Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভূতুড়ে গল্প – ৫

পুঁজিবাদের একটি ভূতুড়ে গল্প – ৫

নারীবাদী আন্দোলন এবং এনজিওকরণ

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-2ন্যায়বিচারের আইডিয়াকে মানবাধিকারের শিল্পে রূপান্তরিত করাটা একটি কল্পনাশক্তি সম্পন্ন পরিবর্তন। এর মাধ্যমে এনজিও ও ফাউন্ডেশনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়। মানবাধিকারের সংকীর্ণ কেন্দ্রবিন্দু ফলে নৃশংসতাভিত্তিক বিশ্লেষণের সৃষ্টি হয়, যার ফলে বৃহত্তর ছবি বাধাগ্রস্থ হয় এবং সঙ্ঘাতে লিপ্ত উভয় পক্ষকেইযেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাওবাদী ও ভারত সরকার কিংবা ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও হামাস– ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘনকারী’ হিসেবে ধিক্কৃত করা যেতে পারে। এতে করে ভূমি লুণ্ঠনকারী খনি করপোরেশন বা ইসরাইল রাষ্ট্রের ফিলিস্তিনি ভূমিতে সম্প্রসারণের ইতিহাস পরিণত হয় আলোচনায় নগন্য গুরুত্ব বহনকারী ফুটনোটে। মানবাধিকার কোনো ব্যাপারই নয়এমনটা কিন্তু বলা হচ্ছে না। অবশ্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি, সেখানকার মহা অবিচার দেখা বা সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উপলব্ধি করার জন্য এটা যথেষ্ট ভালো মাধ্যম নয়।

নারীবাদী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে ফাউন্ডেশনগুলোর সম্পৃক্ততা আরেকটি কল্পনাশক্তিসম্পন্ন পরিবর্তন। কেন ভারতের বেশির ভাগ ‘ঘোষিত’ নারীবাদী ও নারী সংস্থা ৯০ হাজার সদস্যবিশিষ্ট ‘ক্রান্তিকরি আদিবাসী মহিলা সংগঠন’ (রেভ্যুলশনারি আদিবাসী ওম্যান্স এসোসিয়েশন)- এর মতো সংস্থা, যারা তাদের নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে পিতৃতন্ত্র এবং একইসঙ্গে দণ্ডকারন্য বনে খনি করপোরেশনগুলোর উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে? কেন কোটি কোটি নারীকে তাদের মালিকানাধীন যেসব ভূমিতে তারা কাজ করত, সেখান থেকে তাদের মালিকানা কেড়ে নেওয়া ও উচ্ছেদকে নারীবাদী সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না?

তৃণমূল পর্যায়ের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী গণআন্দোলনগুলো থেকে উদার নারীবাদী আন্দোলনের সম্পর্ক ছিন্ন করাটা ফাউন্ডেশনের অশুভ কৌশলের মাধ্যমে শুরু হয়নি। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৬০ ও ১৯৭০এর দশকে নারীদের দ্রুত আমূল পরিবর্তন কামনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ও খাপ খাওয়াতে এসব আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণে। নারীদের ঐতিহ্যবাহী সমাজে সহিংসতা ও পুরুষতন্ত্র এবং সেইসঙ্গে বাম আন্দোলনগুলোর তথাকথিত প্রগতিশীল নেতাদের সম্পর্কে তাদের ক্রমবর্ধমান অধৈর্যকে ফাউন্ডেশনগুলো স্বীকৃতি দিতে এবং তাদের প্রতি সমর্থন ও তহবিল জোগান দিতে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিল। ভারতের মতো দেশে পল্লী ও নগরের মধ্যে বিভক্তিও ছিল। বেশির ভাগ আমূল সংস্কারবাদী ও পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল পল্লী এলাকায়, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষতন্ত্র তখনো বেশির ভাগ নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ করত। শহুরে যেসব নারী এ ধরনের আন্দোলনে (নক্সালি আন্দোলনগুলোর মতো) যোগ দিয়েছিল, তারা পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনে প্রভাবান্বিত ও উদ্দীপ্ত ছিল এবং মুক্তির পথে তাদের নিজস্ব যাত্রা প্রায়ই ‘জনসাধারণের’ সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পুরুষদের কর্র্তব্যবোধের প্রতি সাংঘর্ষিক হতো। অনেক নারী কর্মী প্রতিনিয়ত যেসব নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হতো, এমনকি তাদের নিজস্ব কমরেডদের হাতেও, তার অবসান করতে ‘বিপ্লব’এর জন্য আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক ছিল না। তারা জেন্ডার সাম্যকে চেয়েছিল বিপ্লবীপ্রক্রিয়ার নিরঙ্কুশ, তাৎক্ষণিক ও আপসহীন অংশ হিসেবে, কেবল বিপ্লবপরবর্তী প্রতিশ্র“তি হিসেবে নয়। বুদ্ধিমতী, ক্রুদ্ধ ও মোহমুক্ত নারীরা সরে গিয়ে সমর্থন লাভ এবং টিকে থাকার অন্যান্য উপায়ের খোঁজ করল। এর ফলে ১৯৮০এর দশকের শেষ দিকে, ওই সময়েই ভারতীয় বাজার খুলে দেওয়া হচ্ছিল, ভারতের মতো দেশে উদার নারীবাদী আন্দোলন অত্যধিক মাত্রায় এনজিওকৃত হয়ে পড়ে। এসব এনজিও’র অনেকগুলো সমকামী অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা, এইডস এবং যৌন কর্মীদের অধিকার প্রশ্নে দারুণ কাজ করে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, উদার নারীবাদী আন্দোলনগুলো নতুন নতুন অর্থনৈতিকনীতি চ্যালেঞ্জ করার ব্যাপারে সামনের কাতারে ছিল না, যদিও নারীরাই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল। তহবিল বণ্টনকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে ফাউন্ডেশনগুলো কোন ‘রাজনৈতিক’ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে, তা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। এখন এনজিওগুলোর তহবিল দেওয়ার নির্দেশিকার মধ্যে বলা হতে থাকল কোনটি নারীদের ‘ইস্যু’ এবং কোনটি নয়।

নারীদের আন্দোলন এনজিওকরণের ফলে পশ্চিমা উদার নারীবাদই (এতে সবচেয়ে বেশি তহবিল থাকার গুণে) নারীবাদের সংজ্ঞা নির্ধারণকারীতে পরিণত হয়। স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধ হতে থাকে নারীদের দেহের ওপরএকদিকে জবরদস্তি করে ত্বকে ভাঁজ পড়তে না দেওয়া এবং অন্যদিকে বোরকা পরা। (আর অনেকে আছে যারা ত্বকের ভাঁজ না পড়া এবং বোরকার দ্বিমুখী দুর্ভোগ পোহায়।) সম্প্রতি যখন ফ্রান্সে নারীদের বোরকা থেকে বের হতে বাধ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হলো, নারীরা নিজেরাই বেছে নিতে পারে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করার বদলে, তখন তা আসলে নারীদের মুক্ত করার ব্যাপার ছিল না, বরং তাকে পোশাকহীন করার বিষয় ছিল। এটা অবমানিত ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদমূলক কার্যক্রম ছিল। বিষয়টা বোরকার ব্যাপার নয়। এটা বলপ্রয়োগের ব্যাপার। কোনো নারীকে বোরকা থেকে বলপূর্বক বের করাটা তাকে বলপূর্বক তাতে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতোই খারাপ। এই পন্থায় জেন্ডারকে বিবেচনা করায়সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাটাছেড়া করাএটা পরিচিতির তথা বিরাজমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং পোশাকপরিচ্ছেদের একটি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। আর এটাই ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানোর সময় মার্কিন সরকারকে নৈতিক ঢাল হিসেবে পশ্চিমা নারীবাদী গ্র“পগুলোকে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছিল। আফগান নারীরা তালেবান শাসনে মারাত্মক কঠিন অবস্থায় ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু তাদের ওপর মারাত্মক বোমা বর্ষণ তাদের সমস্যার সমাধান ছিল না।

এনজিও’র বিশ্বে, যা তার নিজস্ব উদ্ভট বেদনানাশক ভাষায় বিবর্তিত হয়, সবকিছুই পরিণত হয় পৃথক পেশাদারিত্বের মোড়কে মোড়া, বিশেষ স্বার্থপূর্ণ ইস্যুর ‘বিষয়’এ। সমাজ উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বংশবিস্তারের অধিকার, এইডস, এইডস আক্রান্ত এতিমসবই তাদের নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ ও অলঙ্ঘনীয় তহবিল নির্দেশনাসহ তাদের নিজস্ব গুদামঘরে কঠোরভাবে আবদ্ধ রাখা হয়। নারীবাদের মতো দারিদ্র্যও প্রায়ই অভিন্ন সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গরিব মানুষ যেহেতু অবিচারের কারণে সৃষ্টি হয়নি, বরং তারা স্রেফ টিকে থাকা হারানো গোত্র, তাই তাদেরকে স্বল্প মেয়াদে কষ্ট লাঘবকারী ব্যবস্থায় (এককভাবে, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে এনজিও’র মাধ্যমে) উদ্ধার করা সম্ভব এবং তাদের দীর্ঘ মেয়াদি উত্থান আসবে ‘সুশাসন’ থেকে। ‘বৈশ্বিক করপোরেট পুঁজিবাদ’ শাসনের অধীনে কোনো বিরোধিতা ছাড়াই এটা অগ্রসর হবে।।

(চলবে)