Home » রাজনীতি » দিকভ্রান্ত পথে রাজনীতির যাত্রা

দিকভ্রান্ত পথে রাজনীতির যাত্রা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

politics-1-১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসে সে সময়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন প্রতিমন্ত্রী বাগেরহাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ১৯৭১এর ভূমিকার জন্য অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা এ নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন এবং ঐ প্রতিমন্ত্রীর অপসারন ও বিচার দাবি করেছিলেন। আমি তখন ভোরের কাগজে কর্মরত। পেশাগত দায় তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অপরিসীম দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এ বিষয়ে অবিরাম লেখালেখি শুরু করি। পরিনামে ২০০০ সালের ৩১ জানুয়ারীর রাতে হত্যা করার জন্য আমার ওপর হামলা করা হয় এবং নিহত ধরে নিয়ে সন্ত্রাসীরা চলে যায়। প্রচন্ড রক্তক্ষরনে মৃতপ্রায় আমি কোনরকমে হাসপাতালে পেীঁছতে সক্ষম হই এবং সে যাত্রা জানে বেঁচে যাই।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দান এবং চেতনার ধারকবাহক বলে দাবিদার আওয়ামী লীগ বা সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করার পরেও ঐ প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপই গ্রহন করেনি। উল্টো আমার হত্যার প্রচেষ্টার ঘটনায় যে মামলাটি দায়ের হয়েছিল সরকারী নির্দেশে কালক্রমে সেটি ধামাচাপা পড়ে যায়। পরবর্তীকালে সাংবাদিক এবং নাগরিকর সমাজ এ বিষয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও সরকারী দমনপীড়নের ভয়ে কেউই মুখ খুলতে সাহস পান নি। ব্যক্তিগত এই প্রসঙ্গটি শুরুতেই উপস্থাপন করলাম এ জন্য যে, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আওয়ামী লীগ চেতনাগত জায়গা থেকে কখনই অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল কিনা অথবা রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জিগীর তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে কিনাসে বিষয়ে এখনকার প্রজন্ম ধারনা পেতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে এই যে, গণতন্ত্র্রের লেবাসে যখন যে দলই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে সীমাহীন অবজ্ঞার চোখে তারা দেখেছে। যাদের ভোটে তারা নির্বাচিত হয়, তাদের প্রতি এই ধরনের নিষ্ঠুর আচরন ফ্যাসিস্ট রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে ফ্রান্সের একজন খ্যাতনামা জেনারেল ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্রেঞ্চ ফিফথ রিপাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস দ্য গলের একটি অবিস্মরনীয় উক্তিকে স্মরণ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি রাজনীতিবিদরাই করবেন। কিন্তু সুতাটি থাকতে হবে জনগণের এবং তাদের পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির হাতে। তারা কোন রাজনীতিককে টেনে তুলবেন, আবার কাউকে নামাবেন। রাজনীতির মতো সিরিয়াস বিষয়টি তাই গণতান্ত্রিক দেশে শুধু রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমাজ গঠনের জন্য, যার অর্থনীতির চরিত্র হবে সমাজতান্ত্রিক এবং রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা থাকবে। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রের এই মূলগত চেতনার ওপর প্রথম আঘাতটি আসে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সূচনা করে। এভাবেই সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে সংবিধানের মূলগত চেতনা ও জনগণের আশাআকাঙ্খা ভূলুন্ঠিত করা হয়। পরিনতিতে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অগণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা ঘটে।

আমাদের রাষ্ট্রের শুরুতে প্রতিস্থাপিত দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান নানাবিধ আদর্শভিত্তিক ধারাকে সমন্বিত করতে চেয়েছে। জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র দুই আদর্শের নাম। রাষ্ট্র এবং আদর্শকে আমরা বিভাজিত করতে পারিনি। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে গণতন্ত্র সংযোজিত করে জুড়ে দেয়া হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা। গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে আলাদাভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা উচ্চারন করার কোন প্রয়োজন হয় না, কারণ গণতন্ত্র নিরপেক্ষভাবে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমন্বিত আশ্রয় হয়ে ওঠে।

আমাদের হাল নাগাদ সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরেও এই সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়েছে। পনেরবার সংবিধান কাঁটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে অজস্র গোঁজামিল দিয়ে আমাদের রাষ্ট্র চলছে। এই অবস্থায় সংবিধানের মূলগত চরিত্র বজায় রেখে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে তা আসলে বহুমাত্রিক পরস্পর বিরোধিতা। ৪৩ বছর পার করা এই রাষ্ট্রের মূল জটিলতাগুলো সমাধান না করে আমরা অধিকতর রাষ্ট্রনৈতিক জটিলতার ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। রাষ্ট্রের নাগরিকরা একটি গণতান্ত্রিক সমাজ চান। যেখানে থাকবে তার মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ বলছে, “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্বার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।”

এই মৌলিক মানবাধিকারের চেহারাটি গত ক’মাসে বাংলাদেশে কোন অবস্থায় চলে গেছে, সেটি এখন নাগরিক মাত্রই জানেন। গত ক’মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় যে দেড় শতাধিক মানুষ খুন হলেন, জনসম্পত্তি ধ্বংস হলো, উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত হলো, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমনের শিকার হলোরাষ্ট্রের ম্যানেজার হিসেবে সরকার কি আদৌ তাদের কোন সুরক্ষা দিতে পেরেছে? সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু যারাই রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হোন না কেন, তার ন্যায্য তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা কিংবা ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে কোন ব্যবস্থা কি সরকার নিতে পেরেছে? উত্তর হচ্ছে, না পারেনি। উল্টো ক্ষমতাসীন দল, প্রধান বিরোধী দল ও তাদের জোটবদ্ধ জামায়াতে ইসলামী’র সহিংস রাজনীতির কবলে সংবিধানের ‘১১ অনুচ্ছদ’ ভূলুন্ঠিত। এর সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল এবং গ্র“প তিন দলের পৃষ্ঠপোষকতায় যারা দেশজাতিকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে মেতে উঠেছে।

গণজাগরন মঞ্চের আহবায়ক ইমরান এইচ সরকারের একটি বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় সকল নাগরিক সম্ভবত: একমত পোষন করবেন। তিনি বলেছেন, ‘সরকার তামাশা দেখছে’। তার এই মন্তব্যটি খুবই প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, গত ক’মাসের রক্তপাত ও সহিংসতায় সরকারের নির্বিকার আচরন এবং রাজনৈতিক অপকৌশল এখন আর অপ্রকাশ্য নয়। একদিকে গণজাগরন মঞ্চকে দলীয়করণ এবং অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একধরনের আপোষ চেষ্টাভোটের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের চরম দেউলিয়াপনা প্রকাশ করে দিয়েছে। খোদ দলের মধ্যে এবং মহাজোটের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যনীয়। প্রচন্ড ক্ষুব্দ তোফায়েল আহমেদ এবং রাশেদ খান মেনন তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, দুই নৌকায় পা রাখা ঠিক হবে না এবং আমও যাবে ছালাও যাবে।

গণজাগরন মঞ্চ থেকে সরকার রাজনৈতিক ফায়দা তুলে গত চার বছরের দু:শাসন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট আর সন্ত্রাসের চেহারা আড়াল করতে চেয়েছে। এজন্যই বছরের শুরুতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি এক নম্ব^র এজেন্ডা হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। সন্দেহ নেই, এটি বাংলাদেশেরে মানুষের প্রাণের দাবি। মুষ্টিমেয় কতিপয় দেশবিরোধী মানুষ ছাড়া একাত্তরে পাক বাহিনীর গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের বিচার গোটা জাতির কাছে সবচেয়ে প্রত্যাশিত বিষয়ের একটি। আওয়ামী লীগ মূলত: জনগণের এই আবেগকে পূঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছিলো এবং সফলও হয়েছিলো।

অন্যদিকে, এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপিজামায়াত ও তাদের অন্য সহযোগীরা হাতে গোনা কয়েকজন ব্লগারের দায়িত্ব জ্ঞানহীন মন্তব্যকে পূঁজি করে ধর্মকে সামনে নিয়ে এসে দেশব্যাপী একটি উন্মাদনা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। আওয়ামী লীগ ও এর সঙ্গে ভিন্ন উপায়ে যোগ দিয়েছে। এই মূহুর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ইস্যুটিকে বড় করে তোলা হয়েছে মূলত: জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করতে। তাদের ১৩ দফা দাবীর প্রতি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মহাজোট মিত্র জাতীয় পার্টি সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধন্যবাদ দিয়ে বলেছেন, তাদের দাবি বিবেচনা করা হবে। আওয়ামী লীগ সঙ্গে আপোষের অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারকবাহক বলে দাবিদার এই দলটি সংবিধান এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং ধর্মভিত্তিক এমন ১৩ দফা দাবী নিয়ে আলোচনা করতেও রাজি আছে ও এর অরাজনৈতিক দফাগুলো মেনে নেয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।

ফলে এখন রাজনীতিতে ধর্ম একেবারে সামনে চলে এসেছে। ধর্মীয় আবেগকে পূঁজি করার ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল। এই খেলার শেষ পরিনতি কিএই প্রশ্নটি এখন প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের। বড় দুই দলের প্রত্যক্ষ লড়াই আর ধর্ম নিয়ে উত্তেজনা ইঙ্গিত দিচ্ছে সামনে অশুভ পরিস্থিতি অপেক্ষমান। গোটা দেশ ভাগ হয়ে গেছে দুটি শিবিরে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের অশুভ শক্তির সঙ্গে আঁতাত ও আঁতাতের চেষ্টা অধিকতর সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করছে। আশংকা দেখা দিয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বর্তমান আদলটি ধ্বসে পড়ার।

এই সুযোগে মনে করিয়ে দিতে চাই, ২০০৯ এর নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিশের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল। ৯০ দশকের মধ্যভাগে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন মনে করিয়ে দেয় ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ পিছিয়ে নেই বিএনপি জামায়াতের তুলনায়, বরং তারা সবসময়ই এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে। ফলে অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, একাধারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধুম্রজাল, অন্যদিকে, ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দল এবং গ্র“পের সঙ্গে আপোষ প্রবনতা দেশের নিরীহ জনগণের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ফেলেছে। বিএনপি অন্তত: এদিক থেকে অনেকটাই পরিষ্কার। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে হেফাজত’র দাবিদাওয়ার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষনা করে তার অবস্থান এই মূহুর্তে জনগণের কাছে পরিষ্কার।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর বাকি মাত্র মাস সাতেক। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে প্রায় আড়াই বছর ক্ষমতাসীন ছিল এক ‘বিচিত্র সরকার’, যার নাম সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার। জনগণকে বিবেচনায় না রেখে, চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে রাজনীতিকরা যখন ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, তখনই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহন করেছিল সেই ‘বিচিত্র সরকার’। জনগণ এই সরকারকে শুরুতে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তারা সেনাসমর্থিত সরকার সম্পর্কে বুঝতে পেরেছে। বিএনপি ক্ষমতা ছেড়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে, রাষ্ট্রপতিকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে, পূর্ণ নিয়ন্ত্রন নিজেদের হাতে রেখে। আওয়ামী লীগ এবার আগে থেকেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রন নিজেদের হাতে রাখতে চায়।

২০০৬ সালের প্রথম থেকে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, বর্তমানেও তেমনিই অবস্থার দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সাত বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতি মোটেই বদলায়নি। বদলেছে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান। এটি এখন খুবই অনিশ্চিত যে, সব দলের অংশগ্রহনে একটি নির্বাচন কিংবা আদৌ নির্বাচন হচ্ছে কিনা? সুপ্রীম কোর্টের রায়ে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং আরো দুটি নির্বাচন তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারেএরকম নির্দেশের পরপরই আওয়ামী লীগ সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় পূর্নাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই।

এর পর পরই বিএনপি আপোষহীন অবস্থান গ্রহন করে যে, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া কোন নির্বাচন তারা হতে দেবে না। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগও অনড় থাকে যে, আগামীতে কোন নির্বাচনই তত্বাধায়ক সরকারের অধীনে হবে না। বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে এখন সংকটের মূল জায়গা হচ্ছে এটি। এর সঙ্গে পরবর্তীকালে যুক্ত হয় ৭১’র যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে রাজনীতি। আজকে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এই বিচার সংঘটনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যতোটা না অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা, তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ফায়দা তোলা। এর মাধ্যমে জামায়াতের সঙ্গে তারা একটি সমঝোতায় পৌছানোর চেষ্টা করছিল এবং বিএনপি থেকে জামায়াতকে আলাদা করার অপকৌশল গ্রহন করেছিল। বেশ কিছু ব্লগারের মাধ্যমে সংগঠিত গণজাগরন মঞ্চের আন্দোলন এই অপকৌশলকে ভেস্তে দিতে সক্ষম হয়।

এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপির সরকার পতনের একদফা দাবি জামায়াতের সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পরিণামে দেশজুড়ে চরম অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে মূল দাবি তত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বা আগামি নির্বাচন কিভাবে হবে সে বিষয়ে কোন রকম উদ্যোগ না নিয়ে দ্বিগুন সহিংসতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে দেশকে অঘোষিত এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিনত করে ফেলে। এর সঙ্গে ধর্মীয় ইস্যু পরিস্থিতিকে দ্রুতই চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই বলয়ের মধ্যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রতিটি দিন পার করছে আতংকের মধ্য দিয়ে।

এ অবস্থায় সরকার গণতন্ত্রের শেষ আবরনটুকুও সরিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। সরকারের রাজনৈতিক জিঘাংসার সবশেষ প্রকাশ ঘটেছে গত ৭ এপ্রিল রোববার। এদিন সিএমএম আদালতে হাজির হতে আসা বিএনপি’র প্রথম সারির এবং আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা প্রায় সকল নেতৃবৃন্দের জামিন বাতিল করে দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপিও পিছিয়ে নেই, সঙ্গে সঙ্গে তারা ৩৬ ঘন্টার হরতালের কর্মসূচি ঘোষনা করেছে। ৯ এপ্রিল হরতাল শুরুর আগের রাতেই গুলশানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বেরোনোর মুখে দলের যুগ্মমহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। কেন, কি অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এ বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশ কিছুই জানায়নি। ফলে বিএনপি এখন অনেকটা কেন্দ্রীয় নেতা শূন্য দলে পরিনত হয়েছে। অনেকেই ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সরকার আরো বড় ধরনের গ্রেফতার এবং নির্যাতনের পথে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনের ব্যাপারে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে এবং তার সাম্প্রতিক সব আচরনের মধ্যে এই আচরনের প্রতিফলন ঘটছে। অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের মতো তার এই আচরনকে ‘দিশেহারা’। বিরোধী দলের প্রতি এ ধরনের চরম পদক্ষেপ রাজনৈতিক মীমাংসার সবশেষ সম্ভাবনাটুকু নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সরকার ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ পর্যায়ে চলে গেছে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সে এখন যে কোন হঠকারী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এ অবস্থায় আগামী রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কি হবে, সেটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

দেশের প্রতিটি মানুষের প্রশ্ন, আমরা কি এই রাষ্ট্র চেয়েছিলাম? রাষ্ট্রসরকার জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কাজ করবে। সরকার পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তুলবে। কিন্তু জনগণ অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করছে, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির মুনাফা নিশ্চিত করতে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সরকার বেশি আগ্রহী। জন মানুষের কল্যানে পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে শক্তিশালী না হয়, গত দুই দশকের সরকারগুলো সেই চেষ্টাই করছে। ফলে সরকারের তরফ থেকে জনগণ অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ‘পয়সা যাররাষ্ট্র তার’ এই নীতিকেই সুরক্ষা দিতে গিয়ে লুটেরা শ্রেনী সরকারের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নীতিভ্রষ্টতা আর এই সঙ্গে রাষ্ট্র ও আদর্শ এক করে ফেলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। দুর্নীতি, দলীয়করণ, আত্মীয়করণসবচেয়ে দুর্বল করে দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানকে। সামন্ততান্ত্রিক ধারনায় ব্যক্তি ও পরিবারমুখী হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এই আত্মঘাতী প্রবনতা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। এর ফলে আক্রান্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং খোদ জাতীয় সংসদ। আর এ জন্যই দেশের রাজনীতি ক্যুপাল্টা ক্যু, হত্যা, গুম, লুটপাট এবং দীর্ঘস্থায়ী নৈরাজ্যর মধ্যে পতিত হয় বার বার।।

১টি মন্তব্য

  1. Bacchu Bhai,
    Thanks for your analytical article. I expected little more- your recommendations to over come the present political situation. Both sides are fixed at their own stands but where is the way out? TIB has given their formula yesterday, taking it in account what’s your way out formula which might be acceptable to both parties?