Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

সাক্ষাৎকার – সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

শাস্তি না হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার কারণেই সাভারের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে

Sultan Uddin Ahmedসৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের সহকারী নির্বাহী পরিচালক এবং গার্মেন্টস শিল্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। সাভারের প্রাণহানির ঘটনাসহ গার্মেন্টস শিল্পের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: একের পর এক গার্মেন্টস শিল্প কারখানায় প্রাণহানিসহ যে হতাহতের ঘটনা ঘটছে এর কারণ কি বলে আপনি মনে করছেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: এর মূল কারণ হচ্ছে, এমন একটা আবহ তৈরি করা হয়েছে যে, এ দেশে মালিকরা, বিশেষ করে গার্মেন্টস মালিকরা কোনো অপরাধ করলে তার বিচার এবং শাস্তি হবে না। সরকার এবং এর নানা প্রতিষ্ঠানই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যেহেতু গত বিশ বছরে কোনো ঘটনার কোনো বিচার হয়নি, উল্টো যারা বিচার চেয়েছে, আন্দোলন করেছে তাদের পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করানো হয়েছে। অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। সুতরাং আইন না মানার এবং অপরাধ করলেও কিছুই হবে না এমন নিশ্চয়তা যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, রাষ্ট্র এবং সরকারের পক্ষ থেকে, এর ফলশ্রুতি হচ্ছে, বর্তমানের নির্মম এই ঘটনাটি। এবারের ঘটনার একটি তাৎপর্য আছে। সাভার দুর্ঘটনার আগের যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা ছিল অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা। আগেরগুলোর কোনোটিই আগাম জানান দিয়ে আসেনি। কিন্তু সাভারের ঘটনাটি জানান দিয়ে এসেছে অর্থাৎ ঘটনার আগের দিন ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন শ্রমিকদের কর্মস্থলে ঢুকতে বাধ্য করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই শ্রমিকদের প্রতি চরম উদাসীনতা, অবহেলা, অবজ্ঞা এবং আইনের প্রতি চরম ঔদ্ব্যত্যা প্রকাশ করা হয়েছে।

আমাদের বুধবার: ইতোপূর্বে যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তার কোনো বিচার কেন হয়নি? কিন্তু মামলা তো করা হয়েছিল।

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: কারণ, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান দর্শন হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রা যারা আনে তাদেরকে কোনো প্রকার বিরক্ত না করা। এর মাধ্যমে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আরেকটি ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছে যে, এ শিল্পটি প্রচুর কর্মসংস্থান করছে এবং এর মালিকরা বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসছেন। তাছাড়া শিল্প এবং শিল্প মালিকদের অবিচ্ছেদ্য করা হয়েছে অর্থাৎ দুটো বিষয়কে এক করে ফেলা হয়েছে। শিল্প যে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এটি শ্রমিকমালিক, রাষ্ট্রীয় সহায়তা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরিস্থিতি, সব কিছু মিলিয়েই গড়ে উঠে। কিন্তু প্রচারপ্রচারণার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বোঝানো হচ্ছে, শিল্পের অর্থই হচ্ছে শিল্প মালিক। অর্থাৎ শুধুমাত্র উদ্যোক্তারাই এককভাবে একক প্রচেষ্টায় এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমেই তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ধরাছোয়ার বাইরে এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। আর এর মাধ্যমে মালিক তোশনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

আমাদের বুধবার: ইতোপূর্বে স্পেকট্রার্ম, তাজরিন ফ্যাশনস বা অন্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও মামলা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলাফল কী?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: যে মামলাগুলো হয়েছিল সেগুলো জনস্বার্থের মামলা। এসব মামলার ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া হয়, শাস্তির বিধান নেই। কিন্তু সরকার যদি প্রত্যেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করতো, তাহলে কিছু ব্যবস্থা নেয়া যেতো। কিন্তু শাস্তিও খুবই কম। এখানে বলা প্রয়োজন যে, আইনের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে বিস্তর। তারপরে যেটুকুও আছে, হয়তো কিছু হতো, কিন্তু তাও সরকার পরিচালনা করেনি। মামলা তো হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যায়।

আমাদের বুধবার: কেন হারিয়ে গেছে?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: কারণ, মামলা পরিচালনা করেনি। সরকারের যে দফতর এর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা যদিও বলে, তাদের জনবল নেই, কিন্তু আমরা মনে করি, তাদের জনবল, মনোবল কোনোটিই নেই। তাছাড়া যে মামলাগুলো হয়, তা কিন্তু পরিচালনা করতে হবে প্রথমত, শ্রম আদালতে এবং এটি পরিচালনা করতে হবে শ্রম পরিদফতরের। যে মামলাগুলো হয়, তার কোনোটি হয় ক্ষতিপূরণের, কোনোটি হয় জনস্বার্থে নির্দেশনা চেয়ে। কিন্তু প্রথমত এগুলো হচ্ছে শ্রম আইনের লঙ্ঘন। এর পরে হচ্ছে, ফৌজদারী আইনে মামলা। তাহলে মামলাটি চালাবে কে? শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলাটি চালাবে শ্রম পরিদফতর। আর ফৌজদারী আদালতে মামলা চালাবে সরকারি প্রশাসন অর্থাৎ পুলিশ। আর যে সব মামলাগুলো বেসরকারি সংস্থা বা মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে করা হচ্ছে, তাতে নির্দেশনা চাওয়া হয়। কাজেই শাস্তির ব্যবস্থাটা কোত্থেকে আসবে? মোদ্দা কথা, সরকারের উদাসীনতা, গাফিলতি এবং তোষননীতি পুরোপুরিভাবে কাজ করে। শুধু উদাসীনতা বা গাফিলতি হলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু একটি শিল্পকে কেন্দ্র করে ওই শিল্পের মালিককে ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমার্থক করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো কৃতিত্বই মালিকদের দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মালিকরা ধরাছোয়ার বাইরে। আর এই সুযোগ নিচ্ছে কতিপয় মালিক। কিন্তু হাতেগোনা দুই একটি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানে কোনো অঘটন ঘটেনি। কিন্তু সাভারের যে গার্মেন্টসগুলো তার মালিকরা ঔদ্ব্যতের সাহস কোথায় পেল? যেহেতু তারা জেনে গেছে, এই শিল্পের পুরো মালিকরাই আইনের ঊর্ধ্বে। আসল বিষয় হচ্ছে, কোনো শাস্তি না হওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার কারণেই সাভারের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এছাড়া আমাদের যে আইনকানুনগুলো রয়েছে, সেগুলোও সমন্বিত নয়, যথেষ্ট নয়। যে বিভাগগুলো এই আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে, তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই, যোগাযোগ নেই। দালান করছে একজন, নকশা অনুমোদন দিচ্ছেন আরেকজন, নিরাপত্তা দেখছেন অন্য আরেকজন এভাবেই চলছে।

আমাদের বুধবার: গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রে কমপ্ল্যায়েন্স বা সার্বিক সুরক্ষা এবং শ্রমিকরা যাতে সুস্থ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, তার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এটা কেন হলো না?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: বিদেশিদের প্রেসক্রিপশন দিয়ে তো আর বাংলাদেশ চলবে না। বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত নিরাপত্তা আইন থাকতে হবে। এবং সে আইন বাস্তবায়নের জন্য একক একটি কর্তৃপক্ষ থাকতে হবে। কিন্তু এটা হচ্ছে না কারণ, সরকার তো ধরেই নিয়েছে, এই শিল্পকে ধরাছোয়া এবং আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে নানা ধরনের অঘটন ঘটতেই থাকবে।

আমাদের বুধবার: সাভারে যে ঘটনাটি ঘটলো, তাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: কোনোটিকেই আমি দুর্ঘটনা বলবো না। কারণ, দুর্ঘটনা হচ্ছে, আপনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন কিন্তু ঘটনা ঘটে গেছে। আর এটির ক্ষেত্রে তো আগের দিন জানা গেছে যে, একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। তারপরও যখন শ্রমিকদের বাধ্য করা হয়েছে তা করা হয়েছে সচেতনভাবে, পরিকল্পিতভাবে। এটা অবশ্যই একটা হত্যাকাণ্ড। যারা বলছেন, এর প্রচারণা হলে শিল্পের ইমেজ নষ্ট হবে, তাদের প্রথম উচিত এই মালিকদের বলা, যে এই মালিকরাই শিল্পের ইমেজ ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত কিনা? কারণ, তাদের যে মানসিকতার জন্ম হয়েছে, এই শ্রমিক মারা গেলে আমাদের কিছু হবে না এই কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। সমস্ত গার্মেন্টস মালিকদের মধ্যে এই মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছে যে, যা কিছুই হোক, তারা আইনের ঊর্ধ্বে। এই মানসিকতার ফলশ্রুতিই সবকিছু। কাজেই, উদাহরণ সৃষ্টির জন্য শুধু সাভারের ঘটনার জন্য নয়, অতীতের সকল ঘটনার জন্য দায়ীদের গ্রেফতার করে শাস্তির বিধান করতে হবে। শুধু এদের শাস্তি দিলেই হবে না, এদের যারা পৃষ্ঠপোষক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট সকলকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

আমাদের বুধবার: অতীতের কিছু ঘটনার জন্য বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ব্যাপারে বর্হিবিশ্বে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, সাভারের ঘটনা তা আরো বাড়িয়ে দেবে?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: আমি তা মনে করি না এ কারণে যে, এই দুঃসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যদি আমরা খুব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। দু’ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে এক. দোষীদের যদি বিচারের আওতায় আনা যায় এবং সে বার্তা যদি বর্হিবিশ্বে পৌঁছে দেয়া যায়, দুই. আমরা যদি এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করি যার মাধ্যমে দৃশ্যমাণ উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়, তাহলে বর্হিবিশ্বে একটা ইতিবাচক বার্তা পৌছে যাবে। কিন্তু যারা প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বলেন, তাদের জানা উচিত, এটা তো নাটক মঞ্চস্থ করে প্রচারণা করা হচ্ছে না। ঘটনাটা ঘটেছে বলেই এই প্রচারণা হচ্ছে। ইমেজ চলে গেল, ইমেজ চলে গেল বলে চিৎকার চেচামেচি করে ইমেজ বৃদ্ধি হবে না। ইমেজ বৃদ্ধি করার একমাত্র পথ হচ্ছে, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বর্হিবিশ্বকে নিশ্চিত করা যে, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং উন্নয়নের দিকে যাচ্ছি। কিন্তু এ সব ব্যবস্থা যদি আমরা করতে অথবা করাতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা নিশ্চিহৃ হয়ে যাবো। পুরো ঘটনায় পুরো দেশবাসী ক্ষুব্ধ। এতো ক্ষুব্ধ মানুষের ক্ষোভকে অস্বীকার করা উপায় কী? মানুষের ভাষা বুঝতে হবে। সাভারে যা ঘটে গেছে, তা কিন্তু আর শ্রম বা শ্রমিকদের ইস্যু নয়, এটি এখন জাতীয় ইস্যু। মানুষ এই জীবনহানির শেষ দেখতে চায় এবং এটা শেষ করতে অথবা শেষ করাতে যদি রাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তাহলে পরিণতি ভয়াবহ।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।