Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সেলিনা হায়াত আইভি

সাক্ষাৎকার – সেলিনা হায়াত আইভি

প্রশাসন যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে যেকোনো সময় নারায়ণগঞ্জে যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে

IVY INTERVIEWসেলিনা হায়াত আইভি, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। ত্বকী হত্যা, নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতিসহ এ সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন বলে আপনি মনে করছেন?

সেলিনা হায়াত আইভি: পরিস্থিতি ভালো তা বলা যাবে না। কারণ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, প্রতিটি মা এক ভীতিকর অবস্থার মধ্যে আছে। কারণ এ ধরনের একটি মেধাবী কিশোর ছেলেকে অকারণে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং আমি বলবো না যে, নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।

আমাদের বুধবার: কেন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে?

সেলিনা হায়াত আইভি: আসলে এটা ধারাবাহিকভাবেই হয়ে আসছে। যদি গত এক বছর সময় আমরা দেখি,তাহলে দেখবো যে, একটার পর একটা খুনের ঘটনা ঘটছে শহরের মধ্যে। ২০১১ সালের জুনে আশিক হত্যা, এরপর মিঠু হত্যা, এর কিছুদিন পরে তরুণ নাট্যকার চঞ্চলকে হত্যা করা হলো। মাস দুয়েক আগে এক ব্যবসায়ী গোবিন্দ সাহা বুলুকে অপহরণ করা হয়। পরে তার লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্মার পাড়ে। পরিস্থিতি বছর দুই যাবত এ ধরনের অবস্থার মধ্যে রয়েছে। হয়তো সাম্প্রতিক মাস দুয়েক ধরে বেড়ে গেছে। যারা ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে আসছে, ত্বকী হত্যা তাদেরই কাজ।

আমাদের বুধবার: কারা এই হত্যাকাণ্ডের জড়িত বলে আপনার ধারণা?

সেলিনা হায়াত আইভি: আমার ধারণার চেয়েও বড় কথা নারায়ণগঞ্জের মানুষের কি ধারণা? নারায়ণগঞ্জের শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ মনে করে, এটা একটা প্রভাবশালী পরিবারের কাজ। এই প্রভাবশালী পরিবারটি নারায়ণগঞ্জের অনেক হত্যাকাণ্ড এর আগেই ঘটিয়েছে এবং ত্বকীকেও তাদের হাতে নিহত হতে হয়েছে। এই দায়ী করাটা শুধু আমি একা করছি না, সমগ্র নারায়ণগঞ্জবাসী করছে।

আমাদের বুধবার: তাদের ক্ষমতার মূল উৎস কোথায়?

সেলিনা হায়াত আইভি: তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। যখনই যে দল ক্ষমতাসীন থাকে, তখন তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে। আসলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু এই অপশক্তিটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অপব্যবহার করছে এবং জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করছে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে তারা মানুষ খুন করছে, চাঁদাবাজি করছে, রাহাজানি করছে, করছে ভূমিদস্যুতা।

আমাদের বুধবার: আপনারা কি অসহায় বোধ করছেন?

সেলিনা হায়াত আইভি: আমি বলতে চাই, জনগণ কোনো এক সময় অসহায় ছিল। এখন নারায়ণগঞ্জের জনগণ জেগে উঠছে। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবরে জনগণ রায় দিয়েছিল সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে। আমি এখনো মনে করি, জনগণ কিছুটা অসহায় হলেও নারায়ণগঞ্জের মানুষ এখন অনেক জাগ্রত, অনেক সঙ্গবদ্ধ এবং ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ। প্রশাসন যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে যেকোনো সময় নারায়ণগঞ্জে যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে।

আমাদের বুধবার: ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কি কোনো অগ্রগতি হয়েছে?

সেলিনা হায়াত আইভি: এটা তো আমি বলতে পারবো না। এটা জানবে পুলিশ প্রশাসন। তবে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমি ততোটুকুই বলতে পারি, যতোটুকু প্রশাসন বলছে।

আমাদের বুধবার: আপনার কি মনে হয় এক্ষেত্রে অগ্রগতি কম?

সেলিনা হায়াত আইভি: তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে, প্রশাসন ইতোমধ্যেই জানে যে, এই হত্যাকাণ্ডটি কে বা কারা ঘটিয়েছে। আমার ধারণা, নারায়ণগঞ্জের মানুষও একই ভাষায় কথা বলবে। কারণ ৪০ দিন হয়ে গেছে, কিন্তু প্রশাসন মুখ খুলছে না।

আমাদের বুধবার: এর কারণ কি?

সেলিনা হায়াত আইভি: সেই চিহ্নিত মহল ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সদিচ্ছা আছে। আর যেহেতু ত্বকী একটি কিশোর মেধাবী ছেলে ছিল, সেহেতু আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী এখানে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন এবং সন্ত্রাসী যেই হোক, আজ হোক কাল হোক আমরা তা জানতে পারবো।

আমাদের বুধবার: এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি কি আরো সংঘাতপূর্ণ হবে না? আপনার কি অভিমত?

সেলিনা হায়াত আইভি: রাজনীতি কেন সাংঘর্ষিক হবে। এটা তো রাজনীতির বিষয় না, এটা তো খুনিদের ব্যাপার। এর সঙ্গে রাজনীতির তো কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো এখানে হচ্ছে না, অথবা দলীয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানে হচ্ছে না। এখানে তো মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, প্রভাবপ্রতিপত্তি আর কালো টাকার বিরুদ্ধে। যদি এভাবে চলতে থাকে, এভাবে খুন হতে থাকে এবং এর কোনো প্রতিকার না হয়, তাহলে অবশ্যই কেউ না কেউ তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। তারা যে দলের, সে দলেরই ক্ষতি হবে।

আমাদের বুধবার: আপনি সরকারের ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন?

সেলিনা হায়াত আইভি: যেকোনো সরকারের শেষের দিকে এসে কিছু অস্থিরতা থাকে। এ কারণে দেশে এখন একটি অস্থিরতার পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিটি সরকারের সময় এসে পরিস্থিতি অস্থির করা হয়। আর এই অস্থিরতার সুযোগগুলো নেয় অপশক্তিগুলো বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন স্থানে। সে সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে নারায়ণগঞ্জের একটি অপশক্তি ত্বকীকে হত্যার মধ্যদিয়ে। যেহেতু সরকার ব্যস্ত সারাদেশকে সামাল দেয়ার জন্য, ঠিক সে সময়ই তারা ঘটনাটা ঘটিয়েছে।

আমাদের বুধবার: যে শক্তির কথা আপনি বলছেন সেই শক্তির ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জবাসীর মনোভাব কি?

সেলিনা হায়াত আইভি: এর আগেও অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সাহস করে তো কেউ থানায় জিডি পর্যন্ত করতে পারেনি। কিন্তু ত্বকীর বাবা মামলা করেছেন, স্পষ্টভাষায় কিছু নাম বলেছেন, কিছু অভিযোগ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য দলগুলোও কথাগুলো বলছে। সাধারণ মানুষ সবাই ত্বকীর বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি জনগণের একজন হয়েই ত্বকীর বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। আপনি যদি নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক সভাসমাবেশগুলো দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন, সাধারণ মানুষ কথা বলছে, তারা অংশ নিচ্ছে। এতে কি বোঝা যায় না, সাধারণ মানুষের মনোভাব কি?

আমাদের বুধবার: এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের কতোটা ক্ষতি হচ্ছে? কারণ আপনি এই দলেরই একজন সদস্য।

সেলিনা হায়াত আইভি: আমি অবশ্যই এই দলের সদস্য। ক্ষতি আমার দলের কমবেশি হচ্ছে, হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের দল কেন, অন্য দলেও যদি এমনটা হতো, তাদেরও ক্ষতি হতো। আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ যথেষ্ট সতর্ক আছে এবং আর যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে ব্যাপারে দল সচেষ্ট হবে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।