Home » বিশেষ নিবন্ধ » জনগণের মূল লড়াই

জনগণের মূল লড়াই

শাহাদত হেসেন বাচ্চু

politics-1-মহাত্মা গান্ধী ১৯০৮ সালে হিন্দ স্বরাজে লিখেছিলেন, “তৎকালীন ইংল্যান্ডের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশের উচ্চতর জীবন সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে, দেশের বাইরে প্রায় অর্ধেক ঔপনিবেশিক জগতের মানুষদের তারা শোষন করতে পেরেছে। সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে”। শতাধিক বছর পরে গান্ধীর এই বক্তব্য এখনও কতোটা প্রাসঙ্গিক তা স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে তাকালে বোঝা যাবে। আমাদের এখানে শোষক বদল হয়েছে, ঔপনিবেশিক শাসন আর নেই, ১৯৪৭ সালে একবার তথাকথিত স্বাধীন হয়ে আমরা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনেই ছিলাম, ১৯৭১ সালে স্বশস্ত্র মক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জনগণ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়। পরিনামে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

দু দুটি ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে গত শতকে মুক্তি লাভ করলেও শোষনের চেহারা এতোটুকু বদলায়নি। বৃটিশ শোষকের জায়গা দখল করে নিয়েছিল পাকিস্তানীরা। ’৭১ সালের পরে সেই জায়গা দখল করেছে বাংলাদেশী শোষকরা। কখনও গণতান্ত্রিক শাসনের আদলে, কখনও সামরিক স্বৈরতন্ত্র’র আদলে শাসনশৈাষণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নব্য ধনিক শ্রেণীর হাতেই জনগণের ভাগ্য আটকা পড়ে আছে। তাদের ক্ষমতার লড়াইয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ জিম্মি হয়ে আছে গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে।

বাংলাদেশ নামক এই ভূখন্ডে, এই সমতটের মানুষের চরিত্রে অসাধারন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সমতটের মানুষ যুগে যুগে মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে সাময়িক পরাজিত হলেও ঘুরে দাড়িয়েছে বার বার। শাসক শ্রেণীর কাছে তারা প্রতারিত হয়েছে, হচ্ছে যুগ যুগ ধরে, সব সময়। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই সমতটের মানুষ ভাগ্য বদলের একটি স্বপ্ন দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধনীগরীব, নারীপুরুষ, ভালোমন্দ সব একাকার হয়ে গিয়েছিল। জনগণ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল দেশকে স্বাধীন করার জন্য। তাদের কিছু স্বপ্ন ছিল, গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণ অনুধাবন করতে পারেননি তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুতোটি যে নেতৃত্বের হাতে তাদের মধ্যেকার অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব এবং হানাহানি ও বিদেশী স্বার্থ তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবে।

এরপরেও এই সমতটের মানুষ পরাজিত হয়নি। ১৯৯০ সালে দুর্বার গণআন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমাজের নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের পথ ধরে রাষ্ট্র যেহেতু ‘জনগণের রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে, সে কারণে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমাজ প্রাপ্তির স্বপ্ন পুনরায় ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে, যে কারণে জনসম্পদ বন্টনে বৈষম্য বাড়তে থাকে তীব্রভাবে। এর ফলে একদিকে তৈরী হতে থাকে ভোক্তা শ্রেণী, বাড়তে থাকে কোটিপতির সংখ্যা এবং কোটিপতি ঋন গ্রহীতার সংখ্যাও। রাজনীতিবিদদের প্রতারনা এবং শোষনবৈষম্য’র কারণে এর বাইরে পড়ে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নি:স্ব থেকে নি:স্বতর হতে থাকে।

এখানেই শেষ নয়। রাজনীতিবিদদের জনগণের সঙ্গে প্রতারনায় এই খেলায় সৃষ্ট কোটিপতি ব্যবসায়ীরা, ঋনখেলাপী কোটিপতিরা দখল করে নিচ্ছে জাতীয় সংসদ। ফলে রাজনীতিবিদ শূন্য হতে চলেছে সংসদ। জনকল্যানের চাইতে গুটিকয়েক ধনপতির স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই তৈরী হচ্ছে নানান আইন ও কালাকানুন। রাজনীতিবিদদের এই যে জনগণের সম্পদ লুট করে কোটিপতি বনে যাওয়া, একটি বিশেষ ধনবান শ্রেণী গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে জনগণকে পুনর্বার পরাজিত হতে হয়।

যে দেশের জনগণকে সামরিক শক্তি দমাতে পারে না, সিডরআইলার মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে যারা পরাজয় স্বীকার করে না, ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যায়, সেই মানুষের সঙ্গে যুগের পর যুগ ধরে শাসক শ্রেণীর এরকম প্রতারনা এবং নিষ্ঠুর শোষনের উদাহরন আমাদের হাতে খুব বেশি নেই। এই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৯৯০ সালের পরে ৪ টি সরকার একই ধরনের প্রতারনা এবং শোষন চালিয়ে নব্য যে কোটিপতি শ্রেণী এবং ধর্মের লেবাসে যে সুবিধাভোগী শ্রেণীটি তৈরী করেছে, তাদের কাছেই সরকার এখন জিম্মি হয়ে পড়েছে।

এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১৩০ জন। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে গত ৪২ বছরে কোটিপতির সংখ্যা কিভাবে বেড়েছে তার একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক আমলে এদেশের জনগণ কোটিপতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবারের কথা শুনেছে। বাংলাদেশ জন্মের পরেও অর্ধ শতকেরও কম সময়ে এই সংখ্যা ধারনা করা হয় ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ব্যাংকের হিসাবধারী কোটিপতি আমানতকারীর হিসেব অনুযায়ী ১৯৭৫ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ জন। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা দাড়ায় ৯৪৩ জনে। ৯০ এর পর গণতান্ত্রিক আদলে জনগণের নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সময় কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি বিষ্ময়কর।মাত্র ৬ বছর পরে এই সংখ্যা ১৯৯৬ সালে গিয়ে দাড়ায় ২ হাজার ৫৯৪ জনে। ২০০১ সালে সংখ্যাটি দাড়ায় ৫ হাজার ৭৯৯ জনে। ২০০৬ সালে দ্বিগুন বেড়ে দাড়ায় ১৪ হাজর ৪৯ জনে। ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩ জন এবং ২০০৯ সালে এটি পোঁছে যায় ২৩ হাজার ১৩০ জনে। আগেই বলা হয়েছে, এই পরিসংখ্যানটি ব্যাংকে আমানতকারী হিসাব অনুযায়ী। এর বাইরে বিশাল অংকের কালো টাকা, বিদেশে অর্থ পাচার, বিদেশে ব্যাংকের একাউন্টস্বাভাবিকভাবেই এই পরিসংখ্যানে আসেনি।

ওপরের পরিসংখ্যান থেকে পাঠক কৌতুহলী হয়ে উঠতে পারেন এটা ভেবে যে, গণতান্ত্রিক ও সামরিক ছত্রছায়ায় তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহুগুন কোটিপতি তৈরী হয়েছে বাংলাদেশে। এ সময়ে কোটি টাকা ঋন গ্রহীতার সংখ্যাও বেড়েছে বিষ্ময়করভাবে। ১৯৭৫ সালে এই অংকের বা তার ওপরে ঋনগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২১২ জন। ১৯৯০ সালে তা দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ১২৫ জনে। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাড়ায় ২৯ হাজার ৪৫৮ জনে। হলমার্ক, ডেসটিনি কেলেঙ্কারীর বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এরকম ঋন গ্রহীতার সংখ্যা ২০১৩ সালে লাখ ছাড়িয়ে গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে জনগণের নির্বাচিত সরকারের আমলে কোন দেশে ২৩ হাজার লোকের কোটিপতি হয়ে যাবার নজীর বা পরিসংখ্যান আছে বলে আমাদের জানা নেই। পরিসংখ্যান আমাদের আরো জানাচ্ছে যে, এ সময়কালে ওপরতলার ১০ ভাগ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের ৩৩ থেকে ৩৭ শতাংশ সম্পদ জমে গিয়েছিল। আর নিচুতলার ১০ ভাগ মানুষের হাতে ছিল ১.৭ থেকে ২ শতাংশ সম্পদ। এই সময়ে চরম দারিদ্র্য সীমার নীচে চলে যায় ৫০ শতাংশের ওপর মানুষ (সূত্র:বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)। এভাবেই ওপর ও নীচ তলার মানুষের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। সম্পদের পাহাড় জমে উঠছে বিশেষ একটি শ্রেণীর হাতে।

শোষিতবঞ্চিত ও নির্মম লুন্ঠনের শিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশাল এই জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করছে না রাজনীতিবিদ, শাসক শ্রেণী, জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগকেউই না। ত্যাগী রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক দল ও জাতীয় সংসদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন, নির্বাসিত হচ্ছেন। তাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নব্য পুঁজির মালিক, সাবেক সিভিল বা সেনা আমলাগণ। নানা উপায়ে সহসাই তারা পাচ্ছেন দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ, সংসদ সদস্যের টিকেটনির্বাচিত হচ্ছেন জাতীয় সংসদে। নির্বাচনী হলফনামায় দেয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমান সংসদে কোটিপতির সংখ্যা ১২৮ জন, যা মোট সংসদ সদস্য সংখ্যার ৪৪ শতাংশ।

এই নব্য কোটিপতি শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘুরে ফিরে ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশ শাসন করে আসছে। মাঝখানে প্রায় ৩ বছর ছন্দপতন ঘটিয়েছিল সামরিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় আসা অদ্ভুত ধরনের এক তত্বাবধায়ক সরকার। সে সময়ের সেই সরকার দেশকে রাজনীতি শূন্য করার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে ধনিক শ্রেণীর শোষন আরো পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা করে দিয়ে গিয়েছিল।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে সদ্যগঠিত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান একটি চরম সত্য উচ্চারন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “বিচার ব্যবস্থায় জনগণের কোন স্থান নেই। আইনগুলো দরিদ্রবান্ধব নয়। ধনীবান্ধব বিচার ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য বিচার করছে”। তার এ বক্তব্য প্রযোজ্য হতে পারে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে সকল কিছুর বানিজ্যিকীকরণ এবং এসব ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষদের প্রান্তিক অবস্থান নিয়ে।

কর্মক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের অবস্থান কতটা করুণ, তার একটি বড় উদাহরন গার্মেন্টস সেক্টর। এই সেক্টরে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিক বেতনভাতার দাবীতে মোকাবেলা করছে সরকার, পুলিশ ও মালিকপক্ষকে। লক্ষ্যনীয় যে, প্রান্তিক এই শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে গোটা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্যদিকে, ব্যাপক এনজিওকরণ, দাতাদের তহবিল, দারিদ্র্য বিমোচন বানিজ্য, ক্ষুদ্র ঋন, সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট, বিদেশী ঋন জর্জর সরকারী অর্থাগমসব ক্ষেত্রেই চলছে দুর্নীতি, নতুন নতুন কোটিপতি তৈরী হচ্ছে আরো। শিক্ষাস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। অবকাঠামো নির্মানে বিপুল ব্যয় হচ্ছে। জনগণের জন্য এগুলি করা হলেও ভাগ্য ফিরে যাচ্ছে ক্ষমতাবানদের।

প্রায় সবক্ষেত্রেই রাষ্ট্রসরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠির মিত্র হবার বদলে বিশেষ একটি গোষ্ঠির অর্থসম্পদ অর্জনের হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। এই গোষ্ঠিটি মূলত: এখন বাংলাদেশে রাজনীতিঅর্থনীতিসংস্কৃতি, সবকিছুরই মূখ্য নিয়ন্ত্রক বনে গেছে। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করছে, ধর্মের ছদ্মাবরনে রাজনীতি করছে। সহজসরল মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত এবং প্রতারিত করছে।

বাংলাদেশে ক্ষমতাবান ধনিক শ্রেণী এখন দুটি শিবিরে বিভক্ত। একটি শিবিরে অবস্থান করছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট নাম ধারন করে এবং অপর শিবিরে ভর করেছে ১৮ দলীয় জোট নামে বিএনপি’র ওপর। জোট বা মহাজোট যাই বলি না কেন, সবই করা হচ্ছে নব্য ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায়। ফলে ক্ষমতাসীনরা যে কোন কিছুর বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকতে চায় আর যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় আসতে চায় বাইরে অবস্থানকারীরা। এর মূলে রয়েছে, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ লুট করে অর্জন করা কোটি কোটি টাকার নিরাপত্তা বিধানের অদম্য আকাঙ্খা। এখানে কোন নীতিনৈতিকতা, জনগণের স্বার্থ, দেশপ্রেম কিছুই নয়, মোদ্দা কথা হচ্ছে, স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছুই এখানে বিবেচ্য নয়। এই কারণে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে অবস্থানকারীরা জনস্বার্থের বিপরীতে ক্ষমতার লড়াইয়ে এখন এতটাই বেপরোয়া যে, তারা মানুষের জীবন নিয়ে ‘রক্তের হোলি’ খেলায় মেতে উঠতে দ্বিধা করছে না। সবশেষে ধর্মের নামে ক্ষমতা রক্ষা বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মধ্যযুগীয় ‘ধর্মভিত্তিক ব্যবস্থা’কে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। ‘ধর্মভিত্তিক ব্যবস্থা’ গত ৪২ বছরে রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় ভোটের হাতিয়ার হিসেবে যেহেতু সংগঠিত শক্তি, সে কারণে দুই দলই হাত বাড়িয়েছে তাদের দিকে। এক সময়ের ‘নাস্তিক’ তথাকথিত ‘কম্যুনিস্ট’রা এখন প্রতিদিন ‘ধর্মভিত্তিক ব্যবস্থা’র পক্ষে কথা বলছেন। অথচ এদের ব্যাক্তিগত জীবনে ধর্ম, ইসলাম, নামাজরোজা, হজ্বযাকাতের কোন স্থান নেই।

এই অন্ধকার যাত্রায় বাংলাদেশ সামিল হয়েছে মূলত: দুই দলের মধ্যে অবস্থানরত নব্য ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা ও পুন: পুন: লুটপাটের অবাধ বিস্তার ঘটাতে। ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, বিএনপি ‘ধর্মভিত্তিক ব্যবস্থা’কে আঁকড়ে ধরেছে, আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে। আর আওয়ামী লীগ নিজেই আতঙ্কিত হয়ে ধার্মিক’ সাজার প্রানান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ জন্য তাকে ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী দেশ চালানোর কথাও বলতে হচ্ছে। এ থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করার ক্ষমতা এখনো দুই দলে অবস্থানরত সৎ রাজনীতিবিদদের রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, অন্যের ধ্বংস কামনায় যে আত্মঘাতীজিঘাংসা প্রবন রাজনৈতিক ইর্ষায় বড় দুই দলের শীর্ষ নেতারা যে কামড়াকামড়িতে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে তারা বেরিয়ে আসবেন কি করে, সাধারন জনগণের কাছে এখন সেটি মূখ্য প্রশ্ন?

বাংলাদেশ এখনো ‘গ্রাম’ থেকে যে ‘রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠেনি বা উঠতে পারলো না, তা দুই বড় দলের অবয়ব, আচরন, স্বপ্ন এবং ভাবনার দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ৪২ বছর বয়সী বাংলাদেশের জনগণের মূল লড়াইটি এখনো সেখানেই। কার্যকর রাষ্ট্র হয়ে ওঠার লড়াই। চ্যালেঞ্জটিও সেখানেই। ‘গ্রাম’ থেকে ‘রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে সংখাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যানকর রাষ্ট্র। সেটি কায়েম করতে গেলে একটি বড় লড়াই রয়েছে, সেজন্য জনগণকে পুনরায় সংগঠিত করতে হবে। আর তা করতে হলে এই দুর্বল,পরিবারমুখী, আত্মকেন্দ্রিক, আঞ্চলিকতাপ্রিয়, স্বজন ভারাক্রান্ত রাজনীতি বাদ দিয়েই করতে হবে।।

2 টি মন্তব্য

  1. হাসান মাহমুদ দীপ্র

    ভালো হয়েছে লেখাটা।