Home » শিল্প-সংস্কৃতি » গল্পকারের গল্প – জঁ ক্লোদ কাগিয়ে (শেষ অংশ)

গল্পকারের গল্প – জঁ ক্লোদ কাগিয়ে (শেষ অংশ)

ফ্লোরা সরকার

film 111ছায়াছবি নির্মাণের শুরুতে প্রথম যে কাজটি করা হয় তা হলো একটি ভালো চিত্রনাট্য বাছাই করা। একটি ছবি তা যত চমৎকার হোক তার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে চিত্রনাট্যের ওপর। চিত্রনাট্য দাঁড়িয়ে থাকে গল্পের ওপর। দৃশ্যের পর দৃশ্য বা শটের পর শট গেঁথে তা যত নিপুণভাবে উপস্থাপন করা হোক না কেন তার গল্প যদি দর্শকহৃদয়কে স্পর্শ করতে না পারে তাহলে যে কোন ছবি ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমরা আজ সেই ধরনের একজন গল্পকার চিত্রনাট্যকার জন জঁ ক্লোদ কাগিয়ে (১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১-) কথাই বলবো। জন জঁ ক্লোদ কাগিয়ের সাক্ষাতকারের প্রথম অংশটি গত সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। এবারে রয়েছে তার শেষ অংশ।

এন্ডারসান: ‘দ্যা সিক্রেট ল্যাংগুয়েজ অফ ফিল্ম’ বইটিতে আপনি অদৃশ্য চিত্রনাট্যের কথা বলেছেন। এই বইটিতে যতজন চিত্রনাট্যকারের কথা আছে নিঃসন্দেহে আপনি অন্যতম একজন, বিশেষত ইউরোপে। ছায়াছবির প্রক্রিয়ায় একজন অদৃশ্য বা নামহীন চিত্রনাট্যকার হিসেবে আপনি কেমন বোধ করেন?

কাগিয়ে: ছবির চিত্রনাট্য যারা লেখেন তাদের জন্যে এটাই সব থেকে পরস্পরবিরোধী একটি বিষয়। তাকে অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করতে হয়, তার সাধ্যানুযায়ী সবকিছু দিয়ে দিতে হয়, শুধু অন্যের কাজের জন্যে। এই বিষয়টি তাকে প্রথম থেকে মাথায় রাখতে হয়। সে একজন সহযোগি। সে তার নিজের কোন ছবির জন্যে কাজ করছে না, কাজটা সর্বজনীন। অধিকাংশ সময় চিত্রনির্মাতা একজন প্রভুর ভূমিকায় থাকেন, কখনো বা অভিনেতা বা তারকারাও সেই ভূমিকায় থাকেন, কিন্তু প্রায়শই চিত্রনাট্যকার সেই ভূমিকায় থাকেন না। তাকে সেটা মনে রাখতে হবে। এটা যদি সে গ্রহণ করতে না পারে তাহলে ভালোয় ভালোয় লেখকের তালিকা থেকে সরে যাওয়াই ভালো। যদিও টেলিভিশানের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন কথা।

একবার আমি একটি অনুষ্ঠানে ছিলাম ভেনিসে, জার্মান চিত্রপরিচালক পিটার ফ্লেশমানের সঙ্গে, যেখানে প্রায় তিনশ মানুষের সমাগম ছিল আমাদের কথা শোনার জন্যে। পিটার তাদের জিজ্ঞেস করলেন ‘ডালাস’ সিরিয়ালের পরিচালকের নাম কি, কেউ বলতে পারলো না। কাজেই মাঝে মাঝে চিত্রনাট্যকারের মতো পরিচালকের নামও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সেখানে তারকা বা চরিত্র বা অভিনেতাঅভিনেত্রীরাই সিরিজ। আমি অন্য কোন দেশের কথা জানিনা অন্তত ফ্রান্সে তাই দেখেছি।

৫০,’৬০,’৭০ এর দশকে চিত্রনির্মাতাদের সুনাম পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকতো। কিন্তু ’৮০ দশকে স্ট্যানলি কুব্রিক এর সময় থেকে নির্মাতাদের নাম আর বিশেষ শোনা যায় না। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক বা অনেক ইউরোপিয় দেশে ধীরে ধীরে নির্মাতারা অদৃশ্য বা নামহীন হয়ে পড়ছেন। যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।

প্রায় সব নির্মাতাদের সঙ্গে আমার কাজের পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এমনকি যদি কোন নির্মাতা নিজেকে শুধু লেখক নয়, একজন সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে নিজেকে দাবী করতেন,তাহলেও তাদের আমি আমার সামনে রেখে জানাতাম আমি কি চাচ্ছি তা তারা যেন জানেন, চিত্রনাট্য থেকে কিছু কিছু দৃশ্যও তাদের পড়ে শোনাতাম। বুনুয়েল, পিয়েখ এতিয়ে, মিলোস ফরমান, লুই মালে, ভোকার শলনদর্ফ যাদের সঙ্গে কাজ করতাম তারা ছিলেন সহকারি চিত্রনাট্যকার, এখনও সেই প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করি। তাদের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে কথা বলা, ছবির গবেষণামূলক এবং সার্বিক বিষয়াদি নিয়ে অলোচনা করা ইত্যাদি।

সিনেমার সর্বপ্রথম অভিযাত্রাটি শুরু হয় একজন চিত্রনাট্যকারের কাজের মধ্যে দিয়ে। এই যাত্রা এখানেই শেষ হয়ে যায় না। একজন চিত্রনাট্যকার একজন চিত্রপরিচালকও বটে। যদিও তিনি তার লিখিত পান্ডুলিপি বাস্তবায়নের সময় থাকেননা। চিত্রনাট্য একটি অস্থায়ী বিষয়। শুটং শেষে এর বিলোপ ও লয় ঘটে। চিত্রনাট্যকার ছবির কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় তাকে শুধু একজনের সঙ্গে কাজ করে যেতে হয় আর তিনি হচ্ছে চিত্রনির্মাতা। একই ছবির একই বিষয় নিয়ে দুজনেই কর্মরত এই মূল সুরটা ধরতে হবে। যদি কখনো দুই বা তিন সপ্তাহ পর হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমরা দুজন দুই ধরণের ছবি নিয়ে চিন্তা করছি, অর্থাৎ একই ছবি দুটো ভিন্ন পথে আমরা চিন্তা করছি, তাহলে সেই ছবি ব্যর্থ হতে বাধ্য।

যতদূর সম্ভব অত্যন্ত অন্তরঙ্গ হয়ে কাজ করতে হবে। সেটা করার জন্যে অনেক ধরণের পথ আছে। ছবির দৃশ্যপট এঁকে দেখানো যেতে পারে। যেমন আপনি আমার সামনে ডান দিকে বসে আছেন। মনে করেন আপনি চিত্রনির্মাতা এবং আমি চিত্রনাট্যকার আপনার বাম দিক আমার ডান দিক এবং আপনার ডান দিক আমার বাম দিক। আমরা দুজন একই ছবির একই স্থানে অবস্থিত নই। এখন আমি যদি বলি, ‘মা’য়ের প্রবেশ ঘটবে ডান দিক দিয়ে’, আপনার ডান আমার ডান কিন্তু ভিন্ন। কাজেই দুজনকে তৃতীয় একটি স্থানে যেয়ে পৌঁছাতে হবে সেটা কি? সেটা হচ্ছে যাকে আমরা ছবির ভাষায় বলি ‘ফিল্ম স্পেস’ বা ‘ছবির স্থান’ এভাবে অনবরত ঘুরপাক খেতে হবে, যা আপনার বা আমার নয় তৃতীয় একটি স্থান। আমাদের এই বিষয়ে সদাসর্বদা সতর্ক থাকতে হবে কেননা আমরা একই অবয়ব সব সময় একই ভাবে দেখতে অভ্যস্ত। এটা মনে রাখা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

সেই তৃতীয় স্থানটি আবিষ্কার করার জন্যে আপনাকে মাঝে মাঝে হয়তো আঁকার কাজটাও করতে হতে পারে। বুনুয়েলের জন্যে আমি প্রায় শ’খানেক ড্রয়িং করেছি। এমনও হয়েছে কোন কোনদিন সারারাত ধরে কয়েকটা দৃশ্য এঁকে পরদিন বুনুয়েলের কাছে গিয়েছি এবং তাকে সেই স্কেচ দেখানো ছাড়াই দৃশ্যটি নিয়ে আলোচনা করছি, দেখা গেলো স্কেচে বর্ণিত চিত্রের মতো বুনুয়েলের দৃশ্যেও ব্যাখ্যা হুবহু মিলে যাচ্ছে (প্রসঙ্গত এখানে ‘ডিসক্ট্রিট চার্মস অফ দ্যা বুর্জোয়া’ ছবির একটি দৃশ্যের বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল, সেটা সংক্ষিপ্ত আকারে বলা হলো অনুবাদক)। এমনকি ছবির তাল, লয়, ছন্দ, সুর, সংলাপ সব কিছু লেখকনির্মাতা এক হয়ে লীন না হলে সেই ছবি অব্যার্থ ভাবে ব্যর্থ হবে।

সুষম সহযোগিতা (লেখকনির্মাতার জন্যে) একটি ছবির জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজন। কারোর ওপর কোন কিছু আরোপ করা যাবেনা, ক্ষমতা প্রয়োগের তো প্রশ্নই ওঠে না। এটা খুবই কঠিন। কেননা সবাই জিততে চায়, সবাই মনে করে, আমি যা ভাবছি সেটাই সঠিক। এবং এই সঠিকতা প্রমাণের জন্যে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রবণতা চলতে থাকে। তাই দীর্ঘ সময়ের সহযোগিতার জন্যে সেই তিন সেকন্ডের তত্ত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এন্ডারসান: আপনার লেখা ‘দ্যা সিক্রেট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ ফিল্ম’ বইটি ভবিষ্যত চিত্রনাটক্যকারদের যথেষ্ঠ নয়। বর্তমানে অনেকে চিত্রনাট্য লিখতে উৎসুক। যারা লিখতে উৎসুক তাদের প্রেরণার উৎস সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

কাগিয়ে: চিত্রনাট্য একটি কৌশলগত অনুশীলনের কাজ। প্রথমে আপনাকে জানতে হবে একটি ছবি কিভাবে নির্মিত হয়। যদি তা না জানেন তাহলে লেখার প্রয়োজন নেই। আমার জীবনে অনেক চিত্রনাট্য দেখেছি প্রতিভাবান লেখক হওয়া সত্ত্বেও তা ছবি হয়ে ওঠেনি। পেশাগত চিত্রনাট্যকার হতে হলে আপনাকে দলগত ভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষত যারা ছবি নির্মাণ করেন তাদের সঙ্গে দলগত হয়ে কাজ করতে হবে।

একজন ভালো চিত্রনাট্যকার হতে হলে আপনাকে শুটিং এ স্বশরীরে উপস্থিত হতে হবে। দেখতে হবে ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে, আলোর প্রক্ষেপন কিভাবে বিন্যাস করে ইত্যাদি। লিখিত চিত্রনাট্য কিভাবে চিত্রে প্রতিফলিত হয় অর্থাৎ লেখা থেকে ছবিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া। যা লিখছেন তা প্রকাশিত হবার জন্যে নয়। লেখার পরেই ভুলে যেতে হবে এবং অন্য মাধ্যমে তা রূপান্তর ঘটবে এটা মনে রাখতে হবে। নতুন নতুন ভাবনাও মাথায় রাখতে হবে। কাজেই আমার মতে চিত্রনাট্যকারের দুটো প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয় . নতুন ভাবনার অনুসন্ধান যা আপনি পড়ে, দেখে, শুনে এবং আপনার কল্পনার সঙ্গে মিশেল ঘটিয়ে দুই তিন পাতার ভেতর বেশ কয়েকটা গল্পের সারমর্ম লিখে রাখতে পারেন। ২. যখন সেসব গল্প থেকে চিত্রনির্মাতা একটি বেছে নেবে তখন গল্পের আরও গভীরে যেয়ে ঠিক একজন নির্মাতার দৃষ্টি দিয়ে সিনেমার ভাষায় রূপ দিতে হবে। অনেক চিত্রনাট্যকার চিত্রনাট্য লিখতে ব্যর্থ হন। কেননা চিত্রনাট্যকে তারা লিখিত রূপ বলে মনে করেন। মনে রাখতে হবে কোন ছবির জন্যে লেখার অর্থ ছবি নির্মাণ করা।

এন্ডারসান: আপনার বইয়ের তাকে অনেক আমেরিকার এবং হলিউডের ছবির চিত্রনাট্যের ছাপা বই দেখা যাচ্ছে। এসব বই কি একজন চিত্রনাট্যকারের জন্যে খুব প্রয়োজন?

কাগিয়ে: এসব বইয়ে মূলত একটি গল্প কিভাবে দাঁড়ায়, তার অবয়ব কিভাবে গঠিত হয় এসব নিয়ে লেখা। যা চিত্রনাট্য লেখার নিয়ম বা রীতি সম্পর্কে অবহিত করে, এর বেশি কিছু সহায়তা করেনা। ইমানুয়েল কান্টও সেই কাজটি করেছিলেন কিন্তু চিত্রনাট্য সম্পর্কে কিছু বলেননি। নিয়ম ভাঙ্গতে হলে আপনাকে সেই নিয়ম সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। এবং খুব ভালো ভাবে। কাজেই এসব বই ততক্ষণ পর্যন্ত কাজের যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি মেনে না চলছেন। আসলে আমেরিকান ছবির একটা বড় সমস্যা, পৃথিবী বদলে গেলেও তারা একই ছবির নির্মাণ অব্যহত রাখে, যেমন ফ্র্যাংকেনস্টইনের রিমেক, ব্যাটম্যানের রিমেক ইত্যাদি। সবই পৌরাণিক বিষয়। কাজেই রীতি বা নিয়ম কোন চিরন্তন বিষয় নয়। সমাজ, জাতি, প্রতিদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ের ইন্টারনেট আমাদের জীবনের একটি বিশাল পরিবর্তনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিনেমার ডিজিটাল ব্যবহার আমাদের ভবিষ্যত ছবি লিখিয়েদের মাঝেও অনেক পরিবর্তন এনে দেবে।

এন্ডারসান: কিভাবে?

কাগিয়ে: সেটা তো জানিনা। আমরা কখনোই ভবিষ্যত জানিনা। আমাদের শুধু ভবিষতের জন্যে তৈরি হয়ে থাকতে হয়।।