Home » রাজনীতি » লাইসেন্সড টু কিল

লাইসেন্সড টু কিল

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

police-4.লাইসেন্সড টু কিল’ বাক্যটি মূলত: এসপাইঅ্যানাজ বা গুপ্তচরবৃত্তিতে প্রচলিত। বিভিন্ন দেশে কাউন্টার এসপাইঅ্যানাজ সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এরকম অবাধে হত্যা করার লাইসেন্স সরকার দিয়ে থাকে। দেশীবিদেশী থ্রিলার পাঠক মাত্রই জানেন, কল্পনার নায়ক জেমস বন্ড বা মাসুদ রানাকে অফিসিয়ালি সরকারের তরফ থেকে এ ধরণের ক্ষমতা দেয়া থাকে এবং তারা এ ক্ষমতার প্রয়োগ করে থাকে। যাই হোক, এ সমস্ত বিষয়াদি স্বপ্ন বা কল্পনার জগতের ব্যাপার। বাস্তবে আমরা জানিনা, প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কোন সরকার অকাতরে মানুষ মারার লাইসেন্স কখনো কাউকে দেয় বা দিয়েছে। তবে, বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে গত ৪২ বছর ধরেই আমরা দেখছি, সেটি কি সামরিক শাসন অথবা কথিত গণতান্ত্রিক শাসনসকল আমলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচারের মুখোমুখি করা ছাড়াই অকাতরে মানুষ হত্যা করে আসছে এবং পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে এতকাল এই ‘লাইসেন্সড টু কিল’ ছিল গোপনঅপ্রকাশ্য।

এই প্রথম বাংলাদেশের একজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ‘নাশকতা’ সৃষ্টিকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এরকম ভয়াবহ নির্দেশ এবং এর পরিনতি সম্পর্কে গোটা দেশের আমজনতা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গত ২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে তার এই নির্দেশের একটি ব্যাখ্যাও হাজির করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রচলিত আইনেই বলা হয়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রসঙ্গে প্রচলিত আইন কি বলছে সেটি দেখা যাক। পুলিশ প্রবিধানের ১৫৩ ধারা জানাচ্ছে, ‘কেবলমাত্র ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতীত ব্যক্তিগত গুলি চালনা নিষিদ্ধ।’ সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এ ধরণের বক্তব্যকে মানবাধিকার কমিশন ‘চরম বাড়াবাড়ি’ বলে মনে করছে। প্রচলিত আইন এভাবে নির্বিচারে নাশকতাকারীদের দেখামাত্র গুলি চালানোর এখতিয়ার কাউকেই দেয়নি। আত্মরক্ষা ছাড়া কথিত মতে ‘দেখামাত্র’ গুলি করারও কোন সুযোগ দেয়া হয়নি।

২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে ‘দেখামাত্র গুলি’এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে আইনানুযায়ী যা যা করা দরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাই করবে।’ তার এ বক্তব্য আগের দিনের থেকে ভিন্নতর এবং দেশের শান্তিপ্রিয় যে কোন নাগরিক এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হবেন। আবার নাগরিকরা ধন্দ্বে পড়বেন যখন জানবেন, হামলাকারী ও অগ্নিসংযোগকারীদের দেখামাত্র গুলি করা হলে মানবাধিকার লঙ্খিত হবে কিনাএ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন,‘সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে না।’

. ১৯৭৫ সালের ১ বা ২ জানুয়ারী অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা’র প্রথম পাতার বাম পাশে শীর্ষে একটি সিঙ্গেল কলাম রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিলো। হেডিংটি ছিলো এরকম পালাতে গিয়ে পূর্ববাংলা সর্বহারার পার্টি প্রধান সিরাজ শিকদার নিহত। ষাটসত্তর দশকের তুখোড় বিপ্লবী নেতা সিরাজ শিকদারের নির্মম হত্যাকান্ডের খবর এমনই সাদামাটা ভাষায় সংবাদপত্রে পরিবেশিত হয়েছিলো। সিরাজ শিকদার নিহত হবার পরে জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, কোথায় আজ সিরাজ শিকদার।’

বাংলাদেশের মানুষ অচিরেই এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের ভেতরকার খবর পেয়ে যান। তুখোড় বিপ্লবী নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে পুলিশ চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে এবং অকথ্য নির্যাতনের পরে হত্যা করে তার লাশ সাভার এলাকায় ফেলে দেয়। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি, এ হত্যাকান্ডকে ‘জায়েজ’ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় প্রচার করা হয় যে, পালাতে গিয়ে সিরাজ শিকদার নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন মতালম্বী রাজনৈতিক নেতা সিরাজ শিকদারের হত্যাকান্ডটিই ছিলো সম্ভবত: প্রথম বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড। অবশ্য এর আগে ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম দিবসে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিলে পুলিশের গুলিতে দ’জন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী’র নিহত হবার ঘটনা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের প্রথম রক্তাক্ত এ্যাকশন। সাম্প্রতিক কালে র‌্যাব বা পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে দায় এড়ানোর জন্য সরকারী প্রচারনার সেই ষ্টাইলের সঙ্গে পাঠক মাত্রই এখনো মিল খুঁজে পাবেন। গণপিটুনি, ক্রস ফায়ার, এনকাউন্টার বা পালাতে গিয়েএই বাক্যগুলির আড়ালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাতে গত কয়েক দশকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে অসংখ্য দোষীনির্দোষ মানুষ।

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে একটি অর্ডিন্যান্স (অধ্যাদেশ) জারীর মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিলো জাতীয় রক্ষী বাহিনী নামে একটি আধা সামরিক বাহিনী। ষাটসত্তর দশকের বাংলাদেশে যারা বেড়ে উঠেছেন, এই বাহিনীর ভয়ংকর স্মৃতি এখনো নিশ্চিতভাবে তাদের তাড়া করে বেড়ায়। সে সময়ে খুব কম মানুষই ছিলেন, যারা এই বাহিনীর ভয়াবহ অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেননি বা শোনেননি। এই বাহিনী গঠনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অচিরেই এটি একটি বর্বর বাহিনীতে পরিণত হয়েছিলো। ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা ছিলো মূলত: এই বাহিনীর টার্গেট। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রক্ষী বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়ে বাম রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, তরুনযুবাসহ কমবেশি ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলো।

প্রয়াত: বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার বিষয়ক একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করতে গিয়ে রায়ে দেয়া তার পর্যবেক্ষণে, এই বাহিনীর নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ, কোন পর্যায়ে রক্ষী বাহিনীর কৃতকর্মের কোন জবাবদিহিতা ছিলো বলে জানা যায় না। তাদের কর্মকান্ডে সে সময়ে সামরিক বাহিনীও বিব্রত ও ক্ষুব্দ ছিলো বলে জানা যায়। রক্ষী বাহিনাীর বিরুদ্ধে জনগণের নেতিবাচক মনোভাব তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা কখনো আমলে নিতে চাননি, যা পরবর্তীতে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৭৫ সালের আগষ্টে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যূত্থান এবং ৩ ও ৭ নভেম্বর পাল্টাপাল্টি অভ্যূত্থানের খেলায় জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের শীর্ষ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সেনানিবাস হয়ে ওঠে দেশের রাজনীতির মুখ্য নিয়ন্ত্রক। অবস্থা এরকম দাড়িয়েছিলো যে, জিয়ার শাসনামলে কমবেশি ২০টি সামরিক অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়েছিলো। শত শত সামরিক অফিসারকর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী এসব সামরিক অভ্যূত্থানের বলি হিসেবে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।

ক্ষমতার পালা বদলে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘ধুর্ততম‘ সেনাপ্রধান এরশাদ ক্ষমতাসীন হন এবং তার বিরুদ্ধে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরম নির্দয়তার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। মিছিলে পুলিশের ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে সেলিমদেলোয়ারের হত্যাকান্ড, নুর হোসেনকে গুলি করে হত্যাসহ সে সময়ে অসংখ্য খুনের ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে এখনো দগদগে ক্ষতের মতই রয়ে গেছে।

. ইতিহাসের পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমুহকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের দলনে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। বিরোধী রাজনীতিকে কোন সরকারই ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসুচির মাধ্যমে মোকাবেলা করেনি। ফলে স্বাধীনতার পরে, এরশাদের আমল বাদ দিলে, কি সরকার, কি বিরোধী দলকেউই ইতিবাচক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাটি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। বিরোধী দল কদাচ যদি সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কোন আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, সরকারের ভয়াবহ দমনপীড়নের শিকার হতে হতে একসময় তা ভয়ংকর সহিংসতার রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেদিক থেকে বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন দমন করার ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘দুষ্টক্ষত’ জামায়াতে ইসলামীকে যদি সামরিক শাসন পূনর্বাসিত করে থাকে তাহলে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী দুই দল আওয়ামী লীগ তার ‘পরিচর্যাকারী’ এবং বিএনপি তার ‘লালন ও পালনকারী’। আজকে জামায়াতের দানবীয় চেহারায় আবির্ভূত হওয়ার পেছনে ইতিহাসের দায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কখনোই অস্বীকার করতে পারবে? ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহনারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত প্রতিকী বিচার সংঘটনের পরে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ তাদের তৎকালীন ‘সুহৃদ’ জামায়াতের বিচার শুরু করেনি।

২০০৯ সালে গণআদালত গঠনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৮ বছর পর বাংলাদেশের জনগণের বহু কাঙ্খিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। এই বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জনগণের কাছে মোটামুটি পরিস্কার। প্রথম বিচারের রায় নিয়ে জনগণের মধ্যে উল্লাস দেখা গেলেও কাদের মোল্লার রায়ের মধ্য দিয়ে সারাদেশের জনগণ সরকার এবং জামায়াতের মধ্যে আঁতাতের গন্ধ খুঁজে পান এবং শাহবাগ গণজাগরন মঞ্চের স্বত:স্ফুর্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে আঁতাতের সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে ভেস্তে গেছে।

কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি বনাম রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘটিত অঘোষিত যুদ্ধের বলি হয়ে ইতিমধ্যে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। শত শত প্রতিষ্ঠান, যানবাহন ধ্বংস হয়েছে জামায়াতের তধাকথিত ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার হয়ে এবং এখনও হচ্ছে। কারণ জামায়াতের জন্য এটি এখন বাঁচামরার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত দমনের নামে সরকারের অব্যাহত দমনপীড়নের শিকার হয়ে নিরীহ জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

কি জবাব দেবে সরকার, কি জবাব দেবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ? ভয়াবহ সন্ত্রাস ও মানবিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের কি প্রস্তুতি ছিলো? প্রস্তুতি ছিলো বলেই কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এখন নাশকতাকারীদের ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশ দিয়ে দায় সারতে চাচ্ছেন? প্রশ্নটি এখন সারাদেশের জনগণের।

মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের রায় আদালত প্রদান করবেবাস্তবায়ন করবে সরকার। জনগণ এটাই দেখতে চায়। আদালতের রায় কেউ মেনে না নিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করলে তা থেকে জনগণ ও তাদের জানমাল রক্ষার দায়ও সরকারের। মহাসড়কে, রেলপথে আগুন লাগানো, ভাংচুর বা নাশকতামূলক কর্মকান্ড যারা চালাবেতাদের প্রতিরোধ করা, আইন আমলে নিয়ে আসা, বিচারের মুখোমুখি করা সরকারের কর্তব্য। অবশ্যই এ কাজটি করতে হবে প্রচলিত আইনের মধ্য থেকে। রাজনৈতিক কর্মসূচিজনিত বর্তমান সহিংসতার ধরণও রাজনৈতিক। সরকার কোন পেশাদার সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে লড়ছে না। যে সমস্যার মূলে রাজনৈতিক সংকট, তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে।

ক্ষমতাসীনদের যাবতীয় অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অথবা তত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুসহ যে কোন গণ দাবির আন্দোলনকে সরকার ‘মানবতা বিরোধী বিচার বানচালের অপচেষ্টা’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিককালে আন্দোলনের ভয়াবহ সহিংসতার ধরণ এবং দমন কৌশলে দ্বিগুন সহিংসতা দেখে মনে হচ্ছে প্রধান দুই দলের কাছে যে কোন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকা অথবা ক্ষমতায় যাওয়াই মুখ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। জনগণের কোন বিষয়ই তাদের কাছে কোন কালেই বিবেচ্য বিষয় নয়।

মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত জামায়াত ও মুসলিম লীগ নেতাদের বিচারে ২০০৯ সালে গণ আদালত গঠিত হবার পরে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল বা যে কোন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনের মধ্যে সরকার সবসময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বানচালের অপচেষ্টা খুঁজে পেয়েছে। এই ধূঁয়া তুলে জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব আন্দোলনসংগ্রামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে নির্বিচারে দমন করা হয়েছে। হামলামামলাগুলিটিয়ার গ্যাস, কোন কিছুই বাদ যায়নি। ঢাকার রাজপথ জুড়ে ছিলো পুলিশ, র‌্যাব, ছিলো মোবাইল কোর্ট, সরকার দলীয় ক্যাডাররাও ছিলো। গত ৪ বছরের কোন আন্দোলন বা হরতালে কিছুই না থাকুক, এই সরকারের আমলে নাভিশ্বাস ওঠা জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে পুলিশের মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা।

নাশকতাকারীদের দেখামাত্র গুলি চালানোর নির্দেশ’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন, তিনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমাজের কতগুলি সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে, রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিকহোক সে পেশাদার খুনী বা সন্ত্রাসী, তারও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে এবং তা রাষ্ট্রকেই সমুন্নত রাখতে হবে। গত ৫ মাসে আন্দোলনের সহিংতায় শত মানুষের প্রানহানি ঘটেছে, শতকোটি টাকার সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। সরকার এ পর্যন্ত একটি প্রাণহানি বা নাশকতার ঘটনায় কারো শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। পিটুনি, গুলি, আটক ও মামলা করার মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ রয়ে গেছেন। ক্ষতিপূরন আইনের বিধানও প্রয়োগ তারা করতে পারছেন না। অবশেষে, অসহিষ্ণুতার চরম প্রকাশ ঘটেছে, গুলি চালানোর ভয়াবহ প্রবণতার মধ্য দিয়ে। ফলে দেশের জনগণ আতঙ্কিত হচ্ছেন এটা ভেবে যে, অপরাধীর বিচারে বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থা ও আইনের প্রতি সরকারের আস্থা কতোটা ভঙ্গুর!