Home » রাজনীতি » ক্ষমতাসীনরা বরাবরই বেপরোয়া

ক্ষমতাসীনরা বরাবরই বেপরোয়া

ফারুক আহমেদ

black badgeবেপরোয়া। বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরের শাসন কালের দিকে তাকালে এক কথায় এই শব্দটিই বলতে হয় বেপরোয়া। রানা প্লাজায় হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের হতাহত হওয়া থেকে পিছনের দিকে যেতে থাকলে সবগুলো ঘটনাকেই শাসকদের বেপরোয়া কর্মকান্ড ছাড়া অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টসে ভবন ধ্বসে,তাজরিন গার্মেন্টসে আগুনে সহ ছোট বড় অসংখ্য শ্রমিক হত্যাকান্ডকে সরকার এবং মালিক পক্ষের বেপরোয়া মনোভাব অবশ্যই বলা যায়। কিন্তু রানা প্লাজায় যে শ্রমিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হলো তার বেপরোয়া মনোভাব সভ্য দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে শুধু ভবন নির্মাণের ব্যাপারেই কোন কিছু তোয়াক্কা না করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ভবন মালিক এবং গার্মেন্টস মালিকেরা। অগেরদিন ভবনটির পিলারে ফাটল দেখা গিযেছিল। সেদিনই সেখানকার শ্রমিক সহ সবাই ভবনটি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বের হয়ে গিয়েছিলেন। এ নিয়ে প্রচার মাধ্যমে খবরও প্রচারিত হয়েছিল।পরদিন গার্মেন্টস কারাখানা ছাড়া ঐ ভবনের আর সব কিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষদেরকে জোর করে, কাজে যোগ না দিলে তাদের বেতন বন্ধের হুমকি দিয়ে ভবনটিতে ঢুকানো হয়েছিল। এই গার্মেন্টস মালিকরা এবং ভবনের মালিক এমন বেপরোয়া হওয়ার সাহস কিভাবে পায়? তারা এমন বেপরোয়া হওয়ার সাহস পায় শাসকদের বেপরোয়া কর্মকান্ডের মধ্য থেকে। কারণ এরা কেউই শাসকদের বাইরের নয়।

আওয়ামীলীগের নের্তৃত্বে বর্তমান মহাজোট সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল।আওয়ামীলীগের দিক থেকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণকে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।ক্ষমতা গ্রহনের এক বছর পর্যন্ত তাদের আগের বিএনপির নের্তৃত্বে জোট সরকার সবকিছু লুটপাট করে রাষ্ট্রের সবকিছুই শূন্য অবস্থায় রেখে গেছে এই দোহাই বার বার উচ্চারণ করেছেন।একদিকে এই দোহাই দিতে থাকলেও অন্যদিকে তাদের দলীয় লোকজনের চাঁদাবাজি, লুটপাট, দুর্নীতি, সন্ত্রাস থেমে থাকেনি। ছাত্রলীগের দাপটে শুধু শিক্ষাঙ্গণই নয় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সরকারী বেসরকারী অফিস থেকে শুরু করে জনপদও আক্রান্ত হতে থাকে।যুবলীগের টেন্ডারবাজী,দখল লুটপাট সমান তালে চলতে থাকে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জনগণকে নিরাপত্তা দান এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো সে সরকার অপরাধীর বিচার করবে। অপরাধীকে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দেবে না।কিন্তু বিগত সাড়ে চার বছরে অপরাধীর বিচারের কোন দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু পৃষ্ঠপোষকতার দৃষ্টান্ত আছে অসংখ্য।

বেনামি সামরিক সরকারের সময় দ্রব্যমূল্যে দিশেহারা মানুষের কাছে আওয়ামীলীগের প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল তারা দ্রব্যমূল্য কমাবে,মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখবে।কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো। দ্রব্যমূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলো।দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য সেসময় বাণিজ্য মন্ত্রী বেশ কিছু অদ্ভুত কথাবার্তা বললেন।শাসকদের এ এক কৌশল।এর সুবিধা হলো, অনেক সময় এসব কথা এমনই অদ্ভুত হয় যে শাসক দলের অনেকেই তার প্রতিবাদ করতে লেগে যায়। বর্তমানে যেমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উদ্ভট কথার পরিপ্রেক্ষিতে খোদ আওয়ামী লীগেরও অনেক মন্ত্রী এমপি এবং তাদের বুদ্ধিজীবীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্যদের চেয়েও অনেক বেশি বলছেন এবং লিখছেন। এভাবে অর্থমন্ত্রীর, শিল্প মন্ত্রীর সহ আরো অনেকেরই অনেক উদ্ভট উক্তি শোনা গেছে।তাঁরা কেউই উম্মাদ বা পাগল নন।এ হলো শাসক দলের শ্রেণীগত এক কৌশল। যা হোক দ্রব্য মূল্য কিন্তু কমেনি।এদের আর এক কৌশল হলো এক যন্ত্রণার ওপর আর একটি বড় যন্ত্রণা দিয়ে পুর্বের যন্ত্রনাটাকে চাপা দেওয়া।বর্তমান সরকারের বিগত সাড়ে চার বছর ধরে এদেশের মানুষ এই কঠিন সত্যের মধ্যে আছেন।পানির জন্য শহরের মানুষের বিশেষ করে ঢাকা শহরের অনেক এলাকার মানুষের হাহাকার অবস্থা।সাড়ে চার বছরে এ সমস্যার সমাধান সরকার করতে পারেনি।বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে সরকার যে পথ অবলম্বন করেছেন তার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে বিদ্যুতের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চাপে মানুষ দিশেহারা। সরকার এ বিষয়ে কারো কোনো পরামর্শ গ্রহন না করে বরং অন্যদেরকে দেশদ্রোহী পর্যন্ত আখ্যায়িত করে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও লুটপাটের কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিল। এর ফলে বিদ্যুতের সঙ্কট তো কমেইনি বরং এতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ জনজীবনে সঙ্কট বেড়েছে।

দ্রব্যমূল্যের চাপে জর্জরিত মানুষ দেখেন তার নিরাপত্তা বলে কিছু নেই।দিনমজুর থেকে কলকারখানার শ্রমিক,ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী,ব্যবসায়ী,চাকুরিজীবী,পেশাজীবী, গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু কোথাও কেউ নিরাপদ নন। রাস্তা সহ বিভিন্ন জায়গায় যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে অনেক নারী তার মধ্যে শিশুও আছে আত্মহত্যা করেছেন।যৌন সন্ত্রাসকে খুবই নরমভাবে ইভটিজিং নাম দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা কখনোই করা হয়নি।মানুষ সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন মনে করে তখনই যখন দেখেন যারা নিরাপত্তা বিধান করবেন তারা মানুষের নিরাপত্তার মারাত্মক যে কোন অবনতিতে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তাজরিন গার্মেন্টসে আগুন লাগার পর গেট আটকিয়ে, সিঁড়ি বন্ধ রেখে যখন শ্রমিক হত্যা করা হলো এবং বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা যখন এসব কথা বললেন তখন সরকার তাঁদের কথায় কর্ণপাত করলেন না।উপরন্তু অদৃশ্য এবং অজ্ঞাত নাশকতাকারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে মালিককে রক্ষা করলেন।সে নাশকতাকারী কারা তা খুঁজে পেলেন না! সরকারের দিক থেকে এসব তত্ত্ব হাজির না করে অপরাধীদের শাস্তির বিধান করা হলে এখন রানা প্লাজায় যে বেপরোয়া হত্যাকান্ড ঘটে গেল তা ঘটতো না। এক অপরাধীর বেপরোয়া কাজের সরকারী আস্কারায় অন্য অপরাধী আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।বাংলাদেশে যেন এখন সরকারী আস্কারায় বেপরোয়া অপরাধেরই প্রতিযোগিতা চলছে। সাগররুনি হত্যা সহ আলোচিত হত্যাকান্ড এবং গুমের ক্ষেত্রেই সরকার দোষিদের সনাক্ত করা এবং তাদের শাস্তির বিধান করতে চায়নি,এর বাইরে যেগুলো কম আলোচিত সেসবের তো কোন প্রশ্নই ওঠে না।

এতো গেল মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত দৈনন্দিন সমস্যা।সরকার তার সাড়ে চার বছরের শাসনামলে কারো কোনো তোয়াক্কা না করে এমন সব কাজ করেছে যার দ্বারা সামগ্রীকভাবে মানুষের জীবন দীর্ঘ মেয়াদে আক্রান্ত হয়। তেলগ্যাস চুক্তি,বিনা শর্তে ভারতকে করিডোর প্রদান,টিপাইমুখ বাঁধ,রামপালে তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প,রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এ সকল ক্ষেত্রে সরকার জনগণ, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী, পরিবেশপ্রকৃতি কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এসব বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সর্বশেষ সরকার যা করতে যাচ্ছে তা হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং রামপালে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প। জার্মানিসহ সারা পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প আগে থেকেই ছিল,পরিবেশ এবং জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে সে সমস্ত দেশ পর্যায়ক্রমে এসব প্রকল্প বাতিল করছে। অথচ বাংলাদেশের মত একটি দেশ যা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক পিছিয়ে আছে এবং অতি ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র বিদেশীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এ বিষয়ক অনেক বিশেষজ্ঞের মত অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এখানে সরকারের বৈপরিত্য হলো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে তেলগ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের নামে দেশের সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে শুধুমাত্র নিজেদের পকেট পুর্তির শর্তে। অথচ তেলগ্যাস রক্ষা কমিটি দেখিয়েছে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সামর্থ্য আছে এবং উদ্যোগ নিলে তা আরো অনেক বাড়ানো সম্ভব। অপরদিকে রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তিতো আছেই। তাছাড়া এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিপদজনক দিক হলো এতে সুন্দরবন স¤পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থনীতিরও এবং দেশীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে সরকার এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সব আয়োজন সম্পন্ন করছে।

ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে এবং ক্ষমতায় এসেও শুরুর দিকে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে দুর্নীতি নিয়ে। অথচ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত লাগাতার কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতিতো আছেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ব দৃষ্টান্ত ছাড়িয়ে যাওয়া শেয়ার বাজার দুর্নীতি,পদ্মা সেতু দুর্নীতি,হলমার্ক দুর্নীতির মত বড় বড় দুর্নীতি। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা নির্বিঘ্নেই এসব কাজ করে চলেছে বেপরোয়াভাবে।।