Home » আন্তর্জাতিক » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

জনস্বার্থ নয় মুনাফাই বেশি

ফারুক চৌধুরী

coal power-1তেল লুটের ‘কাহিনী’ জটিল, অনেক ডালপালায় ছড়ানো। বিশদভাবে না দেখলে সে লুটের নোংরা চেহারাটি চোখে পড়ে না। বিশদভাবে দেখা দরকার সব ক্ষেত্রেই, কেবল তেলগ্যাস লুটের ক্ষেত্রে নয়। কোনো বিষয় বুঝতে চাইলে বিশদভাবেই দেখতে হয়; ভাসাভাসাভাবে দেখলে মনকাড়া কথাবার্তা বলা যায়, কিন্তু অন্যকে বোঝানো দূরের কথা, নিজেই বুঝতে পারা যায় না। তাই, তেল লুটের ‘কাহিনী’ও মনোযোগ দিয়ে বিশদভাবে দেখা উচিত।

তেল লুটের ‘কাহিনী’র একটি ‘মজাদার’ বা সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করা অংশ হচ্ছে উৎপাদন শরিকানা চুক্তি। এটিকে ইংরেজিতে বলা হয় প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা সংক্ষেপে পিএসসি। কোথাও কোথাও এটিকে কন্ট্রাক্ট না বলে এগ্রিমেন্ট বলা হয়। সংক্ষেপে বলা হয় পিএসএ। বাংলায় সংক্ষেপে উশচ বলা যেতে পারে।

এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে চলে লুট। তেল আছে, এমন অনেক দেশেরই মাটির গভীর থেকে তেল আহরণের কারিগরি জ্ঞান, প্রযুক্তি, উপযুক্ত জনবল, পুঁজি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা নেই। এসব রয়েছে তেল আহরণে নিয়োজিত বড় বড় কোম্পানির। তাই এ সব দেশকে সহায়তা নিতে হয় এই কোম্পানিগুলোর।

উশচের বা উৎপাদন শরিকানা চুক্তির প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারার জন্য উদাহরণ হিসেবে উগান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত উশচ দেখা যেতে পারে। উগান্ডার তেল আহরণ নিয়ে যে সব উৎপাদন শরিকানা চুক্তি (উশচ) বা প্রডাকশন শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট (পিএসএ) হয়েছে সেগুলোরই কয়েকটি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, লাভের ভাগ তেল কোম্পানির বেশি, এ বিশ্লেষণ করা হয় একটি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটির নাম কন্ট্রাক্টস কার্স, উগান্ডাজ অয়েল এগ্রিমেন্টের প্লেস প্রফিট বিফোর পিপল। এ প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে জনগণের স্বার্থের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

তেল সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প লাভজনক কিনা, সেটা যাচাইয়ের একটি প্রধান পদ্ধতি হচ্ছে ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন দেখা। সহজ কথায় বলা যায়, কত টাকা খরচ করে ঘরে কত দিনে কত টাকা ফিরবে সে হিসাব দেখা। এ হিসাবটি বেশ জটিল। সংক্ষেপে বলা যায়, যদি টাকা ঘরে ফেরার হার বেশি হয় তাহলে কোম্পানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করে। অন্য কোথাও সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে, সেখান থেকে যে পরিমাণ মুনাফা আসবে, যদি তেল প্রকল্প থেকে মুনাফা তার চেয়ে বেশি আসবে বলে হিসাব কষে অনুমান করা যায়, তাহলে তেল প্রকল্পটি উপযুক্ত বিবেচিত হয়। সাধারণত ১২%-এর বেশি মুনাফা হলে প্রকল্পকে তেল কোম্পানিগুলো লাভজনক মনে করে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ হার ১৫% থেকে ২০% গণ্য করা হয়। আর মুনাফার হার ২০%-এর বেশি হলে মনে করা হয় বিপুল মুনাফা। এসব তথ্য উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হিসাবনিকাশ করে দেখা গেছে যে, উগান্ডার তেল কোম্পানিগুলোর সম্পাদিত চুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য খুবই লাভজনক। টাল্লোর ক্ষেত্রে এ হার ৩০% থেকে ৩৫%। দেখা গেছে, তেলের দাম যে স্তরেই থাকুক না কেন, উগান্ডার মুনাফার হার সিরিয়ায় মুনাফার হারের চেয়ে বেশি। উগান্ডার সরকার যখন মুনাফা হারাবে, তেল কোম্পানি তখন পাবে। অর্থাৎ একজনকে ফতুর করে অন্যজন লাভ ঘরে তুলবে। এমনকি তেলের দাম যখন চড়া হবে, উগান্ডা সরকার তখনো নিজের মুনাফা বাড়াতে পারবে না। তেলের দাম কমে যদি ৩০ ডলারে আসে, তখনও টাল্লোর মুনাফা হার থাকবে ১৩%। আবার তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে টাল্লোর মুনাফার হার হবে ৭০ ডলারে ২৬ দশমিক ৫%, ১২০ ডলার ৩৬ দশমিক ৩% ও ১৮০ ডলারে ৪৪ দশকি ৪%। অথচ উগান্ডার ভাগ বৃদ্ধি পাবে না। উগান্ডার পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কমিশনারও স্বীকার করেন যে, উগান্ডা সুবিধা নিতে পারেনি।

উগান্ডার এই স্বার্থহানির ক্ষেত্রে কাজ করেছে রাজনীতি। এ ক্ষেত্রে গত বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং সে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ভূমিকা পালন করেছে। দেশের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা না করে স্বল্পমেয়াদী রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ ধরনের মন্তব্য উক্ত প্রতিবেদনে করা হয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ নির্ধারণ করে দিচ্ছে রাজনীতিকে, আর অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে রাজনীতিকে কাজে লাগানো হচ্ছে।

আবার উল্লেখিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকল্পে খরচ যতো বৃদ্ধি পাবে উগান্ডা সরকারের প্রাপ্তি যাবে তত কমে। এ বিষয়টি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির শর্তগুলো এমন যে, মূল্যজনিত ঝুঁকি থেকে তেল কোম্পানি রক্ষা পেয়েছে। চুক্তিটির সালিশ, ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোও কোম্পানির মুনাফাকে রক্ষা করে। এ সুরক্ষা করা হয় উগান্ডার আইনে কোনো পরিবর্তন বা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন থেকে। এর অর্থ দাঁড়ায় নিজ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে উগান্ডার ওপর সীমাবদ্ধতা চেপে বসা। অথচ একই সঙ্গে উগান্ডার নাগরিকরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার বা পরিবেশ রক্ষার কোনো ব্যবস্থা থেকে সুবিধা নিতে পারবেন না। কার্যত, তেল কোম্পানির পক্ষে ঝুঁকি বহন করতে হয় উগান্ডার জনসাধারণকে।

চুক্তিতে তেল কোম্পানিগুলোকে মহাসমুদ্র তীরবর্তী কোনো বন্দর পর্যন্ত তেল পাইপ বসানোর অধিকার দেয়া হয়েছে। অশোধিত তেল যাতে তেলবাহী জাহাজে ভরা যায়, সে উদ্দেশ্যে পাইপ বসানো হতে পারে। এ পাইপ বসানো হতে পারে উগান্ডা ও কেনিয়ার মধ্যদিয়ে। এ অধিকার প্রায় এক তরফা কেবল তেল কোম্পানিগুলোর। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এ অধিকারটি তেল কোম্পানিগুলোর এবং সরকারের কাজ হচ্ছে সে পরিকল্পনাকে সাহায্য করা। কিন্তু চুক্তিতে এ কথা বলা হয়নি যে, তেল কোম্পানিগুলো পাইপ বসালে কি কি প্রভাব পড়তে বা প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে, সেটা আগেই নিরূপণ করতে হবে বা পরিবেশগত ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থাকতে হবে বা নির্দিষ্ট একটি মান বজায় রেখে পাইপ বসাতে হবে। আবার পাইব বসানোর বিষয়টি অনুমোদনের আগে প্রস্তাবটি পরীক্ষানিরীক্ষা বা পরিকল্পনাটির রূপায়ণ তত্ত্বাবধান করার অধিকার চুক্তিগত দিক থেকে উগান্ডা সরকারের রয়েছে। এ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইপ বসানোর ক্ষেত্রে নানা জটিল বিষয় রয়েছে, ঝুঁকিও আছে। জলাভূমি, শহরসহ কোন কোন পথে পাইপ বসানো হবে, পাইপে কোন রংয়ের প্রলেপ দেয়া হবে, তাপ নিরোধে পাইপ কিভাবে আবরণ যুক্ত করা হবে, তাপমাত্রা, এসব এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য। এ পাইপের নিরাপত্তার দায়িত্বও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, তেলের পাইপ লাইন নিয়ে তেল কোম্পানিগুলো লাভের সুযোগ খোঁজে। অশোধিত তেলের সঙ্গে যে গ্যাস উঠে আসে ভূগর্ভ থেকে, সেটিকে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের ভাষায় ইংরেজিতে বলা হয় অ্যাসোসিয়েটেড গ্যাস। এটিকে বাংলায় বলা যেতে পারে সাথী গ্যাস। ননঅ্যাসোসিয়েটেড গ্যাস বা অসাথী গ্যাস হচ্ছে প্রধানত গ্যাস ক্ষেত্র থেকে আহরিত প্রাকৃতিক গ্যাস। অ্যাসোসিয়েটেড গ্যাসের ওপর প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকে তেল কোম্পানির। এ গ্যাস ব্যবহার করা লাভজনক কিনা, সে ব্যাপার কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তেল কোম্পানি এ গ্যাস যত ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারে নিখরচায়। এর ফলে উগান্ডার জনসাধারণের এ গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ কমে যায়। তাছাড়া, এ গ্যাস প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা অর্থনেতিক দিক থেকে লাভজনক কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক তেল কোম্পানি। চুক্তিতে কেবল বলা হয়েছে, লাইসেন্স প্রাপক, অর্থাৎ তেল কোম্পানির ‘যুক্তিসঙ্গত মতামতই’ এ ব্যাপারে নির্দেশনা যোগাবে। অর্থাৎ তেল কোম্পানির যুক্তিসঙ্গত মতামতের ওপর নির্ভর করছে সিদ্ধান্ত। আর কোম্পানির যুক্তিসঙ্গত মতামত নিঃসন্দেহে কোম্পানির স্বার্থের বিপক্ষে যাবে না। আরো বিপজ্জনক ব্যাপার হচ্ছে, তেল কোম্পানি চাইলে সরকারের সম্মতি নিয়ে এ গ্যাস পুড়িয়ে ফেলতে পারে বলে চুক্তিতে উল্লেখিত হয়েছে। এ সম্মতি অযৌক্তিকভাবে বিলম্বিত করা হবে না বা আটক রাখা হবে না, মর্মেও ব্যাখ্যা রয়েছে।

উল্লেখ করা দরকার যে, গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা পরিবেশের জন্য অনেক দিক থেকে ক্ষতিকর। প্রাণের জন্য, জলবায়ুর জন্য তা ক্ষতিকর। নাইজেরিয়ায় শেল ও অন্যান্য তেল কোম্পানিকে এ গ্যাস পোড়ানো বন্ধে বাধ্য করার জন্য সরকারকে প্রবলভাবে লড়তে হয়। আদালত বারবার আদেশ দিলেও তেল কোম্পানিগুলো সে আদেশ অবজ্ঞা করছিল। এ ধরনের গ্যাস পোড়ানোর উদাহরণ আরো দেশে রয়েছে। উগান্ডায় যদি সরকার এভাবে গ্যাস পোড়ানোকে অপচয় বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মনে করে তা পোড়ানো বন্ধ করতে বলে তেল কোম্পানিকে, এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে, তাহলে তেল কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেবে উগান্ডা সরকার অথবা সালিশের জন্য লন্ডনে যেতে হবে বলে উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়। অর্থাৎ এখন থেকে শিক্ষণীয় প্রথম বিষয়টি হচ্ছে: গড় কথাবার্তা না বলে চুক্তিটিকে খুঁটিয়ে নানা দিক থেকে দেখতে হয়। গড় কথাবার্তায় প্রথমে হাততালি পাওয়া গেলেও অবশেষে দেশের স্বার্থরক্ষা হয় না।

উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উগান্ডার নাগরিকদের তেল আহরণ কাজে প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তিতে যে ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া এ খরচ চূড়ান্ত অর্থে উগান্ডা সরকারের ঘাড়ে চাপবে, কারণ তেল কোম্পানি এ প্রশিক্ষণের জন্য যে অর্থ দেবে সেটাকে খরচ অর্থাৎ খরচ তেল হিসেবে দেখাবে তেল কোম্পানি। অর্থাৎ বোঝা চাপবে উগান্ডার জনসাধারণের ওপরেই।

চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পরিবেশ সংক্রান্ত ধারা। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে যা বলা হয়, সেটা সার কথায় হচ্ছে: শব্দ বাক্যের চাতুরি দিয়ে তেল কোম্পানিকে দায়মুক্ত ও বোঝামুক্ত রাখা হয়েছে। চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ও শিল্প ক্ষেত্রে অনুসৃত উত্তম কর্মপন্থা অনুসৃত হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই উত্তম কর্মপন্থার নানা ধরণ রয়েছে এবং কার্যতর তা অর্থহীন হয়ে ওঠে। কারণ, তেল কোম্পানিগুলোর কর্মপন্থা প্রধানত নির্ভর করে স্থানীয় অর্থাৎ উগান্ডার বিধিবিধান আইনগুলোর ওপর। অর্থাৎ, যে সব আইন প্রয়োগযোগ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যে দেশে এ বিষয়ে শৈথিল্য দেখা গেছে, সেখানেই তেল কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো কাজ কারবার করে পরিবেশের ক্ষতি করেছে। এর উদাহরণ হিসেবে ইকুয়েডর, রাশিয়া ও নাইজার অঞ্চলের উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবেশ ধ্বংস করার দায়ে জরিমানা করার কোনো ব্যবস্থার কথা উগান্ডার উৎপাদন শরিকানা চুক্তিতে বলা হয়নি। তেল কোম্পানিগুলো অনুসন্ধান কাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবেশের গুরুতর ক্ষতি করছে।

এ প্রতিবেদনে বলা হয়, উৎপাদন শরিকানা চুক্তিতে বিরোধ মীমাংসার যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা উগান্ডার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে। এ চুক্তিতে উগান্ডা রাষ্ট্রকে একটি বাণিজ্যিক অস্তিত্ব হিসেবে গণ্য করে, রাষ্ট্রকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সমপর্যায়ে নাামিয়ে আনা হয়। ফলে জনস্বার্থের দায়িত্বের ও সার্বভৌমত্বের ধারণাগুলো আর কার্যকর থাকে না। তেল কোম্পানি ও উগান্ডা রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে শালিসের জন্য যেতে হবে লন্ডনে, উগান্ডার কোনো আদালতে নয়। লন্ডনে শালিস আয়োজনের ব্যবস্থা করবে ইন্সটিটিউট অব পেট্রোলিয়াম। পরবর্তীকালে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয় এনার্জি ইন্সটিটিউট। এটি কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়। বরং এটি ব্রিটেনে তেল কোম্পানিগুলোর ও তেল পেশাজীবীদের স্বার্থরক্ষা করে। এ প্রতিবেদন রচনাকালে এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন তেল কোম্পানি শেল ইউকের চেয়ারম্যান জেমস স্মিথ। তিনিই নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করবেন সালিশের জন্য।

এছাড়া উগান্ডার আইন প্রণয়নগত সার্বভৌমত্বও ক্ষুণ্নহয় এ চুক্তির মাধ্যমে। উল্লেখিত প্রতিবেদন রচনাকাল পর্যন্ত উগান্ডার সম্পাদিত পাঁচটি উৎপাদন শরিকানা চুক্তি ছিল। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সরকার বা তেল কোম্পানিগুলো এসব চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। অর্থাৎ গোপনীয়তা এসব চুক্তির অন্যতম দিক। গোপনীয়তা বজায় রাখায় জনসাধারণ এসব চুক্তি সম্পর্কে অবহিত নন। তারা জানতেও পারেন না যে, এসব চুক্তি কিভাবে সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করে, তাদের দেশের স্বার্থের ক্ষতি করে। এগুলো গোপন থাকায় পরিবেশের ক্ষতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নানা ধরনের সংঘাত, জনসাধারণের স্থানচ্যুতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি দেশবাসী জানতে পারেন না।

হিসাব নিরক্ষরণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে এ প্রতিবেদনে বলা হয়: এর ফলে তেল কোম্পানিগুলোকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

এসব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তেল আহরণে উগান্ডার সম্পাদিত উৎপাদন শরিকানা চুক্তি দেশটির জন্য সুবিধাজনক বা লাভজনক হয়নি। বরং তা হয়েছে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ লোপাটের আইনসম্মত আবরণ।।