Home » শিল্প-সংস্কৃতি » গল্পকারের গল্প – জঁ ক্লোদ কাগিয়ে

গল্পকারের গল্প – জঁ ক্লোদ কাগিয়ে

ফ্লোরা সরকার

film 111ছায়াছবি নির্মাণের শুরুতে প্রথম যে কাজটি করা হয় তা হলো একটি ভালো চিত্রনাট্য বাছাই করা। একটি ছবি তা যত চমৎকার হোক তার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে চিত্রনাট্যের ওপর। চিত্রনাট্য দাঁড়িয়ে থাকে গল্পের ওপর। দৃশ্যের পর দৃশ্য বা শটের পর শট গেঁথে তা যত নিপুণভাবে উপস্থাপন করা হোক না কেন তার গল্প যদি দর্শকহৃদয়কে স্পর্শ করতে না পারে তাহলে যে কোন ছবি ব্যর্থ হতে বাধ্য। সেই চিত্রনাট্য লেখার ক্ষেত্রে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের কথা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। কেননা সিনেমা যেহেতু দেখা এবং শোনার মাধ্যম ফলে ছবি দেখার সময় প্রথমত এবং প্রধানত তারকা এবং মাঝে মাঝে নির্মাতাদের দিকে আমাদের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হয় বা থাকে। ছবির লিখিত রূপটা থাকে দৃষ্টির অন্তরালে। তাই আমরা আজ সেই গল্পকারদের গল্প উপস্থাপন করবো। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ছবির ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকের মাঝে দুজন চিত্রনাট্যকারের পরিচিতি এবং সেই সঙ্গে দুজনের দুটো সাক্ষাৎকার অনুবাদ করে পেশ করা হবে ক্রমান্বয়ে। প্রথম জন জঁ ক্লোদ কাগিয়ে (১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১-)এবং দ্বিতীয়জন সুশো সেশি দামিকো (২১ জুলাই, ১৯১৪ ৩১ জুলাই,২০১০)। প্রথম জন ফ্রান্স এবং দ্বিতীয় জন ইতালির। দুজনেই পৃথিবী বিখ্যাত পরিচালকদের ছবির চিত্রনাট্য লেখার জন্যে আজও স্মরণযোগ্য।

জঁ ক্লোদ কাগিয়ের সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে ১৯৯৯ এর ২৬ অক্টোবর, সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাইকেল কলভিলএন্ডারসান। কাগিয়ে তার লেখক জীবন উপন্যাস দিয়ে শুরু করলেও প্রায় পঁচাত্তরটির মতো ছবির চিত্রনাট্য বা স্কিপ্ট লিখেছেন। যার মধ্যে ‘দ্যা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিং’, ‘দ্যাট অবসকিওর অবজেক্ট অফ ডিজায়ার’ এবং ‘দ্যা টিন ড্রাম’ তার অন্যতম বিখ্যাত ছবি। মূলত তার কাজের বেশির ভাগ সময় ফ্রান্সের অন্যতম বিখ্যাত পরিচালক লুই বুনুয়েলের সঙ্গেই কেটেছে, সাক্ষাৎকারের অনেকাংশ জুড়ে তাই বুনুয়েলকে পাওয়া যাবে। এবার সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণটি দেখা যাক।

এন্ডারসান: ছবিতে কিভাবে এলেন সেই সম্পর্কে যদি কিছু বলেন….

কাগিয়ে: লেখার কাজটি শুরু হয়েছিল উপন্যাস লেখার মধ্যে দিয়ে। প্রথম উপন্যাসটি যখন লিখি তখন আমার বয়স ২৩ বছর এবং আমার পাবলিসারের সঙ্গে ফরাসি চিত্রপরিচালক জাঁক তাতির সঙ্গে এই মর্মে একটি চুক্তি হয়েছিল তার ছবির জন্যে সেই উপন্যাসটি লিখিত হবে। তবে বেশকয়েকজন একত্রে লিখেছিলাম। একেকজন একেকটা অধ্যায় হয়তো লিখেছি অনেকটা ট্রায়ালের মতো এবং এভাবেই শুরু হলো লেখার কাজটা। দেখা গেলো তাতি আমার অধ্যায়টা বেশ পছন্দ করেছেন। সেই সময়ে তাতি খুব বিখ্যাত পরিচালক ছিলেন। একই সময়ে আরও দুটি ছোট গল্প লিখেছিলাম।

যদিও আমার চুক্তি ছিল তাতির সঙ্গে কিন্তু সেই সময়ে আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তাদের মধ্যে একজন হলেন পিয়েখ এতিয়ে, যিনি তাতির সহকারি পরিচালক ছিলেন। তখন বেশ কিছু স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবির জন্যে গল্প লিখি। কিছুদিন পরে আমাকে আলজিরিয়ার যুদ্ধের জন্যে যুদ্ধে যোগদান করতে হয় এবং ১৯৬১ তে যখন যুদ্ধ থেকে ফিরে অসি তখন আমার বয়স প্রায় তিরিশের কোঠায়। একজন সিনেমা প্রডিউসারের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যিনি স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করতে চান। তার সঙ্গে একত্রে বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির গল্প লিখি এবং পরিচালনা করি। কাজেই বলা যায় কাজের শুরুটা হয়েছিল সহকারি লেখক এবং সহকারি পরিচালক হিসেবে।

হ্যাপি অ্যানিভারসেরি’ নামে যে ছোট গল্পটা লিখি সেটা সেই সময়ে অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পায়। তখন পর্যন্ত অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। যখন প্রডিউসার আমাকে জানালো যে ছবিটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে আমি তাকে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম “অসকার বিষয়টি কি?” (উল্লেখ্য ছবিটি শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলঅনুবাদক)। তখন তিনি আমাকে ফিচার ফিল্ম লেখার এবং পরিচালনা করার সুযোগ করে দিলেন। এরপর ‘দ্যা সুটার’ ছবিটি যখন পিয়েখ এতিয়ের সঙ্গে যৌথ ভাবে লেখা ও পরিচালনা করলাম সেটিও ফ্রান্সে প্রিক্স দ্য লুক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যৌথ পরিচালনা নয়, একক ভাবে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখবো কেননা লেখার কাজ করলে পাশাপাশি বই, থিয়েটারের জন্যে নাটক লেখা ইত্যাদি কাজও আমি করতে পারি। ছবি পরিচালনার মতো কোন পূর্ণ দায়িত্ব নিতে চাইনি। কারণ একবার যদি আপনি ছবি পরিচালনার ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে ফেলেন আপনি অন্য কোন কাজ করতে পারবেন না। এক ধরণের সোনার বাক্সে বন্দী হয়ে পড়বেন। সবার না হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে যায়।

এন্ডারসান: কিন্তু আপনি যখন ছবির চিত্রনাট্যকার হলেন তখন আপনি শুধুই একজন চিত্রনাট্যকার এমনকি আপনি যদি পরিচালকের সঙ্গে সহযোগি হয়ে কাজটা করেন তখনও চিত্রনাট্যের পাশাপাশি আপনি আপনার বই প্রকাশ করতে পারবেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং চিত্রনাট্যকার হওয়া যায়। যা আমি গত চব্বিশ বছর ধরে করে আসছি।

কাগিয়ে: আমার কর্মজীবনের শুরুতে এভাবে আমি দুটো রাস্তার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি কেন চিত্রনির্মাতা নই এই প্রশ্নটি যখন কেউ করে তখন আমি তাদের এই উত্তরটি দেই। পাশাপাশি এটাও বিশ্বাস করি নির্মাতার চেয়ে লেখক হিসেবে আমার সহজাত গুন তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি যদিও এর অর্থ এই নয় যে লেখক হিসেবে আমি খুব প্রতিভবান। একজন নির্মাতাকে সব সময় যে ছবিটি তিনি নির্মাণ করবেন সেটা নিয়ে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্ত্তে একটা বোধ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে হয়। এমনকি দুই,তিন, চার বছর ধরে, যা নির্মাণ করতে চাচ্ছেন তা নিয়ে আবিষ্ট হয়ে থাকতে হয়।

আমি ঠিক তেমন নই। আমি সুবিন্যস্ত ভাবে কাজ করতে পছন্দ করি। মাঝে মাঝে এক কাজ থেকে অন্য কাজে আমাকে যেতে হয় বা একই সময়ে একই সঙ্গে দুটো ভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। এবং একজন চিত্রপরিচালকের জন্যে এটা ভালো নয়। এই বিষয়টি শুরুতে আমার জানা ছিল না। আপনার বয়স যখন পঁচিশ বা তিরিশ আপনার পক্ষে বলা সম্ভব না যে আপনি জীবনে কি করতে চাচ্ছেন। আটষট্টির কোঠায় এসে আপনি তা বলতে পারেন। এবং এখন আমি মনে করি সেই সময়ে আমার জীবনের সেই সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল।

এন্ডারসান: এটা বেশ কৌতুহলদ্দীপক যে চলচ্চিত্রে আপনার আগমন সাহিত্যের প্রেক্ষাপট থেকে ঘটেছিল। তারপর আপনি কোথায় গেলেন?

কাগিয়ে: দ্যা সুটার ছবির পর পরই লুই বুনুয়েলের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে, সময়টা ছিল ১৯৬৩ সাল। উনি তখন একজন ফরাসি সহকারিচিত্রনাট্যকার খুঁজছিলেন তার পরবর্তী ছবির জন্যে। ছবির নাম ‘ডায়রি অফ এ চেম্বারমেড’, যা একটি ফরাসি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হবে। তিন চারজন তরুণ লেখকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি আমাকে বেছে নেন ঠিক যেভাবে জাঁক তাতি আমাকে বেছে নিয়েছিলেন।

বুনুয়েলের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় উপন্যাসটি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় এবং তখনই তিনি আমাকে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারপর পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত নির্মাতা বুনুয়েলের সঙ্গে কাজ করার জন্যে স্পেনে চলে গেলাম, যাকে আমি আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। প্রথম সাক্ষাতেই তার প্রতি খুব মুগ্ধ হয়ে পড়ি, যা পরবর্তী বিশ বছর একত্রে কাজ করা পর্যন্ত সেই মুগ্ধতা বজায় ছিল। আমরা একসঙ্গে প্রায় নয়টি ছবির পান্ডুলিপি লিখেছি, এমনকি একটি বই ‘মাই লাস্ট ব্রেথ’ বা ‘মাই লাস্ট সাই’ (উল্লেখ্য এটা লুই বুনুয়েলের একটি জীবনচরিত: অনুবাদক) দুজনে লিখেছি।

আমি আরও অনেক চিত্রনির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছি কিন্তু প্রধানত পিয়েখ এতিয়ে এবং বুনুয়েলের সঙ্গেই বেশিরভাগ কাজ করা হয়েছে। বিশেষত বুনুয়েলের সঙ্গে আমার বিশ্বাসের জায়গাটা ছিল খুব দৃঢ়। তাকে প্রত্যাখ্যান করার কোন কারণ আমি খুঁজে পেতাম না, তিনি নিজে থেকেই বার বার আসতেন আর আমরা কাজ করে যেতাম।

এন্ডারসান: আপনার সঙ্গে বুনুয়েলের যৌথভাবে কাজের অনেক কথা আমরা জানি। তাই বুঝতে পারছি সহযোগিরূপে কাজ করার ফলে বুনুয়েল আপনাকে কি দিয়েছে, কিন্তু বুনুয়েলকে আপনি কতটুকু দিতে পেরেছেন?

কাগিয়ে: সঠিক বলতে পারবো না, তবে এটা ঠিক যে প্রডিউসার সার্গে সিলবারম্যান এবং আমি ছাড়া বুনুয়েলের পক্ষে তার পঁয়ষট্টি বছরের পর এত ছবি নির্মাণ করা সম্ভব হতো না। আমরা দুজন ক্রমাগত তাকে কাজের উৎসাহ দিয়ে যেতাম। সেই উৎসাহের কারণে কাজের মান বাড়লো না কমলো সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতাম না। কিন্তু বুনুয়েল আর আমি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলাম। এমনও হয়েছে আমরা দুজন নিঃসঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মেক্সিকো অথবা স্পেনের কোন শহরের কোন প্রত্যন্ত এলাকায়, ফরাসি বা স্প্যানিশে কথা বলে যাচ্ছি, কোন বন্ধু নেই, কোন নারী নেই, কারোর স্ত্রী সঙ্গে নেই। একদম সঙ্গীহীন দুজন মানুষ। একসঙ্গে খাচ্ছি, পান করছি, কাজ করছি এবং একসঙ্গে ডুবে আছি যে ছবি নির্মিত হতে যাচ্ছে সেই স্ক্রিপ্টের গভীর অতলে। আমি একবার হিসেব করেছিলাম আমরা প্রায় দুই হাজারবার একসঙ্গে খেয়েছি। যা কোন দম্পতি একসঙ্গে তাদের জীবদ্দশায় খেয়েছে কিনা সন্দেহ।

কাজেই বুঝতে পারছেন কতটা কাছাকাছি ছিলাম আমরা, ফলে কেউ বলতে পারবো না কোন্ আইডিয়াটা কার ছিল। এর মধ্যে দুই একটার উল্লেখ আমি করতে পারি। প্রথম যখন ওনার সঙ্গে কাজ করতে গেলাম তা এতটাই রোমাঞ্চকর, আনন্দদায়ক আর উচ্ছলিত ছিল আমার কাছে যে বুনুয়েল যেকোন আইডিয়া দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রহণে উন্মুখ হয়ে যেতাম। নিজের কোন মত বা আইডিয়া তার ওপর চাপিয়ে দিতে একেবারে ইচ্ছে করতো না। কয়েক সপ্তাহ পর একদিন সার্গে সিলবারম্যান প্যারিস থেকে মাদ্রিদে এলেন যেখানে আমরা কাজ করছিলাম। আমাকে ডিনারের নিমন্ত্রণ করলেন বুনুয়েলকে ছাড়া, যা ছিল খুব ব্যতিক্রম। কেননা আমরা তিনজন সব সময় একসঙ্গে খেতাম। যাক, সেই দীর্ঘ ডিনারের পর ফরাসি রাজনীতি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলার পর তিনি বললেন “লুই তোমাকে নিয়ে খুব খুশি। তুমি প্রচুর পরিশ্রম করো এবং দীর্ঘ সময় কাজ করো। কিন্তু ..একটা কথা, তুমি মাঝে মাঝে তাকে ‘না’ বলতে শিখবে”।

পরে আমি আবিষ্কার করেছি বুনুয়েলই সার্গেকে প্যারিস থেকে ডেকে আনিয়েছিলেন কথাটি বলার জন্যে। অর্থাৎ আমি যেন বুনুয়েলকে সময়ে সময়ে প্রত্যাখ্যান করি। যদি তা না করি তাহলে আমার কৃতিত্ব থাকবে শুধু ৫০% ভাগ। এই ধরণের সহযোগিতার ক্ষেত্রে যখন দুজন মানুষ একত্রে একই বিষয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করে সেইক্ষেত্রে কেউ কারোর দাস হয়ে কাজ করতে পারেনা, যদিও বুনুয়েলের খ্যাতি, বয়স এবং ক্ষমতা আমার থেকে অনেক ওপরে অবস্থান করছিল। বুনুয়েলের বক্তব্য ছিল একই অবস্থানে থেকে দুজনের কাজ করা। যা কিনা কিছুটা জটিলও ছিল বটে।

তখন থেকে সময়ে সময়ে আমি তাকে ‘না’ বলতাম। বলতাম “দেখো লুই, তোমার এই আইডিয়াটা আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না”। মাঝে মাঝে বুনুয়েল বিব্রত হতেন বটে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুশি হতেন। পরের ছবি ‘বেল দু জুগ’ বা ‘বিউটি অফ দ্যা ডে’ লেখার সময়ে আমরা বোধের একটা চুড়ান্ত সহযোগের জায়গায় চলে গিয়েছিলাম।

বুনুয়েলের সঙ্গে আরেক ধরণের সহযোগের জায়গা ছিল। তার ভেতর এক ধরণের সুরিয়েল বা পরাবাস্তবতার প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। যা আমার ভেতরেও ছিল। আমরা কখনোই যৌক্তিক ছিলাম না। ‘অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ’ যেটা বুনুয়েলের প্রথম ছবি সালভাদোর দালির সঙ্গে সেখানেও তারা এই নিয়ম পালন করেছিল। নিয়মটা ছিল এরকম যে যখন একজন আরেকজনকে কোন ভাব বা আইডিয়া দিতাম,তখন মাত্র দুই বা তিন সেকেন্ড সময় থাকতো সেটা সম্পর্কে কোন মতামত দেবার জন্যে, হয় হ্যা নয় না। কোন মধ্যবর্তী অবস্থান ছিল না। অচেতন মন থেকে তাৎক্ষণিক ভাবে যা আসতো বুনুয়েল সেটা গ্রহণে উৎসাহী ছিলেন।

তবে এভাবে কাজ করাটা কিন্তু খুব সহজ ছিল না। কেননা আপনি যখন কোন কিছু উপস্থাপন করছেন তখন আপনাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে কেন আপনি সেটা করতে চাইছেন। এভাবে কাজ করার জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রমের সদাসতর্ক একটি মনের প্রয়োজন পড়ে, যেখানে সৃষ্টিশীল এবং নতুন কিছু ব্যক্ত করার প্রতিভা বিদ্যমান থাকবে। ধাপে ধাপে আপনি আবিষ্কার করবেন, বুনুয়েলের ভাষায় বলা যায় মানুষের কল্পনাশক্তি অনেকটা পেশিশক্তির মতো অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির মতো অনুশীলিত এবং ক্রমবর্ধিত। বুনুয়েলের কাছ থেকে যদি কিছু শিখে থাকি তাহলে বলবো এটাই শিখেছি।

তাতি এবং এতিয়ের কাছ থেকে শিখেছি পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার নিপুণ পর্যবেক্ষণ। মানুষের প্রতি সদা জাগ্রত একটি দৃষ্টি রাখা এবং তাদের কথার বোধগম্যতা করা, যা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। প্রায় প্রতিদিন আমি যেখানে যেতাম মেট্রোতে, ক্যাফেতে, বারে সর্বত্র আমি মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম এবং নোট করে রাখতাম যা আমাকে পুষ্টি যোগাতো। অবশ্যই সে ধরণের অনুশীলনে বাস্তবতার উন্নতকরণ, পরিবর্তনকরণ এবং বর্ধিতকরণ ঘটতো। তাতি এবং এতিয়ের সঙ্গে প্রায় ৬০% ভাগ কাজ হতো এসব পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে। কি চরিত্র নির্মাণে, কি গল্প নির্মাণে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নিরন্তর চেষ্টা চলতো।

বুনুয়েলও খুব ভালো পর্যবেক্ষক কিন্তু তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কল্পনাশক্তিকে কি করে কাজে লাগাতে হয়। নিজের ভেতর খুব গভীরে কিভাবে ডুবে যেতে হয়। যে কোন পরিস্থিতিতে, যতদূর যাওয়া সম্ভব। তার মূল চাবিকাঠি ছিল নিবিড় পরীক্ষানিরীক্ষা। সব ধরণের সম্ভাবনার উন্মোচন ঘটানো।।

(চলবে)