Home » মতামত » রাজনৈতিক সঙ্কটে স্থবির অর্থনীতি – প্রতিক্রিয়া

রাজনৈতিক সঙ্কটে স্থবির অর্থনীতি – প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

politics-1-বিদ্যমান রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সঙ্কটের কারণে অর্থনীতি পরিস্থিতি প্রতিদিনই নাজুক অবস্থার দিকে যাচ্ছে, আর্থিক খাতে দেখা দিচ্ছে নানাবিধ জটিলতা। বিনিয়োগ কমছে, কমছে রফতানি এবং সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসাবাণিজ্য করতে আগ্রহীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে। অভ্যন্তরীণভাবেও অর্থনীতির পরিস্থিতি বেহাল অবস্থায় পড়ে গেছে। সার্বিক অবস্থায় রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে স্থবির হয়ে পড়ছে অর্থনীতি। আর এর উপরেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় দুই দিক থেকে ক্ষতি হয়। বিশেস করে সাময়িকভাবে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি শ্লথ হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। হরতালে সামষ্টিক অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে প্রবৃদ্ধির হার, বিনিয়োগ ও সঞ্চয় কমেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মধ্যে রাজস্ব আদায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন, বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ এবং কলমানি বাজারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আবার, হরতাল ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ে। এর মধ্যে আমদানি, রফতানি, আমদানির ঋণপত্র খোলা এবং বিদেশী সহায়তা কমে আসে।

এদিকে, বিশ্বব্যাংক এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সঠিক পথে হাঁটলেও বাংলাদেশের বিনিয়োগের গতি অতি মন্থর। দ্রুততম সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ না হলে অর্থনীতিতে বড় সংকট দেখা দিতে পারে। এতে কঠিন হয়ে পড়বে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখাও। পদ্মা সেতুর অর্থায়নে অভিজ্ঞতাহীন সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে বড় ধরনের জঠিলতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরে জিডিপির হার হবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। একই শঙ্কা ব্যক্ত করেছে এশীয়ান উন্নয়ন ব্যাংকও।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইএর সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এতে অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, অনতিবিলম্বে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে এক সঙ্গে বসতে হবে। ‘তা না হলে অর্থনীতি ভেঙে পড়বে’ উলে¬খ করে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করতে। এ কারণে আমরা ব্যবসায়ী সমাজ রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানাতে চাই। সঙ্কট দূর করার জন্য সংলাপের বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী সমাজের তরফ থেকেও উদ্যোগ থাকবে সংলাপের।

এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে। রাজনীতিকদের অনেকবার হরতালের বিকল্প কর্মসূচি দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। পরামর্শ আমলে নেয়া হয়নি। কিন্তু তারপরেও হরতাল থেমে থাকেনি। তিনি বলেন, এ অবস্থায় অর্থনীতির গতি যদি তলানিতে ঠেকে যায়, তাহলে সেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা খুবই মুশকিল হবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ প্রবাহে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়বে। আর এটা দিনকে দিন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলে মনে করেন সাবেক এই ব্যবসায়ী নেতা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সবুর খান বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের ভেতরে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে আমরা যতটা না উদ্বিগ্ন,তার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন দেশের বাইরে এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে। কারণ দেশীবিদেশী মিডিয়ায় বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তাতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারী ও ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক বিদেশী ব্যবসায়ী ডেলিগেট বাংলাদেশে তাদের সফরসূচি বাতিল করছেন।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমরা ব্যবসায়ীরা চরমভাবে উদ্বিগ্ন, ভীত। রাজনীতিকদের নিয়ে ব্যবসায়ীদের বসার কথা সেটা কতটা সফল হবে তা অনিশ্চিত। তিনি বলেন, এবার অতীতের যে কোন অবস্থার তুলনায় পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আছেন। সেই সঙ্গে আমাদের যারা বিদেশী ক্রেতা তারাও বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ক্রেতারা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে ফোন করে তাদের উদ্বেগের কথা জানান। সবচেয়ে বড় কথা, গণমাধ্যমে যখন দেশের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্ববাসী দেখে তখন দেশ ইমেজ সঙ্কটে পড়ে। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে খারাপ মেসেজ যায়। এ কারণে অনেক ক্রেতা রপ্তানি আদেশ ফিরিয়ে নিয়ে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে দিচ্ছে। এভাবে আমরা বাজার হারাচ্ছি। তিনি উল্লেখ করেন, এমনিতেই দুর্বল অবকাঠামো, ব্যাংকের অতি উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে রপ্তানিকারীরা আজ দিশাহারা। এ অবস্থায় টানা হরতাল কর্মসূচি অর্থনীতিকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নবনির্বাচিত সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অবশ্যই রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা রয়ে গেছে। রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কারণেই হরতাল ও সহিংসতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার সমাধানও রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে। শুধু সরকারি ও বিরোধী দলই নয়, দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে সংসদ ও সংসদের বাইরে সব দল নিয়ে সংলাপে বসার দাবি জানান তিনি।

ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ব্যবসায়ীদের শিল্পকারখানা চলে না। ব্যবসাবাণিজ্য প্রায় বন্ধ। যত ব্যবসার কথাই বলা হোক না কেন, সবাই কিন্তু টাকা নেয় ব্যাংক থেকে। দেশের যে অবস্থা, তাতে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েও দিতে পারছে না। জবরদস্তি করে তো আর টাকা আদায় করা যায় না। ফলে গভীর সংকটে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে দেশ চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতালের কারণে আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি গভীর সঙ্কটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

গাড়ি আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টারস অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন বলেন, বর্তমান সময়ে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি বিকাশ করেছে বেসরকারি খাত। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ভালো নেই। এর সঙ্গে যুক্ত আছে দেড়দুই বছর ধরে ইউরোপ ও আমেরিকায় যে আর্থিক মন্দা চলছে এর ধকল। এ প্রেক্ষাপটে আমি রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে, আপনারা এমন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবেন না, যাতে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল বলেন, আবাসন খাত অনেক দিন ধরেই গভীর সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিন ধরে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে, তাতে আবাসন ব্যবসার অবস্থা খুবই করুণ। আমাদের পণ্য পরিবহন বন্ধ। পণ্য পরিবহন না থাকায় অনেক নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজ বন্ধ। এতে আবাসন খাতের অবস্থা যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনি মন্দ হচ্ছে অর্থনীতি।

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের ব্যবসা খুব খারাপ যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ নিয়েও ব্যবসা করতে পারছে না রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। ব্যাংকগুলো একের পর এক চাপ প্রয়োগ করছে। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুবই খারাপ। এখন বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আমির হোসেন খান বলেন, বড় দোকানগুলোতে দৈনিক ৬০০ কোটি ও ছোটবড় সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী হরতালগুলোতে যেভাবে হোক ২টা থেকে সব দোকান খুলে রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।।