Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিচ্ছে চীন

ভারতের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিচ্ছে চীন

 

প্রসঙ্গ: শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

india-china-3পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ভারত। আয়তন, জনসংখ্যা এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে তারা এমন স্বপ্ন দেখতেই পারে। কিন্তু সেটা যে শুরুতেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা দেশটি ভাবতে পারেনি। ভারত অবকাঠামো উন্নয়নে জড়িত হয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা করেছিল। এর অংশ হিসেবে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের জ্বালানি কূটনীতির সূচনা হয়েছিল। কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। মালদ্বীপেও ভারত হোঁচট খেয়েছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের প্রতি ভারতের সমর্থনকে দেশটির বর্তমান শাসকেরা সন্দেহের চোখে দেখছেন। এর জের ধরে ভারতের জিএমআর গ্রুপ সম্প্রতি মালে বিমানবন্দর পরিচালনার চুক্তি হারিয়েছে। অথচ এশিয়া, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার ব্যস্ততম সামুদ্রিক অঞ্চলে অবস্থান হওয়ার কারণে কৌশলগত দিক থেকে মালদ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে।

ভারতের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিচ্ছে চীন। এর দুটি উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কায় ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি লিমিটেড একটি ৫০০ মেগাওয়াটের প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তবে দ্বীপ দেশটি এখন বলছে, তারা ওই প্রকল্পটি চীনাদের দিয়ে করাতে চায়। এনটিপিসি বাংলাদেশেও কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। খুলনার সুন্দরবনের কাছে ওই প্রকল্পটির চূড়ান্ত ক্ষমতা ২,৬৪০ মেগাওয়াট। তবে পরিবেশবিদেরা ইতোমধ্যেই এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলছে, ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে। ভারতের ওই প্রকল্প নিয়ে যখন প্রবল সমালোচনা হচ্ছে, তখন চীন চট্টগ্রামে ১,৩২০ মেগাওয়াটের একটি প্লান্ট বসানো নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

ভারত ও চীন এখন দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে হাঁটছে। আর এটা করতে গিয়ে তারা বিশ্বের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এই লক্ষ্যেই মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি কূটনীতি শুরু করেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা কাক্সিক্ষত ফল আনেনি।

শ্রীলঙ্কার প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ার কারণ ছিল শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে তামিল নাড়– সরকারের প্রতিবাদ। শ্রীলঙ্কায় তামিলদের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কা সরকারের কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তামিল নাড়–তে ব্যাপক ক্ষোভের সূচনা হয়েছে। প্রদেশটির দ্রাভিদা মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) দাবি করেছিল, শ্রীলঙ্কায় মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে ২১ মার্চ জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের যে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকা ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভোট দিক। কিন্তু ইউপিএ সরকার তা করেনি। এর প্রতিবাদে ডিএমকে সরকার থেকে বেরিয়ে গেছে। ভারত সরকার পড়েছে দোটানায়। নিজ দেশে গদি টিকিয়ে রাখবে, নাকি শ্রীলঙ্কা সরকারকে ক্ষ্যাপাবে? এই সুযোগটি গ্রহণ করে তাদের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিত চীন দ্বীপ দেশটিতে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে নিচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য প্রকল্পটি নিয়ে কোনো ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত বক্তব্য পুরোপুরি অসত্য।’ আর ভারতে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কার হাই কমিশনার প্রকাশ করিয়াওয়াসাম বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। ‘আপনার তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। প্রকল্প নথি শিগগিরই চূড়ান্ত হবে, সর্বশেষ পর্যায়ের আলোচনা চলছে।’ এনটিপিসির একটি দল শিগগিরই শ্রীলঙ্কা সফর করবে।

ডিএমকের পদক্ষেপের আগে ভারতের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানটি শ্রীলঙ্কার সিলন ইলেকট্রিসিটি বোর্ডকে (সিইবি) বলেছিল, তারা দ্বীপ দেশটির নতুন কোনো শর্ত গ্রহণ করবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনটিপিসির এক নির্বাহী সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘চীনা প্রভাবে শ্রীলঙ্কা শর্ত পরিবর্তন করতে চাইছে। শ্রীলঙ্কা প্রাথমিক সমঝোতায় ফিরে যেতে চাইছে, কিন্তু আমরা তাতে রাজি নই। এটা একটা কৌশলগত প্রকল্প, বাণিজ্যিক নয়। তারা প্রকল্পটি চীনকে দিয়ে দিতে চায়। দেশটি সেখানে বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে আগ্রহী।’ শ্রীলঙ্কায় চীনা উপস্থিতির বিরোধী এনটিপিসির আরেক নির্বাহী, তিনিও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, ওই প্রকল্পটি কৌশলগত স্থাপনা।

এনটিপিসি ও সিইবি ২০১১ সালে যৌথ বিনিয়োগ উদ্যোগটিতে সাক্ষর করে। তবে বিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল ২০০৬ সালে। তখন আশা করা হয়েছিল, ২০১১ সালেই এর উৎপাদন শুরু হবে।

তৃতীয় এক ব্যক্তিও জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কানরাও চায় চীনারা প্লান্টটি স্থাপন করুক। ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কা চীনা ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনকে ৩০০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাচালিত প্লান্ট স্থাপনের কাজ দিয়েছিল।

শ্রীলঙ্কায় কেবল বিদ্যুৎ প্লান্ট নয়, আরো নানাভাবে জড়িত হয়ে পড়ছে চীন। চীনা প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণ করছে। পূর্বপশ্চিম ব্যস্ত শিপিং রুটে এটা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। ফলে শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে চীন।

বাংলাদেশের খুলনায় যৌথ উদ্যোগে ২,৬৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্ল­ান্ট স্থাপনের জন্য এনটিপিসি ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি করে। এই প্রকল্পের সম্ভাবতা যাচাইও শেষ হয়েছে।

বাংলাদেশে ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন শেখ হাসিনা সরকার অবশ্য চীনের উপস্থিতি নাকচ করে দিচ্ছে না। চীনকেও বিদুৎ উৎপাদন প্ল­ান্টে সম্পৃক্ত রাখতে চাইছে এই সরকার। এ কারণেই চট্টগ্রামে চীনকে ১,৩২০ মেগাওয়াটের প্রকল্প স্থাপনের দায়িত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ এখানেও চীন অন্তত পিছিয়ে নেই। খুলনার ভারতীয় প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও চট্টগ্রামের চীনা প্ল্যানটির ব্যাপারে তাদের আপত্তি নেই। অর্থাৎ ভারতীয় প্রকল্পটি পরিবেশগত কারণে যেকোনো সময়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু চীনা প্রকল্পটি এগিয়ে যেতে পারবে।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)

১টি মন্তব্য

  1. Analysis should be neutral. Rampal coal power plant will affect Sundarban and surrounding areas, what’s about Chinese plant in Chittagong, is it not affecting the surrounding areas of Chittagong and Hill Tracts?