Home » আন্তর্জাতিক » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

ষড়যন্ত্রগৃহযুদ্ধদারিদ্র

ফারুক চৌধুরী

coal power-1তেল যে কতো গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারা যায় বিশ্বের নানা অঞ্চলে ভূরাজনীতির দিকে দৃষ্টি দেয়া হলে। সে অঞ্চল হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকায় গিনি উপসাগর সন্নিহিত দেশগুলোতে বা কাম্পিয়ান সাগর অঞ্চল বা ভেনেজুয়েলা। নানা শক্তি নানা ভাবে ‘খেলা’ করে তেল নিয়ে বা তেলের জন্য। তেল নিয়ে দেখা দেয় নানা সংঘাতরক্তপাত, দেশ বিভাজন ও তেল কেমন ‘জিনিস’ তা বুঝতে পারা যায় যুক্তরাষ্ট্রের এককালের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের একটি উক্তি থেকে। তিনি ১৯৪৪ সালে এ উক্তিটি করেছিলেন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের কাছে। রুজভেল্টের উক্তিটি হচ্ছে: ‘পারস্য উপসাগর অঞ্চলের তেল আপনাদের। ইরাক ও কুয়েতের তেল আমরা ভাগাভাগি করে নিই। আর, সৌদি আরবের তেল আমাদের।’ এ উক্তিটি উদ্ধৃত হয়েছে ডি ইয়েরজিনের দি প্রাইজ: দি এপ্রিক কোয়েস্ট ফর অয়েল, মানি এন্ড পাওয়ার নামের বইতে।

পারস্য উপসাগর অঞ্চলে নানা সরকারকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক মদদ দিয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গের জন্য প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ ধরনের মদদ দেয়া ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ করেছে। এ সব হস্তক্ষেপের মধ্যে ছিল সামরিক আক্রমণ এবং কোনো দেশের সামরিক বাহিনীতে অনুগতদের মাধ্যমে অভ্যুত্থান সংগঠিত করা। এছাড়া ইে অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অনুগত শাসকদের ক্ষমতাসীন রাখা, সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখা ইত্যাদি তো ছিলই।

ফলে এই অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার সম্পর্ক, ক্ষমতার মধ্যকার সমীকরণ তো বটেই, বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে, উন্নয়ন কার্যক্রমে, রাজনৈতিক ঘটনার ধারায়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে।

আবার, তেল থেকে যে অর্থ আয় হয়, তার সিংহ ভাগ জমা হয় এই অঞ্চলের শাসক গোষ্ঠীর হাতে। অপরদিকে, জনগণ রয়ে যান বঞ্চিত। ফলে দেখা দেয় বৈষম্য।

এভোবে, একেকটি দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তেল এই অঞ্চলের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক (শেষোক্ত দুটি রাজনীতিরই অংশ) ক্ষেত্রে, সংঘাতে রক্তপাতে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ, কখনো কখনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। এস কে এবুরিশ এ ব্র“টাল ফ্রেন্ডশিপ: দি ওয়েস্ট এন্ড দি এরাব এলিট (১৯৯৭ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিক) ই আই শোর্স এবং এ মেয়ার্স জের্ফে স্ট্রাটেজিক এনার্জি পলিসি: চ্যালেঞ্জেস ফর দি টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি, (২০০১ সালে প্রকাশিত), রিচার্ড স্কোফিল্ড টেরিটোরিয়াল ফাউন্ডেশন্স অব দি গালফ স্টেটস (১৯৯৪ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত) বইতে এবং এমন আরো বইতে, গবেষণা প্রবন্ধে, সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবনেন্ধ এ ধরনের বিপুল তথ্য রয়েছে।

একদিকে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, অপরদিকে, দারিদ্র্যবৈষম্যবঞ্চনা, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের হাত ধরে আসা সামরিক হস্তক্ষেপষড়যন্ত্রহত্যাখুনঅভ্যুত্থানগৃহযুদ্ধ; এ সব দেখেই এল্যান এইচ গেল্ব ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত অয়েল উইন্ডফলস,: ব্লেসিং অর কার্স? রিচার্ড এম অটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত সামটেনিং ডেভেলপমেন্ট ইন মিন্যারাল ইকোনোমিস: দি রিসোর্স কার্স থিসিস বইতে এ অবস্থাকে বলেছেন, ‘রিসোর্স কার্স’ বা ‘সম্পদ’ অভিশাপ। আবার, টেরিলিন কার্ল ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত দি প্যারাডক্স অব প্লেন্টি: অয়েল বুমস এন্ড পেন্টো স্টেটস বইতে এ অবস্থাকে অভিহিত করেছেন ‘প্যারাডক্স অব প্লেন্টি’ বা ‘প্রাচুর্যের আপাত বৈপরীত্য’ হিসেবে।

আবার পল কলিয়ের এবং এংকে হোয়েফলার ২০০৪ সালে গ্রিড এন্ড গ্রিভ্যান্স ইন সিভিল ওয়্যার শীর্ষক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে। অনুরূপভাবে, মাইকেল এল রস ২০০২ সালে প্রকাশিত ডাজ অয়েল হিন্ডার ডেমোক্র্যাসি? শীর্ষক প্রবন্ধে এবং নাথান জেনসেন ও লিওনার্ড ওয়ান্টচেমন ২০০৪ সালে প্রকাশিত রিসোর্স ওয়েলথ এন্ড পলিটিক্যাল রেজিমস ইন আফ্রিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বিপুল তেল সম্পদের সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা সম্পর্ক রয়েছে।

এসব বক্তব্যের পক্ষেবিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। যেমন কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। কিন্তু দেশ দুটিতে কোনো বিদেশী আগ্রাসন হয়নি। (কেবল দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে জাপান একবার ভয়ংকর আক্রমণ চালায়। তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে নেয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়)। ভারতে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। দেশটির সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়েছে কয়েকবার (১৯৪৮ সালে, ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে। এ যুদ্ধগুলোর কোনোটিই ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করা নিয়ে হয়নি। ভারত ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যে যুদ্ধ শুরু করে, সেটি ছিল সীমান্ত বিরোধ নিয়ে। চীনের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য নয়। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ দেশ চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু তা প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করা নিয়ে হয়নি। আবার, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেছিল দেশটির কয়লা সম্পদ কুক্ষিগত করার জন্য। এছাড়াও দেখা যাবে যে, ইউরোপের অনেনক দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে বিপুল। অথচ সে দেশগুলোতে ইতিহাসের আধুনিক পর্বে গৃহযুদ্ধ হয়নি।

তাই তেল, গ্যাস তথা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই গৃহযুদ্ধআক্রমণবিপদ হবে, এভাবে না দেখে এ সব সম্পদ বিশিষ্ট দেশগুলোতে শাসক গোষ্ঠীর অবস্থা, সামর্থ, পরিপক্কতা, আনুগত্য, শাসক গোষ্ঠীর হাতে থাকা পুঁজির চরিত্র ও গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বৈশিস্ট্য, এসব দেশে জনসাধারণের সংঘবদ্ধতা, রাজনৈতিক সচেতনতা, রাজনৈতিক সক্রিয়তা, এসব দেশে গণতান্ত্রিক অবস্থা ও আন্দোলনের পরিস্থিতি ইত্যাদি দিকগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কারণ, আক্রমণহস্তক্ষেপষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে এসব দিকের ভূমিকা ও প্রভাব রয়েছে। কে কিভাবে দেখবেন, এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। তবে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, তেল গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, তা অনেককে লোভাতুর ও আগ্রাসী করে তোলে।।