Home » প্রচ্ছদ কথা » প্রধানমন্ত্রীর মাইনাস হওয়ার আতঙ্ক

প্রধানমন্ত্রীর মাইনাস হওয়ার আতঙ্ক

আমীর খসরু

arrested bnp leadersদুই সপ্তাহ রাজনৈতিক অঙ্গণে এক অস্বস্তিকর নিরবতা ছিল। জনগণ বুঝতে পারছিলেন, এই নিরবতার অর্থ একেবারেই নিরবতা নয়, সাময়িক। অস্বস্তিকর নিরবতা এই কারণে যে, রাজনীতির মূল সমস্যার সমাধান না করে, বিরোধী দলকে নির্মূল করার বাসনায় গ্রেফতার, নির্যাতন বহাল রেখে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, এটা যে কেউই বুঝতে পারেন। এ কারণে জনমনে শঙ্কা ছিল, এই নিরবতা সঙ্কট উত্তর স্বস্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদী নয়। আর বাস্তবে হয়েছেও তাই। গ্রেফতারকৃত বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের জামিন দেয়া হলো না। কি কারণে এবং কেন তা যে কেউই উপলব্ধি করতে পারেন। জামিন দেয়া যে হবে না, বরং সরকার আরো ভয়ঙ্কর পথেই যাচ্ছে তার যৎসামান্য প্রমাণ মিলেছে দুইজন মন্ত্রীর বক্তব্যে। আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কয়েকদিন আগে স্বদ্বম্ভে উচ্চারণ করলেন, বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় সব নেতাকর্মীকে জেলে দিলেই দেশ শান্ত হয়ে যাবে। মঙ্গলবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বনমন্ত্রী বললেন, বিএনপির সব নেতাকে জেলে পাঠানো হবে। এই যৎসামান্য উদাহরণ দিয়েই বোঝা যায়, সরকারের মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড কি হতে পারে, সে সম্পর্কে। জেলে নিয়ে, নির্যাতন করে, বিরোধী দল নিশ্চিহৃ করে দেয়ার যে কৌশল সরকার গ্রহণ করেছে, তা কখনই কোনো দেশে, কোনো কালে কাজে আসেনি, বরং যারা এ কাজটি করেন, তারাই অতল গহীন পথে হারিয়ে যান। এমন এক অস্বস্তিকর এবং ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দেশ চলছে, এক অজানা গন্তব্যে।

দেশেবিদেশে কে কি বললো, তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না। দেশের আমজনতা থেকে বুদ্ধি জ্ঞান আছে এমন শ্রেণী পর্যন্ত সবাই বলছেন, সরকার যে পথে যাচ্ছে তা সঠিক পথ নয়। বিদেশি রাষ্ট্র এবং নানা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে সঙ্কট নিরসনের জন্য। কিন্তু সরকার কোনো কিছুই আমলে নিচ্ছে না। সবশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মানবাধিকার রিপোর্টেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি এবং স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্রেফতার, আটক রাখা, বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকারের বাধা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বলা হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের রিপোর্টেও রাজনৈতিক সহিংসতার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে। আরব বিশ্ব, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কি পশ্চিম কি পূর্ব সবাই সমঝোতার কথা বলছেন। কিন্তু এসব বলায় সরকারের কিছু যায় আসে না।

বরং এই দমনপীড়ন নির্যাতনের পরিবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সোমবার নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বলেছেন। তিনি বলেছেন, বিরোধী দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে স্পষ্ট যে, প্রধান বিরোধী দল এবং এর জোটভুক্ত দল বা অন্যান্যরা নির্বাচনে আসুক বা না আসুক, সরকার একটি নির্বাচন করবেই। অতীতের এককভাবে নির্বাচনের রেকর্ড এ দেশে ভালো নয়, তা নিশ্চয়ই সরকার ভুলে যায়নি। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলেই নির্বাচনের ইতিহাস যদি কারো মনে থাকে, তাহলে এ কথা নিশ্চয় মনে পড়বে, নির্বাচনের ফলাফল ওলটপালট করলে জনসমর্থন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সে সময় অবশ্য তৎকালীন বিরোধী দলকে নামকাওয়স্তে হলেও নির্বাচন করতে দেয়া হয়েছিল। এই চল্লিশ বছরে নেতা বদল হয়েছে, পরিস্থিতির বদল হয়েছে, বদল হয়েছে অনেক কিছুই। আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য হলেও, একদলীয় হওয়ার কারণে তা একদিন স্থায়ী হয়েছিল।

বিরোধী দলবিহীন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান কতোটা সম্ভব, তা একটি বিশাল প্রশ্ন। তবে সৈয়দ আশরাফ, কামরুল আর হাসান মাহমুদের বক্তব্যের মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। যোগসূত্র এখানে যে, নির্যাতননিপীড়নের মাধ্যমে যেনতেন একটি নির্বাচন করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করা।

আশরাফুল ইসলাম মাত্র কয়েকদিন আগে প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের কথা বলেছিলেন। সবারই মনে সামান্য হলেও আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সে সংলাপের কথা আর শোনা যায়নি। এ থেকে বড় একটি শিক্ষা নেয়ার আছে। আর তাহলো, ছোটবেলার পড়া একটি উপদেশবাণী, ….. লোকের মিষ্ট কথায় ভুলিও না।

একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রধান বাধা, নির্বাচনটি কার অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে। সরকার বুঝে শুনে আশপাশের অভিভাবকদের বুদ্ধি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সংবিধান থেকে মুছে ফেলে। বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুযায়ী নির্বাচন এই সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হতে হবে, সরকার বরাবরই এ বিষয়টি চায় এবং এ লক্ষ্যে তারা যা কিছু প্রয়োজন তা করতে রাজি আছে। এখন সমঝোতার লক্ষ্যে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের সময়ে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা দেয়া হয়েছে দুটো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রী এর জবাবে গত রোববার বলেছেন, আগামী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন ফর্মুলা ও সুপারিশের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং আমাকে মাইনাস করার জন্য এসব ফর্মূলা দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, তার মনস্তত্ব সম্পর্কে। প্রধানমন্ত্রীর এই মনস্তাত্বিক সন্দেহ কেন হয়েছে, তা বলা মুশকিল। প্রধানমন্ত্রী যদি নিশ্চিত হন যে, তিনি তার শাসনামলে মাইনাস হওয়ার মতো কিছু করেননি, তাহলে সমস্যা কোথায়? তিনি যে বক্তৃতাবিবৃতি দিয়ে থাকেন, তাতে তাকে খুব নিশ্চিত এবং দৃঢ় বলে মনে হয়। কিন্তু এই বক্তব্যের পরে প্রধানমন্ত্রীর মনোজগতের ভিন্ন ভাবনা সম্পর্কে একটি পরিস্কার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি এখন মাইনাস হবার ভয়ে শঙ্কিত কেন? মাইনাস হবার ভয় থাকবে তাদেরই, যারা জনগণকে ভয় পায়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে কামরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলামসহ মন্ত্রী আর নেতানেত্রীদের বক্তব্যের মধ্যে নিদারুণ এক সংযোগ খুজে পাওয়া যায়,

আর তাহলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতাকে আকড়ে ধরে রাখার মনোবাসনা। তাহলে কি প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার গ্রেফতারনির্যাতন অব্যাহত রেখে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে, একদলীয় একটি নির্বাচন করে মাইনাস হওয়া ঠেকাতে চান? একথা বলতেই হবে, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে বিশ্বাস না করার অর্থ হচ্ছে, জনগণের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। আর যখন শাসক জনগণের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তখন তাকে অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী পথে যেতেই হয়। এটাই হচ্ছে জনগণকে বিশ্বাস করতে না পারার পরিণতি।।