Home » আন্তর্জাতিক » পাকিস্তানের নির্বাচন এবং জঙ্গিবাদ

পাকিস্তানের নির্বাচন এবং জঙ্গিবাদ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

pak electionপাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ মে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসা মানে রাজনৈতিক সমাবেশ এবং জনসভার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পরিকল্পনা জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে সম্ভব সব ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। তাদের সমাবেশগুলোতে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগ্রহী থাকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পর থেকে দেশটিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। পরিণতিতে আতঙ্কিত জনসাধারণ সমাবেশগুলোতে যোগ দিতে ভয় পাচ্ছে।

নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা আরো বাড়ে তেহরিকতালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) শান্তি আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর। টিটিপির মুখপাত্র ইহসানুল্লাহ ইহসান জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকার সংলাপ নিয়ে আন্তরিক না হওয়ায় তারা শান্তি আলোচনা স্থগিত করেছে।

তালেবান তিনটি দলকে টার্গেট করেছে। এগুলো হলো পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), করাচিভিত্তিক এমকিউএম ও পখতুন জাতীয়তাবাদী আওয়ামী ন্যাশনাল বা এএনপি। সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের প্রতিও হুমকি দিয়ে রেখেছে তালেবান। ইসলাম ঘেঁষা বা সেক্যুলার নয়, এমন দলগুলো পুরোদমে প্রচারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইমরান খানের তেহরিকইনসাফ পার্টি, নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ বিশাল বিশাল জনসভার আয়োজন করছে।

অবশ্য দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।

অথচ পাকিস্তানের এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো বেসামরিক সরকার তাদের মেয়াদ পূরণ করতে সক্ষম হলো। কোনো বেসামরিক সরকার আরেকটি বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারল। শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে পারলে তা হবে দেশটির ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দেশটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কিন্তু সন্ত্রাসীরা নির্বাচনই হতে দিতে চায় না। এ কারণেই নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, সন্ত্রাসী হামলা তত বাড়ছে। মসজিদ, বিচার বিভাগীয় কমপ্লেক্সসহ সর্বত্র হামলা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে পুলিশ, সেনাবাহিনীর স্থাপনাও সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। জনগণ যাতে নির্বাচনীপ্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে থাকে, সেজন্য ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি তাদের কাম্য।

এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডনএর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছেনির্বাচনী কার্যক্রম থেকে জনগণকে দূরে সরে থাকার ইহসানুল্লাহ ইহসানের হুঁশিয়ারি ভয়ঙ্কর বিষয়। কারণ টিটিপি ইতোমধ্যেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা নির্বাচনকে অনৈসলামিক মনে করে। আর এ কারণেই তারা নির্বাচনী প্রচারণাকালে ‘সেক্যুলার’ রাজনীতিবিদদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। টিটিপির হুমকিই ফাটা (কেন্দ্র শাসিত বিশেষ অঞ্চল) এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও করাচির কিছু কিছু অঞ্চলের ভোটার এবং কোনো কোনো প্রার্থীর ঘরে বসে থাকা বেছে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এর ফলে তালেবানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য দরজা আরো খুলে যাবে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রচারকাজ আরো বাড়াতে পারবে এবং ভোট টানতে পারবে বাধাহীনভাবে। টিটিপিকে তার খুশিমতো ভোটের ছক কষা থেকে বিরত রাখতে হলে ব্যাপকভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করতে হবে।

যদিও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ পূর্তি বিবেচিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা, কিন্তু তবুও এই সময়ে সরকারের অদক্ষতায় সহিংসতা, সন্ত্রাস, দুর্নীতির নজিরবিহীন বৃদ্ধিতে জনগণ অত্যন্ত হতাশ। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী আশরাফ তার শেষ বক্তৃতায় বলেছেন, সরকারের মেয়াদ সম্পূর্ণ করার অর্থ হলো গণতন্ত্রের জয় এবং এতে প্রমাণিত হয়, সরকার গণতন্ত্রকে এতটাই শক্তিশালী করেছে যে, কেউই ভবিষ্যতে এটাকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

ডয়েচেএ ভেলে’র বিশ্লেষক গ্রাহাম লুকাসের মতে, পাকিস্তান এখন সন্ধিক্ষণে রয়েছে। তিনি তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলেছেনপাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা ২০০৮ সালে একনায়ক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের পদত্যাগ করার মতো পরিস্থিতির মতো। বিদায়ী সরকার কোনো ধরনের অভ্যুত্থান ছাড়াই, পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারের ইতিহাসে প্রথম, পাঁচ বছর টিকে থাকতে সক্ষম হলেও ফলাফল হলো হতাশাজনক। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে ব্যাপক আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল, তা মিলিয়ে গেছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করা সত্ত্বেও পাকিস্তান এখনো বিবেচিত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি হিসেবে।

উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় উপজাতীয় এলাকাগুলো, আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তসংলগ্ন বেলুচিস্তান প্রদেশে শিয়া সংখ্যালঘু, সরকারি স্থাপনা, সেনা কর্মকর্তাদের ওপর অব্যাহত হামলায় শত শত জীবন ঝড়ে পড়ছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী তালেবান ও অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

তবে পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফখরুদ্দিন জি ইব্রাহিম মনে করেন না, এসব হুমকির কারণে ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচন বাধাগ্রস্থ হবে। তিনি জানান, গত নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪০ শতাংশ। তার মতে এবারের নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় কাজ করবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, উদ্দীপ্ত মিডিয়া সংস্কৃতি, তরুণ প্রজন্মে আদর্শবাদী তরুণসমাজ এবং শক্তিশালী সুশীল সমাজ। এগুলো ভোটার উপস্থিতি ৬০ শতাংশও করতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

পাকিস্তানের ৮ কোটি ৬১ লাখ ভোটারের মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তারাই ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে বিশ্লেষকদের বিশ্বাস।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)