Home » অর্থনীতি » অর্থ বিনাশ, তবুও বিদ্যুৎ সঙ্কট

অর্থ বিনাশ, তবুও বিদ্যুৎ সঙ্কট

বি.ডি. রহমতউল্লাহ

coal power-1এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তীব্র বিদ্যুৎ সঙ্কট দেখা দেয়। কিন্তু এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার বদলে নতুন করে আরেক সঙ্কটের সৃষ্টি করা হয় এবং জিইয়ে রাখা হয় পুরনো সঙ্কটকেই। কেন এই সঙ্কট জিইয়ে রাখা হয়েছে এবং সঙ্কট উত্তরণের নামে নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে? এর কারণ খুবই সহজ রেন্টাল এবং কুইক রেন্টালের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন। আর এ কাজে যে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আর্শীবাদ এবং সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তা সবারই জানা। সরকার জনগণকে সহজে ও সস্তায় সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ দেবার পথে যায়নি। এরাও রেন্টাল মার্চেন্ট প্ল্যান্টসহ বিদেশ নির্ভর সব ধরণের প্রকল্প নির্মানে গেল এবং সমস্যাকে জিইয়ে রাখলো এবং সেজন্যই জনগণের স্বার্থবিনাশী রেন্টাল বিদ্যুৎ স্থাপনের সিদ্ধান্তটি তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করা হলো। কিন্তু আসল সমস্যার কোনো সমাধানই হয়নি। বরং রেন্টাল এবং কুইক রেন্টালের নামে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের আর্শীবাদপুষ্টরা লাভবান হচ্ছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশন স্থাপন করে ”আপৎকালীন” বিপদ থেকে উদ্ধারের নামে দ্বায়মুক্তি বিল এনে অনাকাক্সিক্ষত উচ্চ ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা যদি সমস্ত তথ্য নিয়ে স্থাপিত রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ট্যারিফ নির্ধারন করি, তাহলে দেখবো যে ডিজেল ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রগুলির প্রায় সবধরনের যন্ত্রপাতি পুরান বিবেচনায় সর্বোচ্চ ট্যারিফ দাঁড়ায় ৮ টাকা যেখানে এ ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে ১৪.৮০ টাকা। ফার্নেস ভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রগুলিও পুরান বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়ায় ৬.৬০ টাকা, সেখানে ট্যারিফ ধার্য্য করা হয়েছে ৮.৮০টাকা অর্থাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি প্রতারণা করা হচ্ছে ৬.৮০ টাকা আর ফানের্সের ক্ষেত্রে ২.২০ টাকা। এতে বলা যায় যে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক বড় ধরনের ফাঁদে ফেলে দেয়া হয়েছে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, রেন্টাল হিসেবে স্থাপিত সর্Ÿমোট ৩ হাজার মেগাওয়াটের ক্ষমতার মধ্যে গ্যাসচালিত কেন্দ্রের সংখ্যা ৮শ মেগাওয়াট, আর তেল চালিত কেন্দ্রের সংখ্যা হলো ২২শ মেগাওয়াট। অর্থ্যাৎ প্রধানমন্ত্রীর দাবীকৃত ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঠিকই বসানো হয়েছে। কিন্তু এ এমন এক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র যা চালালে রাষ্ট্রের কোষাগার নিঃশেষিত হতে থাকবে। এই ৩ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে যদি মাত্র ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় ট্যারিফ বৃদ্ধি করার পরও ভর্তুকির পরিমান দাঁড়ায় বার্ষিক ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর যদি স্থাপিত ৩ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার মধ্যে সিষ্টেমে ২ হাজার মেগাওয়াট চালু করা হয় তাহলে, ভর্তুকির পরিমান দাঁড়ায় বার্ষিক ৩৬ হাজার কোটি টাকা। যার জন্যেই কার্যাদেশ দেয়ার পরও শুধু ভর্তুকির ভয়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের রেন্টাল বসাবার পরও মাত্র ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশী চালু রাখতে সাহস পাচ্ছে না। ২ হাজার মেগাওয়াট চালু না রাখলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী রেন্টাল ওয়ালাদের বসিয়ে বসিয়ে মাসে মাসে অহেতুক ভাড়ার জন্য ১ হাজার কোটি টাকা দিতে হচ্ছে।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল যে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু সরকার সেদিকে কোনদিনই দৃষ্টি দেয়নি। পাকিস্তান প্রায় সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও সেদেশের আদালত রেন্টাল বন্ধ ও রেন্টালের মদদদাতা প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারের নির্দেশদানের এক যুগান্তকারী রায়দানের মাধ্যমে দেশরক্ষার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অবশ্যই তাদের জন্য এক অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশে সরকার গৃহীত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্রকল্পসহ জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন কর্মসূচী অর্থনীতি ও দেশের জ্বালানী খাতের জন্য এর চেয়েও আরো বিনাশী হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের দেশের সুশীল সমাজ, পেশাজীবিসহ সবাই নিষ্ক্রিয়, নির্জীব হয়ে বসে আছেন।

বাংলাদেশে অধিকাংশ রেন্টাল দলীয় লোক সমর্থকদের দেয়া হয়েছে। যাদের কারোরই আইন অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত প্যাকেজ নির্মিত রেডিমেইড কোন রেন্টালতো অভিজ্ঞতা ছিলই না, অধিকাংশের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কথা বাদ দিলাম, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিষয়েও অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই মুনাফা জন্য বিদ্যুৎ খাতের সংকটগুলোকে ইচ্ছে করে জিইয়ে রাখা হয়েছে এবং দলীয়করণ করা হয়েছে, তা কি সত্যে পরিণত হয় নি?

অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের হিসেব ও পরামর্শ অনুযায়ী, খুব অল্প সময় এবং কম ব্যয়ে বর্তমানের ২শ থেকে ৫শ মেগাওয়াট ঘাটতি পূরণ করে বরং আরও কিছু বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। পুরোনো অদক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদনগুলোকে নবায়ন করে ১শ মেগাওয়াট, কোজেনারেশনের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানীর মাধ্যমে ১৫শ মেগাওয়াট অর্থাৎ ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করা যেতো ৩ হাজার মেগাওয়াট ওয়াট। লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৫শ মেগাওয়াট সাশ্রয় অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ৫শ মেগাওয়াট হয় সাশ্রয় কিংবা উৎপাদন বৃদ্ধি করে সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের ১২ মাসের মধ্যে সিষ্টেমের নির্ভরশীলতা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি করা যেতো। আর এ কাজে সর্Ÿমোট ব্যয় হতো সর্Ÿাধিক ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা, যা রেন্টাল খাতের বার্ষিক ভর্তুকিতে দেয়া ২৮ হাজার কোটি টাকার মাত্র ১৪ শতাংশ। রেন্টালে বসানোর ফলে আরও যে ব্যতয়গুলি প্রতিভাত হয়ে উঠছে সে গুলো হলো ঃ রেন্টাল সিস্টেমে টেন্ডার পরিহার করার ফলে নিম্নমানের কাজ হয়, জনেজনে আলাপের মাধ্যমে কার্যাদেশ ইচ্ছে মতো দর বৃদ্ধির সুযোগই থাকে না, এ ধরনের “আলাপী টেন্ডার”এর ফলে কতো পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বসানো যায় বিধায় দক্ষ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তুলনায় সমপরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১২৫ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশ বেশী জ্বালানী ব্যবহৃত হয় তাতে জ্বালানী বাবদ বিপুল অর্থের অপচয় হয়, বিদ্যুতের অহেতুক দর বাড়ে, দূষণ বৃদ্ধি পায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানী সরকার কর্তৃক সাবসিডি রেটে সরবরাহ করা হয় বলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারীরা প্রচুর অপচয় করছে এবং জ্বালানীর হিসেব গড়মিল করে বাজারে বিক্রি করার সুযোগ নিচ্ছে, পুরনো উৎপাদন কেন্দ্র বসানো হয় বলে উৎপাদন কেন্দ্রের নির্ভরশীলতা অত্যন্ত কম। ইতোমধ্যেই স্থাপিত রেন্টালের ৩ হাজার মেগাওয়াট এর মধ্যে বর্তমানে সর্বাধিক ১ হাজার থেকে ১২শ মেগাওয়াট চালু আছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের নিরসনে এই অবৈধ প্রক্রিয়া থেকে অবিলম্বে বের হওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। যতোদিন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকবে, ততোদিন গুনতে হবে হাজার হাজার কোটি টাকা। এটি হচ্ছে এমন এক পথ, যেখানে অর্থ শুধু বিনাশই হবে, বিদ্যুতের সঙ্কট কোনোদিনই সমাধান হবে না।।