Home » প্রচ্ছদ কথা » সাভার জানান দিয়ে গেছে রাষ্ট্রটিই বড্ড বেশি নড়বড়ে

সাভার জানান দিয়ে গেছে রাষ্ট্রটিই বড্ড বেশি নড়বড়ে

আমীর খসরু

savar 7গ্রীক নগর রাষ্ট্রসহ সে জমানার কথা আলোচনা না করলেও, বর্তমান পর্যায়ে এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামো, পথপদ্ধতি, দায় এবং দায়িত্বগত সর্বোপরি একটি কার্যকর সবল সজিব প্রতিষ্ঠানে রূপায়নের জন্য নিকোলো মেকিয়াভেলি থেকে শুরু করে জঁ জ্যাঁ রুশো পর্যন্ত যেসব দার্শনিক ও জ্ঞানীজন অপরিসীম চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাদের সব চিন্তাভাবনা তত্ত্ব, দর্শন বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে অচল। রাষ্ট্র ব্যবস্থার ব্যবস্থাপক হিসেবে সরকারকে যারা আরো গতিশীল ও জনমুখী করার জন্য প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা চালু করার নিরন্তর কাজ করে গেছেন তাদের সে সব মহান কীর্তি বাংলাদেশে বেমানান। শোষন, নির্যাতনের মাধ্যমে সংখ্যাগুরু শ্রমিকমজদুর, সাধারণ মানুষকে যারা অবিরাম বঞ্চিত করছে, তাদের হাত থেকে মুক্তির পথ যারা বাতলে দিয়েছেন, বাংলাদেশে তারা ব্রাত্যজন। কারণ, রাষ্ট্র কিভাবে সুচারুভাবে জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হবে এসব বিষয়ে যারা নিরন্তর সাধনা করে গেছেন, তাদের তত্ত্ব, দর্শন, চিন্তাভাবনা, আকাঙ্খা কোনো কিছুই এ দেশে চলে না, চলতে দেয়া হয় না। আজ সে সব মনীষী, দার্শনিক, রাজনৈতিক তত্ত্বের জন্মদাতারা বাংলাদেশে শুধু অচলই নয়, বড্ড বেশি অবহেলিত। কারণ, এখানকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি যেভাবে চলার কথা, সেভাবে চলে না। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক হিসেবে সরকার তার চলার নিজস্ব নিয়মকানুন তৈরি করে নিয়েছে। এখানে জনগণ নয়, দেশ নয়, দেশের স্বার্থ নয়, নিজ এবং কতিপয়ের স্বার্থই মুখ্য। রাষ্ট্র আর সাধারণের জন্য নয়, মুষ্ঠিমেয় ক্ষমতাবান এবং ক্ষমতাশ্রয়ী ব্যক্তিবর্গের জন্য। রাষ্ট্র এবং সরকার সাধারণের নয় এই ভাবনাই পুনরায় জনমনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে।

রাষ্ট্রটি যে সাধারণের নয়, মুষ্ঠিমেয় ক্ষমতাসীনদের, তার সবশেষ প্রমাণসাভারে ভবন ধসে শয়ে শয়ে মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা। এটা দ্বৈবদূর্বিপাক নয়, দুর্ঘটনা নয়, এটি একযোগে অসংখ্য মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা। আর এখানে কতিপয়ের কেউ নিহত হয়নি, কখনো হয়ও না, হয়েছেন সাধারণ মানুষ। যারা সেই কতিপয় বা মুষ্টিমের বৃত্তের বাইরে বিশাল জনগোষ্ঠী, তারাই বার বার এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। এরা শুধু সংখ্যা মানুষ নয়, মৃত্যুর আগে বা মৃত্যুর পরেও। এদের শুধু সংখ্যা হিসেবেই গণ্য করা হয়।

সেই সব মহান চিন্তাবিদদের বিপরীতে যে নিজস্ব দর্শন গড়ে উঠেছে অর্থাৎ সাধারণবর্গের কাউকে হত্যা করলে, নির্যাতন করলে, নিপীড়ন করলে কিছুই হয় না। এখানে জবাবদিহিতা নেই, আইন নেই, কানুন নেই।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি সচল না থাকার কারণে এখানে যে সরকার থাকে, তারা নিজেদের অসীম ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। আর কখনো কখনো সরকার প্রধান নিজেকেই মনে করেন রাষ্ট্র, সরকার সবকিছুই তিনি একাই। তিনি একক। এমন দুঃসময়ের মধ্যদিয়ে সাধারণ মানুষ দিন পার করে দিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে পরিস্থিতি আরো জটিল, ভয়াবহ এবং দুঃসহ হয়ে উঠছে।

সাভার ঘটনার পরে সেই সব সংখ্যাগুরু মানুষ যখন ক্ষোভেবিক্ষোভে উত্থাল, তখন সরকার নানা ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার ভবনটিতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। কিন্তু সাধারণের মধ্যেও যারা অনেক বেশি সাধারণ, সেই সব গার্মেন্টস শ্রমিকদের জোর করে ঢোকানো হয় কারখানাগুলোর মধ্যে। ওই দিন বিরোধীদলের হরতাল ছিল। ওই গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভেতরে ঢোকানো উদ্দেশ্য ছিল, হরতালবিরোধী মিছিল বড় হয়েছে তা প্রমাণ এবং পরবর্তীতে ঢাকায় একটি বড় সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য তাদের প্রস্তুত করা। কিন্তু ভবন যখন ধসে পড়লো, হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে তাদের বাঁচাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এগিয়ে এলেন না। তবে এলেন ভবনের মধ্যে আটকেপড়া প্রিয়ভাজন, নানা কর্মের অংশীদার ভবন মালিক রানাকে উদ্ধারের জন্য। উদ্ধার করে তাকে নিয়েও যাওয়া হলো। এবার শুরু হলো তাদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা। সবাই যখন দাবি করতে শুরু করলেন গ্রেফতারের, তখন ভবন ধসের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী এক বক্তৃতায় বললেন, এখন ধরো মারোর সময় নয়। এখন সময় হচ্ছে, উদ্ধার কাজের। অর্থাৎ এর মধ্যদিয়ে ভবন মালিক ক্ষমতাসীন দলের যুব শাখার স্থানীয় নেতাকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলো। যদি ওই সময়ই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিতেন, ভবন মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারের, তাহলে এতোটা সময় ব্যয় করতে হতো না এবং জনগণকে দেখতে হতো না গ্রেফতারের নাটকও। ঘটনার দিন বুধবারই স্থানীয় সংসদ সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি জিজ্ঞাসাবাদ করতো, তখনই ওই পর্যায়ের সমাপ্তি হতে পারতো। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মাত্রা এতো বেশি যে, এই মালিককে তাজরিন ফ্যাশনসের মতো গ্রেফতার থেকে বাঁচানো গেল না। সরকার এবং গার্মেন্টস মালিকদের জন্য এটি একটি বড় দুঃখ হিসেবেই রয়ে গেল।

মানুষের ক্ষোভ, ধিক্কার যখন তুঙ্গে তখন রানাকে গ্রেফতার দেখানো হলো। মনে করা হয়েছিল, এর মাধ্যমে খুবই কম স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভুলে যাবে এবং বাহবা দিতে শুরু করবে সরকার এবং সরকার প্রধানের। কিন্তু বার বার একই ঘটনা ঘটে না, ঘটতে পারে না।

কিন্তু এক রানাকে গ্রেফতারের মধ্যদিয়েই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? কয়েকজন গার্মেন্টস মালিককে গ্রেফতারই কি সব সমস্যার সমাধান? দেশব্যাপী হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ রানার যে উত্থান হয়েছে এবং এসব রানারা যে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, ক্ষমতাকে হাতে তুলে নিয়েছে, তাদেরকে বিষধর বৃক্ষে পরিণত করা হয়েছে, তা এখন স্পষ্ট। ভবন ধসের কারণেই জানা গেল, এখানে একজন রানা ছিল। ভবনটি না ধসে পড়লে জানাই যেত না যে, রানারা কি করতে পারে? জানাই যেত না রানাদের পৃষ্ঠপোষক কারা? কপালে চুমু দেয়ার ছবি, মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার ছবি, পোস্টার, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের স্বীকারোক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে দেয়া বক্তব্য, জনগণের ক্ষোভের পরেও প্রধানমন্ত্রী অবিরাম বলে যাচ্ছেন, রানা যুবলীগের কেউ নয়। কেউ নয় যদি সত্যি হয়, তাহলে ওই সব আলামত মিথ্যা! ছবি মিথ্যা, পোস্টার মিথ্যা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য মিথ্যা, মিথ্যা জনগণের চোখ এবং স্মৃতিশক্তি। কিন্তু ওই সব প্রমাণাদি যদি সত্যি হয় তাহলে? প্রধানমন্ত্রী অস্বীকার করার তত্ত্ব বেছে নিয়েছেন। আবার রানাদের বাঁচানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেছে নিয়েছেন, ঝাঁকুনি তত্ত্ব।

এই ধরনেরই এক তত্ত্বের কারণে নাশকতা, ষড়যন্ত্রের কথা বলে বাঁচানো গেছে তাজরিন ফ্যাশনসের মালিককে। ধামাচাপা দেয়া গেছে আরো অনেক ঘটনা।

অস্বীকার তত্ত্ব অবশ্য সরকারের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ছাত্রলীগযুবলীগের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিটেন্ডারবাজি, হত্যা, খুন, প্রকাশ্য রাজপথে অত্যাধুনিক অস্ত্র উঁচিয়ে বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা, সব কিছুই কি অস্বীকার তত্ত্বের আওতায় পড়ে? আড়িয়াল বিল, রূপগঞ্জ, রামপালসহ অসংখ্য স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ দমনে হত্যাকাণ্ড কি ওই তত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত? শেয়ারবাজারে লুটপাট, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতিসহ আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম আর ভাগবাটোয়ারাও কি ওই তত্ত্ব ভুক্ত? যৌন সন্ত্রাসীদের কারণে অসহায় কিশোরী থেকে নারীরা পর্যন্ত তাদের জীবন দিয়েছেন, আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। শিক্ষকমা, নানাসহ যারা ঘটনার নির্মম শিকার, তারাও কি এর মধ্যে পড়েন? কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতের যে হরিলুট, তাও কি অস্বীকার তত্ত্বের মধ্যে? যেসব গুম, খুন, বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এই সেদিন ১৭০ জনকে নিহত করার ঘটনাও কি একই কাতারে পড়বে? এভাবে তালিকা শুধু দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। কিন্তু এই হিসাব এতই দীর্ঘ যে, হিসাব মিলবে না, মেলানো যাবে না।

অবশ্য এই হিসাবনিকাশে ক্ষমতাসীনদের কিছুই যায় আসে না। কারণ, একদিকে তাদের ক্ষমতা আর বিপরীত চারিদিকে আজ সর্বনাশের হাওয়া। এই সর্বনাশের হাওয়ার সাম্প্রতিকতম সংযোজন, সাভারে ভবন ধসে অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণহানি। আর যারা অঙ্গ হারিয়ে বেঁচে গেছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কি? এটা নিশ্চিত, এই হিসাবও কোনোদিন মিলবে না। আরো কতো কি যে ঘটবে এই জনপদে, সে কথাও আমজনতা এখন জানে না। তবে একটি হিসাব মিলেছে, রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তি ও কতিপয়ের শাসন এবং কর্তৃত্ব যখন বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন সমগ্র ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তে বাধ্য। সাভারের ভবন ধস জানান দিয়ে গেছে রাষ্ট্রটিই এখন বড্ড বেশি নড়বড়ে।।