Home » অর্থনীতি » কুইক রেন্টাল – পাকিস্তান পারলেও আমরা পারলাম না

কুইক রেন্টাল – পাকিস্তান পারলেও আমরা পারলাম না

বি. ডি. রহমতউল্লাহ্

energy-9রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দেশের অর্থনীতিকে যে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়, ইতোমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমরা বারবার তা বলে আসলেও সরকার সেদিকে কোনদিনই দৃষ্টি দেয় নাই। তার কারণও যথেষ্ট ছিলো। পাকিস্তান প্রায় সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও সেদেশের আদালত রেন্টাল বন্ধ ও রেন্টালের মদদদাতা প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারের নির্দেশদানের এক যুগান্তকারী রায় দেয়ার মাধ্যমে যে অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ নিয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে,বাংলাদেশে সরকার কর্তৃক গৃহীত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্রকল্পসহ জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন কর্মসূচী অর্থনীতি ও দেশের জ্বালানী খাতের জন্য এর চেয়েও আরো বিনাশী হওয়া স্বত্ত্বেও, আমাদের দেশের সুশীল সমাজ, পেশাজীবি গোষ্ঠী আশ্চর্য্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং নির্জীব হয়ে বসে আছেন।

এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই এক তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়লো। বিশেষজ্ঞরা বললেন, অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে ও অল্প সময়ে এ সংকট সমাধান যোগ্য। কিন্তু অতীতের সরকারের ন্যায় এ সরকারও জনকল্যানকর সাশ্রয়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে যায় নি। সরকার উল্টো রেন্টাল/মার্চেন্ট প্লান্টসহ বিদেশ নির্ভর সব ধরনের প্রকল্পের দিকে গেল এবং সমস্যাকে জিইয়ে রাখলো। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সৃষ্টি অব্দি সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে অপরাধমূলক, কলংকজনক, দুর্নীতিগ্রস্ত, বেপরোয়া, অনৈতিক, অস্বচ্ছ এবং জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল অযাচিত রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। এরা এটার নাম কখনো কখনো “কুইক রেন্টাল”ও বলে।

এ কথা নির্র্দ্ধিধায় বলা যায় যে, বিদ্যুৎ খাতে এ ধরনের ব্যতয়গুলো ইচ্ছে করে ঘটানো হচ্ছে এবং হয়েছে। কারণ নীতির বাইরে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এ ধরনের জটিল কারিগরী খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে অনিয়মের সম্ভাবনা থাকে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ খাতে সংকট জিইয়ে রেখে দীর্ঘ কয়েক বছর এখাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। ইতিহাস ঘাটলে এবং বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশ করলে এটা দেখা যাবে যে, একটি রাষ্ট্রের আপৎকালীন সময়েই মাত্র রেন্টাল/কুইক রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশন বসানো হয়ে থাকে, যা অদ্যাবধি ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান ও ফিলিপিন্স ছাড়া আর কোথাও বসাতে দেখা যায় নি।

আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই এদেশে য্দ্বুাবস্থা বিরাজ না করা এবং কোন শক্তি এদেশে আক্রমন না করা স্বত্ত্বেও, গণবিরোধী ও রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। ফিলিপাইনস্ ১৯৯০ সালে এক ভয়াবহ নিয়ন্ত্রনহীন বিদ্যুৎ সংকটের সময় এবং যুদ্ধকালীন সময়ে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র যে বিশেষ অবস্থায় বসানো হয়েছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যাদেশ দেবার সর্বাধিক ১/২ মাসের মধ্যে ঐগুলি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যাদেশ দেবার ৪ বছর পার হলেও এখনো কার্য্যাদেশ প্রাপ্ত অনেক ঠিকাদার বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পারেনি।

এক্ষেত্রে এক অসম্ভব রকমের ব্যতয় ঘটানো হয়েছে। কার্যাদেশ দেবার ন্যূনতম ১৮ এবং সর্বাধিক ৪৮ মাসেও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি। অথচ সাধারন নিয়মে টেন্ডার করে ১০০ মেঃ ওয়াট একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মান করতে সর্বাধিক ২০/২৪ মাস সময় লাগে। তাহলে এক্ষেত্রে এধরনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে রেন্টাল নামে অভিহিত করার একটি যুক্তিই ভেসে উঠে,আর তাহলো অবৈধভাবে ট্যারিফ ৩/৪গুণ বাড়িয়ে দিয়েজনগনের রক্ত চুষে অবৈধ ব্যবসার জন্য।

আরো একটি লক্ষ্য করার বিষয় বাংলাদেশে অধিকাংশ রেন্টাল দলীয় লোক/সমর্থকদের দেয়া হয়েছে। যাদের কারোরই আইন অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত প্যাকেজ নির্মিত রেডিমেইড কোন রেন্টালতো ছিলই না, অধিকাংশের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কথা বাদ দিলাম, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিষয়েও অভিজ্ঞতা নেই। তাহলে দীর্ঘদিন আমরা যে বলে আসছিলাম যে, অবৈধ মুনাফা লুন্ঠনের জন বিদ্যুৎ খাতের সংকটগুলোকে ইচ্ছে করে জিইয়ে রাখা হচ্ছে, তা কি সত্যে পরিণত হয় নি?

রেন্টাল সিস্টেমে টেন্ডার পরিহার করা হয় ফলে একেবারেই নিম্নমানের কাজ হয়।

যেহেতু পুরোনো উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয়সেগুলি অদ্যবধি বিধায় দক্ষ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় সমপরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১২৫% থেকে ১৫০% গুন বেশী জ্বালানী ব্যবহৃত হয়। তাতে জ্বালানী বাবদ সরকারের তথা জনগনের বিপুল অর্থের অপচয় হয়, বিদ্যুতের অহেতুক দর বাড়ে, দূষণ বৃদ্ধি পায়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানী সরকার কর্তৃক সাবসিডি রেটে সরবরাহ করা হয় বলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারীরা প্রচুর অপচয় করছে এবং জ্বালানীর হিসেব গড়মিল করে বাজারে বিক্রি করার সুযোগ নিচ্ছে।

পুরনো উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয় বলে উৎপাদন কেন্দ্রের নির্ভরশীলতা অত্যন্ত কম। ইতোমধ্যেই আমরা দেখলাম স্থাপিত রেন্টালের ৩০০০ মেঃ ওয়াট এর মধ্যে বর্তমানে সর্বাধিক ১০০০/১২০০ মেঃ ওয়াট চালু আছে।

রেন্টাল এবং তথাকথিত কুইক রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশন স্থাপন করে ”আপৎকালীন ” বিপদ থেকে উদ্ধারের নামে দ্বায়মুক্তি বিল এনে অবৈধভাবে উচ্চদর নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা যদি সমস্ত তথ্য নিয়ে স্থাপিত রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ট্যারিফ নির্ধারন করি তাহলে দেখবো যে, ডিজেল ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের,পুরান বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়ায় ০৮.০০ টাকা, যেখানে ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪.৮০টাকা। এবং ফার্নেস ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের, পুরান বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়ায় ০৬.৬০ টাকা,যেখানে ট্যারিফ ধার্য্য করা হয়েছে ৮.৮০টাকা অর্থ্যাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি প্রতারণা করা হচ্ছে (১৪.৮০.০০) .৮০ আর ফানের্সের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতারণা করা হচ্ছে (.৮০.৬০).২০। হিসেব করে দেখা গেছে যে, যদি রেন্টাল হিসেবে স্থাপিত সর্ব্বমোট ৩০০০ হাজার মেগাওয়াটের ক্ষমতার মধ্যে মাত্র যদি ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, তাহলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়ায় বার্ষিক ৮,০০০হাজার কোটি টাকা। আর যদি স্থাপিত ৩০০০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার মধ্যে সিষ্টেমে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাহলে ভর্তুকির পরিমান দাঁড়ায় বার্ষিক ১৬,০০০ কোটি টাকা । যার জন্যেই কমিশনের লোভে একটার পর একটা কার্য্যাদেশ দেয়ার পরও শুধু ভর্তুকির ভয়ে সরকার ৩০০০ হাজার মেগাওয়াটের রেন্টাল বসাবার পরও মাত্র ১০০০ মেগাওয়াটই চালু রাখে। ২০০০ মেগাওয়াট চালু না রাখলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী রেন্টাল ওয়ালাদের বসিয়ে বসিয়ে অহেতুক ভাড়ার পয়সা দিতে হচ্ছে।

দেশপ্রমিক ও নিষ্ঠাবান অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের হিসেব ও পরামর্শ অনুযায়ী নিম্নেবর্ণিত উপায়ে খুব অল্প সময় ও ব্যয়ে বর্তমানের ২৫০০ ঘাটতি নিবারণ করে বরং আরও কিছু বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

পুরোনো অদক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে নবায়ন করে ১০০০ মেঃওঃ, কোজেনারেশনের মাধ্যমে ৫০০ মেঃওঃ, নবায়নযোগ্য জ্বালানীর মাধ্যমে ১৫০০ মেঃওঃ অর্থাৎ ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতো। ৩০০০ মেঃওয়ার্ট ও লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৫০০ মেঃওঃ সাশ্রয় অর্থাৎ প্রায় ৩৫০০ মেঃওঃ হয় সাশ্রয় কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধি করে সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের ১২ মাসের মধ্যে সিষ্টেমের নির্ভরশীলতা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি করা যেতো। আর এ কাজে সর্বমোট ব্যয় হতো সর্বাধিক ৩০০০ থেকে ৪০০০ হাজার কোটি টাকা যা রেন্টাল খাতের বার্ষিক ভর্তুকিতে প্রদত্ত ২৮,০০০ কোটি টাকার মাত্র ১৪ %

জ্বালানী ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ার সাথে সাথে সমস্ত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জ্বালানী ও বিদ্যুৎ অপরিহার্য্য বিধায় কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক শিরা উপশিরায় এ বিদ্যুতের ধাক্কা আঘাত করবেই। বিদ্যুতের মূল্যের পরিবর্তন রাষ্ট্রের শিরা উপশিরায় অবারিতভাবে প্রবাহিত হয়ে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া করবেই। আমরা হিসেব করে দেখেছি, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ একটি সুস্থ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশে ১০০ টাকার পুতুল ১৫% জ্বালানী ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে সর্বাধিক বিক্রি মূল্য ১৪৫ টাকায় পৌছাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারণে, এ সীমানা স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক অনেকগুন বেশী বৃদ্ধি পেয়ে, ন্যূনতম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঠেকবে।।