Home » মতামত » সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে

সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে

প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামানের বিশ্লেষণ

army-logo-বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কেউ কেউ সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নে নানা আলোচনা করছেন। বাস্তব অবস্থাটা হচ্ছে, এই আলোচনাটিই অনভিপ্রেত এবং অনাকাক্সিক্ষত। দেশে বর্তমানে যে সঙ্কট চলছে, তা রাজনীতিবিদদের একগুয়েমী এবং গোয়ার্তুমি বাদ দিলে সমাধান সম্ভব। তাদের একগুয়েমীর কারণেই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। আসল পরিস্থিতি হচ্ছে, দেশ বাস্তবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। এই অবস্থায়, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মনে হয়, এই প্রশ্নে দু’পক্ষ একটি বায়বীয় যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। কাজেই সেনাবাহিনী কি করবে বা তাদের কি করা উচিত তা নিয়ে কথা না বলে, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে কিভাবে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়, সে নিয়েই আলোচনা করা উচিত।

দেশে বিদেশের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণের মধ্যে থেকে যদি উৎসাহিত করা না হয়, তাহলে সামরিক হস্তক্ষেপ সম্ভব নয়। বর্তমানে আমার মনে হয়, কোনো পক্ষই সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের জন্য উৎসাহ দেবে না। বেগম খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই বিতর্ক যতো তাড়াতাড়ি বন্ধ করা যায় তা দেশের এবং দেশের গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের জন্য, ততোই মঙ্গলজনক।

একটি কথা মনে রাখতে হবে, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে প্রমাণিত হয়েছে যে, সামরিক হস্তক্ষেপ সমস্যা সমাধানের কোনো পথ নয়। দেশের রাজনীতির সমস্যা ও সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানই হতে হবে। দু’পক্ষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সঙ্কট, সংঘাত এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি চলছে, তাতে দেশের সিভিল সোসাইটিকে একটু কষ্ট করে হলেও উদ্যোগ নিতে হবে। দু’দলের মধ্যে যাতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, তার চেষ্টা গ্রহণ জরুরী। এক্ষেত্রে আমি বলতে চাই, যেসব সিভিল সোসাইটির সদস্য অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা বদল চায়, তাদের প্রতিহত করাও উচিত। আর এটা করতে হবে, দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল চায়, তাদেরই।

উস্কানিমূলক বক্তব্য না দিয়ে, নির্বাচন সম্পর্কে মতৈক্য পৌঁছানোই হচ্ছে বর্তমান সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ এবং পদ্ধতি। এ ভিন্ন অন্য কোনো পথ নেই। এক্ষেত্রে সরকারকেই একটি উদ্যোগ নিতে হবে, বিরোধী দলের সঙ্গে একটি কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে। এর মধ্যদিয়েই নির্বাচিত সরকারের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের কথা বলেছিলেন। এতে আমি আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এ কথা বলার পরে কোনো উদ্যোগ আর দেখতে পেলাম না। আমি মনে করি, এটাই হচ্ছে সঙ্কটের মূল কারণ। এখানে কেউ কারো সঙ্গে সমঝোতা করতে চায় না। আমি বার বার একথাটি বলছি, দেশের গণ্যমান্য যারা আছেন, তাদের যদি তিরস্কারও করা হয়, তবুও দেশের স্বার্থে, তাদের চেষ্টা করা উচিত। যেমন ব্যারিস্টার রফিকুল হককে তিরস্কার করলেন, প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ব্যারিস্টার রফিক তার কথা বলে যাচ্ছেন। আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। অন্যদেরও এভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে সরকারই সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এখন তাদেরই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। যদি সরকার এমন উদ্যোগ না নেয়, তবে যা হবার তাই হবে। এই যা হবার তাই হবে অবস্থার সৃষ্টি যাতে না হয়, তার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়াও তো কোনো পথ খোলা নেই।

এই অবস্থায় বিরোধী দলেরও উচিত হবে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখা। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে এসেছিল, এবারেও তাই হবে। সেদিন যেমন সংবিধান পরিবর্তন করতে হয়েছিল, এবারও সে ধরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশ দিনে দিনে ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে যাচ্ছে। আমি অতিমাত্রায় আশাবাদী হতে চাই যে, সমস্যা সমাধানে সিভিল সোসাইটি একটি বড় ধরণের উদ্যোগ নেবে এবং নেয়া উচিত, যদিও তারা বার বার আশাহত হয়েছেন।

দেশের রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমশই বাড়ছে। রাজনৈতিক বিভাজন যদি রাজনীতিবিদরা না ঘোচাতে পারেন, সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তো অসহায়।

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, দুটো উপায়ে সমস্যার সমাধান হতে পারে। একটি হলো, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য, অন্যটি হলো, সামাজিক বিপ্লব অর্থাৎ মানুষ যখন বিদ্রোহ করে। কিন্তু বিদ্রোহ তো এমনিতে হয় না, এ জন্য সংগঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রয়োজন। কিন্তু এখানে বিদ্রোহের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কাজেই সমস্যার সমাধান আলাপআলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে হতে হবে।

কিন্তু সমস্যা এতোই জটিল হয়ে পড়েছে যে, সহজ কোনো উপায় নেই, এ সঙ্কট সমাধানের। তবে প্রধানমন্ত্রীকে সমাধানের একটি উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সমঝোতা না হলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বও সঙ্কটে পড়বেন। যেমনটি হয়েছিল ১/১১র পরে। কিন্তু সে কথাটি তারা বেমালুম ভুলে গেছেন।

সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। যদি রাষ্ট্রপতি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হন, তবে তিনি দু’দলের মধ্যে একটি সমঝোতার প্রচেষ্টা নিতে এবং হয়তো সফলও হতে পারেন।

মোদ্দা কথা হলো, যতো কষ্টই হোক, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একগুয়েমী কমাতে হবে এবং সিভিল সোসাইটিকে সমঝোতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এর কারণ, সেনা সমাধান কোনো সমাধানই নয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সমাধানই সঙ্কট উত্তরণের একমাত্র পথ এবং এই সমাধান বের করতেই হবে।।