Home » প্রচ্ছদ কথা » চিন্তা নিষিদ্ধ, কণ্ঠ নিষিদ্ধ, রাজপথ নিষিদ্ধ….

চিন্তা নিষিদ্ধ, কণ্ঠ নিষিদ্ধ, রাজপথ নিষিদ্ধ….

আমীর খসরু

police fireরাজনৈতিক সমঝোতায় সরকারের অনীহার কারণে দেশে যখন সংঘাতসহিংসতার পরিস্থিতি চরমে, জনমনে অনিশ্চয়তা আর শঙ্কার মাত্রা যখন সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে, তখন দেশের সর্বস্তরের মানুষ তো অবশ্যই, দেশবিদেশের নানা পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রীক বিরোধ নিষ্পত্তি হলে সঙ্কটের সমাধান হবে। সবাই বলছেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে, তা নিষ্পত্তি করা গেলে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে যে সব উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করছে, তা দূরীভূত হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচন তার সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি এও বলেছেন, কোনো ফর্মূলায় গণতন্ত্র সুসংহত হবে না, এতে জটিলতা বাড়বে। এ কোনো নতুন কথা নয়, পুরনো অবস্থানে যে তিনি দৃঢ় রয়েছেন এটা তারই প্রতিফলন মাত্র। গভীর সঙ্কটে যখন দেশ, তখন আশা করা হয়েছিল যে, নির্বাচন একেবারেই সামনে চলে আসায় প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান হয়তো কিছুটা নমনীয় হবে। কিন্তু নমনীয়তার বদলে আগের চেয়েও কঠিন ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি এবং তার সরকার। এতে সামগ্রিক পরিস্থিতি যে আরো ঘোলাটে হয়েছে এবং দিন দিন হচ্ছে তা সবাই বুঝতে পারছেন। বুঝতে পারছেন সঙ্কট কতোটা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্যদিয়ে এই সঙ্কটের সূচনা, সে কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। যদিও সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথমদিন থেকেই বিরোধী মত এবং পথ নিশ্চিহৃ করার জন্য যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়টি যখন সরকারের দিক থেকে উত্থাপিত হয়েছিল এবং সরকার এ ব্যাপারে যখন চূড়ান্ত উদ্যোগ নেয়, এর পুরোটা সময় জুড়েই আওয়ামী লীগ বাদে অন্যরা সবাই এক বাক্যে বলেছিলেন, এতে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। এখন তাই হয়েছে। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এই আওয়ামী লীগই জামায়াতসহ অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছিল এই বলে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এ দেশে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হতে পারে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বহুবার অতীত নির্বাচনগুলো ফলাফল নিয়ে ভোট ডাকাতি, সুক্ষ্ম কারচুপিসহ নানা অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী এখন বলছেন, তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাহলে পরিস্থিতির কি এমন উন্নয়ন হয়েছে যে, সরকারের অধীনে এবং জাতীয় সংসদ কার্যকরি থাকাকালীন সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, ওই নির্বাচনটি অবাধ এবং সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তার সরকারের সময় নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। কটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সরকারের অধীনে? কতোটিতেই বা বিরোধী দল অংশগ্রহণ করেছে? দু’একটি উপনির্বাচন আর স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান এক কথা হলো?

প্রধানমন্ত্রী এখন কথায় কথায় বলে থাকেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেভাবেই এদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃটেনভারতসহ ওই সব দেশে কি নির্বাচনকালীন বা নির্বাচনের আগে থেকেই প্রশাসনসহ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে দলীয়করণ করা হয়? সে দেশের সরকার কি আগে থেকেই আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার নকশা মাথায় নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে? সে সব দেশে কি দলীয় ক্যাডাররা প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ায়? সে সব দেশে কি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হয়? সে সব দেশে কি নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে দমনের জন্য নিত্যনতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়? সে সব দেশে কি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে এবং ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার মানসে বিরোধী মতপথ নিশ্চিহৃ করার জন্য বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা হয়? সে সব দেশে কি নির্বাচনকে সাইড লাইন ইস্যু হিসেবে রাখার জন্য নিত্যনতুন কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়? সব প্রশ্নের জবাবই হবে না। এসব নাএর মধ্যে তাহলে কিভাবে সরকারের অধীনে একটি অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া সম্ভব? এই সরকার কি নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য? এর জবাবও না।

পাকিস্তানের অতীত নির্বাচনগুলো কোনো না কোনোভাবে বিতর্কিত হয়েছে। গণতন্ত্র না থাকলেও সেখানে নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি মাঝে মাঝে সচল হয়। এমন একটি দেশে এবারে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। সে দেশের আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। পাকিস্তান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাণপন চেষ্টা করলেও,এ দেশটি চলে যেতে চায় পাকিস্তানের অতীত পরিস্থিতিতে।

আর মাত্র কয়েক মাস পরেই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। স্বাভাবিক সময় হলে দেশে এখন নির্বাচনী উত্তাপউত্তেজনা বিদ্যমান থাকার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি। প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বের মধ্যে এর প্রধান খালেদা জিয়া ছাড়া প্রায় সব নেতাই জেলে। সংবাদ সম্মেলন করার মতো নেতাও এখন আর বাইরে নেই। নানা মামলায় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ প্রায় একশ নেতা এখন জেলে। তাদের জামিন আবেদন করা হলেও জামিন দেয়া হয়নি। অথচ আইনজ্ঞরা বলছেন, ঢালাওভাবে এই পদ্ধতিতে জামিন না দেয়া আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন। তারা বলছেন, আইনেও ওই সব মামলা জামিনযোগ্য। আর অনেক নেতা আগে থেকেই জামিনে ছিলেন। কিন্তু তাদের জামিন দেয়া হলো না বরং অন্যসব নেতাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর আগে এক সঙ্গে গ্রেফতার এবং জেলে পাঠানো হয় ১৫২ জন নেতাকর্মীকে। সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থায় যাওয়ার বদলে সংবাদপত্রের প্রকাশনাও বন্ধ করা হয়েছে নানা কৌশলে। এমন এক দুঃসহ পরিস্থিতি বিদ্যমান রেখেও প্রধানমন্ত্রী কি করে বলবেন যে, দেশে নির্বাচনের পরিস্থিতি তারা বজায় রেখেছেন? কিভাবে তারা বলবেন, নির্বাচনের পূর্ব শর্ত হিসেবে সবার জন্য সমান সুযোগ অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সকলের জন্য সমান্তরাল অবস্থা রয়েছে? সমান সুযোগের বদলে উল্টো এখন এমন এক দুঃসহ এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে মনে হয় দেশে শুধুই আওয়ামী লীগ আর তার নেতৃত্বাধীন জোট রয়েছে মাত্র। দেশে আর কোনো দল নেই, মত নেই, ভিন্ন মত প্রকাশের কোনো পথ খোলা নেই।

একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল সচল, সজীব এবং সক্রিয় না থাকলে সে ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। এই ভারসাম্যহীনতা যেকোনো সঙ্কটের জন্ম দিতে পারে। এই সঙ্কট দেশ, জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে সীমাহীন এবং অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে করে ফেলতে পারে পঙ্গু এবং স্থবির। নিশ্চয়ই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অবিলাশে এমন ক্ষতি ক্ষমতাসীনরা করবে না। তবে ইতোমধ্যে যা ক্ষতি হবার তা হয়েই গেছে। দেশে এখন বাকব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। অথচ এই অবস্থা কারোই কাম্য ছিল না।

যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী মতপথ এবং দল থাকে না বা থাকতে দেয়া হয় না, সেখানে একটি নির্বাচন তো দূরের কথা, সব কিছুই বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। কারণ, বিপক্ষের মতপথ এখানে নিষিদ্ধ ও বাতিল হয়ে গেছে। যে রাজনৈতিক পরিবেশে স্বাধীন মতপ্রকাশ, মতের ভিন্নতার সংস্কৃতি নিষিদ্ধ, বিরোধী দল ও পক্ষ যেখানে সহ্য করা হয় না, সে ব্যবস্থা নির্বাচনের উপযোগী তো নয়ই, তা পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী। এমন এক অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় নির্বাচন কেন, কোনো কিছুই নিরাপদ নয়।।