Home » আন্তর্জাতিক » পাকিস্তান নির্বাচন – সামনে নানা সঙ্কট

পাকিস্তান নির্বাচন – সামনে নানা সঙ্কট

চন্দন সরকার

pakistanআর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনের দিন ১১ মে যতোই এগিয়ে আসছে, পাকিস্তানে নির্বাচনী উত্তেজনা ততোই বাড়ছে। পাকিস্তানের এই নির্বাচন, দেশটির অভ্যন্তরীণ পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবারই পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেশ কয়েকটি কারণের জন্যই পাকিস্তানের এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির গুরুতর কিছু সমস্যাকে সামনে রেখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সমস্যাগুলো হচ্ছে. উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, যা এখন পাখতুনখোয়া নামে অভিহিত, সেখানে আফগান সীমান্ত হয়ে তালেবানদের উপস্থিতি, . ইরান সীমান্তে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দুর্বল শাসন ও ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি।

এসব সমস্যার আলোচনার আগে এটা বলতেই হবে যে, দেশটির ৬৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার বিভিন্ন ঘাতপ্রতিঘাতের পরও তার মেয়াদকাল শেষ করতে পেরেছে এবং মোটামুটি একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারই প্রথম দেশটিতে প্রত্যক্ষভাবে সরকার বদলে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেনি। তবে পুরো বিষয়টি পাকিস্তানি জনগণ তখনই উদযাপন করতে পারবেন যখন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সমাপ্ত হবে এবং গণতান্ত্রিক নবযাত্রায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে।

পাকিস্তানের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বিশেষ নজর থাকবে। প্রথমত. আল কায়দা বিরোধী যুদ্ধ ও দ্বিতীয়ত. পাকিস্তান হচ্ছে একমাত্র মুসলিম দেশ যার হাতে ঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

অভ্যন্তরীণভাবে পাকিস্তান তথা দেশটির জনগণের জন্য নির্বাচনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বোল্লেখিত সমস্যাগুলোর কারণে। উত্তরপশ্চিম সীমান্তে তালেবান ও আল কায়দার সরব উপস্থিতি পুরো এলাকাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

তালেবান ও আল কায়দা বিরোধী যুদ্ধের নামে সেখানে মার্কিনি ড্রোন হামলা পুরো এলাকাকে ভীতিকর পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে। কার্যত এখানে কোনো প্রশাসন আছে কিনা সেটাই সন্দেহের পর্যায়ে ফিরে এসেছে। এ যাবতকাল সামরিক ও অসামরিক সরকার যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই দ্বিচাবিনির ভূমিকা নিয়েছে। একদিকে আল কায়দা বিরোধী যুদ্ধের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিস্তর অর্থ সাহায্য পেয়েছে। আবার অন্যদিকে আল কায়দার সঙ্গেও সংযোগ রেখেছে। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুজনিত ঘটনা এর প্রমাণ। কিন্তু এই দ্বৈত ভূমিকা একদিকে দেশটির সার্বভৌম ক্ষমতাকে যেমন দুর্বল করেছে তেমনি জনগণের দুর্দশাকেই দুর্বিষহ করে তুলেছে।

এবার আসা যাক, বেলুচিস্তান প্রসঙ্গে। কৌশলগত অবস্থানের দিক দিয়ে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের জন্য যথেষ্ট গুরুত্ববহ। প্রথমত. এর দুই সীমান্তরেখায় অবস্থান করছে ইরান ও আফগানিস্তান। দ্বিতীয়ত. অন্য সীমান্তে রয়েছে আরব সাগরযার উপকূলে তৈরি করা হয়েছে সামরিক ও জ্বালানি কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর গোয়াদার। তৃতীয়ত. পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ যদি হয় যথাক্রমে কৃষি ও বাণিজ্যের প্রধান এলাকা, তাহলে বেলুচিস্তান বর্তমান সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সম্পদ জ্বালানির এলাকা। এখানকার গ্যাসই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের প্রধান উৎস। গোয়াদার বন্দর নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও রয়েছে টাগ অব ওয়ার। এই বন্দর নির্মাণে সাহায্যদাতা চীন। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এখানে নেই। আরব সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে নৌ যোগাযোগে চীনের এই উপস্থিতি পশ্চিমাদের জন্য সুখকর নয়। এছাড়াও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বিশেষ এই অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহনে বন্দরটি হতে পারে প্রধান অবলম্বন। এছাড়াও ওপাশেই ইরান, কৌশলগত কারণে এখানে তাই চীনের উপস্থিতি কোনোক্রমেই কাম্য নয় পশ্চিমা বিশ্বের।

এমন একটি পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্য বেলুচিস্তান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাঞ্জাব ও সিন্ধুর শাসনগণ যারা পাকিস্তানের ভাগ্য নিয়ন্তা, তাদের নির্বিচার শোষণ ও গোত্রনির্ভর সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের বিভাজন বালুচদের বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। তারা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের বাইরেও স্বাধীনতা চায়। ঐতিহাসিকভাবে বিরাজিত ও অসন্তোষ গণতান্ত্রিক মাত্রায় অবসান না করে পাকিস্তানের শাসনবর্গ বার বার এখানে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে এই বীতশ্রদ্ধতা আরো বাড়িয়েছে।

আর তৃতীয় সমস্যা যা হচ্ছে, পাকিস্তানের শাসকদের ধমনীতে প্রবাহিত দুর্নীতির শ্বেতকনিকা। সামরিক কিংবা বেসামরিক, অগণতান্ত্রিক কিংবা তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যে সরকারই ক্ষমতাসীন হয়েছে, তারাই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছে। ৬৬ বছরের ইতিহাসে বেশির ভাগ সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামরিক শাসনের অধীনে থাকায় দেশটি মূলত একটি জবাবদিহীহীন রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ফলে দুর্নীতি ও তার বেড়াজালে নিয়মশৃঙ্খলা রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর প্রমাণ মিলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর করাচী ও লাহোরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।

এমনই এক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে আর একটি নির্বাচন। এ জন্যই এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ, তাহচ্ছে এতকাল রাজনীতিতে এবং সে সুবাদে, নির্বাচনে রেফারির ভূমিকা পালন করতো সেনাবাহিনী। এবারই তারা অনুপস্থিত। ওসামা বিন লাদেন হত্যাকাণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী এই স্তম্ভটির ভিত আলগা হয়ে যায়। রেফারির আসনে অধিষ্ঠিত হন প্রধান বিচারপতি চৌধুরী ইফতেখারের নেতৃত্বে বিচার বিভাগ। এবার মূলত এই বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনে যদিও ১৪৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। কিন্তু তার প্রধান হচ্ছে তিনটি দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএলএন) ও ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিকইনসাফ।

ভুট্টো পরিবারের ইমেজ নিয়ে পিপিপি গত নির্বাচনে বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের পর জনগণের সহানুভূতি ভোটে বৃহত্তম দল হিসেবে কোয়ালিশন সরকার গড়ে। অন্যদিকে, পিএমএলএন প্রধান নওয়াজ শরীফ সরকার গঠনে সমর্থ না হলেও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ক্ষমতার ভারকেন্দ্র পাঞ্জাব প্রদেশের প্রাদেশিক সরকার গঠনে ঠিকই সমর্থ হয়। অন্যদিকে, প্রাক্তন ক্রিকেট আইকন পাঠান ইমরান খান রাজনীতিতে আবির্ভূত হন খেলোয়াড়ি ক্যারিশমা নিয়ে। তারই দল তেহরিকইনসাফ।

এবারের নির্বাচনে সরকার গঠন করবে হয় এই তিনটি দল বা তাদের যে কারো নেতৃত্বাধীন জোট। প্রশ্নটি আসে, এই নির্বাচনে কার ভাগ্যে শিকা খুলবে।

ক্ষমতা থেকে সদ্য বিদায়ী দল পিপিপির অবস্থান বেশ নড়বড়ে। যদিও তারাই প্রথম সরকার যারা প্রথমবারের মতো পুরো মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল। তারপরও দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে প্রবল। বিশেষ করে দেশটির আর্থিক ভিত ও জ্বালানি সঙ্কট এই সময়ে প্রকট আকার নেয়। বিচার বিভাগের সঙ্গে এ দলের সম্পর্কের টানাপোড়েন রয়েছে। আদালত পরপর দুজন প্রধানমন্ত্রীকে অবৈধ ঘোষণা করে। দলটির প্রধান নিয়ামক বেনজিরের স্বামী প্রেসিডেন্ট জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয় এবং তা নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে লুকোচুরি দলটির প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধই করে তুলেছে।

অন্যদিকে, ইমরান খান নতুন রাজনীতিতে এলেও ইতোমধ্যে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছেন জনমনে। তবে রয়েছে অভিজ্ঞতার অভাব। সবশেষে পিএমএলএন প্রধান নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে এর আগে ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। কিন্তু তা পুরনো হওয়ায় এবং পাঞ্জাব প্রদেশের কর্তৃত্ব থাকায় তার অবস্থান যথেষ্ট সুবিধাজনক বলে মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।

এর সঙ্গে একটি নাম আলোচনা না করলেই নয়। আর সে নামটি হচ্ছে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। তিনিও নির্বাচনে দল খাড়া করে প্রার্থী হয়েছেন। তবে বিচার বিভাগের সঙ্গে তার সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত। এছাড়াও পাকিস্তানের জনগণ ও উত্তরপঞ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষ ড্রোন হামলা বৈধ করার ব্যাপারে তাকেই দায়ী করে। ফলে নির্বাচনে তিনি কোন গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত হতে পারবেন বলে মনে হয় না।

সব বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে পিএমএলএনের অনুকূলেই বাতাস বইছে। এককভাবে না হলেও কোয়ালিশন সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন তিনি। তবে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাকে দুটি বিষয়ের মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমত. দেশটির প্রকট জ্বালানি সমস্যা এবং তা থেকে উৎসারিত উৎপাদনে মন্দা। অর্থাৎ সার্বিক বিচারে অর্থনৈতিক সঙ্কট।

দ্বিতীয়ত. নারী অধিকার। দেশটির নারীরা প্রায় অধিকার বঞ্চিত। অথচ ভোটারদের একটি বড় অংশ তারা। এছাড়াও রয়েছে তরুণ ভোটার। যারা মূলত ব্যালান্স ভোট। এদের বেশির ভাগ ভোট যারা পাবে তারাই জয়ী হবে। তাই সামনে যারাই ক্ষমতাসীন হোন, তাদের প্রতি নজর দিতে হবে।।