Home » অর্থনীতি » পুঁজিবাদের একটি ভুতুড়ে গল্প – (শেষ পর্ব)

পুঁজিবাদের একটি ভুতুড়ে গল্প – (শেষ পর্ব)

বৈশ্বিক পুঁজির কাঠামোগত ফাটল

অরুন্ধতী রায়

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arundhati-1ওআরএফএর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দৃশ্যত সোজাসাপ্টা: ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।’ আর জনমত গঠন ও প্রভাবিত করতে ‘পশ্চাৎপদ জেলাগুলোতে চাকরি সৃষ্টি করার মতো প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর জন্য টেকসই, বিকল্প নীতি নির্ধারণ এবং পারমাণবিক, জৈব ও রাসায়নিক হুমকি মোকাবিলায় সর্বাধুনিক কৌশল নির্ধারণ।’

ওআরএফের বর্ণিত লক্ষ্যউদ্দেশ্যের মধ্যে ‘পারমাণবিক, জৈব ও রাসায়নিক যুদ্ধ’এর মতো শব্দগুলো থাকায় আমি শুরুতে বেশ হতবুদ্ধিকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবে সেটা বেশি সময়ের জন্য নয়। এর ‘প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের’ দীর্ঘ তালিকায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুই অস্ত্র নির্মাতা রেথিয়ন ও লকহিড মার্টিনের নাম দেখতে পাওয়ার পর আমার ঘোরলাগা ভাব কেটে যায়। ২০০৭ সালে রেথিয়ন ঘোষণা করে, তারা ভারতের দিকে নজর দিয়েছে। এর মানে কি এই যে, ভারতের ৩২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্তত একটি অংশ রেথিয়ন ও লকহিড মার্টিনের তৈরি অস্ত্র, নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান, রণতরী আর পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হবে?

যুদ্ধ করার জন্য কি আমাদের অস্ত্র প্রয়োজন? না কি অস্ত্রের বাজার তৈরির জন্য আমাদের যুদ্ধের প্রয়োজন? তবে আর যাই হোক ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অর্থনীতি বিপুলভাবে তাদের অস্ত্র শিল্পের উপর নির্ভরশীল। এই একটি শিল্পকে তারা চীনে আউটসোর্স করেনি।

মার্কিনরাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যেভাবে মার্কিন মিত্রের ভূমিকা পালন করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার নতুন স্নায়ুযুদ্ধে ভারতও সেটা করার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে। (এবং দেখুন পাকিস্তানের কী হাল হয়েছে।) যেসব কলামিস্ট ও ‘কৌশলগত বিশ্লেষক’ ভারত ও চীনের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, আপনি দেখবেন তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্দোআমেরিকান থিংকট্যাংক ও ফাউন্ডেশনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত অংশীদার’ হওয়া মানে এই নয় যে রাষ্ট্র দুটির প্রধানদের মধ্যে যখনতখন ফোনে আলাপ হয়। বরং এর মানে হলো প্রতিটি পর্যায়ে সহযোগী হিসেবে কাজ করা (বা হস্তক্ষেপ করা)। এর মানে ইউএস স্পেশাল ফোর্সেসকে ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে দেওয়া (জনৈক পেন্টাগন কমান্ডার সম্প্রতি বিবিসিকে তা নিশ্চিত করেছেন)। এর মানে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কৃষি ও জ্বালানী নীতি পরিবর্তন, বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত খুলে দেওয়া। এর মানে খুচরা বাজার উন্মুক্ত করা। এর মানে এমন এক সঙ্গীর নির্দেশে ভালুকের থাবার মধ্যে নাচা যে নাচতে অস্বীকার করা মাত্র তাকে ধ্বংস করে দেবে।

ওআরএফের তালিকায় থাকা ‘প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের’ মধ্যে আপনি পাবেন র‌্যান্ড করপোরেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংক, ব্র“কিংস ইনস্টিটিউশন (যার ঘোষিত মিশন হলো ‘এমনসব নতুন নতুন ও বাস্তবতাপূর্ণ সুপারিশ করা যেগুলো তিনটি বৃহত্তর লক্ষ্য এগিয়ে নেবে: আমেরিকান গণতন্ত্র জোরদার করা; সব আমেরিকানের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ বেগবান, নিরাপত্তা ও সুযোগ সৃষ্টি করা; এবং আরো উন্মুক্ত, নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সহযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’)। আপনি জার্মানির রোসা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশনকেও দেখবেন। (দুর্ভাগা রোসা! তিনি সমাজতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। অথচ তার নামও এই তালিকায় দেখা যায়!)

যদিও বলা হয়ে থাকে, পুঁজিবাদ হলো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা, কিন্তু আসলে যারা খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করে, তারা নিজেদের সর্বব্যাপী ও স্বার্থ পূরণের জন্য ঐক্য গড়তে দক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে। পশ্চিমা মহা পুঁজিপতিরা ফ্যাসিবাদী, সমাজবাদী, স্বেচ্ছাচারী ও সামরিক স্বৈরাচারের সঙ্গে ব্যবসা করেছে। তারা সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, নতুন নতুন রাস্তা বের করে নিতে পারে। তারা দ্রুত চিন্তা করতে এবং অবিশ্বাস্য ধূর্ত কৌশল প্রণয়ন করতে সক্ষম।

তবে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সফলভাবে ক্ষমতাধর হওয়া, অবাধ বাজারমুখী ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ জড়ানো এবং সামরিক শক্তিতে দেশ জয় করা সত্ত্বেও পুঁজিবাদ একটি সঙ্কট অতিক্রম করছে, যারা গভীরতা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। মার্কস বলেছেন, ‘বুর্জোয়রা যাকিছু উৎপাদন করছে, সর্বোপরি, সেগুলো তাদের নিজেদেরই কবর রচনা। এর পতন এবং শ্রমিক শ্রেণীর জয় সমানভাবে অনিবার্য।’

শ্রমিক শ্রেণী, মার্কস একে যেভাবে দেখেছিলেন, অব্যাহতভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছে। কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, চাকরি পাওয়া যায় না, ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ হয়। শ্রমিক শ্রেণী, বছরের পর বছর ধরে, সম্ভাব্য প্রতিটি উপায়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ভারতে এটা দেখা যায় মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুর, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিন্দুর, আদিবাসীর বিরুদ্ধে দলিতের, বর্ণের বিরুদ্ধে বর্ণের, অঞ্চলের বিরুদ্ধে অঞ্চলের লড়াইয়ে। কিন্তু তবুও বিশ্বজুড়েই এটা প্রত্যাঘাত করছে। চীনে অসংখ্য ধর্মঘট, গণআন্দোলন হয়েছে। ভারতে, বিশ্বের দরিদ্রতম লোকজন তাদের ভূমিতে কয়েকটি ধনীতম করপোরেশনকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।

পুঁজিবাদ এখন সঙ্কটে। চুইয়ে পড়া তত্ত্ব ব্যর্থ হয়েছে। এখন উত্থানও সমস্যায় পড়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক মন্দার সৃষ্টি হচ্ছে। ভাতের প্রবৃদ্ধির হার ৬.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদেশি বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে। প্রধান আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলো বিপুল অর্থের উপর বসে আছে, তারা বুঝতে পারছে না, কোথাও বিনিয়োগ করতে হবে, কিভাবে আর্থিক সঙ্কট কাটবে তারা জানে না। বৈশ্বিক পুঁজির বিশাল ব্যবস্থায় বড় কাঠামোগত ফাটল দেখা দিয়েছে।

পুঁজিবাদের আসল ‘গোরখোদকরা’ হয়তো তাদের নিজেদের মোহগ্রস্ত কার্ডিনালদের, যারা মতাদর্শটিকে ধর্মে রূপান্তরিত করেছিল, সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবে। তাদের কৌশলগত দুর্দান্ত মেধা সত্ত্বেও তারা সম্ভবত এই সাধারণ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছে না: ‘পুঁজিবাদ পৃথিবীকে ধ্বংস করছে।’ অতীতের সঙ্কট মোকাবিলায় তারা পুরনো যে দুটি কৌশল– ‘যুদ্ধ’ ও ‘শপিং’অবলম্বন করেছিল, তা এখন আর কাজ করছে না।

আমি দীর্ঘ সময় অন্টিলার বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম, সূর্য ডোবা দেখছিলাম। আমি আশ্চর্য হলাম, টাওয়ারটি যতটা উঁচু, ঠিক ততটাই গভীর। ভূসমতল থেকে এটা ২৭ তলা পর্যন্ত ভেতরে নেমে গেছে, মাটির নিচে ফনা তুলে আছে, বুভুক্ষুর মতো পৃথিবীর তলা থেকে এর মূল উপাদান শুষে নিয়ে একে ধোঁয়া আর স্বর্ণে রূপান্তরিত করছে।

আম্বানিরা কেন তাদের ভবনটির নাম অন্টিলা রাখল? অন্টিলা হলো কল্পকথার একটি দ্বীপপুঞ্জের নাম, তার হদিস পাওয়া যায় ৮ম শতকের ইবেরীয় কিংবদন্তিতে। বলা হয়ে থাকে, মুসলিমরা হিসপানিয়া জয় করার সময় ষষ্ট খ্রিস্টান ভিসিগোথিক বিশপরা এবং তাদের গির্জাগুলোর লোকজন জাহাজে করে পালিয়ে গিয়েছিল। কয়েক দিন, কিংবা কয়েক সপ্তাহ সমুদ্রে কাটানোর পর তারা অন্টিলা দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করল। তারা সেখানেই বসতি স্থাপন করে নতুন সভ্যতা গড়ার সিদ্ধান্ত নিল। তারা বর্বরদের প্রাধান্যবিশিষ্ট তাদের দেশের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পর্কচ্ছেদের জন্য তাদের নৌকাগুলোকে পুড়িয়ে দিল।

আম্বানিরা তাদের টাওয়ারকে অন্টিলা বলার মাধ্যমে কি তাদের দেশের দরিদ্র ও আবর্জনা থেকে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ এবং নতুন একটি সভ্যতা বিকাশের আশা করেছিল? এটা কি ভারতের সবচেয়ে সফল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত কার্যক্রম? মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের বহির্জগতে সরে যাওয়া?

মুম্বাইতে রাত্রি নেমে এলো, কোঁকরানো লিনেনের শার্ট পরে প্রহরীরা ফুটফাট শব্দ করা ওয়াকিটাকি নিয়ে অন্টিলার নিষিদ্ধ গেটগুলোর বাইরে আবির্ভূত হলো। সম্ভবত ভূতগুলোকে তাড়িয়ে দিতে আলো জ্বালানো হলো। প্রতিবেশিরা অভিযোগ করে, অন্টিলার তীব্র আলো রাত কেড়ে নিয়েছে। হয়তো আমাদের জন্য রাত ফিরিয়ে আনার এটাই উপযুক্ত সময়।।

(শেষ)