Home » অর্থনীতি » কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে গার্মেন্টস শিল্প

কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে গার্মেন্টস শিল্প

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-পোশাক কারখানাগুলোতে একের পর এক বিপর্যয়ের ঘটনা দেশের সামগ্রিক পোশাক শিল্পকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাজরীন ফ্যাশনসএ আগুন লাগার কয়েক মাসের মাথায় রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এই ঘটনা মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বৈদেশিক বাজারে। সাভারের ইতিহাসের ভয়াবহতম ভবন ধসে অসংখ্য মানুষ হতাহতের ঘটনা। সাভারের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ৮ তলা রানা প্লাজায় ছিল কমপক্ষে ৫টি পোশাক কারখানা। বাংলাদেশে গার্মেন্ট তথা পোশাক কারখানায় কাজের পরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের সুবিধাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানিতে জেনারেল ইজ সিস্টেম অব প্রেফারেন্স বা জিএসপি সুবিধা বহাল রাখা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে শুনানি চলাকালে সর্বশেষ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন সবাই।

শুনানির পর ইউএসটিআর কার্যালয় থেকে ১৯টি প্রশ্নের উত্তর চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির উত্তর পাঠানো হয় যেদিন সেদিনই সাভারের দুর্ঘটনা ঘটে। ফলে নতুন করে জিএসপি সুবিধা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন বাজারে জিএসপি সুবিধা বহাল রাখার ক্ষেত্রে সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। জিএসপি ইস্যু নিয়ে আগামী মাস এবং জুনের শুরুর দিকে বিশদ শুনানি শেষে জুনেই সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা করবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। শুনানিতে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা এখনও জিএসপি সুবিধা বহাল থাকা নিয়ে আশাবাদী হলেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনা তাদের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ বিষয়েও মার্কিন প্রতিনিধিদের পুঙ্খানুপুঙ্খ জেরার মুখে পড়তে হবে তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের উপমুখপাত্র প্যাট্রিক ভ্যান্ট্রেল বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারকে পোশাক শিল্পের মালিক এবং ক্রেতাদের পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করার পথ বের করতে হবে। এদিকে, চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও পোশাক কারখানাগুলোতে দুদিন পরপর দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহতের ঘটনায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস নিয়ে বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে রাশিয়া, ব্রাজিল, পেরু, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, জাপান, চীন ও ভারতের বহু ক্রেতা অর্ডার বাতিল করে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক ব্লুমবার্গ বলছে, বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশ নিরাপদ নয়। গণমাধ্যমটির মতে, ভবন ধসের ঘটনা বাংলাদেশের শিল্প নিরাপত্তা রেকর্ডে আরও একটি কালো দাগ টেনে দিয়েছে। গত নভেম্বরে বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রির প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের যে কারখানায় কাজ করাতো সেখানে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত (রানা প্লাজা ধসের আগে) বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ৭শ‘-এরও বেশি গার্মেন্টস শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংগঠন ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়ামএর নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা বলেছেন, বিশ্বব্যাপী যে শ্রমিক সংগঠনগুলো আছে তারা সবাই গত কয়েকবছর ধরে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝাতে চেয়েছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার কর্মপরিবেশ অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে কোনো সময় ইতিবাচক বক্তব্য দেয়নি।

তৈরি পোশাক খাত গত ৩০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বলে মনে করছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা বলা হয়। পুরনো ক্রেতারা আমাদের দেশ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে রাশিয়া, ব্রাজিল, পেরু, জাপান, ভারত ও চীনের মত নতুন ক্রেতারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে এসে হোটেল থেকেই ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। অর্ডার দিচ্ছেন না। নতুন বাজারের অফুরন্ত সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। এক সময় শ্রীলঙ্কার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ মুখি হয়েছিল। এখন আমাদের সমস্যায় তারা প্রতিযোগী মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। প্রয়োজনে দামের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেও প্রস্তুত তারা। সাম্প্রতিক হরতাল ও সহিংসতায় ৩৩টি কারখানার ক্ষয়ক্ষতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয় এই সাংবাদিক সম্মেলনে। এতে বলা হয়, এই কারখানাগুলোতে অর্ডার বাতিল হয়েছে ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকার। ডিসকাউন্ট দিতে হয়েছে ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আকাশ পথে পণ্য পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় ২৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। যথাসময়ে রফতানি না করতে পারায় ক্ষতি ৭৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ভাংচুর ও সহিংসতায় ক্ষতি ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে উদ্যোক্তারা প্রায় ১৩ গুণ বেশি খরচে আকাশ পথে পণ্য পাঠিয়েছেন। সমুদ্রপথে এক কেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হয় ৩০ সেন্ট। অথচ আকাশ পথে একই পরিমাণ পণ্যে খরচ ৪ ডলার ১৫ সেন্ট। এতে উদ্যোক্তাদের লাভ থাকে না। পুঁজিতে হাত পড়ে। শুধুমাত্র গত তিন মাসে (জানুয়ারিমার্চ) ৩৯০ কোটি টাকা আকাশ পথে পণ্য পরিবহন বাবদ লোকসান হয়েছে। এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামপ্রতিক ক্ষতির হিসাব বিজিএমইএর কাছে দাখিল করতে শুরু করেছে সদস্য কারখানাগুলো। ইতিমধ্যে ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রায় ২১ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে) অর্ডার বাতিল হয়েছে। ক্রেতাকে মূল্য কমিয়ে দিতে হয়েছে সোয়া ৯ কোটি টাকা, আকাশ পথে পরিবহনের দরুন ক্ষতি ২৪ কোটি টাকা, নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানি করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষতি ৭৩ কোটি এবং ভাংচুর অগ্নিকাণ্ডের কারণে সোয়া ৮ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। সামপ্রতিক সময়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২২ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ। ক্রেতারা আমাদের দেশের বরাদ্দকৃত অর্ডার থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ কেটে এসব দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। এছাড়া একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খরচ, পরিবহন খরচ, ব্যাংক সুদের হার, রপ্তানিতে উৎস কর বৃদ্ধির কারণে সার্বিকভাবে উৎপাদন খরচ ১২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে মূল্যস্থিতিশীল ক্ষেত্র বিশেষে কমছে। আবার সামপ্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় রফতানি আয় কমছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং মন্দার কারণে অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্ট খাতে আয়ও কমছে আশংকাজনক হারে। তিন বছরের মধ্যে যেখানে ৯.২ বিলিয়ন ডলারের আয়কে দ্বিগুণেরও বেশি করে তোলার কথা ছিল সেখানে গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রফতানির অর্ডার ৩৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। টাকার অংকে এর পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। এ অবস্থা এখনো চলছে, আয় ও বিক্রি বাড়ছে না গার্মেন্ট খাতে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদমিত চাহিদার একটা প্রভাব তৈরি পোশাক রফতানিতে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে যেখানে এ খাতে রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ, সেখানে অক্টোবর পর্যন্ত বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশের মতো। অন্যদিকে অনেক বড় বড় ক্রেতা বাংলাদেশকে পরবর্তী চীন হিসেবে ভাবছেন। আশানিরাশার এই দোলাচলে সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসে কয়েকশ শ্রমিক নিহত হলো। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ইস্যুতে একটি নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রফতানি খাতের ওপর বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান দুটি বাজারের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ) ভোক্তাদের কাছে শ্রম মান সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যদি কোনো একটি কারখানা কমপ্লায়েন্সে ব্যর্থ হয়, তাহলে গোটা খাতের ওপর জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ২০০৬ সালে শ্রম আইন যুগোপযোগী করে এবং কারখানাগুলোর জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করে। তবে এর মনিটরিং দুর্বল। বিশ্বব্যাংক মনে করে, ২০০৬ সালে সরকার শ্রম আইনের যুগোপযোগী সংশোধন করেছে। কমপ্লায়েন্সকে মাথায় রেখে একই বছর ভবন নির্মাণবিধিও করা হয়েছে। তবে আইন মানার প্রবণতা কম। সরকারকে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে বারবার অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনা নিয়ে নিজ নিজ দেশে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন সংশ্লিষ্ট পোশাক শিল্পগুলোর বিদেশি ক্রেতারাও। তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ ক্রেতা ওয়ালমার্ট কর্তৃপক্ষকে অনেক নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে যুক্তরাজ্যসহ গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়নে। সাভারের রানা প্লাজার নিউ ওয়েভ নামে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিদেশি ক্রেতা ছিল ব্রিটিশ রিটেইলার বা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক ও বোনমার্চে। লন্ডন টেলিগ্রাফে ‘বাংলাদেশ ডিজাস্টার : প্রাইমার্ক অ্যান্ড আদার ওয়েস্টার্ন কোম্পানিজ হেভ টাফ কুইসশানস টু অ্যানসার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব পশ্চিমা কোম্পানি ও তাদের গ্রাহকদের দায়িত্ব সচেতনতা প্রশ্নবিদ্ধ। টেলিগ্রাফের প্রধান বৈদেশিক সংবাদদাতা ডেভিড ব্লেয়ারের লেখা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এরপর যখনই আপনি মাত্র আড়াই পাউন্ডে প্রাইমার্কের একটি টি শার্ট কিনতে যাবেন, যার লেবেলে লেখা আছে মেইড ইন বাংলাদেশতখন নিজেকেই প্রশ্ন করে দেখবেন পণ্যটি কেন এতটা সস্তা? আপনি যদি সচেতনভাবে কারণটি জানার চেষ্টা করেন তাহলে বুঝবেন টিশার্টটি যারা বানিয়েছে তারা খুব বেশি মজুরি পায় না। জবাব আছে এর চেয়েও খারাপ। এই শ্রমিকদের জন্য আছে আরও নির্মম বাস্তবতা। তাদের কাজ করতে হয় মৃত্যুর ফাঁদে বসে। রানা প্লাজায় ফাটল ধরা পড়ে মঙ্গলবার। এরপর ভবনটি খালি করার নির্দেশ দেয় পুলিশ। নিউ ওয়েভ কারখানার মালিকরা ওইদিন প্রাইমার্ক ও বোনমার্চেকে পোশাক সরবরাহ করেন। তারপর শ্রমিকদের বলা হয়ম বুধবার কাজে আসতে, নইলে তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে। সে অনুযায়ী নাজুক ভবনটিতে তারা কাজে যোগ দেয়। রানা প্লাজায় কর্মজীবী নারীদের শিশু লালনপালনের একটি কেন্দ্রও ছিল। সে কারণে নারীকর্মীদের সঙ্গে অনেক শিশুরও অকাল মৃত্যু ঘটেছে সেখানে।

টেলিগ্রাফ বলছে, এখন দায়টা আমাদের সবার। কারণ প্রাইমার্কের মতো কোম্পানিগুলো শুধু ব্রিটিশদের সস্তা দামে পোশাক পাওয়ার চাহিদাই পূরণ করে না, তারা গ্রাহকদের সেসব পণ্যই দেয় যা কিনা তারা চান। মাত্র ৭ পাউন্ডে একটি টি শার্ট মন্দ কী? যারা এগুলো বানায় তাদের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দরকারটা কী? টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত তত্ত্ব গত দিক থেকেও এসব সমস্যার একটা জবাব আছে। প্রাইমার্ক, বোনমার্চেসহ অন্য সব বড় ক্রেতাকে একযোগে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা এমন সব কারখানা থেকেই পোশাক আমদানি করবে যেখানে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ন্যূনতম মানরক্ষা করা হচ্ছে। দায়টা বাংলাদেশ সরকারের। তারা যদি মৌলিক স্ট্যান্ডার্ড আরোপ করার মতো সক্ষমতা রাখেন তাহলে তা করতে হবে এখনই।

প্রাইমার্ক ও বোনমার্চের বক্তব্য নিউ ওয়েভ গার্মেন্টের বিদেশি ক্রেতা প্রাইমার্ক ও বোনমার্চে রানা প্লাজা ধসে নিহতদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করেছে। নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রাইমার্কের এক মুখপাত্র বলেছেন, কয়েক বছর ধরে প্রাইমার্ক বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে বাংলাদেশের কারখানার কাজের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করে আসছে। এখন ভবনের কাঠামোগত দিকটাও অবশ্যই আলোচনায় আসবে। অন্য ব্রিটিশ রিটেইলার মাটালান বলেছে, নিউ ওয়েভ গার্মেন্ট থেকে তারা আগে পোশাক আমদানি করেছিল কিন্তু এখন আর তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এক মুখপাত্র বলেন, মাটালান সর্বশেষ নিউ ওয়েভের পোশাক নিয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। নিউ ইয়র্কভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিনারজিস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের কর্ণধার মুনির মাশুকুল্লাহ বলেন, এসব বাজারে ক্রেতাদের মানসিকতা হচ্ছে বেশি দাম না দেওয়া। সে কারণে আমদানিকারকরাও খরচ কমানোর রাস্তা খোঁজে। পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতা এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে ব্যবসা করে মুনিরের প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, যদি ক্রেতারা বেশি দাম না দিতে চায়, কোম্পানিগুলোও পণ্য উৎপাদনে বেশি খরচ করবে না।

তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পরপরই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট সমালোচনার মুখে পড়ে। বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটি ওই কারখানা থেকে পোশাক আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্য এ নিষেধাজ্ঞা হয়তো খুব বেশি দিন বহাল থাকবে না। বাংলাদেশের হামীম গ্রুপে ২০১০ সালে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের পর তাদের ক্রেতা গ্যাপও একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছিল। এর পরও গ্যাপ ওই কারখানা থেকেই পোশাক আমদানি করেছে। ওয়ালমার্ট তাজরীন ফ্যাশনস থেকে পোশাক না নেওয়ার কথা বললেও অন্য কারখানা থেকে যে নেবে না, তা বলেনি। জানা গেছে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশ ভালো করার জন্য মালিকদের ওপর বারবার চাপ দিচ্ছে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পয়সাও খরচ করছে তারা। হামীম গ্রুপে অগ্নিকাণ্ডের পর গার্মেন্টে অগ্নিনির্বাপণসহ কর্মক্ষেত্র উন্নয়নে গ্যাপ১০০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে।

স্থানীয় চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও কিছু শঙ্কা রয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার দেশগুলোকে তাদের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশকে এখনও দেয়নি। নিকট ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে শ্রম পরিবেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান জিএসপি সুবিধা (তৈরি পোশাক এ সুবিধার আওতায় নেই) স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ সুবিধা স্থগিত হলে সেখানে পোশাক রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অগ্নিকাণ্ডভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’এর ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।।