Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের দুর্বল নিরাপত্তা কৌশলগত সংস্কৃতি

ভারতের দুর্বল নিরাপত্তা কৌশলগত সংস্কৃতি

indian defenceচলতি দশকের শেষ নাগাদ ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে বলে মনে করছে প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট। প্রভাবশালী এই ব্রিটিশ সাময়িকী এক নিবন্ধে জানার চেষ্টা করেছে, এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের কি হবে? এই বিপুল শক্তি ভারত কি কোনো কাজে লাগাতে পারবে? এজন্য কি তারা প্রস্তুত? ভারত কি সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য পানে ছুটে চলেছে? না কি গড্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে? দেশটি কি তার আসল শত্রু চিনতে পেরেছে?

এশিয়ার অনেক দেশের বিপরীতে, এবং প্রতিবেশি পাকিস্তানের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমভাবে, ভারত কখনো তার জেনারেলদের দিয়ে শাসিত হয়নি। ঔপনিবেশিক ব্রিটেনের শক্তিধর সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদগুলোতে থাকা লোকদের বেশির ভাগই ছিলেন হিন্দু, আর সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের অসামঞ্জস্য প্রতিনিধিত্ব ছিল। স্বাধীনতা লাভের সময় ভারতের রাজনৈতিক এলিটরা, যারা ছিলেন কঠোরভাবে শান্তিবাদী, জেনারেলদের সেনাশিবিরেই সীমাবদ্ধ রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এই কাজে তারা ভালোভাবেই সফল হয়েছেন।

তবে এজন্য ভারতকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। এর একটি হলো কৌশলগত সংস্কৃতি নামে অভিহিত ক্ষিপ্রতার অভাবে ভোগা। দেশটি বেশ কয়েকটি সীমিত আকারের যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। একবার চীনের বিরুদ্ধে, যাতে সে পরাজিত হয়েছে এবং কয়েকবার পাকিস্তানের সঙ্গে, যার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিতলেও সেটা সবসময় সহজ ছিল না। সেইসঙ্গে দেশটি জিহাদি সন্ত্রাসবাদ এবং দীর্ঘস্থায়ী মাওবাদী বিদ্রোহসহ নানা ধরনের হুমকি মোকাবিলা করে আসছে। কিন্তু তবুও দেশটির সামরিক শক্তিকে কিভাবে ব্যবহার করা উচিত তা জানার ব্যাপারে ভারতের রাজনৈতিক শ্রেণী সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে কিংবা ভেবেছে।

ভারতের সামরিক শক্তি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। ফ্রান্স থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১২৬টি রাফালে জঙ্গি বিমান কেনার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পথে। চীন ছাড়া এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভারতে সক্রিয় সামরিক সদস্য অনেক বেশি, তার প্রতিরক্ষা বাজেট ৪৬.৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বর্তমানে ভারতের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএইএস জেনের হিসাবমতে, ২০২০ সাল নাগাদ জাপান, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে পেছনে ফেলে সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে ভারত চতুর্থ স্থানে উঠে আসবে। তার কাছে অন্তত ৮০টি পারমাণবিক বোমা আছে এবং দেশটির ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পাকিস্তানের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। সম্প্রতি ৫,০০০ কিলোমিটার (,১০০ মাইল) পাল্লার এমন এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, যা চীনের অধিকাংশ এলাকায় পৌঁছাতে পারে।

কোন পথে?

ভারতের সংবাদমাধ্যম সবসময়ই সরব, নয়া দিল্লির থিঙ্কট্যাংকগুলোও প্রাণবন্ত। কিন্তু তবুও দেশটির নেতারা সামরিক বা কৌশলগত ইস্যুগুলোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখান সামান্যই। আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে সেনা কর্মকর্তা এবং আমলাদের তথ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা হয়ে থাকে, তবে এতে নেতৃত্ব দেন রাজনীতিবিদেরা। কিন্তু ভারতে এ ধরনের কিছুর অস্তিত্ব নেই। সশস্ত্র বাহিনী মনে করে, সামরিক বিষয়াদিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভয়াবহ রকমের অজ্ঞ। এ কারণেই লজিস্টিকস ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কয়েকজন দক্ষ লোকের সরবরাহ করা দরকার বলে মনে করে। জ্যেষ্ঠ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সামরিক বাহিনী ক্ষুব্ধ। আমলারা সেখানে ক্যারিয়ার গড়ার চেয়ে কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে সরে পড়াটাই শ্রেয় মনে করেন। দেশের কৌশলগত রূপকল্প নির্ধারণে পররাষ্ট্র দফতর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হলেও তাদেরও পাত্তা দেওয়া হয় না। ৫০ লাখ লোকের দেশ সিঙ্গাপুরের ফরেন সার্ভিসের আকার ভারতের প্রায় সমান, চীনেরটি আটগুণ বড়।

সামরিক দিক থেকে ভারত প্রধান যেসব সমস্যা মোকাবিলা করছে, তা স্পষ্ট: অস্থিতিশীল, ক্ষয়িষ্ণু তবে বিপজ্জনক পাকিস্তান; দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও ভীতিপ্রদর্শনকারী চীন। একটি অবমাননা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি, অন্যটি হীনম্মন্যতা ও ঈর্ষা জাগায়। আঞ্চলিক মর্যাদা ও ‘পরাশক্তি’ হিসেবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার আলোকে চীনই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবিদার। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে গোলমেলে সম্পর্ক ভারতের সামরিক চিন্তাভাবনায় এখনো প্রাধান্য পেয়ে আসছে।

দুই দেশের মধ্যকার বরফ গলার সাম্প্রতিক প্রয়াসটিতে কিছুটা সাফল্য এসেছে। তবে দুই দেশের মধ্যকার ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ বরাবর উত্তেজনা রয়েই গেছে। কাশ্মীরে সম্মত সীমান্তের অনুপস্থিতির ফলে যেকোনো সময় আগুন জ্বলে উঠতে পারে। পরিস্থিতি আরেকটু জটিল এ কারণে, চীন ও পাকিস্তান ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং পাকিস্তানকে ভারতের জন্য কাঁটা হয়ে ওঠার কাজকে উৎসাহিত করতে পারে চীন। ভারতীয়রা মনে করছে, পাকিস্তান তার জেহাদি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০১ সালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী সন্ত্রাসী গ্র“প জয়সি মোহাম্মদের ভারতের পার্লামেন্টে হামলা দেশ দুটিকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। অপর সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করতৈয়বার ২০০৮ সালের মুম্বাইয়ে কমান্ডো হামলা নিয়ে এখনো বিতর্ক হচ্ছে।

পাকিস্তানের পারমাণবিক সামর্থ্য অব্যাহত দুশ্চিন্তার প্রতিশব্দ। চীনা সহায়তায় প্রস্তুত এর অস্ত্রভাণ্ডার অন্তত ভারতের সমান এবং সম্ভবত এর চেয়েও বড়। প্রধানত চীনা নক্সায় তৈরি এর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভারতের বেশির ভাগ নগরীতে আঘাত হানতে পারে এবং ভারতের মতো এর কোনো ‘প্রথমে ব্যবহার নয়’ নীতি নেই। ভারতের প্রচলিত বাহিনীর ক্রমবর্ধমান শ্রেষ্ঠত্বকে ম্লান করে দিতে পাকিস্তান যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য এমন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে যা যুদ্ধরত সেনানায়কদের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বড় এবং যুদ্ধে জয় ভারতের দিকেই ঝোঁকে। তবে উস্কানি অনুভব করে ভারত যদি আবারো সেটা করে, তবে সেটা হবে উদ্বেগের বিষয়। এক দশক ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মূলত ‘কোল্ড স্টার্ট’ নামে পরিচিত তত্ত্ব অনুযায়ী কাজ করছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হলে বিমান বাহিনীর ব্যাপক সহায়তায় সাজোয়া বাহিনীকে দ্রুত পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। তাদের পরিকল্পনা থাকবে, মাত্র ৭২ ঘণ্টার নোটিশে পাকিস্তান বাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলা এবং দ্রুততার সঙ্গে এত পরিমাণ ভূমি দখল করা যাতে, ভারতীয় এলাকা পারমাণবিক হামলার মুখে না পড়ে। তবে এ ধরনের কৌশল বাস্তবায়নে যে ধরনের উচ্চমানের সমন্বিতসেনা যুদ্ধকৌশলের প্রয়োজন, তা ভারতের নেই। অধিকন্তু কৌশলগত পর্যায়ে ভারত ধরে নিয়েছে, পাকিস্তান তার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে দ্বিধা করবে এবং ভারতীয় কৌশলগত সীমাবদ্ধতা অনুসরণ করে চুপচাপ বসে থাকবে। বেসামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদেরা অস্বস্থিসহকারে কোল্ড স্টার্ট নামের কোনো ডকট্রিন থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন।

সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ নামের থিঙ্ক ট্যাংকের ভরত কারনাড মনে করেন, ভারতের প্রতি পাকিস্তান যে প্রধান হুমকি সৃষ্টি করতে পারে তা তার সামরিক শক্তি নয়, বরং এর ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। তার মতে, কোল্ড স্টার্ট একটি ‘কানা গলি’। এতে যে সামরিক ও অর্থসম্পদের অপচয় হচ্ছে, তা চীনকে নিবৃত্ত করার কাজে ব্যবহার করা উচিত। ২০০৯ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি সশস্ত্র বাহিনীকে বলেছিলেন, তাদের উচিত পাকিস্তানের বদলে চীনকে ভারতের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি বিবেচনা করা এবং সে অনুযায়ী তাদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। কিন্তু তাতে তেমন কোনো কাজ হয়নি। ভারতের যা করণীয় তা করা থেকে বিরত থাকার কারণ হিসেবে কারনাড দেখতে পাচ্ছেন দুর্বল বেসামরিক কৌশলগত নির্দেশনা এবং সেইসঙ্গে সেনাবাহিনীর নিজস্ব সংরক্ষণবাদ।

অরুনাচল প্রদেশে, যাকে চীন দক্ষিণ তিব্বত হিসেবে অভিহিত করে থাকে, চীন ও ভারতের মধ্যকার ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ কাশ্মীরের মতো উত্তপ্ত নয়। সীমান্ত ইস্যু নিরসন নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার আলোচনা ১০ বছর ধরে ১৫ রাউন্ডে গড়িয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে উভয় পক্ষ জোর দিয়ে বলছে, এই বিরোধ অংশীদারিত্বের অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না।

কিন্তু সীমান্তের চীনা রেখায় সামরিক বিনিয়োগের গতি অগ্রাহ্য করা কঠিন। সেন্টার ফর ল্যান্ড ওয়ারফেয়ার স্টাডিজের ব্রিগেডিয়ার গুরমিত কানওয়াল নতুন নতুন রেললাইন, সব আবহাওয়ায় চলাচল উপযোগী ৫৮ হাজার কিলোমিটার সড়ক, পাঁচটি বিমান ঘাঁটি, সরবরাহকেন্দ্র এবং যোগাযোগ চৌকি নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। ভারত নিয়ন্ত্রিত যে অংশটুকু চীন নিজের বলে দাবি করে থাকে, তা যদি চীন দখল করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে ও দ্রুততার সঙ্গেই করতে পারবে। কারনাড মনে করেন, চীনের মোকাবিলায় ‘অসাড় প্রতিক্রিয়া’ ব্যক্ত করতে অভ্যস্ত ভারতীয় বাহিনী প্রবল পাল্টা হামলা হানতে অক্ষম।

স্থলভাগে চীনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় বিকল্প পথ হতে পারত সমুদ্র। এ ধরনের একটি ধারণার অস্তিত্ব পাওয়া যায় ‘ননঅ্যালাইনমেন্ট ২.০’ নামে পরিচিত আধা সরকারি নথিতে। গত বছর কয়েকজন সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা এটা উত্থাপন করেছেন এবং বর্তমান উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন এর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ভারতের কৌশলগত নৌ সুবিধা এতে কাজে লাগতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এর মাধ্যমে মালাক্কা দিয়ে চীনের তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব।

চীন ও ভারত উভয়েই দ্রুততার সঙ্গে তাদের উপকূলীয় নৌ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরো বহু দূরে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত করছে। চলতি দশকের মধ্যেই উভয় দেশই তিনটি অপারেশনাল ক্যারিয়ার গ্র“প পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারতের কোনো কোনো কৌশলবিদ মনে করেন, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য ভারত মহাসাগরে চীন তার আধিপত্য সম্প্রসারিত করায় সামরিক বাহিনীর মতো দুই দেশের নৌবাহিনীও সঙ্ঘাতে মেতে উঠতে পারে।

চীনা নৌবাহিনীর সম্প্রসারণে এত দূর অগ্রসর হয়েছে যে, এর সঙ্গে ভারত পাল্লা দিতে পারে না। ২০২০ সাল নাগাদ চীন ৭৩টি প্রধান রণতরী, ৭৮টি সাবমেরিনের, যেগুলোর ১২টি পারমাণবিক অধিকারী হবে। তবে ভারতের নাবিকেরা অনেক বেশি যোগ্য। তারা ১৯৬০এর দশক থেকেই বিমানবাহী ক্যারিয়ার চালাচ্ছে, চীন সবেমাত্র কাজটি শুরু করেছে। ভারত আশঙ্কা করছে, চীন ‘স্ট্রিং অব পার্ল’ নামে ভারত মহাসাগরে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বন্দরগুলোতে স্থাপনা নির্মাণ করছে। এর প্রেক্ষাপটেই অ্যান্টনি গত ফেব্র“য়ারিতে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের গোদর বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব চীনা কোম্পানির পাওয়াটা ‘উদ্বেগের বিষয়।’ আর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং সর্বোপরি আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নৌ সম্পর্ককে চীন হুমকি বিবেচনা করছে। ভারত এখন অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশি নৌ মহড়া চালাচ্ছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষে আছে অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক ভূপরিস্থিতি এবং কয়েকটি শক্তিধর মিত্র। অবশ্য, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য শাখার চেয়ে এখনো পিছিয়ে আছে। ভারতের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ১৯ শতাংশ পায় নৌবাহিনী। অথচ বিমানবাহিনী পায় ২৫ শতাংশ, সেনাবাহিনী ৫০ শতাংশ।

বিমানবাহিনী মূলধনীসরঞ্জাম বাজেটের সিংহভাগ পায়, যা নৌবাহিনীর চেয়ে পরিমাণে দ্বিগুণ। দেশটি ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফালে জঙ্গি বিমান কিনছে এবং পুরনো বিমানগুলো (মূলত রাশিয়ান) নতুন নতুন অস্ত্র ও রাডার সজ্জিত করে আপগ্রেড করছে। আমেরিকার এফ৩৫এর প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে রাশিয়ার সুখোই ও হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (এইচএএল) যৌথ উদ্যোগে ‘পঞ্চম প্রজন্মের’ জঙ্গি বিমান তৈরি করছে। ভারত তার পাইলটদের গতির প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি তাদের আরো ‘সক্ষম’ করে গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছে। তারা ছয়টি এয়ারবাস এ৩৩০ সামরিক ট্যাংকার ও পাঁচটি নতুন বিমানবাহী আগাম হুঁশিয়ারি ও নিয়ন্ত্রণ বিমান কেনার আলোচনা করছে। ভারী মালামাল পরিবহনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে ১০টি বিশালাকার বোয়িং সি১৭ পরিবহন বিমান কিনেছে। এ ধরনের আরো বিমান ভবিষ্যতে কেনা হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধ হেলিকপ্টারগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করবেএ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কে হেরে অস্পষ্ট অগ্রাধিকারের কারণে বিমানবাহিনী এখন তার আকাশ প্রতিরক্ষার চিরায়ত ভূমিকার বদলে সেনাবাহিনীর চাহিদা পূরণে মনোযোগী হয়েছে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযানের জন্য সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং ভারত মহাসাগরের নোনাজলে চীনকে মোকাবিলা করতে নৌবাহিনীর প্রস্তুতি দেখে সহজেই বোঝা যায়, প্রতিটি বিভাগ অপর দুই বাহিনীর চাহিদা বা প্রয়োজনের কথা চিন্তা না করেই নিজ নিজ যুদ্ধ পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনা, তত্ত্ব এবং অপারেশনে সহযোগিতার কথা মুখে মুখে বলা হলেও এই ‘অসংলগ্নতা’ প্রায় উচ্চাকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছে। বেশির ভাগ দেশে যে ধরনের ডিফেন্স স্টাফ আছে, ভারতে তা নেই। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সদাসন্দেহ থাকার কারণে সরকার দৃশ্যত চায় না যে, একটি পয়েন্ট থেকে সামরিক উপদেশ আসুক। এমনকি বাহিনী প্রধানেরাও নিজ নিজ স্বায়ত্বশাসন সংরক্ষণে সতর্ক যত্নশীল হওয়ায় অন্যান্য দেশের মতো ওই পদটি চায় না।

কৌশলগত সংস্কৃতির অনুপস্থিতি এবং বেসামরিক পরিচালিত মন্ত্রণালয়গুলো এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যকার অবিশ্বাস অন্য আরেকটি পথে সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা ক্ষুণœ করছে: দেশটির ক্রয়ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত অকার্যকর। অসামঞ্জস্যভাবে বিস্তৃত ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অরগ্যানাইজেশন (ডিআরডিও)-এর প্রাধান্যপুষ্ট প্রতিরক্ষা শিল্প খাতটি এখনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে এবং দেশটির সংরক্ষণবাদী অতীত লালন করছে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় দেখা যায়, গত ১৭ বছরে ডিআরডিও’র তৈরি সামগ্রীর মাত্র ২৯ ভাগ সশস্ত্র বাহিনীর কাজে লেগেছে। প্রতিষ্ঠানটির দেরিতে সরবরাহ এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি প্রবাদসম।

অর্জুন নামের ভারী ট্যাংকটির নির্মাণের ব্যয় মূল ধারণার চেয়ে ২০ গুণ বেশি হয়েছে। সাবেক কর্মকর্তা আজাই শুক্লার মতে, সেনাবাহিনী পুরনো রুশ টি৭২এস এবং নতুন টি৯০এস নিয়ে কাজ অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। তাদের মতে অতিরিক্ত ওজনের কারণে অর্জুনের ওপর ভরসা করা যায় না। মিরেজ ও মিগ২১এসএর পূর্ববর্তী প্রজন্মের বিমানের স্থালাভিষিক্ত হিসেবে হালকা যুদ্ধবিমান নির্মাণের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল সিকি শতাব্দী আগে। কিন্তু তেজ নামের ওই বিমান এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের মতো অবস্থায় পৌঁছেনি।

অবশ্য ধীর পরিবর্তনের লক্ষণ ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের ছোট তবে দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি খাতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদেশী কোম্পানিগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্বের অনুমোদন। এর ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর দ্রুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু রাফালে কেনার চুক্তির ফলে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ড্যাসাল্ট যদিও টাটা ও রিলায়েন্সের মতো বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করতে বেশি আগ্রহী, কিন্তু সরকার চায়, সে কাজ করুক বাধাধরা নিয়মে আবদ্ধ এইচএএলের সঙ্গে। এমনকি ড্যাসাল্ট যদি নিজের পছন্দমতো কোনো অংশীদার বাছাই করে নেয়, তবু ভারতীয় শিল্প সময়মতো কাজটি করার সুযোগ দেবে বলে মনে হয় না।

র‌্যান্ড করপোরেশনের সাবেক বিশ্লেষক বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এস. রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রিচার্ড বিটজিনগার জুরিখভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি নেটওয়ার্কের জন্য সম্প্রতি একটি সমীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাতে তিনি দেখিয়েছেন, ভারত যদি তার বিদ্যমান রাষ্ট্র পরিচালিত সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে দেশটি কখনোই সামরিক বাহিনীকে তার প্রয়োজনমতো আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সক্ষম হবে না। সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা না হলে আগামী ১৫ বছরে অস্ত্র খাতে ভারতের ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অংশই অপচয় হবে।

বাঘ এবং ঈগল

ভারত বিদেশে যে টাকা ব্যয় করবে, তাও ঝুঁকিতে পড়বে। বড় বড় চুক্তিগুলো নিয়ে দুর্নীতির প্রশ্ন সৃষ্টি হবে। ঘুষের লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের কারণে জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আমদানি বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে। এ ধরনের সর্বশেষ ‘কেলেঙ্কারি’র উদাহরণ হলো ইতালির ফিনমেকানিকার কাছ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের হেলিকপ্টার ক্রয় চুক্তিটি। প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ করার কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু তবুও চুক্তিটি স্থগিত রয়েছে।

ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইসরাইল এবং সর্বোপরি রাশিয়া (ভারতের সামরিক আমদানির অর্ধেকের বেশি এখনো এই দেশ থেকেই হয়ে থাকে) আসন্ন মচ্ছব থেকে ফায়দা লোটার জন্য তৈরি হয়ে আছে। আমেরিকাও বড় বড় চুক্তি পাবে বলে আশা করছে। তবে ২০০৫ সালে অতি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং এর পরের উষ্ণ সম্পর্ক সত্ত্বেও আমেরিকা এখনো ভারতের কাছে কম নির্ভরযোগ্য অংশীদার। এই অবিশ্বাস অংশত পূর্ববর্তী অস্ত্র অবরোধ, অংশত পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার অতীত ঘনিষ্ঠতা, এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তির সঙ্গে গাটছড়া বাঁধার ক্ষেত্রে জুনিয়র পার্টনার হওয়ার ব্যাপারে ভারতের উদ্বেগের কারণে।

চীনের প্রসঙ্গ এলে আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়া নিয়ে ভারতের সামনে উভয় সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। আমেরিকা ও ভারত অভিন্ন লক্ষ্য লালন করে। এই দেশ দুটির কেউ চায় না ভারত মহাসাগর চীনা ‘লেক’এ পরিণত হোক। তবে ভারত এমন কিছুও করতে চায় না, যাতে চীন মনে করতে পারে যে, ভারত আমেরিকার সঙ্গে জোট গড়তে যাচ্ছে। ভারত এ কারণেও উদ্বিগ্ন যে, আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কটি বেশ জটিল। এতে প্রায়ই নানা মাত্রার সৃষ্টি হয়। ফলে এই আশঙ্কায় থাকে, সঙ্কটের সময় চীনকে মোকাবিলা করার চেয়ে ভারতকেই ছেড়ে যাবে আমেরিকা। আমেরিকার বন্ধুরা মদদ না দিলে ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষে চীনা তেল সরবরাহ বন্ধ করতে পারবে না।

ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মর্যাদা সবসময়েই দ্বিধাগ্রস্ত ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তার সমস্যাবলী সামরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। মি. কানরাড যুক্তি দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করার লক্ষ্যে শক্তির দিক থেকে ভারতের উচিত একতরফা কিছু ছাড় দেওয়া। উদারহণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ভারত রাজস্তানের মরুভূমিতে জড়ো করা তার সাজোয়া বাহিনীর আকার ছোট করতে পারে, স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও প্রত্যাহার করতে পারে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানি ঘোষণা করেছেন, ভারতের চেয়ে তার দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের বিপদ অনেক বেশি। সেটাকেও একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

নতুন সামরিক শক্তি হিসেবে নিজের প্রতি চীনের আস্থায় ভারতকে সাহসশূন্য করে ফেলছে। কিন্তু অভীষ্ঠ লক্ষ্য পূরণে আগ্রহী চীন যদি তার সাজসজ্জা নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কোনো জটিলতা এবং চিরায়ত বৈদেশিক ভীতি আরো খারাপ অবস্থার দিকে যেতে পারে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক মিত্রতা রয়েছে। ভারতের তা নেই। ভারত তার পূর্ব দিকের প্রতিবেশিদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক চুক্তি করে নতুন সম্পর্ক গড়ছে। কিন্তু সে সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনীহা প্রদর্শন করছে।

স্পষ্ট কৌশলগত চিন্তাভাবনার বদলে ভারত তার সতর্কতা এবং আমলাতান্ত্রিক বন্ধ্যাত্বজনিত বাধার কারণে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। ফলে ভারত তার প্রতিরক্ষাশিল্প ব্যবস্থা সংস্কারে মনোযোগী হতে পারছে না। এতে করে প্রচুর পরিমাণে অর্থ নষ্ট হচ্ছে, সশস্ত্র বাহিনীকে নিম্নমানের সামগ্রী প্রদান করা হচ্ছে এবং সামরিক আধুনিকায়নের জন্য দেশটিকে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত দুর্বল কৌশলগত সংস্কৃতিতে মজে রয়েছে। এর স্বল্প সামরিক উচ্চাভিলাষ তার ক্ষমতা হ্রাস করছে এবং আসল কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজে মনোসংযোগ করছে। কিন্তু চীন ফুলে ফেঁপে ওঠায়, ভারতের কৌশলগত দুর্বলতাগুলো দায়ে পরিণত হচ্ছে। আর এগুলোই ২১ শতকের সত্যিকারের শক্তি হওয়ার ভারতের স্বপ্নের পথে প্রতিবন্ধকতা বিবেচিত হচ্ছে।।

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ