Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ৪

পুঁজিবাদের একটি ভুতুরে গল্প – ৪

এনজিও এবং র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-1১৯৫০এর দশকে রকফেলার ও ফোর্ড ফাউন্ডেশনবেশ কয়েকটি এনজিও ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তহবিল দিচ্ছিল। এরা ল্যাতিন আমেরিকা, ইরান ও ইন্দোনেশিয়ার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো উৎখাতে তৎপর মার্কিন সরকারের দৃশ্যত সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। (প্রায় একই সময়ে তারা ভারতেও প্রবেশ করে। দেশটি তখন জোট নিরপেক্ষ শিবিরে অবস্থান করলেও স্পষ্টভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে ছিল।) ফোর্ড ফাউন্ডেশন ইন্দোনেশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে মার্কিন ধরণের অর্থনীতি কোর্স চালু করে। মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের হাতে বিদ্রোহ দমন প্রশিক্ষণ পাওয়া এলিট ইন্দোনেশীয় ছাত্ররা ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সালের সিআইএসমর্থিত অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা জেনারেল সুহার্তোকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। জেনারেল সুহার্তো তার পরামর্শদাতাদের হিসাব চুকিয়ে দেন হাজার হাজার কমিউনিস্ট বিদ্রোহীকে হত্যার মাধ্যমে।

আট বছর পর, চিলির তরুণ ছাত্রদের, যারা পরিচিত ছিল শিকাগো বয়েজ নামে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে (জে ডি রকফেলারের দানে পরিচালিত) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিল্টন ফ্রিডম্যান তাদের নব্যউদার অর্থনীতি শিক্ষা দেন। তাদেরকে ১৯৭৩ সালের সিআইএসমর্থিত অভ্যূত্থানের জন্য প্রস্তুত করা হয়, যার পরিণতিতে স্যালভাদর আলেন্দে নিহত হন এবং জেনারেল পিনোশে ক্ষমতায় আসেন। এই জেনারেলের ডেথ স্কোয়াড ১৭ বছর ধরে গুম আর সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। (আলেন্দের অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজবাদী এবং তিনি চিলির খনিগুলো জাতীয়করণ করেছিলেন।)

রকফেলার ফাউন্ডেশন ১৯৫৭ সালে এশিয়ার সমাজনেতাদের জন্য র‌্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রবর্তন করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত আস্থাভাজন মিত্র ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট র‌্যামন ম্যাগসেসের নামে এটা করা হয়েছিল। ২০০০ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ‘র‌্যামন ম্যাগসেসে ইমারজেন্ট লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ চালু করে। ভারতের শিল্পী, অ্যাক্টিভিস্ট, কমিউনিটি কর্মীদের মধ্যে ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত। এম এস শুভলক্ষ্মী, সত্যজিৎ রায়, জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক পি শ্রীনাথ এই পুরস্কার পেয়েছেন। তবে তারা ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়ে যতটুকু লাভবান হয়েছেন, প্রতিদান দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি। সাধারণভাবে, এর ফলে কোন কোন কাজ ‘গ্রহণযোগ্য’ এবং কোনগুলো নয়, সে সম্পর্কে একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়ে যায়।

মজার ব্যাপার হলো, গত গ্রীস্মে আনা হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তিন ম্যাগসেসে পুরস্কারজয়ী ব্যক্তিআনা হাজারে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কিরন বেদি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের অনেকগুলো এনজিও’র একটিকে উদারভাবে তহবিল জোগান দেয় ফোর্ড ফাউন্ডেশন। কিরন বেদির এনজিও’র তহবিল দিয়ে থাকে কোকা কোলা ও লেহমান ব্রাদার্স।

আনা হাজারে নিজেকে গান্ধীবাদী হিসেবে অভিহিত করলেও তিনি যে আইনটিকে ‘জন লোকপাল বিল’ অভিহিত করছেন, সেটি অগান্ধীবাদী, চরম এলিট ও বিপজ্জনক। করপোরেট মিডিয়া সার্বক্ষণিকভাবে তাকে ‘জনগণ’এর কণ্ঠস্বর হিসেবে ঘোষণা করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট’এর বিপরীতে হাজারের আন্দোলন একবারও বেসরকারিকরণ, করপোরেট শক্তি বা অর্থনৈতিক ‘সংস্কার’এর বিরুদ্ধে কথা বলেনি। বরং তার সমর্থক প্রধান প্রধান মিডিয়া সফলভাবে ব্যাপক করপোরেট দুর্নীতি কেলেঙ্কারিগুলো (যাতে উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিকদের জড়িত থাকার বিষয়ও প্রকাশিত হয়েছিল) আড়াল করতে সক্ষম হয় এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের ক্ষোভকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, আরো সংস্কার, আরো বেসরকারিকরণে ব্যবহার করে। (২০০৮ সালে আনা হাজারে অনবদ্য জনসেবার জন্য বিশ্বব্যাংক পুরস্কার লাভ করেন।) ওয়াশিংটন থেকে বিশ্বব্যাংক এক বিবৃতিতে জানায়, তার আন্দোলন ব্যাংকের নীতির ‘পরিপূরক’।

সব ভালো সাম্রাজ্যবাদীর মতো সমাজসেবকেরাও নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য বিস্তারে বিশ্বাসী একটি আন্তর্জাতিক ক্যাডার গঠন ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে। তারা এমনভাবে ‘গ্লোবাল করপোরেট গর্ভানমেন্ট’ পরিচালনা করে থাকে যেমনভাবে স্থানীয় এলিটেরা ঔপনিবেশবাদের সেবা করত। আর এ কারণেই ফাউন্ডেশনগুলো শিক্ষা ও শিল্পকলায় হানা দিয়ে থাকে, যা বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিকনীতির পর তৃতীয় প্রভাবশালী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাদান খাতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং ব্যয় করে যাবে।

জন রোলফস তার চমৎকার গ্রন্থ ফাউন্ডেশনস অ্যান্ড পাবলিক পলিসি : দ্য মাস্ক অব প্লুরালিজমএ ফাউন্ডেশনগুলো কিভাবে রাজনীতি বিজ্ঞান শিক্ষার পুরনো ধ্যানধারণার নতুন বিন্যাস এবং ‘আন্তর্জাতিক’ ও ‘এলাকা’ স্টাডিজ বিষয়গুলো হালনাগাদ করা হয়, তার বর্ণনা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করার জন্য বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিশেষজ্ঞদল পেয়ে যায়। সিআইএ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর অব্যাহতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করতে থাকায় স্কলারশিপের নৈতিকতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

যেকোনো ক্ষমতাসীন শক্তির জন্য তাদের শাসিত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা একটি মৌলিক ব্যাপার। ভারতজুড়ে ভূমি অধিগ্রহণ ও নতুন অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, মধ্য ভারতে পুরোদস্তুর যুদ্ধের ছায়ায়, গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে প্রভাব হ্রাসের পদ্ধতি হিসেবে সরকার ‘ইউনিক আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (ইউআইডি) নামের একটি ব্যাপক বায়োমেট্রিক্স কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চাভিলাষী ও ব্যয়বহুল তথ্যসংগ্রহ প্রকল্প। লোকজনের খাবার পানি, কিংবা টয়লেট বা খাবার বা টাকাপয়সা না থাকতে পারে, কিন্তু তাদের ভোটার কার্ড ও ইউআইডি থাকবে। প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, ইউআইডি প্রকল্পটি পরিচালনা করছেন ইনফোসির সাবেক সিইও নন্দন নিলেকানি। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ‘দরিদ্র মানুষের সেবা করা।’ কিন্তু আসলে এটা কি কিছুটা বেকায়দায় পড়া আইটি শিল্পকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদানের কর্মসূচি নয়? (একটি রক্ষণশীল হিসাবে দেখা যায়, ইউআইডি বাজেট শিক্ষা খাতে ভারত সরকারের বার্ষিক প্রকাশনা ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে।) ব্যাপকভাবে অবৈধ ও ‘অযোগ্য’যারা মোটামুটিভাবে বস্তিবাসী, হকার, ভূমি রেকর্ডবিহীন আদিবাসীবিপুলসংখ্যক লোকের একটি দেশকে ‘ডিজিটালকরণ’ করা হলে তা তাদেরকে অবৈধ থেকে বেআইনি মানুষে পরিণত করবে। ‘সাধারণ মানুষকে ঘিরে ফেলা’ এবং ক্রমবর্ধমান কঠোরতর পুলিশি রাষ্ট্রের হাতে বিপুল ক্ষমতা ন্যস্ত করাই এই ডিজিটাল সংস্করণ কাজের উদ্দেশ্য। নিলেকানির উপাত্ত সংগ্রহের বাতিক ডিজিটাল ডাটাবেইজ, ‘সংখ্যাগত লক্ষ্য’, ও ‘অগ্রগতির স্কোরকার্ডের’ ব্যাপারে বিল গেটসের বদ্ধমূল ধারণার মতোই। মনে করা হয় ঔপনিবেশবাদ, ঋণ ও চক্রবৃদ্ধি মুনাফামুখী করপোরেট নীতি নয়, বিশ্বে ক্ষুধার কারণ তথ্যের অভাব।

করপোরেট অনুদানের ফাউন্ডেশনগুলো সমাজ বিজ্ঞান ও শিল্পকলার বৃহত্তম তহবিল জোগানদাতা। ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’, ‘কমিউনিটি স্টাডিজ’, ‘কালচারাল স্টাডিজ’, ‘বিহাভিরাল সায়েন্স’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস’ বিষয়ে কোর্সে অনুদান ও ছাত্রবৃত্তিও দিয়ে থাকে। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য তাদের দরজা খুলে দেয়ার পর লাখ লাখ ছাত্র, তৃতীয় বিশ্বের এলিটদের সন্তানেরা, বন্যার বেগে সেখানে প্রবেশ করেছে। যারা ফি জোগার করতে পারে না, তাদের জন্য আছে স্কলারশিপ। বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্ভবত একটি পরিবারও পাওয়া যাবে না যাদের কোনো সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেনি। এই শ্রেণী থেকে কেবল ভালো বিদ্বজ্জন ও শিক্ষাবিদই উঠে আসবে না, সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, অর্থনীতিবিদ, করপোরেট আইনজীবী, ব্যাংকার, আমলা আত্মপ্রকাশ করবে। তারাই তাদের দেশের দরজা বৈশ্বিক করপোরেশনের জন্য খুলে দেবে।

ফাউন্ডেশনবান্ধব অর্থনীতি ও রাজনীতিবিজ্ঞানের বিদ্বজ্জনদের ফেলোশিপ, গবেষণা তহবিল, মঞ্জুরি, ভাতা ও চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। যারা ফাউন্ডেশনবান্ধব নন, তারা তহবিল পান না, কোনঠাসা বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকেন, তাদের কোর্সগুলো অসমাপ্তই থেকে যায়। ধীরে ধীরে, একটি বিশেষ ধারণাকেবল একক, বিস্তৃত, কঠোরভাবে অবহুত্ববাদী অর্থনৈতিক মতাদর্শের ছাদের নিচে সহিষ্ণুতা ও বহুসংস্কৃতিকবাদের (মুহূর্তের মধ্যে যা রূপান্তরিত হয় বর্ণবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, উৎকট জাতিগত স্বাদেশিকতা বা যুদ্ধবাজ ইসলামাতঙ্কে) ভঙ্গুর, কৃত্রিম অজুহাতপুরো প্রক্রিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। এটা বিরোধীপক্ষহীন অবস্থায় পৌঁছে, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এটা স্বাভাবিকত্বকে পরিব্যপ্ত করে, চলমান প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং একে চ্যালেঞ্জ করা মূর্খতা কিংবা খোদ বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুর্বোধ্য মনে হতে শুরু করে। এখান থেকে এটা দ্রুত অবলীলায় ‘আর কোনো বিকল্প নেই’ পর্যায়ে উপনীত হয়।

ওকুপাই মুভমেন্টের’ কারণেই এখন কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পথেঘাটে এবং ক্যাম্পাসগুলোতে অন্য ভাষাটি আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে। ছাত্রদের ‘ শ্রেণী যুদ্ধ’ বা ‘আমরা তোমার ধনী হওয়াতে ক্ষুব্ধ নই, তবে তোমার আমাদের সরকার কেনায় ক্রুদ্ধ’এর মতো ব্যানারগুলো সম্ভাবনা জাগায়, প্রায় বিপ্লবের মতো এগুলো।

করপোরেট সমাজসেবা শুরুর এক শ’ বছর পর এখন এটা কোকা কোলার মতোই আমাদের জীবনযাত্রার অংশে পরিণত হয়ে গেছে। এখন লাখ লাখ অমুনাফামূলক সংস্থা রয়েছে। এগুলোর অনেকে জটিল আর্থিক গোলকধাঁধার মাধ্যমে বৃহত্তর ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই ‘স্বাধীন’ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এগুলোর মধ্যে বৃহত্তমটি হচ্ছে বিল গেটস ফাউন্ডেশন (২১ বিলিয়ন ডলার)। এরপর রয়েছে লিলি এনডোমেন্ট (১৬ বিলিয়ন ডলার) ও ফোর্ড ফাউন্ডেশন (১৫ বিলিয়ন ডলার)

আইএমএফ যেহেতু ‘কাঠামোগত সমন্বয়’ এবং অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারগুলোকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা, উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করতে বাধ্য করে, আর তাই এনজিওগুলো এগিয়ে আসে। ‘সবকিছুর বেসরকারিকরণ’এর অর্থ ‘সবকিছু এনজিওকরণ’ও। চাকরি ও জীবিকা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় এনজিওগুলো পরিণত হয় চাকরির গুরুত্বপূর্ণ উৎস, এমনকি যারা এগুলোর সত্যিকারের চেহারা দেখতে পায় তাদের জন্যও। অবশ্য এগুলোর সবই খুব খারাপ নয়। লাখ লাখ এনজিও’র মধ্যে কিছু কিছু দারুণ, অসাধারণ কাজ করছে এবং একই তুলি দিয়ে সব এনজিওকে কালিমাযুক্ত করাটা হবে হাস্যকর কাজ। তবে করপোরেট বা ফাউন্ডেশনঅনুদানে চালিত এনজিও হলো প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো কেনার বৈশ্বিক আর্থিক মাধ্যম, যেভাবে শেয়ারহোল্ডারেরা কোম্পানির শেয়ার কিনে তারপর ভেতর থেকে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তারা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রব্যবস্থা তথা বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের সন্ধিস্থলের স্থানে অবস্থান করে। তারা প্রেরকযন্ত্র, গ্রহণকারী, অভিঘাত আত্মস্থকারী, প্রতিটি স্পন্দনে সতর্ক হয়, তাদের স্বাগতিক দেশকে কখনোই বিরক্ত না করার ব্যাপারে সচেতন থাকে। (ফোর্ড ফাউন্ডেশনের তহবিল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ সম্পর্কিত প্রতিশ্র“তি দিতে হয়।) অসাবধানতাবশত (এবং অনেক সময় সতর্কতার সঙ্গে) তারা শ্রবণযন্ত্র হিসেবেও কাজ করে। তাদের প্রতিবেদন, কর্মশালা এবং অন্যান্য মিশনারি কার্যক্রম ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর হওয়ার রাষ্ট্রগুলোর বর্ধিত পর্যবেক্ষণের আগ্রাসী ব্যবস্থায় তথ্য সরবরাহ করে। এলাকাটি যত বেশি গোলযোগপূর্ণ হয়, তত বেশিসংখ্যক এনজিও সেখানে প্রবেশ করে।

বজ্জাতির বিষয় হলো, সরকার বা করপোরেট সংবাদমাধ্যমের কোনো কোনো অংশ যখন প্রকৃত কোনো গণআন্দোলনেরযেমন ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ বা কুন্দনকুলাম পারমাণবিক চুল্লির বিরুদ্ধে প্রতিবাদবিরুদ্ধে অপবাদ প্রচার করতে চায়, তখন তারা এসব আন্দোলনকে ‘বিদেশি অর্থ’ প্রাপ্ত এনজিও হিসেবে অভিহিত করে। তারা খুব ভালো করেই জানে, বেশির ভাগ এনজিও’র, বিশেষ করে যেগুলো আর্থিকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে, দায়িত্ব হলো করপোরেট বিশ্বায়নের প্রকল্পটি আরো জোরদার করা, একে ব্যর্থ করা নয়।

বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পেয়ে, এসব এনজিও সারা দুনিয়া চষে বেড়ায়, সম্ভাবনাময় বিপ্লবীদের বেতনভুক কর্মী, তহবিলপুষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্র নির্মাতায় পরিণত করে ভদ্রভাবে তাদেরকে আমূল পরিবর্তনের সঙ্ঘাত থেকে দূরে থাকতে প্রলুব্ধ করে, তাদেরকে বহুসাংস্কৃতিকবাদ, জেন্ডার, কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের দিকে চালিত করেযা অভিন্ন রাজনীতি ও মানবাধিকারের ভাষায় নিহিত থাকে।

(চলবে)

১টি মন্তব্য

  1. সারওয়ার রেজা

    বানান ঠিক করতে হবে যে! শিরোনামেই বানান ভুল দেখলে লেখা সম্পর্কে(বলা ভাল, লেখক সম্পর্কে) একধরণের আস্থার অভাব তৈরি হয়।
    ‘ভুতুড়ে’ বা ‘ভূতুড়ে’।
    ধন্যবাদ।