্য ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কেন?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নাশকতা ঠেকাতে গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নাশকতার সংজ্ঞা কি? কোন কর্মকাণ্ড নাশকতা বা নাশকতা নয়, তা নির্ধারণ করবে কে? কোন মানদন্ডে বিচার হবে নাশকতার? সরকারের কোনো অবৈধ অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই তা নাশকতার পর্যায়ে গণ্য করা হয়। তাহলে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে যে কেউ মিছিল সমাবেশ করলেই তা ‘অটোমেটিক’ অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা নাশকতা হয়ে যাবে। পাঠক, আপনাদের যদি মনে থাকে এবং অনেকের এটা নিশ্চয় মনে আছে, এই সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুকাল পরে এই ঢাকা শহরেই গ্যাসপানি ও বিদ্যুতের দাবিতে ভুক্তভোগীদের মিছিল বের করার পরে তাদের উপরে পুলিশি তাণ্ডবে কথা। ওই সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, যদি কেউ গ্যাসপানি বিদ্যুতের দাবিতে মিছিল করে, তাহলে কঠিন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে পড়েছে। যদি এখন কেউ বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের দাবিতে মিছিলসমাবেশ করে, তাহলে নিশ্চয়ই বলা হবে, এটা একটা চরম নাশকতা এবং পরিণামে হবে গুলি। আর আড়িয়াল বিল এবং রূপগঞ্জের মতো জনপ্রতিরোধ গড়ে উঠলে তো কথাই নেই। আগেই বলা হয়েছে যে, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, গণপিটুনির পরে সবশেষ যুক্ত হয়েছে গুলি করার অবাধ অধিকার। অথচ ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাসীনদের পক্ষ হলে সেসব সভাসমাবেশ নির্বিঘ্নে করা যাচ্ছে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পূর্ণ নিরাপত্তায়।

জরুরী অবস্থায় মৌলিক অধিকারের ৩১ এবং ৩২ অনুচ্ছেদ স্থগিত করা না হলেও, সরকার তা বিরোধী মত ও পথের যারা রয়েছেন, তাদের জন্য সীমিত করে ফেলেছে। ৩১ অনুচ্ছেদে – ‘আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার’ এবং ৩২ অনুচ্ছেদে – ‘জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান হলেও, বাস্তবে ক্ষমতাসীনরা একটু বেশি মাত্রায় উঁচু। আর এ কারণেই নাটোরের উপজেলা চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে হত্যা করার পরও হত্যাকারীদের এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি। নরসিংদীর পৌর মেয়র দলীয় লোক হওয়া সত্ত্বেও বিচার কার্য খুবই ধীরগতিতে চলছে। এভাবে অসংখ্য ঘটনা আছে। অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুরের তাহের পুত্রসহ অনেকের শাস্তি মওকুফ করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারের এই বৈপরীত্যমূলক চরিত্র জনসম্মুখে বহু আগেই উন্মোচিত হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, আরো এক ভয়াবহ রূপ।

জরুরী অবস্থা জারি করা হলে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ স্থগিত হয়ে যায়। ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ৩৯এর () বলা হয়েছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। ৩৯এর () ()-তে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা অধিকারের এবং () সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার দুই মাস যেতে না যেতেই ২০০৯ সালের মার্চে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ এবং গণমাধ্যমের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপরেও ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক এ মাধ্যমটির উপরে রাজনৈতিক কারনে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা, টকশো উপরে প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, আগেও ছিল, এখনো আছে। এ কথা হলফ করে বলা যায়, মানুষ এখন ভয়ে এবং আতঙ্কে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা হারিয়ে বসে আছে। এখন বিবেক একটিই, অর্থাৎ সরকার যা করছে, যা বলছে তার জয়গান গাওয়া। মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের বিখ্যাত বিচারক পিটার স্টুয়ার্ডএর একটি উদ্ধৃতি এক্ষেত্রে খুবই জরুরী। তিনি বলেছিলেন, ‘বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা একটি সমাজের আস্থাহীনতারই প্রতীক। আর এই বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা কর্তৃত্ববাদী সরকারেরই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’

অথচ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এর ঠিক উল্টো কথাটিই বলেছিল। নিশ্চয়তা দিয়েছিল, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্ঠাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার কথা। একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালার প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছিল।

কিন্তু সরকার অঘোষিত জরুরী অবস্থার নামে এক ভয়াবহ সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। দেশকে দাড় করিয়ে দিয়েছে এক সীমাহীন বিপদের সামনে। সংবিধানে নিশ্চিত করা মানুষের অধিকার হরণের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিকসহ সার্বিক পরিস্থিতিকে দিনে দিনে সংঘাতময় এবং সাংর্ঘষিক করে তুলেছে। সংঘাতসহিংসতা গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সরকারি উদ্যোগেই। দেশিবিদেশি সবাই যখন সঙ্কট নিরসনে সংলাপের কথা বলছে, সরকার তখন ঠিক তার উল্টো কাজটিই করছে। সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই নানা সঙ্কট সৃষ্টি করে তাদের অতীতের কুকর্ম আড়াল করতে চায়। নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস বাকি থাকার পরেও, এখন তারা নির্বাচনকে সাইড লাইনের ইস্যু বানানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এটি হচ্ছে, একটি কূটকৌশল। আর এটি করা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদী করতে চাওয়ার কারণে। কিন্তু জনগণের অধিকার হরণ করে এটা কখনই সম্ভব হয়নি, এখনো সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের নিজেরই এই অভিজ্ঞতা আছে।।