Home » অর্থনীতি » সরকারের ঋণ, ব্যাংকের উপরে চাপ

সরকারের ঋণ, ব্যাংকের উপরে চাপ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

bank moneyব্যাংকের তারল্য সংকট কাটছেই না। ব্যাংকগুলোয় একের পর কেলেঙ্কারি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর এটি আরো বেড়েছে। এতে একদিকে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে, যা সহসা ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। এ কারণে ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২১৩ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ২ হাজার ১২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে। যা গত অর্থবছর একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩৯০ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। সে হিসেবে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১১ দশমিক ০৭ শতাংশ। এ সময়ে আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হয়েছে ২ হাজার ৩১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গেল অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৪২৮ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। সে হিসেবে ঋণপত্র খোলার হার কমেছে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।

আমদানির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্প খাতের পরিস্থিতি নাজুক। এ খাত মধ্যবর্তী পণ্য, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও বিবিধ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর নির্ভর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে শিল্প খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের পণ্য আমদানি কমেছে। জুলাইফেব্র“য়ারি সময়ে গেল অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মধ্যবর্তী পণ্যে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালে ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতিতে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ, বিবিধ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ কমেছে। একই ভাবে পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। জুলাইফেব্র“য়ারি সময়ে ইয়ার্ন আমদানিতে ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং কাঁচা সুতা ও সিনথেটিক ফাইবার আমদানিতে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণপ্রত্র নিস্পত্তি কমেছে। টেক্সটাইল ফেবিক্স ও গার্মেন্টে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র নিস্পত্তি শুন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়েছে।

সরকারের শেষ সময় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। আর সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণ চাহিদার অধিকাংশই মেটাতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। ২৭ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫১কোটি টাকা। যা গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৩৯৯কোটি ৫৪ লাখ টাকা। গত ৩ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৩৫১কোটি ৪৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী জানান, গতবছর (২০১২) ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে চলতি বছরের (২০১৩) প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারিমার্চ) খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। তারা জানান, ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে ঋণের সুদ মওকুফের আবেদন জানিয়েছেন।বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে ২০১২ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়ে যায় ১৯ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের নিট আয়ও কমে যায়। ব্যাংকাররা জানান, বিদ্যুত ও গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাবে এমনিতেই শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর ওপর হরতালসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে পণ্য প্রস্তুত করে তা রপ্তানি করতে পারেননি। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে না পারার কারণে স্টক লটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণবেড়েছে। আবার হলমার্ক,ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্র“প প্রভৃতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তাদের মতে, গতবছর গ্যাসবিদ্যুৎ সংকট ও হলমার্ককেলেঙ্কারির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়েযোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট। এছাড়া বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি ছিল টাকার অতিমূল্যায়ন। এসবের কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে অনেকেই হিমশিম খেয়েছেন। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যা ২১০ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বরে ঘাটতি ছিল ছয়টি ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরে তা বেড়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ব্যাংকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণশ্রেণীকরণ ও প্রভিশন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে ব্যাংকগুলোয় ২৪ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক খাতে সামগ্রিক ঘাটতি ৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ২০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ১৮ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা সংরক্ষণ করেছিল।

এদিকে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। অর্থবছর শেষে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। জানা গেছে, সরকার তার বাজেট ঘাটতিমেটাতে প্রধানত দুটি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। এর একটি অভ্যন্তরীণ খাত, অপরটি বৈদেশিক ঋণ। অভ্যন্তরীণ খাতে ঋণেরজোগান দেয়া হয় দুটি উৎস থেকে। এর একটি ব্যাংকিং খাত, অপরটি ব্যাংকবহির্ভূত খাত। ব্যাংকবহির্ভূত খাতের মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়পত্র, প্রাইজবন্ড ইত্যাদি।

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২৩ হাজারকোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগের অর্থবছরে নেয়া ঋণের চেয়ে প্রায় ৮শ’কোটি টাকা বেশি। আর চলতি অর্থ বছরের ২৭ মার্চ পর্যন্ত সরকার ৯ হাজার ৩৫কোটি ৬৩ লাখ টাকা নিয়েছে।সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ ঋণনেয়া হয়েছে। ওই সময় সরকারের ঋণের চাহিদার সবটুকু তফসিলি ব্যাংকগুলোকে মেটাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর সরকারকে ঋণতো দিচ্ছেই না, উল্টো আগেদেয়া ঋণের পরিশোধ দেখাচ্ছে। এতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের ঋণের চাপ অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহকে সংকোচন করে দিয়েছে। আর সরকারকে কম সুদে ঋণ দেয়ায় গ্রাহকদের কাছ থেকে উচ্চ সুদ আদায় করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ মার্চ পর্যন্ত সরকার তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১৫ হাজার ২০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। আর এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংককে এর আগের বছরের ঋণের ৬ হাজার ১৬৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সব ব্যাংককে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের ঋণের জোগান দিতে হয়। এতে সরকারের চাহিদার বিপরীতে ৬০ শতাংশ সরবরাহ করতে হবে প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকগুলোকে। বাকি ৪০ শতাংশ দিতে হবে প্রচলিত ধারার ২৫টি নন পিডি ব্যাংককে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিচ্ছে। বর্তমান ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ও আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকের যে পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, সরকারকে ঋণ দিয়ে আয় হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। ফলে ব্যাংকগুলো লোকসানের শিকার হচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে ক্রমাগত এ লোকসান দিতে গিয়ে সামনে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘমেয়াদে আরো ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।।