Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাক্ষাৎকার – প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

নির্বাচনের ইস্যুকে যদি সমাধান না করা যায়, তাহলে নানা উপসর্গ দেখা দেবে

S I Cপ্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রফেসর এমেরিটাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মুক্তচিন্তা এবং মতামতের স্বাধীনতা, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: একটি সমাজের জন্য মুক্তচিন্তা ও মতামতের স্বাধীনতা কতোটা প্রয়োজনীয় এবং জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মুক্তমত না হলে তো মুক্ত সমাজ হবেই না। মুক্তি বিষয়টির মধ্যে নানা বিষয় আছে, রাজনীতি আছে, অর্থনীতি আছে। কিন্তু মানুষের চিন্তার যে শক্তি সে শক্তিই হচ্ছে নিরীখ একটি সমাজ কতোটা মুক্ত। মানুষ যদি আবদ্ধ থাকে, যেখানে মানুষ চিন্তা করতে বা মতামত প্রকাশ করার সাহস করে না, সেটা তো একটা আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ। সে সমাজকে মুক্ত তো দূরের কথা, উন্নতও বলা যাবে না। মুক্তির জন্য মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। কারণ এই স্বাধীনতা না থাকলে মানুষের চিন্তাই বিকশিত হবে না। মানুষের সংজ্ঞাই হচ্ছে, মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী এবং এখানেই পশুর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য। অন্য প্রাণীর চিন্তা শক্তি নেই। আর সেটাই যদি না থাকে, তবে অন্য প্রাণী থেকে মানুষ আলাদা হবে না। চিন্তা শক্তি আছে বলেই সভ্যতার যে অগ্রগতি, উদ্ভাবনী চিন্তা, নতুন পথের সন্ধান সম্ভব হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: গণতন্ত্রের জন্য মুক্তমত কতোটা জরুরি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: গণতন্ত্রতো মুক্তির কথা বলে এবং এর সংজ্ঞাটাও তাই। গণতন্ত্র হচ্ছে, সে রকমের সমাজ এবং রাষ্ট্র যেখানে প্রত্যেকেরই স্বাধীনতা থাকবে এবং ব্যক্তির স্বাধীনতার মূল ভিত্তিটাই হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এটাই হচ্ছে ভিত্তি, যেখানে পরীক্ষা হয় যে, মানুষ কতোটা মুক্ত। সে যদি ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে, চিন্তা যদি আরষ্ট থাকে, সে যদি খুব একটা সীমাবদ্ধ পরিসরের মধ্যে থাকে, তাহলে সেখানে তো গণতন্ত্র আছে, এটা বলা যাবে না। কারণ গণতন্ত্র এমন একটি সমাজ যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে।

আমাদের বুধবার: সম্প্রতি দুজন মন্ত্রী একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, আইন সংশোধন করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনা হচ্ছে। আপনি সরকারের এই উদ্যোগকে কিভাবে দেখছেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এটা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য বক্তব্য নয়। একজন মানুষ তার মত প্রকাশ করলে সেই মত যদি আরেক ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে তার শাস্তি হবে, এটা খুব বিপজ্জনক। বিপজ্জনক এই কারণে যে, কোনটি যে আঘাত এবং কোনটি আঘাত নয় এটা নির্ণয়ের তো সংজ্ঞা নেই। যার কোনো সংজ্ঞা নেই, সেক্ষেত্রে এর অপপ্রয়োগ খুবই স্বাভাবিক এবং অপপ্রয়োগ যে কতো নিষ্ঠুর হতে পারে সেটা আমরা পাকিস্তানে দেখছি। পাকিস্তানে এই আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, আক্রমণ করা হচ্ছে এবং উন্মাদনার সৃষ্টি করে সেখানে হত্যা, উপসনালয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ওপরে আক্রমণ চলছে। এই উন্মাদনাকে কোনোক্রমেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। কারণ ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই আচরণ ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। ধর্ম সম্পর্কে মত প্রকাশ করলে, অন্যের কাছে যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে সুষ্ঠু বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের শাস্তির বিধানের প্রয়োজন নেই। বৃটিশ বা তৎকালীন পাকিস্তানেও ছিল না। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও কিন্তু এ রকম হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের বুধবার: কিন্তু ধর্ম নিয়ে যদি কুরুচিপূর্ণ এবং কুৎসিত মন্তব্য করা হয় তাহলে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ব্লগ তো খুবই সামান্য বিষয়। একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে এগুলো করছে। যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে প্রচলিত আইনেই তার শাস্তির বিধান আছে। এর বাইরে চরম শাস্তির বিধান এনে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আসলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচন যতই সামনে আসবে, ততোই এগুলো হবে। নির্বাচনের ইস্যুকে যদি সমাধান না করা যায়, তাহলে নানা উপসর্গ দেখা দেবে। এর সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্য কোনো পথে কাজ হবে না। যারা ধর্মকে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ব্যবহার করতে চায়, এটা তো নির্বাচনে জেতার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা। কে কতোটা ব্যবহার করতে পারবে এবং ব্যবহার করে কে কতোটা ভোট আদায় করতে পারবে সেটাই হচ্ছে তৎপরতা। যারা এ কাজ করেন তারা মোটেই ধার্মিক নন। ধার্মিক হলে এমন কাজ করতে পারে না। ১৯৭১ সালে ধর্মের নামে আমাদের উপরে আক্রমণ করা হয়েছিল এবং গণতন্ত্র চালানো হয়েছিল। কিন্তু কাজটি যারা করেছিল, তারা মোটেই ধার্মিক ছিল না। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশ ধার্মিক ছিলেন। ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য। নির্বাচনে ভোট সংগ্রহে কৌশলটি যে কতো বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে, নতুন যে আইন তৈরির কথা বলা হচ্ছে তা থেকেই বোঝা যায়। কিন্তু রাজনীতি তো হবে তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি কি, পররাষ্ট্রনীতি কি এবং দেশীয় সম্পদ সম্পর্কে কোন দল কি ভাবছে তা নিয়ে। যারা ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে, তাদের কোনো শক্তি নেই। পাকিস্তানিদেরও আমরা দেখতাম, তাদের ধর্মীয় বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বক্তব্য ছিল না। তারা মানুষের ইহজাগতিক সমস্যার সমাধান করতে পারতো না। তাই তারা বিদ্বেষ সৃষ্টি, পরিস্থিতি অশান্ত করাসহ নানা কাজ করতো। কাজেই অন্য ইস্যুগুলোকে চাপা দেয়ার জন্য এসব করা হতো। মূল ইস্যু হচ্ছে, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত। এসব বিষয়কে চাপা দেয়ার জন্য ধর্মকে আনা হয়। ভোট পাওয়ার জন্য তারা আশা করে।

আমাদের বুধবার: বর্তমান সরকারের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সরকারের আপসমুখীতার সমালোচনা, তাদের নিজস্ব লোক যারা, তারাই করছে। বাইরের লোকদের তো কিছু বলার থাকে না। ভেতর থেকেই সমালোচনা হচ্ছে। এ ধরনের আপসমুখীতার তাদের দলের জন্যই বিপজ্জনক হবে, বিপজ্জনক হবে দেশের জন্যও। মানুষ এ সবকে গ্রহণ করবে না। আমি মনে করি, এটা বেশিদূর যাবে না। এসব ইস্যুতে মানুষ ভোট দেবে না। ভোট দেবে রাজনৈতিক দলের উপরে আস্থাঅনাস্থা থেকে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছিল আসলে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে। পাকিস্তান তাদের কাছে ছিল মুক্তির প্রশ্ন। মানুষ ভেবেছিল, এমন একটা দেশ হবে, যেখানে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে।

আমাদের বুধবার: বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: যতোই নির্বাচন সামনে আসছে, পরিস্থিতি ততোই খারাপ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে থাকবে। এখন মানুষের বাঁচাটা হচ্ছে বিষয়, ধর্ম নয়। বাঁচতে হলে মানুষ ইহজাগতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে চাইবে। যতোই নির্বাচন এগিয়ে আসবে, ততোই ধর্মের ব্যবহার বাড়বে বলে মনে হয়। তবে, শেষ পর্যন্ত কোনো দল ধর্মের ভিত্তিতে জিততে পারবে না। কোন দল ধর্মকে কতোটা ব্যবহার করতে পারলো তার উপরে নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে না।।

১টি মন্তব্য

  1. Interview ta besh bhalo legeche.Mukto moner manushera mukto buddhir chorchai kore thaken.