Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – ড. ইফতেখারুজ্জামান

সাক্ষাৎকার – ড. ইফতেখারুজ্জামান

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব, তার সুরাহা হলেই অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব

dr ifteruzzaman. ইফতেখারুজ্জামান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক। টিআইবি সম্প্রতি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা সম্বলিত একটি প্রস্তাবনা পেশ করেছে। এই প্রস্তাবনা এবং দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন একটি সরকার গঠনে প্রস্তাবনা আপনারা কেন দিয়েছেন?

. ইফতেখারুজ্জামান: আমরা চাই একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসিত সমাজ গড়ে তুলতে। আর এ ধরনের সমাজ গঠনের অন্যতম উপায় হচ্ছে, জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে জাতীয় সংসদ। কার্যকর একটি জাতীয় সংসদ অপরিহার্য। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে গত কয়েক দফায় যে সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল, প্রতিটি সময়ই আমরা দেখেছি, নির্বাচনের আগে এক ধরনের অনৈক্য, সংঘাত এবং সংঘর্ষের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধের ফলে এ ধরনের সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। এবারেও একই ধরনের পরিস্থিতি গত কিছুদিন ধরে চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে আনুষঙ্গিক যে সমস্ত সংঘাতময় পরিস্থিতি আছে, এর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আগামী যে নির্বাচন তা কি পদ্ধতিতে হবে এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য, অবাধ নিরপেক্ষ, বিশেষ করে সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে কিনা, সে প্রশ্নটি। যেমন হরতাল, সংঘর্ষ, জনগণের নিরাপত্তাহীনতা, নানা মৌলিক অধিকার হরণসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে জনজীবন বিপর্যস্ত। মানুষ শঙ্কিত যে, সামনে কি হতে যাচ্ছে? আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এই সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে আমরা মনে করি, সামনে যে নির্বাচনটি রয়েছে তা যেন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটি কাঠামো এবং প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা থাকা দরকার। আর এটি করতে হলে বৃহৎ দুটো রাজনৈতিক দলের এবং জোটকে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। উভয় পক্ষ থেকে আলোচনার কথা বলা হচ্ছে এবং অন্যান্য পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে। তবে এসব কথা বলা এক বিষয় আর যদি আলোচনায় আসার জন্য তাদের অঙ্গীকারকে নিশ্চিত করা যায়, তা ভিন্ন বিষয়। এ কারণে তাদের আলোচনা কাঠামো বা বিষয়বস্তু কি এবং কোন ধারায় অগ্রসর হতে পারে, সে নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই হাতের সামনে। আমরা মনে করি, এ নিয়ে একটি প্রচেষ্টা থাকা দরকার। এ কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ গণতান্ত্রিক বিভিন্ন দেশে কিভাবে নির্বাচন হয় এবং আমাদের দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি সে সব নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি এবং এর উপরে ভিত্তি করেই আমরা একটা প্রস্তাব দিয়েছি।

আমাদের বুধবার: সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী এখনও পর্যন্ত তার সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে সে প্রশ্নে অনঢ় অবস্থানে রয়েছেন। এই অবস্থানকে আপনারা কিভাবে দেখেন?

. ইফতেখারুজ্জামান: পঞ্চদশ সংশোধনীকে কেন্দ্র করে যে অবস্থা সংবিধানে রয়েছে, তাতে নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনেই এবং সংসদ চলাকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। এটা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। আর সকলের জন্য সমান্তরাল অবস্থা সৃষ্টি করা এখানে খুবই দুরূহ। অর্থাৎ একজন সংসদ সদস্য, যিনি পদে বহাল আছেন, তিনি যদি পদে নেই এমন একজনের সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন, তাহলে তো সমান্তরাল অবস্থা হলো না। আর বিরোধী দল যে অনঢ় অবস্থান নিয়েছে এবং সেখানে ওই যুক্তিগুলো ও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে গ্রহণযোগ্য হবে না, এ রকম আস্থাহীনতার পরিবেশ রয়েছে। আর এ জন্য কিন্তু আদালতে রায় বাংলাদেশে বাস্তবে যে পরিস্থিতি তাতে ডকট্রিন অব নেসেসিটির কথা বলা হয়েছে। সার্বিকভাবে আমরা দেখছি, একটা ঘোলাটে অবস্থা। যে পরিস্থিতি তাতে কেউ জানেন না, এই অবস্থায় সমাধানের উপায়টি কি এবং কিভাবে? আমরা চাই, আলোচনার একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার, যাতে আলোচনা অনুষ্ঠান এবং ঐকমত্যের সৃষ্টি হতে পারে।

আমাদের বুধবার: সরকারের অবস্থানকে কিভাবে দেখছেন?

. ইফতেখারুজ্জামান: উভয়পক্ষের অনঢ় মনোভাব সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিকে আরো গভীর সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে আলোচনায় যাওয়ার অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ আমাকে ক্ষমতায় থাকতেই হবে অথবা আমাকে ক্ষমতায় যেতেই হবে এ দুটো অবস্থান পারস্পরিক সাংঘর্ষিক। আর এ কারণে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের বুধবার: রাজনৈতিক সহিংসতা চলছে বিভিন্ন ইস্যুতে। এ অবস্থায় কেমন করে মনে করেন যে, নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতা হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে?

. ইফতেখারুজ্জামান: আসলে নির্বাচনকেন্দ্রীক সংঘাতটি রয়েছে কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্য যে সংঘাতময় পরিস্থিতি যেমন, যুদ্ধাপরাধ বিচারকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত বা ধর্মীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর উত্থানের সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে যে পরিস্থিতি এবং অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চ সব কিছু মিলিয়ে যে পরিস্থিতি, সেক্ষেত্রে আমি মনে করি, এগুলো নির্বাচনকেন্দ্রীক যে সংঘাতসংঘর্ষ এবং দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দুটো প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্য হয়, তাহলে অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্য যে ইস্যুগুলো আছে সেখানে উভয়পক্ষ রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সেটাও হচ্ছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনে কতোটা সুবিধা অর্জন করা যাবে সেটাই হচ্ছে মূল বিষয়। অন্য ইস্যুগুলোর গুরুত্ব আমরা কমাতে চাই না, অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতার ৪২ বছরে আমাদের অর্জনগুলো কিন্তু আক্রান্ত হচ্ছে, সেটা উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব, তার সুরাহা হলেই অন্যান্য ইস্যুগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আমাদের বুধবার: আপনাদের প্রস্তাবনা যে মানা হবে সে ব্যাপারে আপনারা কতোটা নিশ্চিত?

. ইফতেখারুজ্জামান: আমরা মনে করি না যে, সরকার বা অন্যান্যরা এটা মেনে নেবে বা এটা যে জাদুর লাঠি তাও আমরা মনে করছি না। আমরা মনে করি, এটা একটা দিকনির্দেশনা দিচ্ছে এবং সুযোগ সৃষ্টি করছে। সবাই যদি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করেন, তাহলে আলোচনা শুরু করার জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা মনে করি, আলাপআলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধান সম্ভব।

আমাদের বুধবার: সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব কার?

. ইফতেখারুজ্জামান: উভয়পক্ষেরই দায়িত্ব। তবে অবশ্যই যে যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদেরই উদ্যোগ নেয়া উচিত, তাদেরই দায়িত্ব বেশি। তাদেরই অগ্রগামী হওয়া উচিত এবং বিরোধীদলের উচিত তা গ্রহণ করা। আবার উদ্যোগটি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে হলেও তাকে স্বাগত জানানো উচিত।

আমাদের বুধবার: একটি বিদেশি সংগঠনের শাখা হিসেবে আপনারা এই ধরনের প্রস্তাব কেন দিয়েছেন? আপনি কি মনে করেন না, আগে যেভাবে বাইরের হস্তক্ষেপ বা দ্যূতিয়ালি হতো তেমনটিই আবার হচ্ছে?

. ইফতেখারুজ্জামান: না, এটা ঠিক নয়। আমরা অবশ্যই একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দেশীয় চ্যাপ্টার হিসেবে কাজ করি। কিন্তু আমরা একটি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যথাযথ আইনে এবং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিবন্ধন প্রাপ্ত। আমাদের কার্যক্রম ও কাঠামোগত বিষয় কিন্তু জাতীয় প্রেক্ষিতে হয় এবং বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ও অনুমতি নিতে হয়। নির্বাচন, জাতীয় সংসদসহ আমাদের সকল কার্যক্রমই কিন্তু সরকারের অনুমতিক্রমে। দেশ এবং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে আমাদের কর্মকাণ্ড। কাজেই এখানে বিদেশী বলে কোনো বিষয় নেই। এটা একান্ত আমাদের দেশীয় পর্যায়ে নিজস্ব একটি কাজ এবং যেভাবে আমরা কাজ করি, তারই একটি দৃষ্টান্ত।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।