Home » অর্থনীতি » রামপালে ভারতের বিদ্যুৎ আগ্রাসন

রামপালে ভারতের বিদ্যুৎ আগ্রাসন

বি.ডি. রহমতউল্লাহ

coal based power plantবাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মানের লক্ষ্যে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে গত ২০ এপ্রিল শনিবার তিনটি চুক্তি সই হয়েছে। উল্লিখিত তিনটি চুক্তি হলো বিদ্যুৎ ক্রয় (পিপিএ), প্রকল্প বাস্তবায়ন (আইএ) ও যৌথ বিনিয়োগের সম্পূরকসংক্রান্ত চুক্তি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্রাক্কলনে দেড়শ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হবে বলে ধরা হয়েছে। ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হবে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য গত বছর বাংলাদেশভারত ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যুৎ কোম্পানি (বিআইএফপিসি) নামে একটি যৌথ কোম্পানিগঠন করা হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) যৌথভাবে এ কোম্পানির মালিক। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ভারতের সঙ্গে শুধু দ্বিপক্ষীয় নয়, উপআঞ্চলিক সহযোগিতার দুয়ার উন্মোচন হয়েছে! আমাদের স্বার্থের বিনিময়ে কিনা তা তিনি বলেননি!!

পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের সমস্ত মতামতকে অগ্রাহ্য করে ঔপনিবেশিক সরকারের একজন যথার্থ মন্ত্রীর ন্যায় তিনি বলে উঠলেন আন্তর্জাতিক সব মান রক্ষা করে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, তাই পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। ভারতের বিদ্যুৎ সচিব পি উমা শঙ্কর বলেন, এ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এ প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনিও মিথ্যাচার করলেন।

আগামী ২০১৮ সালে এ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন হবে বলা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের বিরোধিতার মুখে এ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করল সরকার। পরিবেশবাদীদের দাবি এ কেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবনের পরিবেশ বিপন্ন হবে। যদিও বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলাম চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বলেন, আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। আমরা এমন টেকনোলজি এ কেন্দ্র স্থাপন করব, যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পিডিবি এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ বছর বিদ্যুৎ কিনবে। কেন্দ্র নির্মাণের ব্যয় করবে ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানি। সম্ভাব্য প্রকল্পর ব্যয় ধরা হয়েছে দেড়শ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করা হবে। বাকি ৩০ শতাংশ সমানভাবে বাংলাদেশ ও ভারত জোগান দেবে। চুক্তিপত্রে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়নি। তবে দাম নির্ধারণের জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তির দিক: ভারতের কথামত অনেকটা নিদের্শের মতো বাংলাদেশ ভারত একটি যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে এই ১৩২০ মেঃ ওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সুন্দরবনের চারদিকে ১০ কিঃ মিঃ ব্যাপী বিস্তৃত এলাকায় রামপালে নির্মিত হবে। ঘোষনা করা হয়েছে যে, ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবোর্ড) ৫০৫০ অনুপাতে যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে এটি নির্মিত ও পরিচালিত হবে। তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘোষিত কোন কার্য্যক্রম বা প্রকল্পের বিষয়ে বা কোন চুক্তি আজ পর্যন্ত সরকারীভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বরং এ দু’দেশের যে কোন প্রকল্পকে দু পক্ষীয় না বলে বরং এক পক্ষীয় আরো সহজ কথায় ভারত পক্ষীয় বলাই যৈাক্তিক বলে মনে হয়।

এর বিশদ বিশ্লেষণ করলে যে কথাগুলো স্পষ্ট করে বলা যায় তা হলো,

আমাদের সুন্দর ভূমিতে ভারত এদেশের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বর্জ্য উৎপাদনকারী কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বানাবে, যার বিনিময়ে সে লাভ তো নিবেই উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যুনতম অর্ধেক মালিকানা পাবে।অনেকটা জোর করে চাপিয়ে দেয়া এ চুক্তির মাধ্যমে ভারত তার জমে থাকা অচল অর্থ পুঁজিকে অনেকটা জোর করে এদেশে ঋণ দিয়ে সচল করবে।

এ প্রকল্পে ভারত তুলনামূলকভাবে বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে নিজস্ব নির্মিত নিম্নমানের পাওয়ার ষ্টেশন ও সম্পৃক্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে কৈাশলে বাণিজ্য করার সুযোগ তৈরী করবে।

এ প্রকল্পে ভারত তার দেশীয় লোকবল, ঠিকাদার,প্রকৈাশলী সহ প্রায় সবধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে প্রকল্প ঋণ তো বটেই, প্রকল্পের সমুদয় অর্থ উপার্জ্জনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এ প্রকল্পে ভারত তার অত্যন্ত নিম্নমানের কয়লা যা মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী বর্জ্য উৎপাদনকারী এবং “সবুজ বিনাশী গ্যাস”(গ্রিন হাউস গ্যাস) ও রাসায়নিক বৃষ্টির (এসিড) সৃষ্টি করে তা সরবরাহ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।

১৯১০ ইং সালে কোপেনহেগেনে শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র ভারত কর্তৃক পরিবেশ দূষণকারী বর্জ্য উৎপাদনকারী কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সৃষ্ট পরিবেশ দূষনের হুমকি সৃষ্টির যাবতীয় কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদের যে ন্যায্য যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তা এখোন মুখ থুবড়ে পড়বে।

ভারত ইতোমধ্যেই অন্যান্য ক্ষেত্রে যথাঃ টিপাইমুখ বাঁধ, ট্রানজিট,মালামাল রফতানীতে ননট্যাক্স ব্যারিয়ার, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত হত্যা,টিভি চ্যানেল প্রদর্শনীতে জাত্যাভিমান ও সম্প্রসারণবাদী মনোভাবের পরিচয় দিয়ে আমাদেরকে যেমন একচেটিয়া চুক্তিতে বাধ্য করছে, তেমনি ধরা যায় এক্ষেত্রেও এধরনের একচেটিয়া চুক্তিই সম্পাদন করা হলো। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুতের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত অন্য দেশের খবরদারীতে দেয়া হলে, বিশেষ করে ভারতের মতো দেশ যা নিয়তঃই আমাদেরকে প্রতারণা করছে, সে ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা তো বিঘিœত হবেই এবং বিদ্যুৎ খাতের সংকটকে ব্যবহার করে আমাদেরকে জিম্মি করার সুযোগ বিস্তৃত হবে।

স্বাভাবিকভাবেই এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ফলে ভারত নিশ্চিত হবে বাংলাদেশ তাদের অধীনস্ত একটি ঔপনিবেশিক ধরনের রাষ্ট্র যা পরবর্তীতে তাদেরকে আরো লাভজনক চুক্তি সম্পাদন করতে উৎসাহিত করবে।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে যে সব বিপর্যয় ঘটবে: () রামপালসহ ২০ কিঃ মিঃ বিস্তৃত এলাকায় জীববৈচিত্র যথা গাছপালা, ঝোঁপঝাড়, বনজ গাছগাছালি, বন্যপ্রানী, মাছ, সাপ, মাটি ও পানিতে জন্ম নেয়া জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী সময়ের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে যাবে।

() অন্যান্য বায়ূদূষণকারী বর্জ্য ও ঝঙ উদগীরনের ফলে বনজ গাছগাছালি ধ্বংস হবে, এদের বংশ বৃদ্ধি প্রচন্ডভাবে হ্রাস পাবে এবং ওই এলাকায় ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মরুময় প্রক্রিয়া শুরু হবে।

() কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে বায়ূ মন্ডলে এবং ভূমিতে ঝঙ জমে এসিড রেইনের (রাসায়নিক বৃষ্টি) উৎপত্তি হবে। এই এসিড রেইনের ফলশ্রুতিতে হরিন ও সুন্দরবনের পৃথিবীখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জীবনে হুমকি দেখা দিবে এবং তাদের বংশ বৃদ্ধি করার প্রজনন ক্ষমতা প্রচন্ডভাবে হ্রাস পাবে। এসব প্রাণীকূল অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হবে।

() নদীর পানির গুনাগুন এবং নদীর ভূমিতলের ঋনাত্মক পরিবর্তনের ফলে চিংড়ীসহ অন্যান্য মাছের সংখ্যা প্রচন্ড হ্রাস পাবে। কয়লা থেকে উদ্ভূত বর্জ্জ্য মাছের খাদ্য মান বিষক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত হবার ফলে এ মাছ খেলে মানুষ ক্যান্সারসহ অন্যান্য দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে।

() এ কয়লা থেকে নির্গত বর্জ্জ্য জমির সাথে মিশ্রনের ফলে ফসল উৎপাদনের উর্বরতা প্রচন্ড হ্রাস পাবে।

() এখনি ওই অঞ্চলে পানির লেভেল ১০০০ ফুট নীচে নেমে গেছে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া বয়লারের শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রচুর পানি উত্তোলন করতে হবে বিধায় পানির স্তর আরও অনেক অনেক নীচে নেমে যাবে। ফলশ্রুতিতে সমগ্র এলাকায় পানির এক তীব্র সংকট দেখা দিবে।

() সুন্দরবন বাংলাদেশের সম্ভাব্য সুনামী ও ঝড় প্রতিরোধের এক অদম্য প্রহরী হিসেবে কাজ করছে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ওই এলাকায় পরিচালিত হলে অচিরেই এ বন উজার হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে ঝড়, সুনামী সুন্দরবনের অনুপস্থিতিতে মানব বসতি এলাকায় ঝাপিয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন হানি ও সম্পদের বিনাশ ঘটবে।

() নদীতে বসবাসকারী প্রাণীসমূহ যা লক্ষ লক্ষ বছর বিচরন করে পরিবেশ ও নদীর পানিকে মানব বান্ধব করে রেখেছেএগুলো সব বিনাশ হয়ে যাবে।

() ফলফলাদির উৎপাদন বৃদ্ধি অসম্ভব রকম হারে হাস পাবে ফলে বেকারত, দারিদ্র বৃদ্ধিসহ সমাজে নৈরাজ্য ও হতাশার সৃষ্টি হয়ে এক অস্থিতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে।

() বিশ্ব ঐতিহ্যের এলাকা সুন্দরবন প্রচন্ডভাবে হুমকির মুখে পড়বে এবং ক্রমশঃ বিলীন হয়ে যাবে।

() কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সৃষ্ট পরিবেশ দুষণের কারণে স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটকদের ওই এলাকায় ভ্রমণ কমে যাবে। ফলে ভ্রমণ পিয়াসীদের যেমনি ক্ষতি হবে, তেমিন রাষ্ট্র ও পর্যটন ভিত্তিক উপার্জন হারাবে।

() বিদ্যুৎ উৎপাদন জনিত কালো ধোঁয়া পুরো এলাকা সর্বদাই কালে মেঘ দ্বারা আবৃত থাকবে।

() ওই স্থানে উৎপাদিত ঘাস যা গরুছাগলের খাদ্য অর্থাৎ মূল খাদ্যতা বিষযুক্ত হওয়ার ফলে দুধের মান যেমন হ্রাস পাবে তেমনি দুধের পরিমানও অনেকাংশে কমে যাবে। ঐ সমস্ত গরুছাগলে মাংস ভক্ষনে মানুষের নানা রকম অনিরাময় যোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হবে।

() ওই এলাকায় চাষকৃত চিংড়ীতে কয়লা থেকে উদগীরিত ধাতব পদার্থ যথা টিন, শীশা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, পারদ (As, Pb, Cr, Ni, Hg) ইত্যাদি মিশ্রনের ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী চিংড়ী রপ্তানী বন্ধ হয়ে যাবে।

() উদগীরিত “সবুজ বিনাশী গ্যাস” (গ্রিন হাউস গ্যাস) যথা CH4, NOx এবং SO2 বায়ূমন্ডলে সঞ্চিত হবে। এ সঞ্চীভবনের ফলে জাতীয় আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পরিবর্তন হবে যা কিছুতেই সার্বিক দৃষ্টিকোন থেকে জনগণের স্বাস্থ বিবেচনায় কিছুতেই কল্যাণকর ও শুভ নয়।

() ওই এলাকায় কয়লা ভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্র থেকে NOx Ges SO2 এর ফলে রাসায়নিক বৃষ্টির (এসিড) সৃষ্টি হবে। এই রাসায়নিক বৃষ্টি ভূমি, জমির উর্বরতা এবং পানির গুনাগুনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাবে যা মানুষসহ সমস্ত প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার এক বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং ক্রমশঃ পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর হয়ে প্রাণীকূলের দৈহিক গঠনে এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

() এত দূরান্তরে স্থানে কয়লা পরিবহনের ব্যয়ই শুধু বিদ্যুতের ট্যারিফ নিবারনে ঋনাত্মক প্রভাব ফেলবে না, এ সমস্ত স্থানে বিশেষ করে নদী বন্দর, নৌপথসহ সড়কপথে কয়লা পরিবহনের ফলে সমস্ত এলাকা দূষিত হয়ে যাবে এবং পরবর্তীতে চুক্তিতে লিখিত এ এলাকা পুনরায় পূর্বের ন্যায় পূনঃনির্মান করে দেবার প্রতিশ্রুতি কখনও বাস্তবায়ন করা হবে না। কাজেই এসব স্থানসমূহ চিরদিনের জন্য পরিত্যক্ত হয়ে যাবে।

() কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উদৎপাদনের জন্য যখন কয়লা পোড়ানো হবে তখন সেই কয়লা থেকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ইউরেনিয়াম,থোরিয়াম এবং এ থেকে আরও কিছু রেডিও এ্যাকটিভ পদার্থ সৃষ্টি হয়। এগুলো পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষন করে। যুক্তরাজ্যের একটি প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকের একটি জরিপ থেকে জানা গেছে যে, এ দূষণ প্রক্রিয়া একই ক্ষমতার একটি পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন (নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন) কেন্দ্র থেকে উদগত রেডিও এ্যাকটিভ ম্যাটেরিয়ালের বর্জ্জ্য থেকে ৪০ থেকে ৮১ গুন বেশী। কাজেই মনুষ্যজীবনতো বটেই সুন্দর বনের গাছ গাছালিসহ ওই বনের নদীতে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীকূলের জীবনের জন্য এ এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আর্বিভূত হবে।

() রামপালের এ বৃহৎ কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণকারী বর্জ্য উৎপাদনকারী হিসেবে বাংলাদেশ অচিরেই পরিবেশ দূষণকারী দেশ হিসেবে কালো তালিকাভূক্ত হবে।

যে বৃষ্টির পানি সেচ ও পানের জন্য ব্যবহৃত হতো তা আর করা যাবে নাকারণ যে বায়ূমন্ডল থেকে বৃষ্টি পড়বে তা বিষাক্ত হয়ে উঠার ফলে এ পানি পানের ও সেচের জন্য উপর্যুক্ততা হারিয়ে ফেলবে।

কয়লা পরিবহনকারী যেসব ট্রাক ও রেল মানুষের বসবাসের এলাকা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করবে সেসব এলাকার লোকজন কয়লা বাহিত বর্জ্য দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এতে সার্বিক কয়লাকারী স্থাপনার চারদিক থেকে শুরু করে ওই স্থানের শ্রমিকদেরও প্রচন্ড স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে এবং নিয়মিত অসুস্থতায় ভূগতে থাকবে।

কয়লা থেকে উদগত আর্সেনিক দ্বারা ভূমি জলে আর্সেনিক দূষন শুধু বৃদ্ধিই পাবে না, তা ত্বরান্বিতও হবে। এতে সবাইরই স্বাস্থহানি ঘটবে এবং শিশুদের শ্রবন শক্তি প্রচন্ড হ্রাস পাবে।

শেষ কথা: সবচেয়ে অবাক করা কান্ড যে, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পশ্চিমবঙের সুন্দর বন অঞ্চলে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওখানকার দেশপ্রেমিক মাওবাদীরাসহ সুশীল সমাজ, ছাত্রজনতা, সাংবাদিক. লেখক সহ সমাজের সচেতন অংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে ভারত সরকার বাধ্য হয়ে তা পরিত্যক্ত করে এবং মনে হচ্ছে যেন বাংলাদেশ তাদেরই কোন একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র এবং তার উপর এটা চাপিয়ে দেয়া সহজ কারণ সম্ভতঃ তারা এটাও জানে যে এখানকার এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদসহ সুশীল সমাজ, ছাত্রজনতা, সাংবাদিক. লেখকদের যেভাবেই হোক কেনা যেতে পারে এবং আমার শঙ্কা হচ্ছে হয়তো কেনাও হয়ে গেছে। তা না হলে কই দেশের এতো বড় সর্ব্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, কারো মুখে তো কোন রা নেই।।