Home » মতামত » গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া

গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

savar 4কর্মস্থলে শুধু জীবনই দিতে হয় না, বেঁচে থাকতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আর্থিকসহ নানা ধরনের সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়। সাভারের ভবন ধসের পরে আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ ও শোকাহত করেছে। আর সে কথাই তারা বলেছেন, আমাদের বুধবারএর প্রতিবেদকের সঙ্গে।

১২ নম্বরের এক গার্মেন্ট কারখানার অপারেটর ফজিলাতুন্নেসা। দুই সন্তান ও রিকশাচালক স্বামীকে নিয়ে দুয়ারীপাড়া বস্তিতে থাকেন। ভাড়া দেড় হাজার টাকা। ফজিলার মাসিক বেতন সাড়ে তিন হাজার। প্রতিদিন পরিবারের জন্য কমপক্ষে আড়াইশ টাকার বাজার করতে হয়। এরপরও সকালে প্রায়ই তরকারি থাকে না। তখন শুকনা মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে কাজে যান। দুপুর ও রাতে ভর্তা কিংবা সবজি খেতে হয়। সপ্তাহে দুয়েক দিন মাছ খান। আর মাংস কোনো মাসে একদিনও জুটে না। কোনোরকম বেঁচে আছেন। আগে একশ টাকায় বাজার করতে পারতেন। কিন্তু এখন সেই দিন আর নেই।

একই সুরে কথা বললেন, মিরপুর শ্যাওড়াপাড়ার শাহানাজ সুলতানা। তিনি জানান, তার বেতনের চার হাজার টাকা অর্ধেক মাসের কাঁচাবাজারের খরচও হয় না। বাড়িভাড়াসহ সংসারের বাকি খরচ চলে ভাইয়ের বেতনের টাকায়। মিরপুরে একটি গার্মেন্টকর্মী তনুশ্রী বলেনজীবনে বহু চড়াইউতরাই পার হয়ে আজ ঢাকায় কাজ করছি। কিন্তু সাভারে যেভাবে আমার শ্রমিক ভাইবোনদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে হত্যা করা হয়েছে, তা দেখে বাড়িতে বসে থাকতে পারছি না। সড়কে নেমেছি প্রতিবাদ জানাতে। নইলে সরকার দোষীদের আটক করে শাস্তি দেবে না। আমাদের দাবি দায়ীদের ফাঁসি দিতে হবে।

নগরীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় হেলপারের কাজ করেন আতিক। গতকাল তিনি কারখানায় যাননি। তবে বিজিএমইএ ভবনের সামনে মিছিল করতে এসেছিলেন কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। সাভারের শত শত সহকর্মীর লাশ তাকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। আতিক জানান, ‘আমাদের মালিকপক্ষ মানুষ মনে করে না। তার নিজের কারখানার কথা তুলে ধরে আতিক বলেন, কারখানায় গরমে সাধারণ কোনো মানুষ এক ঘণ্টাও টিকতে পারবে না। অথচ আমরা ৯১০ ঘণ্টা টানা কাজ করি। এর বিনিময়ে যে বেতন দেয়া হয়, তা দিয়ে কোনো রকম মাস কাটে।

মলি বলেন, প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই যথারীতি মামলা হয়। মামলায় কারও সাজা হয়েছে বলে জানা যায়নি। কারণ, গার্মেন্ট মালিকরা এতই শক্তিশালী যে তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। অনেকেই বলছেন, গার্মেন্ট মালিকরা শুধু মুনাফার পেছনে ছুটেন। শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। এই মনোভাব গার্মেন্ট শিল্প সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে।

নাজমুল আশরাফ বলেন, এবারও ভবন ধসে মারা যাওয়ার কারণে ভবনের মালিক বা গার্মেন্ট মালিকদের কোনো শাস্তি হবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাকেও হয়তো তাজরীন ফ্যাশনের মালিকের মতো আইনের মুখোমুখি হতে হবে না। আমরা যাব কোথায়। সরকার যদি বিচারের নামে প্রহসন করে, সেটি মেনে নেয়া যায় না।

মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান এই খাতের শ্রমিকদের জীবনের দাম এখন সবচেয়ে কম। সাভারের রানা প্লাজা থেকে কিছু দূরে সাভারের নিশ্চিন্তপুরে গত বছরের নভেম্বর মাসে তাজরীন ফ্যাশনে আগুন লেগে মারা গিয়েছিল সরকারি হিসাবে ১১১ জন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ছিল আরো বেশি। জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হওয়া অনেক শ্রমিককে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি। সে ভাবেই তাদের দাফন করতে হয়েছিল। এমনকি পুড়ে যাওয়া নিহত শ্রমিকের পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত পাননি। ক্ষতিপূরণের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে শিল্পপুলিশ লাঠিপেটা করে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে দমন করেছে। তাজরীন ফ্যাশনের মালিককে এতগুলো মানুষের জীবনহানির পরও কারাগারে যেতে হয়নি। যেতে হয়েছে কয়েকজন নিম্ন পদস্থ কর্মচারীকে।

মনির বলেন, আসলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিকল্পনাহীনভাবে গার্মেন্ট কারখানার বিস্তার। বড় বড় কারখানা নিজেদেরকে এত বড় করে তুলেছে যে তাঁরা কাজের জন্য যেকোনো মূল্যে অর্ডার সংগ্রহ করছে। এতে করে ছোট ছোট কারখানা টিকে থাকতে পারছে না। অনৈতিক ভাবে অযৌক্তিক মূল্যে কাজ সংগ্রহ করার কারণে কারখানাগুলোর লাভের হার কমে গেছে এটি সত্যি, কিন্তু এর জন্য দায়ী কারখানার মালিকপক্ষ। বার্গেনিং পাওয়ার কমে আসার দায় শ্রমিকদের উপর ফেলা হবে অন্যায়।

রহিম বলেন, যেসব মালিক বলছেন কারখানায় লাভ হচ্ছে না, তারাই অল্পদিনের মধ্যে একটি থেকে দুটি কারখানার মালিক হচ্ছেন। আগে তারা কম দামের গাড়িতে চড়লেও এখন তিন থেকে চার কোটি টাকা দামের গাড়িতে চড়েন। অনেকে আবার দেশে দুতিনটি বাড়ি করার পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশেও বাড়ি তৈরি করছেন। আমাদের বেতনভাতা দিতে গেলে যত সমস্যা। এখন তো জীবনের নিরাপত্তাই নেই। ছোট একটি ঘরে গাদাগাদি করে কাজ করতে হয়। মনে হয় কবে যেন আগুনে পুড়ে মারা যাই। এখন তো নতুন ভয় তৈরি হলো। ভবন ভেঙে চাপা পড়ে মারা যাব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিক নেতা বলেন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে চাহিদা আছে তা পূরণের বিষয়টি বিবেচ্য। কারণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শ্রমিক তখনই শ্রম দিতে পারে, যখন তাঁর বেঁচে থাকার মতো অবস্থা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা কী সেই সুযোগটি পাচ্ছে? ২০১০ সালে অনেক দেনদরবার করে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি করা হয়েছিল তিন হাজার টাকা। দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া অবস্থায় একজন মানুষ মাসে তিন হাজার টাকায় চলতে পারে কি? প্রশ্ন, সংগত কারণেই আসতে পারে। দৈনিক ১০০ টাকা মজুরিতে এখনো বাংলাদেশে শ্রমিক কাজ করছেন, এটা ভাবতেও অবাক লাগে। আজও কৃষি শ্রমিক কিংবা সাধারণ অন্যান্য কাজে নিয়োজিত একজন শ্রমিকের ন্যূনতম দৈনিক মজুরি যেখানে ৪০০ টাকার বেশি, সেখানে গার্মেন্টকর্মী কিভাবে দৈনিক ১০০ টাকা দিয়েছে জীবন ধারণ করতে পারেন? প্রশ্নগুলো যখনই মালিক পক্ষের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখনই তারা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার কথা বলে। বলে, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বৃহৎ এই খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু শ্রমিকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তাদের বঞ্চিত করার এ প্রবণতা নিয়ে তাদের মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। যখনই শ্রমিক তাঁর ন্যায্য পাওনার ব্যাপারে দাবি করেন, তখনই বলতে শোনা যায়, কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা এও মনে করিয়ে দেন, তাহলে দেশের ৩৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবে। এই ৩৫ লাখের কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি তাই জিম্মির মতো ভূমিকা পালন করে। এই ৩৫ লাখ শ্রমিকের শ্রম দিয়েই যে তাঁরা পুঁজি সম্প্রসারণ করছেন সে কথা দিব্যি ভুলে যান।

গার্মেন্ট শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, সম্প্রতি চাল, ডাল, তেলসহ সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একদিকে সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে ব্যস্ত; অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ির মালিকরাও বাড়াচ্ছেন বাড়িভাড়া। পাশাপাশি পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকরাও মানছেন না কোনো দোহাই। এ কারণে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের গার্মেন্ট শ্রমিকদের। শ্রমিকদের জীবন মানবেতর হলেও মালিকরা রয়েছেন পুরো বিপরীত অবস্থানে। শ্রমিকের হাহাকারকে সাক্ষী করে তাদের বিত্তবৈভবের দিন দিন বিশালতর হচ্ছে। সরকার থেকে একের পর এক বিভিন্ন সুবিধা আদায়েই তারা ব্যস্ত। শ্রমিকের দিকে তাকানোর ফুরসত তাদের নেই। সরকারের নগদ সহায়তা, ব্যাক টু ব্যাক পদ্ধতিতে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা, করমুক্ত রফতানি আয়, স্বল্প সুদের ব্যাংক ঋণ আর সস্তা জ্বালানিসহ নানাবিধ সুবিধা নিয়েই তারা এ বিত্তের অধিকারী হচ্ছেন। মালিকরা শ্রমিকদের কথা না ভেবে নিজের পকেট ভরতেই ব্যস্ত।।